রাষ্ট্রীয় সম্পদ হরিলুটের গণবিরোধী চক্রান্ত রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান
একতা প্রতিবেদক :
রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠান দেশি-বিদেশি কর্পোরেট পুঁজির মালিকদের কাছে বিক্রির সরকারি তৎপরতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ ও তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ১৭টি বাম-প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল ও জাতীয় শ্রমিক কর্মচারী সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ।
গত ২০ জুলাই রাজধানীর পুরানা পল্টনে সিপিবি কার্যালয়ে ১৭টি বাম-প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভা থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প কারখানা ঢালাওভাবে দেশি-বিদেশি লুটেরাদের কাছে বিক্রির সরকারি চক্রান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
সভার এক প্রস্তাবে বলা হয়, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) কর্তৃক ঢালাওভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প কারখানাসমূহ দেশি-বিদেশি বেসরকারি কোম্পানির বিনিয়োগের জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ৫টি কর্পোরেশনের আওতাধীন ৪৪টি শিল্প প্রতিষ্ঠান উন্মুক্ত করার তথা বিক্রির গণবিরোধী তৎপরতা শুরু করেছে। দেশের বিপুল সংখ্যক শিল্প কলকারখানা এভাবে ঢালাওভাবে নিলামে তোলার উদ্যোগ দেখে মনে হচ্ছে বানরের পিঠা ভাগ করার বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে।
সভার প্রস্তাবে বলা হয়, দশ হাজার একরেরও বেশি জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত ৪৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প কারখানা ‘বিদ্যমান শিল্পসম্পদে পুনঃবিনিয়োগ’, ‘পুনর্গঠন ও পুনঃউন্নয়ন’, ‘ইজারাভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি ইজারাভিত্তিক ব্যবস্থা’, ‘যৌথ উদ্যোগ’, ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ ইত্যাদি নামে দেশি-বিদেশি বেসরকারি কোম্পানির কাছে বিক্রির জন্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ মূলত রাষ্ট্রীয় সম্পদ তথা জনগণের মালিকানাধীন সম্পদের ওপর কর্পোরেট পুঁজির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি সুপরিকল্পিত উদ্যোগ।
সভার প্রস্তাবে বলা হয়, সরকার এই উদ্যোগকে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কর্মসূচি হিসেবে মিথ্যা প্রচার করে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে এটি দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর পরামর্শে অনুসৃত নয়া উদারীকরণ ও বেসরকারিকরণ নীতিরই ধারাবাহিকতা মাত্র। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং দেশি-বিদেশি বড় কর্পোরেট পুঁজির চাহিদা অনুযায়ী রাষ্ট্রকে উৎপাদন ও শিল্প পরিচালনা থেকে সরিয়ে দিয়ে কেবল বেসরকারি পুঁজির পৃষ্টপোষকতার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার যে নীতি বিগত সরকারগুলোর আমল থেকে অনুসরণ করা হচ্ছে, এই উদ্যোগ তারই ধারাবাহিকতা।
সভার প্রস্তাবে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে যে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান মানেই লোকসানি, অদক্ষ, উৎপাদনশীলতার ঘাটতি ও অকার্যকর। বাস্তবতা হলো, পরিকল্পিতভাবে অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও মাথাভারী প্রশাসন জিইয়ে রাখা, সময়মতো অর্থ ছাড় না করা, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ না করা ও যন্ত্রের আধুনিকায়ন না করা, উৎপাদন সামগ্রীর বহুমূখিকরণ না করা, শ্রমিক প্রতিনিধিসহ অংশীজনদের সমন্বয়ে দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করা, ট্রেড ইউনিয়নসমূহ সরকারি শ্রমিক সংগঠন কর্তৃক দখল করা এবং সরকার নীতিগত অবহেলার মাধ্যমে বহু রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকে পরিকল্পিতভাবে সংকটের মুখে ঠেলে দিয়ে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে। এরপর সেই সংকটে সৃষ্ট লোকসানকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে জনগণের সম্পদ অতীতের মতোই পানির দামে বেসরকারি মালিকানায় তুলে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। এটি কোনো অর্থনৈতিক সংস্কার নয়; বরং ধাপে ধাপে রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদের বেসরকারিকরণ তথা হরিলুটের নীতি।
