কাস্তেটা শান দাও বন্ধু

রাজনৈতিক প্রতিবেদক :

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
অন্তর্বর্তীকালীন বা তত্ত্বাবধায়ক- যে নামেই ডাকা হোক না কেনো, বিশেষ পরিস্থিতিতে মধ্যবর্তী সময়ের জন্য দায়িত্ব নেওয়া অনির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব হলো, যতো দ্রুত সম্ভব একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা বুঝিয়ে দেওয়া। শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের এই প্রক্রিয়ায় অনেক বিষয়ের মধ্যে অন্যতম মূল কথা হলো, নির্বাচনটি হতে হবে অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য। আর সেটি করতে হলে প্রধান শর্ত হলো, যে সরকারের অধীনে নির্বাচনটি হচ্ছে তাদেরকে হতে হবে সম্পূর্ণ এবং সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ। এই বাংলাদেশে এর আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে যে চারটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তার সবগুলো একইভাবে অবাধ হয়েছিল কি না তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও, সেগুলো মোটের উপর গ্রহণযোগ্য হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সন্দেহের কথা বললেও নির্বাচনের ফলাফল জনগণ গ্রহণ করে নিয়েছিল। সেসব নির্বাচনে বাম দলগুলো অংশ নিয়েছিল, তার মানে এই নয় যে সেসব নির্বাচন অবাধ-সুষ্ঠু হয়েছিল, কালো টাকা-পেশিশক্তিমুক্ত হয়েছিল। অবাধ সুষ্ঠু ও অর্থবহ নির্বাচনের জন্য বাম দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রাম করে আসছে। সমাজ বিপ্লব ও বিকল্প গড়ার লক্ষ্যে আন্দোলনকে অগ্রসর করা, শক্তি ভারসাম্য, শ্রেণিসংগ্রাম ও গণআন্দোলনের বাস্তব পরিস্থিতি, জনগণের আকাঙ্ক্ষা ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে কমিউনিস্টরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে থাকে। নিজস্ব নীতি ও কর্মসূচি জনগণের কাছে তুলে ধরার ন্যূনতম গণতান্ত্রিক সুযোগের সদ্ব্যবহার কমিউনিস্টদের করতে হয়। তার ধারাবাহিকতায় শ্রেণিসংগ্রামকে অগ্রসর করা, গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামকে অব্যাহত রাখা এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষার্থে বিকল্প বাম-রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠার কর্মসূচিকে জনপ্রিয় করা ও সেরূপ সরকার প্রতিষ্ঠার কাজকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য কমিউনিস্টরা এবার নির্বাচনি সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছে। কমিউনিস্টরা বুর্জোয়া পার্লামেন্টারি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে জানে। শ্রেণিসংগ্রাম, গণআন্দোলনকে স্থগিত রেখে কমিউনিস্টরা পার্লামেন্টারি মোহে আচ্ছন্ন থাকে না। বুর্জোয়া পার্লামেন্টারি ব্যবস্থাকেই জনগণের প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থার চূড়ান্ত রূপ বলে মনে করা এক ধরনের সুবিধাবাদিতা ও প্রদর্শনবাদের জন্ম দেয়। অপরদিকে শ্রেণিসংগ্রামকে অগ্রসর করতে পার্লামেন্টারি ব্যবস্থা কিংবা তথাকথিত গণতন্ত্রের আইনসিদ্ধ সুবিধাগুলোকে ব্যবহার না করার আহাম্মকি নৈরাজ্যবাদের জন্ম দেয়। তাছাড়া নির্বাচন বানচাল অথবা বিলম্বিত করার যে গভীর ষড়যন্ত্র চরম ডানপন্থি ও উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তি করছে যার প্ররিপ্রেক্ষিতে যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান করাটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু নির্বাচনের শর্তগুলো পরিপূর্ণভাবে উপস্থিত না থাকলেও নিদেনপক্ষে একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এই অবস্থায় জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে কি না, কিংবা ঘোষিত ফলাফলে জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থাকলেও এই পরিস্থিতিতে কমিউনিস্টদের নির্বাচনকে কাজে লাগিয়ে অন্তত বিকল্প কর্মসূচি নিয়ে জনগণের কাছে যাওয়া এবং সংগঠন গড়ে তোলার কাজটিকে অগ্রসর করার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। একথা স্বীকার করতে হবে যে, বামপন্থিরা এখনো এককভাবে জোরালো গণআন্দোলন বা গণঅভ্যূত্থান গড়ে তোলার মত যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। কালো টাকা-পেশিশক্তির দৌরাত্ম্যে নির্বাচনের মাঠেও বামপন্থিরা অনেকটা প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন। সাংগঠনিক কাঠামো ও দেশব্যাপী তার বিস্তারের জায়গা থেকে, এমনকী ঘাঁটি অঞ্চল তৈরির দিক থেকেও বামপন্থিরা এখনো বেশ দুর্বল অবস্থায় আছে। কিন্তু স্বতন্ত্র অবস্থানে বিকল্প গড়ার নীতিনিষ্ঠ রাজনীতির প্রতি এই সময়ে মানুষের আস্থা বেড়েছে। সিপিবিসহ ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’ গঠনের মাধ্যমে সেই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা শুরু হয়েছে। এসময়ে রাজনীতিতে তার স্বতন্ত্র স্বকীয় অবস্থানকে পূর্বের সময়কার তুলনায় জনগণের কাছে তুলে ধরতে সুযোগ পেয়েছে। অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য আন্দোলন এবং নির্বাচনি সংগ্রামের পাশাপাশি, বিকল্প কর্মসূচিকে জনগণের কাছে নিয়ে গিয়ে জনগণের আস্থা অর্জনের কাজটিই এখন কমিউনিস্টদের জন্য কর্তব্য। জনগণের আস্থা অর্জনের পাশাপাশি তাদের সমর্থনকে ভোটে রূপান্তর করতে কমিউনিস্টদের নীতিনিষ্ঠ থেকেই যথেষ্ট সৃজনশীল ভূমিকা নিতে হবে। শুধুমাত্র নির্বাচনে অংশ নিলে, নির্বাচনের ক্যাম্পেইন করলেই বাক্সে ভোট জমা পড়বে না। বাক্সে নিজেদের ভোট জমা করা, কেন্দ্রে কেন্দ্রে ভোটারদের নিরাপত্তা দেয়া, ফলাফল পর্যন্ত ভোট পাহারা দেওয়া কঠিন নির্বাচনি সংগ্রামের অংশ। নির্বাচনের মাধ্যমে সংগঠন গড়ে তোলার বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি হলেও, তাতে সংগঠন আপনা-আপনি তৈরি হবে না। নির্বাচনি এলাকায় লেগে পড়ে থেকে সংগঠন গড়ে তুলতে হবে, জনগণকে সংগঠিত করতে হবে। নির্বাচনি ডামাডোলে পুরোপুরি ডুবে না গিয়ে আন্দোলনের বৃহত্তর লক্ষ্যের কথা মাথায় যেমন রাখতে হবে, আবার প্রতিটি ভোটকে অর্জন ও রক্ষা করতে জানকবুল করে নামতে হবে। মনে রাখতে হবে, এই সময়ে বাম-গণতান্ত্রিক বিকল্পের পক্ষে প্রতিটি ভোট আগামী দিনের সংগ্রামের জন্য সঞ্চিত বারুদের স্তুপ হয়ে ব্যালট বাক্সে জমা হবে। সময় যতই প্রতিকূলে থাকুক, দীনেশ দাসের ভাষায় জনগণের কাছে বার্তা নিয়ে যেতে হবে- ‘বেয়নেট হোক যত ধারালো-/ কাস্তেটা ধার দিও বন্ধু! / শেল আর বম হোক ভারালো / কাস্তেটা শান দিও, বন্ধু।’

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..