সরকারের পাঁচ মাস

দুষ্টচক্রে পুনরাবৃত্তির আভাস

মঞ্জুর মঈন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের পাঁচ মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। অভিজ্ঞ লোকেরা বলে থাকেন ‘সূচনা দেখেই পরিণতি বোঝা যায়’। সেই প্রবাদে আস্থা রাখলে আমাদের সামনে বেশ দুর্গতিই আছে। চটকদার প্রচার প্রচারণার আড়ালে নতুন সরকার সেই একই পুরাতন দুঃশাসনের দুষ্টচক্রে আবর্তিত হচ্ছে। কোন পথে অর্থনীতি ইতিমধ্যে জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের বাজেট গৃহীত হয়েছে। অর্থনৈতিক নীতি হিসেবে সরকার আইএমএফ কেন্দ্রিক নতুন কর্মসূচির পথে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশ ২০২৩ সাল থেকে ‘আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল’ বা আইএমএফ-এর সাথে একটা সাড়ে ৫ বিলিয়ন ডলারের ‘বেইলআউট’ কর্মসূচিতে চুক্তিবদ্ধ ছিল। নতুন সরকার সেই পুরাতন চুক্তির পরিবর্তে নতুন চুক্তির মধ্যদিয়ে আইএমএফ নির্ধারিত সংস্কার কর্মসূচি শুরু করতে চায়। সবকিছু সেভাবেই অগ্রসর হচ্ছে। দেশের সামনে অত্যাসন্ন সমূহ অর্থনৈতিক সংকট সামাল দিতে সরকার সেই পুরাতন পথ আর আইএমএফ কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক দুষ্টচক্রেই আবর্তিত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই পুরাতন জিনিসের নতুন নাম তারা দিয়েছে ‘ধাপে ধাপে সংস্কার’। যুক্তি হলো, ‘একসঙ্গে সব কঠিন সংস্কার বাস্তবায়ন করলে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে’। অর্থাৎ ধাপে ধাপে তারা একই গণবিরোধী অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়ন করবে। সরকারের এই আইএমএফ নির্ধারিত তথাকথিত অর্থনৈতিক সংস্কার প্যাকেজে কি আছে? রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার করে করছাড় কমানো এবং কর আদায় বাড়ানো। তাই এবারের বাজেটেও দেখা যায়, করের আওতা বৃদ্ধি করার নামে আরো বেশি মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের জাল বিছানো হয়েছে। যার ফলাফল হবে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, নিম্ন আয়ের মানুষের অপর আরো শোষণ এবং আরো উচ্চ হারে মুদ্রাস্ফীতি। আমরা যেটাকে বিনিয়োগ বা সাধারণ মানুষকে দেয়া রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা বলি সেটাকেই ভর্তুকি আখ্যা দিয়ে ক্রমাগত জ্বালানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ইত্যাদির মূল্যবৃদ্ধি করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকবে। সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের নামে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের বেসরকারিকরণ আরো জোরের সাথে চলবে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমানোর নামে যাদের শ্রমে-ঘামে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন হয় তাদের এর সরাসরি সুবিধা পাওয়া থেকে বঞ্চিত করা হবে। সরকারের তথাকথিত ‘ব্যবসাবান্ধব নীতির’ আড়ালে এই অর্থের সরাসরি সুবিধা পাবে ব্যাংক মালিকগোষ্ঠীসহ দেশের মুষ্ঠিমেয় ধনিকগোষ্ঠী। দেশের জাতীয় উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা বলে আদৌ কিছু আছে কিনা মানুষ জানে না; ক্ষমতাসীন সরকারের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার বা নির্বাচনপূর্ব প্রতিশ্রুতি যা আমরা শুনেছি সেগুলোও বাস্তবায়ন অসম্ভব যদি আইএমএফ নির্ধারিত সংস্কার কর্মসূচির পথ ধরে দেশের অর্থনীতি চলে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুসারে দেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ প্রায় ১১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা সাড়ে ১৩ লক্ষ কোটি টাকার সমান। এবারের গৃহীত বাজেটের আকার ৯ লক্ষ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। সরকারের সকল পরিকল্পনা যদি শতভাগ বাস্তবায়ন হয়, তবুও ব্যয়ের এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে আরো আড়াই লক্ষ কোটি টাকা দেশি বিদেশি উৎস থেকে নতুন ঋণ নিতে হবে। সরকার কোনোভাবেই স্বীকার করবে না, কিন্তু এই বাজেটে এককভাবে সবচেয়ে বড় খাত হলো ঋণের সুদ পরিশোধের খাত। সরকারের এ বছর শুধু সুদ পরিশোধ করতেই ব্যয় হবে ১ লক্ষ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ সরকারের প্রতি ১০০ টাকা ব্যয়ে ১৩ টাকা ৬০ পয়সা যাবে ঋণের সুদ পরিশোধ করতে। রাষ্ট্রের অর্জিত রাজস্বের একটি বড় অংশ যখন ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়, তখন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর আস্থা রাখা কি সম্ভব? এই প্রশ্নের চেয়েও বড় প্রশ্ন সরকার কি আদৌ এই অর্থনৈতিক দুষ্টচক্র থেকে বের হতে চায়? উত্তর সকলেরই জানা; না, চায় না। উৎপাদনশীল বিনিয়োগ কোথায় দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীল বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি এই দুইয়ের দায় আসলে কার? যারা ক্ষমতায় আছেন, কেন তারা দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই দুটি চ্যালেঞ্জের বিষয়ে নিজস্ব ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের কোন পরিকল্পনা ও আশ্বাস মানুষের সামনে হাজির করতে পারেন না? আমদানি ও ভোগব্যয় ক্রমেই বেড়ে চলেছে। কিন্তু শিল্পায়ন, প্রযুক্তি, কৃষির আধুনিকায়ন, গবেষণা এবং উচ্চ মূল্যসংযোজনকারী উৎপাদন খাতে সেই তুলনায় তেমন কোনো বিনিয়োগ নেই। নতুন ও টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এমন কোন বিশ্বাসযোগ্য উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, তাদের জন্য ন্যূনতম মানসম্মত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যাচ্ছে না। সরকারের প্রচার আর বিনিয়োগ উন্নয়ন বোর্ডের বিজ্ঞাপন দেখে মনে হচ্ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি কেবল বেসরকারি খাতের দায়িত্ব। আর উদারীকরণের মধ্য দিয়ে সব রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি কতিপয় মালিকের মুনাফা ভোগের জন্য বিলি বিতরণ করাই সরকারের একমাত্র কাজ। তাদের বোকা বোকা কথা শুনে মনে হয়, বাংলাদেশে পানির দামে শ্রম, ভূমি, প্রাকৃতিক সম্পদ, অবকাঠামো সুবিধা ইত্যাদি পাওয়া যাচ্ছে এবং সাথে আছে অবাধ লুণ্ঠনের অনন্য সুযোগ; এই খবর দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে পড়লেই বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগের জোয়ারে ভেসে যাবে। অথচ উৎপাদনমুখী শিল্পনীতি প্রণয়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে অর্থায়ন, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা, কৃষি ও শিল্পের সমন্বিত বিকাশ এবং মানবিক মর্যাদা নিয়ে বাঁচা ও শ্রমশক্তি বিকশিত হওয়ার মত শ্রম পরিবেশ নিশ্চিত করা এগুলো হলো রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। ইস্পাত, বস্ত্র, রাসায়নিক, চিনি, খাদ্য ও পাট খাতের ৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত করপোরেশনের অধীনে থাকা ৪৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ১০ হাজার একরেরও বেশি জমি, বিদ্যমান ভবন, ইউটিলিটি সংযোগ ও শিল্প অবকাঠামো সব কিছু এক অর্থে নিলামে তোলা হয়েছে। এত বিপুল সম্পদকে বলা হচ্ছে রাষ্ট্রের বোঝা। দীর্ঘমেয়াদি বরাদ্দ প্রদানের মধ্য