সভার প্রস্তাবে বলা হয়, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ভূমি ও অবকাঠামো জনগণের সম্পদ। এসব সম্পদ কেবল বর্তমান প্রজন্মের নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরও জাতীয় সম্পদ। শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, আঞ্চলিক ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই সাময়িক আর্থিক লাভ কিংবা বিনিয়োগ আকর্ষণের মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে এই সম্পদের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল ও রহিত করা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি।
সভার প্রস্তাবে বলা হয়, সরকার ১৩টি চিনিকলসহ ৪৪টি শিল্পসম্পদ বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করার ঘোষণা করেছে। কোন ক্রাইটেরিয়ার ভিত্তিতে এগুলো নির্বাচন করা হয়েছে, সম্পদগুলোর প্রকৃত আর্থিক মূল্য কত তা ইনভেন্ট্রি করা হয়েছে কিনা, কী শর্তে ইজারা বা যৌথ বিনিয়োগ হবে, রাষ্ট্রের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ কতটুকু বজায় থাকবে এসব বিষয়ে জনগণের সামনে কোনো স্বচ্ছ তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি। জাতীয় সম্পদ নিয়ে এ ধরনের সিদ্ধান্ত দেশের জনগণ, শিল্পের অংশীদার শ্রমিক, বিশেষজ্ঞ, এমনকি জাতীয় সংসদকে পাশ কাটিয়ে গ্রহণ করা গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার সম্পূর্ণ পরিপন্থি।
সভায় থেকে অবিলম্বে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প কারখানা বেসরকারি পুঁজির জন্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ বন্ধ করার, প্রস্তাবিত ৪৪টি প্রকল্প ও প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ তালিকা, মূল্যায়ন ও প্রস্তাবিত চুক্তির শর্ত জনসমক্ষে প্রকাশ করা, শ্রমিক সংগঠন, অর্থনীতিবিদ, শিল্প বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের অংশগ্রহণে জাতীয় আলোচনা আয়োজন এবং বন্ধ সকল রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল পাটকলসহ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আধুনিকায়ন করে পুনরায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে চালুর জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় শিল্পনীতি প্রণয়নের দাবি জানান হয়।
সভার প্রস্তাবে বলা হয়, জনগণের অর্থে গড়ে ওঠা রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প কারখানা কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দেশি-বিদেশি কর্পোরেট স্বার্থের ও তাদের মুনাফার উৎসে পরিণত হতে দেওয়া হবে না। জাতীয় সম্পদ, অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব এবং রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প রক্ষায় সকল বাম প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল, সংগঠন, ব্যক্তিসহ সকল দেশপ্রেমিক জনগণকে ঐক্যবদ্ধ গণআন্দোলন গড়ে তুলে শাসকশ্রেণি ও দেশি বিদেশি লুটেরাদের ষড়যন্ত্র রুখে দাঁড়ানোর জন্য আহ্বান জানানো হয়।
সভা থেকে রাষ্ট্রায়ত্ব বন্ধ চিনিকল আধুনিকায়ন করে চালুর দাবিতে চিনিকল সংগ্রাম কমিটি আহুত আগামী ১০ আগস্ট ঢাকায় সমাবেশের কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জানানো হয় এবং সফল করার জন্য শ্রমিক-কর্মচারী-জনতার প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বাম দলসমূহের সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন সিপিবির সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন, সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্কাফি রতন, জাতীয় গণফ্রন্টের প্রধান সমন্বয়ক টিপু বিশ্বাস, বাংলাদশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. মুশতাক হোসেন, আনোয়ার হোসেন বাবু, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য অধ্যাপক আব্দুস সাত্তার, মোশারফ হোসেন নান্নু, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সমন্বয়ক ফয়জুল হাকিম লালা, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, বাসদ (মাহবুব) সাধারণ সম্পাদক হারুনার রশীদ ভূইয়া, মহিনউদ্দিন