উন্মুক্ত না, বিদেশি না, রপ্তানি না ফুলবাড়ী জেগে আছে, জেগে থাকবে
অনিরুদ্ধ দাশ অঞ্জন
‘তোমার বাড়ি আমার বাড়ি/ ফুলবাড়ী ফুলবাড়ী’ স্লোগান এখনও প্রতিধ্বনিত হয় রাজপথ থেকে প্রত্যন্ত জনপদে। জাতীয় সম্পদ রক্ষার দাবিতে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে সংগঠিত হয়েছিল প্রবল গণ-আন্দোলন। ব্রিটিশ কোম্পানি এশিয়া এনার্জির উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের প্রস্তাবিত প্রকল্পের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছিল স্থানীয় জনতা।
২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন। জাতীয় সম্পদ ও জনগণের স্বার্থবিরোধী রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে, ফুলবাড়ীর আপামর জনগণ এ দিন রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল। তাঁদের সেই প্রতিরোধ জাতীয় সম্পদ রক্ষা ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
২৬ আগস্ট ২০০৬ : রক্তে ভিজেছিল ফুলবাড়ী
২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট। এশিয়া এনার্জির উন্মুক্ত পদ্ধতির কয়লাখনি প্রকল্প বাতিল, কোম্পানিটিকে ফুলবাড়ী থেকে প্রত্যাহার এবং জাতীয় সম্পদ রক্ষার দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি ফুলবাড়ীতে বিক্ষোভ-সমাবেশের ডাক দেয়। ফুলবাড়ী ও আশপাশের এলাকার লক্ষাধিক নারী-পুরুষ সমাবেশে যোগ দেন। বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে ফুলবাড়ী। সমাবেশ শেষে অনুষ্ঠিত মিছিলে বিডিআর সদস্যরা নির্বিচারে গুলি চালায়। গুলিতে ঝরে যায় আল আমিন, সালেকিন ও তরিকুলের তাজা প্রাণ। গুলি ও হামলায় দুই শতাধিক মানুষ আহত হন। বিক্ষুব্ধ জনতা এশিয়া এনার্জির স্থানীয় কার্যালয়ে হামলা চালায় এবং কোম্পানির কার্যক্রম নিষিদ্ধের ঘোষণা দেয়। গুলি চালিয়ে, মানুষ হত্যা করে আন্দোলন দমন করা সম্ভব হয়নি। বরং সারাদেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ফুলবাড়ীর আন্দোলন রূপ নেয় গণ-আন্দোলনে।
ফুলবাড়ীর গণ-আন্দোলনের পটভূমি
জাতীয় সম্পদ রক্ষার ফুলবাড়ীর গণ-আন্দোলনের পেছনে ছিল কয়েক বছরের প্রস্তুতি। ফুলবাড়ীতে কয়লা অনুসন্ধান ও খনির উদ্যোগ সামনে আসার পর স্থানীয় মানুষ জানতে পারেন যে-প্রস্তাবিত প্রকল্পটি প্রচলিত ভূগর্ভস্থ খনি নয়; বরং বিস্তৃত এলাকায় উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এশিয়া এনার্জি ৬৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা অধিগ্রহণ করে গভীর গর্ত খননের মাধ্যমে কয়লা উত্তোলন এবং সেই কয়লা বিদেশে রপ্তানির পরিকল্পনা করেছে। এর বিনিময়ে বাংলাদেশকে মাত্র ৬ শতাংশ রয়্যালটি প্রদান করা হবে। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কৃষিজমি, বসতি ও বিভিন্ন স্থাপনা বিলীন হওয়ার আশঙ্কা এবং বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি নিষ্কাশনের প্রয়োজনীয়তা স্থানীয় মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করে। ক্রমে সেই উদ্বেগ রূপ নেয় ক্ষোভে, আর ক্ষোভ থেকে গড়ে ওঠে প্রতিরোধ।
প্রকল্পের পক্ষে এশিয়া এনার্জির প্রচারণা এবং জমি অধিগ্রহণের প্রস্তুতি যত এগোতে থাকে, স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিরোধও তত সংগঠিত হতে থাকে। উচ্ছেদ আর জীবিকা ও বসতভূমি হারানোর আশঙ্কা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ ক্রমেই গভীর হয়। এই পরিস্থিতিতে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির নেতৃত্বে গ্রাম থেকে গ্রামে জনমত গড়ে ওঠে। জাতীয় কমিটির উদ্যোগে ২০০৬ সালের মার্চ মাসে ঢাকা থেকে ফুলবাড়ী পর্যন্ত লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়। শ্রমিক-কৃষক-শ্রমজীবী মানুষ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠনের সক্রিয় অংশগ্রহণে আন্দোলন ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়ে একটি সুসংগঠিত গণ-আন্দোলনের ভিত্তি লাভ করে।
মানুষের ক্ষোভ ক্রমে রাজনৈতিক প্রতিরোধে রূপ নেয়। আন্দোলনের দাবিগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে-এশিয়া এনার্জিকে প্রত্যাহার করতে হবে, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হবে, জাতীয় সম্পদের ওপর বিদেশি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করতে হবে এবং কয়লা রপ্তানির পরিকল্পনা বাতিল করতে হবে। ধারাবাহিক সভা-সমাবেশ, বিক্ষোভ, প্রচারণা, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ফুলবাড়ী ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় আন্দোলনের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
