ফিদেল কাস্ত্রোর জীবন ও সংগ্রাম থেকে মুক্তির শিক্ষা নিতে হবে

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা প্রতিবেদক : ফিদেল কাস্ত্রো শুধু কিউবা বিপ্লবের নেতা নন; তিনি জাতীয় মুক্তি, জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার, সামাজিক ন্যায়, সার্বভৌমত্ব এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামের এক অনন্য প্রতীক। তার জীবন ও রাজনৈতিক সংগ্রাম থেকে বামপন্থি ও প্রগতিশীল শক্তিকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। কিংবদন্তি বিপ্লবী কমরেড ফিদেল কাস্ত্রোর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে ২২ আগস্ট বিকেল ৫টায় ঢাকার পুরানা পল্টনে মুক্তিভবনে অবস্থিত মৈত্রী মিলনায়তনে সিপিবি আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা এ আহ্বান জানিয়েছেন। ‘শতবর্ষ পেরিয়ে আমাদের ফিদেল’-শীর্ষক এই আলোচনা সভায় সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও আন্তর্জাতিক বিভাগ প্রধান রাগীব আহসান মুন্নার সভাপতিত্বে ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মঞ্জুর মঈনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত বক্তব্য রাখেন পার্টির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ডা. দিবালোক সিংহ, লাকী আক্তার, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের সভাপতি খান আসাদুজ্জামান মাসুম, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মাহির শাহরিয়ার রেজা, সাংগঠনিক সম্পাদক মণীষা ওয়াহিদ প্রমুখ। আলোচনায় বক্তারা বলেন, ভৌগোলিকভাবে কিউবা বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে হলেও ফিদেল কাস্ত্রো বাংলাদেশের মানুষের কাছে আপন হয়ে উঠেছেন তাঁর রোমাঞ্চকর জীবন ও সংগ্রামের কারণে। ফিদেলের রাজনীতির সবচেয়ে বড় অর্জন হলো, জাতীয় মুক্তিকে শুধু রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাকে জনগণের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির সঙ্গে যুক্ত করতে পারা। বক্তারা বলেন, কিউবার বিপ্লবের ইতিহাসকে সরলীকরণ না করে তার ঐতিহাসিক বিকাশকে বুঝতে হবে। ফিদেলের নেতৃত্বাধীন ২৬ জুলাই আন্দোলন প্রথম পর্যায়ে ছিল বাতিস্তার স্বৈরশাসন ও মার্কিন আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি বিস্তৃত জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম। পরবর্তীতে ভূমি সংস্কার, অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাস, বিদেশি পুঁজির আধিপত্যের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ এবং জনগণের স্বার্থে রাষ্ট্রীয় নীতি গ্রহণের মধ্য দিয়ে সেই বিপ্লব সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে অগ্রসর হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে বক্তারা বলেন, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ১৯৭১ পূর্ববর্তী জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে জাতীয়তাবাদী শক্তিকে অনেকেই প্রধান রাজনৈতিক নেতৃত্বের স্বীকৃতি দিলেও তারা অদ্যবধি জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম থেকে বিচ্যুত আছে। দেশের কমিউনিস্ট ও অন্যান্য বামপন্থি শক্তি মুক্তিযুদ্ধে সর্বাত্মক ভূমিকা পালন করা থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত সততার সাথে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের নেতৃত্ব প্রদান দিয়ে যাচ্ছে। বক্তারা আরও বলেন, ফিদেল কাস্ত্রোর জীবন এ দেশের সংগ্রামী রাজনৈতিক কর্মীদের জাতীয় মুক্তি ও সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের পারস্পরিক সম্পর্ককে বুঝতে শেখায়। সভায় বক্তারা বলেন, দেশপ্রেম ও আন্তর্জাতিকতাবাদ পরস্পর পরিপূরক। আন্তর্জাতিকতাবাদ নিপীড়িত জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণ ও জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে পৃথিবীব্যাপী প্রগতিশীল ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু জাতীয়তাবাদ যখন মুখেমুখে দেশপ্রেমের কথা বলে অন্য জাতির প্রতি বিদ্বেষ, আধিপত্য বা সংকীর্ণ শ্রেষ্ঠত্ববাদীতে পরিণত হয়, তখন তা কখনই আর মুক্তির শক্তি থাকে না। তারা বলেন, ফিদেলের কিউবা নিজের জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি বিশ্বের নিপীড়িত ও মুক্তিকামী মানুষের সংগ্রামের সঙ্গে সংহতি স্থাপন করে আন্তর্জাতিকতাবাদের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। যার প্রেক্ষিতে গোটা লাতিন আমেরিকায় বামপন্থা ও মানুষের মুক্তি সংগ্রামের উত্থান ঘটেছে। আলোচনায় আরও বলা হয়, গণতন্ত্রকে শুধু নির্বাচন ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলে না। রাজনৈতিক গণতন্ত্রের পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে রাষ্ট্র চরম গণবিরোধী চরিত্র ধারণ করে একসময় ফ্যাসিবাদীর শক্তির কেন্দ্রে পরিণত হয়। বর্তমান রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ফিদেলের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বক্তারা উল্লেখ করেন। তারা বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ, অর্থনীতি ও কৌশলগত স্বার্থের ওপর জনগণের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে এবং কোনো বিদেশি শক্তির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা ভূরাজনৈতিক আধিপত্য মেনে নেওয়া যাবে না। বক্তারা বলেন, ফিদেল কাস্ত্রো কোনো মূর্তিমান অতীত নন; তাঁর জীবন ও সংগ্রাম বর্তমান পৃথিবীর প্রায় সকল রাজনৈতিক প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত। শতবর্ষ পেরিয়ে ফিদেলকে স্মরণ করার অর্থ শুধু তাঁর জীবন ও কর্মের প্রশংসা করা নয়। বরং জাতীয় মুক্তির অসমাপ্ত কাজকে সামাজিক মুক্তির সঙ্গে যুক্ত করা, গণতন্ত্রকে জনগণের কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত করা এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্তর্জাতিক সংহতি আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার নিয়ে ফিদেল কাস্ত্রোর জন্মশতবার্ষিকী পালিত হচ্ছে। আলোচনা সভা শেষে সন্ধ্যা ৭টায় ফিদেল কাস্ত্রোর বিপ্লবী জীবন ও কিউবার সংগ্রামভিত্তিক একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হয়।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..