সরকার এই বোঝা নিজের কাঁধ থেকে নামাতে চায়। উন্নয়ন বাজেট নামে পরিচিত বাৎসরিক উন্নয়ন প্রকল্প বা এডিপি ২ লক্ষ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। যার একটা বড় অংশ ব্যয় হবে প্রশাসনিক ও অনুৎপাদনশীল খাতে। আর সাথে অপচয়, দুর্নীতি ও অদক্ষতা তো আছেই। ফলে দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীল বিনিয়োগের অভাবে একদিকে টেকসই কর্মসংস্থান হবে না, অন্যদিকে কর্মসংস্থানবিহীন তথাকথিত ‘প্রবৃদ্ধি’ শেষ পর্যন্ত বৈষম্য, অনিশ্চয়তা এবং অধিকার ও মর্যাদাহীন মানুষের দীর্ঘশ্বাস বৃদ্ধি করবে। বিপর্যস্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পাঁচ মাস অতিবাহিত হলেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি ঘটেনি; বরং অনেক ক্ষেত্রে জননিরাপত্তাহীনতা আরও প্রকট হয়েছে। হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, নিপীড়ন মব সহিংসতা এবং রাজনৈতিক সংঘর্ষের ঘটনায় সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বেড়েছে। একের পর এক অপরাধ সংঘটিত হলেও দ্রুত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়ার তেমন কোনো নিশ্চয়তা না থাকায় দায়মুক্তির সংস্কৃতিই অব্যাহত আছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি, পেশাদারিত্ব, জবাবদিহি ও আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করার নতুন করে প্রশাসনিক দলীয়করণ চলছে। নাগরিকের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা যত বক্তৃতাবাজী করছেন, পরিস্থিতি তার চেয়েও দ্রুত খারাপ হচ্ছে। রাষ্ট্র সংস্কার প্রসঙ্গ জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কিংবা বর্তমান সরকার উভয়ই রাষ্ট্র সংস্কারের কথা অনেক উঁচু গলায় বলেছে। সাম্যবাদের আদর্শে বিশ্বাসীরা যদিও মনে করে সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ছাড়া মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন সম্ভব নয়। তবুও মানুষের অধিকার এবং গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য যতদূর অগ্রসর হওয়া যায় ততটুকুই মঙ্গল, এই আকাঙ্ক্ষার থেকে উভয় সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের উপর দৃষ্টি রেখেছে। সাংবিধানিক, প্রশাসনিক, বিচারিক, নির্বাচন ব্যবস্থা, শ্রম, নারী ও দুর্নীতি দমনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের লক্ষ্যে একাধিক কমিশন গঠন এবং সুপারিশ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কোনো এক নেপথ্যের কারণ দ্বারা পরিচালিত হয়ে সকল সংস্কার কার্যক্রমকে এক ‘সংবিধানের মূলনীতি পরিবর্তন’ বিতর্কে জড়িয়ে গোটা বিষয়টাকেই গোলমেলে অবস্থায় পর্যবসিত করেছে। ফলাফল হিসেবে সংসদের তথাকথিত বিরোধী দল নতুন সংবিধান রচনার দাবিকে রাজনীতির কেন্দ্রীয় বিষয়ে পরিণত করতে চাচ্ছে। সংসদে গ্রামীণ ব্যাংক (সংশোধন) অধ্যাদেশসহ কেবলমাত্র নাম পরিবর্তন সংক্রান্ত বহু অধ্যাদেশ হুবহু অনুমোদিত হলেও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সম্পর্কিত ৪টি অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, পাবলিক অডিট অধ্যাদেশের মত জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো হারিয়ে গেছে। এত প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে প্রাণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা ব্যর্থ হয়েছে। সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিস্তৃত ঐকমত্য গড়ে তোলা, সংস্কার প্রক্রিয়ায় জনঅংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের ইচ্ছাকৃত ব্যর্থতাই কেবল কমিশন গঠন বা