সিপিবির পথ পরিক্রমণের তথ্য-কণিকা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একতা ডেস্ক : এই কলামটি সাপ্তাহিক একতার ৫৬ বর্ষের সংখ্যা-৩২ থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে। আজ মুদ্রিত হচ্ছে তার ১৯তম কিস্তি। (১৯) মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশের) কমিউনিস্ট পার্টির প্রচারিত লিফলেট- (বানানরীতি অপরিবর্তিত) শত্রু বাহিনীকে মোকাবেলায় প্রস্তুত হউন গণস্বার্থে স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অব্যাহত রাখুন ভাইসব, বাংলা দেশের জনগণ আজ গণতন্ত্র ও নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এখানে একটা পৃথক ও স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র কায়েম করিতে বদ্ধ পরিকর হইয়াছেন এবং এই জন্য এক গৌরবময় সংগ্রাম চালাইতেছেন। এই সংগ্রামে জনগণ সশস্ত্র সেনাবাহিনীকে অসীম সাহসিকতার সহিত মোকাবেলা করিতেছেন এবং নিজেদের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য বুকের রক্ত ঢালিতেও দ্বিধা করিতেছেন না। কমিউনিস্ট পার্টি পূর্ব বাংলার সংগ্রামী বীর জনগণকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাইতেছে। পূর্ব বাংলার কমিউনিস্টরা দীর্ঘকাল হইতেই বাঙালী সহ পাকিস্তানের সকল ভাষাভাষী জাতির বিচ্ছিন্ন হইয়া পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের অধিকার তথা আত্ম-নিয়ন্ত্রণ অধিকার দাবী করিয়া আসিতেছে। পূর্ব বাংলার জনগণ আজ অনেক ঘটনার ঘাত প্রতিঘাতের ভিতর দিয়া পূর্ব বাংলায় একটি পৃথক ও স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের যে দাবী উত্থাপন করিয়াছেন, আমরা উহাকে ন্যায্য মনে করি, তাই পূর্ব বাংলার জনগণের বর্তমান সংগ্রামে আমরাও সর্বশক্তি লইয়া শরিক হইয়াছি। জনগণের দুশমন কাহারা? বাংলা দেশে পৃথক ও স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের এই সংগ্রামে জনগণের দুশমন হইল পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠী ও বর্তমান সামরিক সরকার। পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠী বিদেশী সাম্রাজ্যবাদ বিশেষতঃ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, বড় বড় .... একচেটিয়া পুঁজির মালিক ২২টি পরিবারের কায়েমী স্বার্থ রক্ষার.... স্বার্থে শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার সমগ্র জনগণকে জাতীয় অধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার হইতে আগাগোড়া বঞ্চিত করিয়াছে। আজও উহাদের স্বার্থেই ইয়াহিয়া সরকার প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী সমূহের নেতা ভূট্টোর সহিত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হইয়া জাতীয় পরিষদের অধিবেশন নস্যাৎ করে ও গণতন্ত্র, জাতীয় অধিকার এবং শাসন ক্ষমতা হস্তান্তরের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে। এই প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার জনগণের বর্তমান সংগ্রামকে দমনের জন্য ষড়যন্ত্র লিপ্ত রহিয়াছে এবং সেনাবাহিনীকে জনগণের বিরুদ্ধে নিয়োগ করিয়াছে। সেনাবাহিনী পূর্ব বাংলায় ইতিমধ্যেই গণ হত্যা ঘটাইয়াছে ও রক্তের বন্যায় পূর্ব বাংলার জনতার সংগ্রামকে স্তব্ধ করিবার জন্য সেনাবাহিনী প্রস্তুত হইয়া রহিয়াছে। তাই বাংলা দেশের জনগণের দুশমন হইল সাম্রাজ্যবাদ-সামন্তবাদ ও একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থরক্ষাকারী সরকার ও উহাদের সেনাবাহিনী। পশ্চিম পাকিস্তানের পাঠান, বেলুচ, সিন্ধি, পাঞ্জাবী জাতি সমূহের মেহনতী জনতা পূর্ব বাংলার জনগণের শত্রু নয়। বরং পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের গণতন্ত্র ও বিভিন্ন জাতিগুলির জাতীয় অধিকারকেও পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠীই নস্যাৎ করিয়া রাখিয়াছে। পূর্ব বাংলার অবাঙালী উর্দু ভাষাভাষী মেহনতী জনগণকেও ঐ শাসকগোষ্ঠী শোষণ ও নিপীড়ন করিতেছে। তাই, ঐ দুশমনদের পরাজিত করিয়া বাংলা দেশের জনগণের দাবী কায়েম করার জন্য আজ এখানে গড়িয়া তুলিতে হইবে বাঙালী-অবাঙালী, হিন্দু-মুসলমান জনগণের দুর্ভেদ্য একতা। ঐ দুশমনদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে বাংলা দেশের জনগণকে বেলুচ-পাঠান-সিন্ধি-পাঞ্জাবী মেহনতী জনগণকে মিত্র বলিয়া মনে করিতে হইবে এবং পূর্ব বাংলার সংগ্রামে তাঁহাদের সাহায্য পাইতে সর্বদাই সচেষ্ট থাকিতে হইবে। এই সংগ্রামে এখানকার জনগণের সুদৃঢ় ঐক্য ও বেলুচ-পাঠান প্রভৃতির সমর্থন যত বেশী গড়িয়া উঠিবে গণ-দুষমনদের পরাজয়ও ততই নিশ্চিত হইবে। প্রকৃত মুক্তির লক্ষ্যে অবিচল থাকুন ঐক্যবদ্ধ গণ শক্তি ও জনতার সংগ্রামের জোরে গণদুষমনদের ও উহাদের সেনাবাহিনীকে পরাস্ত করিয়া এখানে জনগণের দাবী মতে ‘স্বাধীন গণতান্ত্রিক বাংলা’ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অগ্রসর করিয়া লইতে হইবে। কিন্তু স্বাধীন বাংলা যাহাতে সাম্রাজ্যবাদীদের ডলারের শৃংখলে বাঁধা না পড়ে, স্বাধীন বাংলার কৃষক ও সমাজের উপর যাহাতে জোতদার মহাজনদের শোষণ না থাকে, স্বাধীন বাংলায় যাহাতে শ্রমিক ও সর্বসাধারণকে পুনরায় পুঁজিপতিদের শোষণ ও নিপীড়নে ধুকিয়া ধুকিয়া মরিতে না হয়, সেজন্য ও সংগ্রামকে সঠিক ভাবে আগাইয়া লওয়ার জন্য কমিউনিস্ট পার্টি শ্রমিক-কৃষক-ছাত্র-মধ্যবিত্ত জনতাকে তাহাদের সংগ্রাম আগাইয়া লওয়ার আহ্বান জানাইতেছে। কমিউনিস্ট পার্টি বাংলা দেশে এমন একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামের আহ্বান জানাইতেছে যেখানে সাম্রাজ্যবাদ-সামন্তবাদ উচ্ছেদ করিয়া ও পুঁজিবাদী বিকাশের পথ পরিহার করিয়া জনগণের স্বার্থে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সমাধা করা ও সমাজতন্ত্রের পথে অগ্রসর হইবার বিপ্লবী পথ উন্মুক্ত হইতে পারে। বিভ্রান্ত হইবেন না কতগুলি তথাকথিত “কমিউনিস্ট পার্টি” জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য “ধর্মঘট অসহযোগ আন্দোলন প্রভৃতির প্রয়োজন নাই”, “গ্রামে গ্রামে কৃষি বিপ্লব শুরু কর”, “জোতদারদের গলা কাট” প্রভৃতি আওয়াজ তুলিতেছে। কোন কোন নেতা “স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠা হইয়া গিয়াছে” বলিয়া ধ্বনি তুলিয়া আজিকার গণ সংগ্রামের উদ্দীপনা, সংকল্প ও প্রস্তুতিতে ভাটা আনিয়া দিতে চাহিতেছেন। মার্কিন এজেন্টরা এই সংগ্রামে অনুপ্রবেশ করিয়া সংগ্রামকে বিপথগামী করার প্রচেষ্টা করিতে পারে। শাসকগোষ্ঠী ও প্রতিক্রিয়াশীলদের উস্কানিতে সমাজবিরোধী দুষ্কৃতকারীরা দাঙ্গা-হাঙ্গামা লুঠ-তরাজ প্রভৃতি বাঁধাইয়া সংগ্রামকে বিনষ্ট করিতে তৎপর হইতে পারে। এই সকল বিষয়ে হুঁশিয়ার ও সজাগ থাকার জন্য আমরা জনগণের প্রতি আহ্বান জানাইতেছি। দৃঢ় সংকল্প বজায় রাখুন বাংলা দেশের জনগণ আজ অভূতপূর্ব দৃঢ়তা ও একতার সাথে অফিস-আদালতে হরতাল, খাজনা, ট্যাক্স বন্ধ প্রভৃতির যে সংগ্রাম চালাইতেছেন, সে সংগ্রাম ইতিমধ্যেই ইতিহাসে এক নতুন নজীর স্থাপন করিয়াছে। সামরিক সরকারের হুমকি, দমননীতি, অভাব অনটন প্রভৃতির মধ্যেও সে সংগ্রাম শিথিল বা দমিত হইবে না এবং শত্রুর নিকট আমরা কখনও নতি স্বীকার করিব না—এই বজ্রদৃঢ় সংকল্প আজ বাংলার ঘরে ঘরে জাগিয়া উঠুক। ..... সেনাবাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করুন বস্তুতঃ হরতাল, লক্ষ লক্ষ জনতার সমাবেশ, মিছিল, সরকারী অফিস-আদালত ও সামরিক বাহিনীর সহিত অসহযোগ প্রভৃতি শান্তিপূর্ণ পন্থায় বর্তমান পর্যায়ে জনগণের আকাঙ্ক্ষিত স্বতন্ত্র স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালাইতে হইবে। কিন্তু জনগণকে আজ সংগ্রাম করিতে হইতেছে প্রত্যক্ষভাবে সশস্ত্র সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। তাই শান্তিপূর্ণ পন্থায় শেষ পর্যন্ত জনগণের সংগ্রাম বিদ্বেষী হইবে এইরূপ মনে করিবার কারণ নাই। প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠীর আজ্ঞাবহ সেনাবাহিনী জনগণের উপর সশস্ত্র হামলা শুরু করিতে পারে। তাই আত্মরক্ষার কোন কারণ নাই। সংগ্রাম যে কোন সময়ে সূক্ষ্ম রূপ ধারণ করিতে পারে। এই অবস্থায় স্বতঃস্ফূর্ততার উপর নির্ভর না করিয়া সুশৃঙ্খলভাবে সংগ্রামের সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করা দরকার। সেনাবাহিনীর আক্রমণ মোকাবেলা ও উহা প্রতিরোধ করার জন্য শহর-গ্রাম সর্বত্র জনগণকে সংগঠিতভাবে প্রস্তুত হইবার জন্য আমরা জনগণের প্রতি আহ্বান জানাইতেছি। এইজন্য পাড়ায়, মহল্লায়, গ্রামে, কল-কারখানায় সর্বত্র দলমত নির্বিশেষে সমস্ত শক্তি নিয়া গড়িয়া তুলুন স্থানীয় সংগ্রাম কমিটি ও গণবাহিনী। সেনাবাহিনী আক্রমণ করিলে উহা প্রতিরোধের জন্য ব্যারিকেড গঠন করুন, যার যাহা আছে উহা দিয়েই শত্রুকে প্রতিহত করুন। শ্রমিক-কৃষক-ভাইরা এগিয়ে আসুন আজিকার সংগ্রাম জনগণের ন্যায্য সংগ্রাম। পশুশক্তির বিরুদ্ধে এই সংগ্রামে বিজয়ের বজ্রকঠিন শপথ ও সংকল্প নিয়া আগুয়ান হওয়ার জন্য পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি আজ নারী-পুরুষ, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বাংলা দেশের সমস্ত জনগণকে বিশেষতঃ শ্রমিক, শহরের গরীব বস্তিবাসী, কৃষক ও ছাত্র সমাজের প্রতি আহ্বান জানাইতেছে। সাহসের সহিত শত্রুর বিরুদ্ধে সঠিকভাবে সংগ্রাম চালাইতে পারিলে আমাদের জনগণের বিজয় নিশ্চিত। ঢাকা ১৯.৩.৭১ কেন্দ্রীয় কমিটি পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..