চৌধুরী লিটন, নয়া গণতান্ত্রিক গণমোর্চার সভাপতি জাফর হোসেন, বাসদ (মার্কসবাদী) নেতা ডা. জয়দ্বীপ ভট্টাচার্য, সাম্যবাদী আন্দোলনের নেতা মনজুর আলম মিঠু, জাতীয় গণফ্রন্টের ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়ক রজত হুদা, জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চের আহ্বায়ক মাসুদ খান, গণমুক্তি ইউনিয়নের আহ্বায়ক নাসিরউদ্দিন আহমেদ নাসু, স্যোসালিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম, সোনার বাংলা পাটির সভাপতি সৈয়দ হারুন অর রশীদ, সমাজতান্ত্রিক পার্টির নির্বাহী সভাপতি আব্দুল আলী। আরও উপস্থিত ছিলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল রক্ষা সংগ্রাম জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক কামরুজ্জামান ফিরোজ, কাইউম হোসেন, মানস নন্দী, শামীম ইমাম, আ.ক.ম জহিরুল ইলাম, শহীদুল ইসলাম সবুজ, সুশান্ত সিনহা সুমন, সুলতান মাহমুদ, গিয়াস উদ্দিন, মোফাজ্জল হোসেন মোস্তাক, দলিলের রহমান দুলাল, তৈমুর খান অপু, মো. সোলায়মান প্রমুখ।
বিরাষ্ট্রীয়করণ নয় বরং আধুনিকায়ন করে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় চালু করার আহ্বান
‘জাতীয় শ্রমিক কর্মচারী সংগ্রাম পরিষদ’-এর কেন্দ্রীয় পরিচালনা কমিটি পাটকল-চিনিকলসহ রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প কারখানা ঢালাওভাবে দেশি-বিদেশি লুটেরাদের কাছে বিক্রির সরকারি চক্রান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সেগুলি আধুনিকায়ন করে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় চালু করার আহ্বান জানিয়েছেন।
নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে প্রস্তাবিত রাষ্ট্রায়ত্ত ৪৪টি প্রকল্প ও প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ তালিকা, মূল্যায়ন ও প্রস্তাবিত চুক্তির শর্ত জনসমক্ষে প্রকাশ করা, শ্রমিক সংগঠন, অর্থনীতিবিদ, শিল্প বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের অংশগ্রহণে জাতীয় আলোচনা আয়োজন এবং বন্ধ সকল রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল পাটকলসহ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আধুনিকায়ন করে পুনরায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে চালুর জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় শিল্পনীতি প্রণয়নের দাবি জানান।
২৪ জুলাই সকাল ১০টায় পুরানা পল্টনস্থ সিপিবি কার্যালয়ে ৯টি জাতীয় ফেডারেশনের জোট ‘জাতীয় শ্রমিক কর্মচারী সংগ্রাম পরিষদ’-এর কেন্দ্রীয় পরিচালনা কমিটির সভায় নেতৃবৃন্দ উপরোক্ত আহ্বান জানান।
জাতীয় শ্রমিক কর্মচারী সংগ্রাম পরিষদ-এর সমন্বয়ক ও জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক শামীম ইমামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জোটের সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন জোটের অন্যতম নেতা বাংলাদেশ শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনের সভাপতি মানস নন্দী, জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হারুন অর রশিদ, বাংলাদেশ শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনের সভাপতি জহিরুল ইসলাম, গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি অ্যাডভোকেট মন্টু ঘোষ, সাধারণ সম্পাদক সাদেকুর রহমান শামীম, রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম নাদিম, বিপ্লবী শ্রমিক সংহতি’র সভাপতি মীর মোফাজ্জল হোসেন মোস্তাক, কেন্দ্রীয় নেতা হাবিবুর রহমান হাবিব, গণতান্ত্রিক শ্রমিক আন্দোলনের সদস্য সচিব সুশান্ত সিনহা ও জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সদস্য অনুপ কুন্ডু প্রমুখ নেতৃবৃন্দ।
প্রথম পাতা
চা-শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা নির্ধারণ কর
নোটিশ
দুষ্টচক্রে পুনরাবৃত্তির আভাস
হাম : মৃত্যু ৮০০ ছাড়িয়েছে
দিল্লির গণআন্দোলনের প্রতি ঢাকায় সংহতিতে পুলিশি বাধা
সিপিবির পথ পরিক্রমণের তথ্য-কণিকা
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য একই স্থানে পুনঃস্থাপনের দাবি
‘ভিডিও’
সরকারের ৫ মাসের শাসন আতঙ্ক আশঙ্কা আর দীর্ঘশ্বাস বাড়িয়েছে
ছাত্র-তরুণদের আন্দোলনে উত্তাল নয়াদিল্লি
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন