দিনাজপুরে ফুলবাড়ী দিবসের সমাবেশে বক্তব্য রাখছেন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতনএকতা প্রতিবেদক :
ফুলবাড়ী চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, মার্কিন চুক্তি বাতিল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের জনবান্ধব সমাধান এবং জ্বালানি, বিদ্যুৎ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে বেসরকারিকরণ বন্ধ করার ৪ দফা দাবিতে তিনদিন ব্যাপী ‘প্রচারযাত্রা’ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির উদ্যোগে ২৪ আগস্ট থেকে শুরু হয়ে তিনদিনে একযোগে গাজীপুর, টাঙ্গাইলে মাওলানা ভাসানীর মাজার, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, গোবিন্দগঞ্জ, বিরামপুর এবং দিনাজপুরে সমাবেশ, পথসভা ও মার্কিন চুক্তির ক্ষতিকর দিক উল্লেখ করে প্রচারপত্র বিলি হয়েছে।
২৬ আগস্ট ফুলবাড়ী গণঅভ্যুত্থান দিবসে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর নিমতলার মোড়ে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির আয়োজিত সমাবেশে সংহতি ও একাত্মতা জানিয়ে এ ‘প্রচারযাত্রার’ সমাপনী হয়।
সমাবেশে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, চিকিৎসক ডা. হারুন উর রশীদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃ সামিনা লুৎফা নিত্রা এবং সহযোগী অধ্যাপক ডঃ মোশাহিদা সুলতানা ঋতু। পাশাপাশি এই সমাবেশে বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল কাফী, জাতীয় গণফ্রন্টের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক রজত হুদা, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের দিনাজপুরের নেতৃত্ব সঞ্জিত প্রসাদ জিতু, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা শহীদুল ইসলাম সবুজ সহ বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল, আদিবাসী মুক্তি সংগ্রাম কমিটি, দেশপ্রেমিক কৃষক শ্রমিক ছাত্র দল, খেলাঘরসহ নানান স্থানীয় সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
সমাবেশের শুরুতেই ফুলবাড়ি গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে শহীদ বেদীতে পুস্পস্তবক দিয়ে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানো হয়। এরপর নিমতলার মোড়ে মার্কিন চুক্তির ভয়াবহতা দিক নিয়ে ‘বিপদের প্রদর্শনী’ আয়োজন করা হয়। এ প্রদর্শনীতে মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি কিভাবে বাংলাদেশের পোল্ট্রি, কৃষি, ওষুধ, গ্যাস শিল্পকে ধ্বংস করে তুলবে তা পূর্ণাঙ্গভাবে দেখানো হয়েছে।
সমাবেশে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘ফুলবাড়ী অভ্যুত্থান আন্দোলন ছিল সারা পৃথিবীর জন্যই একটি দৃষ্টান্ত। এই আন্দোলন ছিল ভয়াবহ বিপদ থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করার এক দুর্দম্য আখ্যান। যে এশিয়া এনার্জি কোম্পানি জনপ্রতিরোধের সামনে টিকতে পারেনি, আজকের দিনেও তারা শেয়ার বাজারে ফুলবাড়ীকে দেখিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছে। ২০০৬ এর পর থেকে প্রতিটি সরকারই এই মুনাফা গোষ্ঠীকে সুবিধা দিয়ে এসেছে, ফুলবাড়ীর চুক্তি বাস্তবায়ন করেনি। ২০১২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই এলাকা পুলিশ দিয়ে দখল করার চেষ্টা করা হয়েছিলো, তখনও মানুষ প্রতিরোধ করে। এখন বিএনপি সরকারের ৬ মাস যেতে না যেতেই তাদের মন্ত্রী উন্মুক্ত কয়লা খননের কথা বলছে।’
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ কয়লা উত্তোলনের বক্তব্যদাতা মন্ত্রীকে জনগণের কাছে ক্ষমা চেয়ে বক্তব্য প্রত্যাহারের কথা বলেন।
অন্যদিকে জাতীয় কমিটি প্রস্তাবিত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের অন্যতম সদস্য এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মাহবুব সুমন বিরামপুর ও দিনাজপুর সমাবেশে বিএনপি সরকারের উন্মুক্ত কয়লা তোলার প্রস্তাবের সমালোচনা জানিয়ে বলেন, ‘দিনাজপুরের ফুলবাড়িতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করতে হলে ৭৯০ থেকে ৮০০ ফুট গভীর কাটার পর কয়লা উত্তোলন শুরু হবে। তার পর কয়লার জন্য আরো ১৫০ ফুট গভীর হবে। যে পরিমাণ বর্জ্য হবে তা রাখার জন্য পুরা দিনাজপুর শহরের সমান জায়গা লাগবে।
চারপাশের টিলার পানি এসে জমা হবে এই উন্মুক্ত খনিতে। ফলে আশেপাশের ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত তীব্র পানি সংকট তৈরি হবে, একই সাথে ডিওয়াটারিং এর জন্য খনির মধ্যে জমা হওয়া বিষাক্ত পানি তুলে ফেলা হবে বাইরে, যা নতুন করে আবার বিষক্রিয়ায় ফেলবে সমগ্র বাস্তুসংস্থানকে।’
তিনি দেখিয়েছেন কেবলমাত্র ২০০ জনের কর্মসংস্থান দেখিয়ে এই উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খনন স্থানীয় জনগণের জন্য আদতে ভালো কিছু নিয়ে আসবে না।
গ্যাস বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি সংকটের জনবান্ধব সমাধানের লক্ষ্যে বিদেশি ঋণনির্ভর, আমদানি নির্ভর, বিদেশি কোম্পানি নির্ভর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মহাপরিকল্পনার বাতিল করে ‘তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি’ প্রস্তাবিত মহাপরিকল্পনা (২০১৭) ধরে সুলভ, পরিবেশবান্ধব নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের বাস্তবায়নের জোরালো দাবি জানায় গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি।