প্রতিবেদন প্রকাশের মধ্য দিয়ে গণঅভ্যুত্থানে প্রকাশিত মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে কবর দিয়েছে। ফলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধি, ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন নিশ্চিতকরণ এবং নাগরিকের অধিকার ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টি জনগণের লড়াইয়ের উপরেই নির্ভরশীল থেকে যাচ্ছে। দুর্নীতি, ঋণখেলাপি, ব্যাংক লুটসহ অর্থনৈতিক অপরাধের বিচার ও প্রতিকার বাংলাদেশ এখনো পায়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদকাল ও বর্তমান সরকারের পাঁচ মাসে কিছু আলোচিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা, সম্পদ জব্দ, তদন্ত এবং ব্যাংকিং খাতে অনিয়মের অনুসন্ধান শুরু হলেও সামগ্রিকভাবে দৃশ্যমান অর্জন তেমন কিছু নেই। লক্ষ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার, অর্থপাচারকারীদের বিচারের আওতায় আনা, বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ ফেরত আনা এবং প্রভাবশালী অর্থনৈতিক অপরাধীদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এখনো দেখা যায়নি। একই সঙ্গে বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, তদন্তের ধীরগতি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আইন প্রয়োগের প্রশ্নেও জনমনে যথেষ্ট উদ্বেগ আছে। দুর্নীতিবিরোধী অভিযান তখনই বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করবে, যখন তা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীভিত্তিক নয়, বরং আইনের সমান প্রয়োগ, দ্রুত বিচার, সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যাবে। জুলাই গণহত্যার বিচার তদন্ত, অভিযোগ গঠন এবং বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু করার ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি হলেও, জুলাই গণহত্যার বিচার কার্যক্রম সঠিক পথে এগোচ্ছে এমন মূল্যায়ন করা কঠিন। দায়ী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক পরিচয়, পদমর্যাদা বা প্রভাব নির্বিশেষে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মানদণ্ডে বিচার সম্পন্ন হবে, এটাই ভুক্তভোগী পরিবার, আহত ব্যক্তি ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা। একই সঙ্গে গণহত্যার পূর্ণাঙ্গ সত্য উদ্ঘাটন, নির্দেশদাতা, পরিকল্পনাকারী ও প্রত্যক্ষ অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যাচাই বাছাই শেষে জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট ও সেই সময়কালের মোট কতটি ফৌজদারি মামলা সারা দেশে রুজু হয়েছিল এবং বর্তমানে কতটি কোন পর্যায়ে চলমান আছে, যে কোনো দায়িত্বশীল সরকারের অন্তত এই বিষয়ে দেশের মানুষের সামনে স্পষ্ট বিবৃতি হাজির করার কথা। মামলা বাণিজ্য, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে হত্যা মামলার আসামি করা ইত্যাদি অভিযোগ নিতান্তই কম নয়। জুলাই পরবর্তী সারা দেশে দায়ের হওয়া কয়েক হাজার মামলায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়া এবং আইনের শাসন ও রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারলেই কেবল জুলাইয়ের ক্ষত নিরাময় সম্ভব হবে। চট্টগ্রাম বন্দর চট্টগ্রাম বন্দরে এখন চালু টার্মিনালের সংখ্যা ৪টি। যার মধ্যে গভীর ড্রাফটের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালটি রেড সি গেট ওয়ে নামের সৌদি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে দেয়া হয়েছে। নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান টার্মিনাল যা ৭৩৭ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে নির্মাণ করা হয়েছে। নির্মাণকালীন নকশা অনুযায়ী এই টার্মিনাল বছরে ১১ লক্ষ ইউনিট কন্টেইনার পরিচালনা করতে পারার কথা, বাস্তবে এটি বর্তমানে বছরে ১৩ লক্ষ ইউনিট কন্টেইনার পরিচালনা করছে। দেশের প্রায় ৫৫% কনটেইনার কার্গো পরিচালনা করে এই টার্মিনাল বছরে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে। নিখাদ লাভজনক প্রতিষ্ঠান নিজস্ব আয় থেকে ইতিমধ্যে ৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। বর্তমানে নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগাং ড্রাই ডক লিমিটেড এটি পরিচালনা করছে। বন্দরের এই টার্মিনালটি সরকার যে কোনোভাবেই হোক বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দিতে চায়। ড. ইউনূস সরকার দেশপ্রেমিক জনতার আন্দোলন ও প্রতিরোধের মুখে যা পারেনি, ক্ষমতাসীন সরকার সেই অপচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশল এসবের কিছুই সরকারের কাছে বিবেচনার বিষয় বলে মনে হচ্ছে না। মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নির্বাচনের কয়েকদিন পূর্বে অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি জাতীয় স্বার্থ বিরোধী গোলামির চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিল। কারো কারো একটি সাধারণ প্রত্যাশা ছিল নির্বাচিত সরকার তার দেশপ্রেমের অঙ্গীকার থেকে এই চুক্তি বাতিল করবে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে সেই চুক্তির মূল পাহারাদার ব্যক্তিটিই নতুন সরকারের পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রীর পদে আসীন হয়েছেন। তিনি দেশবাসীকে জানিয়েছেন, বিএনপি ও জামাত উভয়ের সম্মতিতেই সেই চুক্তি হয়েছিল। আমরা দেখছি সেই চুক্তির শর্ত প্রতিপালন করতে বড় অংকের লোকসান গুনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম কিনতে হচ্ছে। বিমান কেনার ক্রয় আদেশ দিতে হচ্ছে। এই মার্কিন দাসত্বের চুক্তি বাতিল না হলে বাংলাদেশ অচিরেই এক মহাবিপর্যয়ের মুখে পড়বে। এই বিষয়ে সরকারের নীতিগত অবস্থান যেহেতু দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে নয়, ফলে এটিও সম্পূর্ণভাবে মানুষের রাজনৈতিক সংগ্রামের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সংকটের শেষ নাই স্থানীয় সরকারের সংস্থাগুলোতে বিনা নির্বাচনে দলীয় দখলদারি কায়েম করা হয়েছে। ড. ইউনূস সরকারের রেখে যাওয়া অধ্যাদেশকে কাজে লাগিয়ে সর্বত্র দলীয় লোকদের প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সীমান্ত হত্যা ও প্রতিবেশী ভারত রাষ্ট্র কর্তৃক জোরপূর্বক মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া (পুশ-ইন) নিয়ে সরকার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোন শক্ত অবস্থান তুলে ধরতে পারেনি। উপরন্তু অভিন্ন নদীর পানির হিস্যা, বাংলাদেশ-ভূটান-নেপাল-ভারত আঞ্চলিক সংযোগ, ভারতের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি ইত্যাদি বিষয়ে কোনো রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেই। সাম্প্রতিক বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে সরকারের প্রস্তুতি, ত্রাণ ব্যবস্থাপনা এবং পুনর্বাসন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের সূচনাকালীন পাঁচ মাসে ইতিমধ্যে এটা নিশ্চিত হয়ে গেছে যে, পুরাতন দুঃশাসনের দুষ্টচক্র থেকে মুক্তি পেতে হলে নতুন রাজনৈতিক প্রস্তুতি ও সংগ্রাম গড়ে তোলাই দেশের মানুষের সামনে একমাত্র বিকল্প। সময় ও শাসক পরিবর্তিত হয়েছে, সংগ্রাম শেষ হয়নি।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..