মার্কিন চুক্তিবিরোধী

‘বিপদের প্রদর্শনী’ তে দেখানো হয়েছে যে, এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত বোয়িং বিমান, অস্ত্র, মাংস ও মাছ আমদানি করতে হবে। অতিরিক্ত দামে এলএনজি, গম ও তুলা আমদানি করতে হবে। দেশীয় ওষুধ কোম্পানি কম খরচে ওষুধ উৎপাদন করতে পারবে না, ফলে ওষুধের দাম বেড়ে যাবে কয়েকগুন। বিপর্যয়ের মুখে পড়বে দেশীয় পোল্ট্রি ও গরুর খামারিরা। সর্বোপেরি জনগণের ডিজিটাল তথ্যের নিরাপত্তা এবং জনগণের সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত হানবে এই চুক্তি। কারণ মার্কিন রাষ্ট্র এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ কার সাথে ব্যবসা বাণিজ্য করতে পারবে তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
এর আগে ফুলবাড়ী অভ্যুত্থানের ২০ বছর পূর্তিকে সামনে রেখে ২৪ আগস্ট সকাল ৯টায় ঢাকা থেকে ফুলবাড়ী প্রচারযাত্রার উদ্বোধনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে এই প্রচারযাত্রার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন তৎকালীন বিএনপি সরকারের সাথে ফুলবাড়ীবাসীর পক্ষে চুক্তি সাক্ষরকারী এবং গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। উদ্বোধনী কর্মসূচিতে বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মোশাহিদা সুলতানা ঋতু এবং বাংলাদেশ নারী মুক্তি কেন্দ্রের প্রেসিডেন্ট সীমা দত্ত। উদ্বোধনী সমাবেশে ‘ফুলবাড়ী তাদের লড়াইয়ের কথা মনে রেখো’ সঙ্গীত পরিবেশন করেছে কোরাস সাংস্কৃতিক সংগঠনের শিল্পী জয়মা মুনমুন। গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের সমন্বয়ক রাফিকুজ্জামান ফরিদ সঞ্চালনা করেন।
প্রচার যাত্রাটি গাজীপুর চৌরাস্তায় পথসভা, মাওলানা ভাসানীর মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন, টাংগাইল শহরে সমাবেশ, সিরাজগঞ্জের কড্ডার মোড়ে পথসভা, বগুড়ার শেরপুরে পথসভা করে রাতে বগুড়া শহরে গিয়ে বিরতি নেয়।
২৫ আগস্ট বগুড়া, গোবিন্দগঞ্জ, বিরামপুর এবং দিনাজপুরে প্রচারযাত্রার সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। পাশাপাশি মার্কিন চুক্তির ক্ষতিকর দিক উল্লেখ করে প্রচারপত্র বিলি হয়েছে।
সমাবেশসমূহে বক্তা হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য তাজুল ইসলাম, বগুড়া জেলা প্রতিনিধি আমিনুল ফরিদ, গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য ডা: হারুন উর রশীদ ও মাহতাব উদ্দিন আহমেদ, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মাহাবুব সুমন, বাংলাদেশ সাম্যবাদী আন্দোলনের দিনাজপুর প্রতিনিধি মনির হোসেন, উত্তরবঙ্গ কৃষক মঞ্চের নেতা শাহনেওয়াজ শুভ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের রাজনৈতিক কর্মী সুমাইয়া আক্তার, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি তামজীদ হায়দার চঞ্চল, বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) এর সহ সভাপতি শুভাশিস চাকমা, বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য মোশাররফ হোসেন নান্নু, ঢাকা মহানগর সম্পাদক ইকবাল কবীরসহ আরো অনেকে।
ঢাকায় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন ও সমাবেশ
এদিকে ফুলবাড়ী অভ্যুত্থানের ২০তম বার্ষিকীতে ২৬ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ঢাকা মহানগর, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে জাতীয় কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সচিব অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেছেন, জনপদ, প্রাণ, প্রকৃতি পরিবেশ ধ্বংস করে ফুলবাড়ীতে নতুন করে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের যেকোন চক্রান্ত দেশবাসী রুখে দাড়াবে।
অধ্যাপক আকাশ বলেন, ২০০৬ সালে ফুলবাড়ি গণঅভ্যুত্থানে তৎকালীন বিএনপি সরকার জাতীয় কমিটির সাথে ছয় দফা চুক্তি করেছিল। বিগত দিনের আওয়ামী লীগ সরকার এই চুক্তি বাস্তবায়ন করে নাই। বর্তমান সরকারের প্রধান দায়িত্ব হল এই চুক্তি বাস্তবায়ন করা ।
তিনি আরো বলেন, দেশের জ্বালানি সংকট সমাধানে অনেক পথ আছে। সেই পথ অনুসরণ করতে হবে। কোন একটা অঞ্চলের মানুষের প্রাণ, প্রকৃতি, পরিবেশ ও জীবন জীবিকা ধ্বংস করে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলা চলবে না।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন নগর কমিটির অন্যতম সমন্বয়ক জুলফিকার আলী; পরিচালনা করেন অন্যতম সমন্বয়ক খান আসুজ্জামান মাসুম। এ সময় জাতীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে সিপিবি সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন, রুহিন হোসেন প্রিন্স, বজলুর রশিদ ফিরোজ, সাইফুল হক, আব্দুস সাত্তার, শুভ্রাংশু চক্রবর্তী, জয়দীপ ভট্টাচার্য, আব্দুল আলী, মাহিন উদ্দিন চৌধুরী লিটন, বাচ্চু মিয়া উপস্থিত ছিলেন।