প্রাণ-প্রকৃতি, পরিবেশ ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী এই প্রকল্পকে এশিয়া এনার্জির পক্ষ থেকে উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে উপস্থাপন করে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়। কিন্তু জনগণ সেই প্রচারণা প্রত্যাখ্যান করে। এশিয়া এনার্জিবিরোধী আন্দোলন গণ-আন্দোলনের চরিত্র লাভ করে।
রক্তে লেখা ফুলবাড়ী চুক্তি
গণ-আন্দোলনের তীব্রতার মুখে তৎকালীন বিএনপি-জামাত জোট সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়। ২০০৬ সালের ৩০ আগস্ট সরকার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসে। সরকার এবং তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির মধ্যে ছয় দফা সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর মধ্য দিয়ে ফুলবাড়ী গণ-আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিজয় অর্জন করে।
চুক্তিতে সরকারের পক্ষ থেকে এশিয়া এনার্জির সঙ্গে সম্পাদিত সব চুক্তি বাতিল, কোম্পানিটিকে ফুলবাড়ী তথা বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কার এবং এর এজেন্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের অঙ্গীকার করা হয়। চুক্তিতে আরও বলা হয়, ফুলবাড়ীসহ বাংলাদেশের কোথাও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হবে না। ভবিষ্যতে কয়লা উত্তোলনের পদ্ধতি নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট জনগণের মতামত ও সম্মতিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথাও চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়। চুক্তিতে সরকার নিহতদের পরিবার ও ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ এবং আহতদের সুচিকিৎসার অঙ্গীকার করে।
দুই দশকে কোনো সরকারই ফুলবাড়ী চুক্তি বাস্তবায়নের পথে হাঁটেনি। ২০০৬ সালের গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের সামনে উত্থাপিত মৌলিক প্রশ্নগুলোর রাজনৈতিক নিষ্পত্তি হয়নি। বিশেষ করে এশিয়া এনার্জিকে বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কার এবং ফুলবাড়ীসহ বাংলাদেশের কোথাও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন না করার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি। ২০০৬, ২০০৭ ও ২০১২ সালে সরকারের উদ্যোগে গঠিত তিনটি পৃথক বিশেষজ্ঞ কমিটি ফুলবাড়ী প্রকল্প পর্যালোচনা করে এবং তিনটি কমিটিই প্রকল্পটির বিপক্ষে মত দেয়। তা সত্ত্বেও প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়নি। ফলে ফুলবাড়ী চুক্তির বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্রের অঙ্গীকার রক্ষার প্রশ্নটি অমীমাংসিতই থেকে যায়।
উপরন্তু প্রকল্পটি নিয়ে জিসিএম রিসোর্সেস নামে এশিয়া এনার্জি ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে কোম্পানিটি ফুলবাড়ীর কয়লা কেনার জন্য বাংলাদেশের দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আগ্রহপত্র পাওয়ার কথা জানায়। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে প্রকল্প বাস্তবায়নের অনুমোদন পেতে সহায়তার জন্য একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে।
নতুন সরকারের পুরনো মতলব
ফুলবাড়ী আবার জাতীয় আলোচনায় ফিরে এসেছে। নবাগত বিএনপি সরকার ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের কথা বলছে। ১৬ আগস্ট আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, “দুর্ভাগ্যবশত, আমরা এখন কয়লা উত্তোলনের দিকে যাচ্ছি। আমাদের ফুলবাড়ী ও অন্যান্য এলাকায় উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের দিকে এগোতে হবে। কারণ, আমাদের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই।”
অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্য নিছক একটি অর্থনৈতিক মতামত নয়; এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নীতি, জাতীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং ফুলবাড়ী গণ-আন্দোলনের ঐতিহাসিক অর্জনের প্রতি বর্তমান সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ। বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো-উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনকে তিনি এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যেন এর কোনো বিকল্প নেই। অথচ এই অবস্থান ফুলবাড়ীর গণ-আন্দোলন এবং রাষ্ট্রের অঙ্গীকারের পরিপন্থী।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুতর দিক হলো, এটি ২০০৬ সালের ফুলবাড়ী চুক্তির অন্যতম মৌলিক অঙ্গীকারের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। ৩০ আগস্টের সেই চুক্তিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল-ফুলবাড়ীসহ বাংলাদেশের কোথাও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা হবে না। সেই চুক্তি কোনো সাময়িক প্রশাসনিক সমঝোতা ছিল না; এটি ছিল গণ-আন্দোলনে তিন কিশোরের আত্মদানের পর রাষ্ট্রের দেওয়া একটি আনুষ্ঠানিক অঙ্গীকার।
সরকার আমদানিনির্ভরতা কমানোর কথা বলছে। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনে উন্মুক্ত পদ্ধতিই কেন একমাত্র পথ, তার কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। জ্বালানি সংকটের সমাধানের নামে এমন একটি পদ্ধতিকে ‘বিকল্পহীন’ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, যার বিরুদ্ধে ফুলবাড়ীর মানুষ রক্ত দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। এর পাশাপাশি তিনটি সরকারি বিশেষজ্ঞ কমিটিও প্রকল্পটির বিপক্ষে মত দিয়েছিল।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য ফুলবাড়ী চুক্তি এবং তার রাজনৈতিক তাৎপর্য সম্পর্কে সরকারের অবস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সরকার কি ফুলবাড়ী চুক্তির অঙ্গীকারকে অগ্রাহ্য করতে চায়? বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন ও মতামতকে উপেক্ষা করে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের ভিত্তি কী? জনগণের মতামত ও সম্মতি ছাড়াই কি নতুন করে পুরনো প্রকল্প বাস্তবায়নের পথ তৈরি করা হচ্ছে? এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু একটি কয়লা প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; জাতীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতারও পরীক্ষা নেবে।
২০০৬ সালে বাংলাদেশের ছোট্ট জনপদ ফুলবাড়ীর মানুষ যে প্রশ্ন তুলেছিল, তা কোনো স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পের বিরোধিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; খুব দ্রুতই তা জাতীয় প্রশ্নে পরিণত হয়। কারণ, এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল জাতীয় সম্পদের ওপর জনগণের মালিকানা, বিদেশি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ ও কয়লা রপ্তানির পরিকল্পনা বাতিল করা, কৃষিজমি ও পানিসম্পদের নিরাপত্তা বিধান এবং সর্বোপরি জনগণের সম্মতির প্রশ্ন।
দুই দশক পরও সেই প্রশ্নগুলোর কোনোটিই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়নি। বরং বর্তমান সরকারের অবস্থান প্রশ্নগুলোকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। ফুলবাড়ী চুক্তিকে কেবল গণ-আন্দোলনের পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার একটি কৌশল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সেটি রাষ্ট্রের একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন শুধু চুক্তি রক্ষার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা, জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার এবং জাতীয় সম্পদের ওপর জনগণের সার্বভৌম কর্তৃত্বের প্রশ্নও যুক্ত।
ফুলবাড়ীর জনগণ একটি গণবিরোধী প্রকল্পের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রকে একটি নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করতে বাধ্য করেছিল। দুই দশক পর সেই অবস্থান থেকে সরে আসার যেকোনো উদ্যোগ শুধু চুক্তি লঙ্ঘন নয়, জনগণের রক্তে অর্জিত রাজনৈতিক অঙ্গীকার অস্বীকার করার শামিল। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য তাই নতুন সরকারের জ্বালানি নীতির সম্ভাব্য দিকনির্দেশনা সম্পর্কে একটি সতর্ক সংকেত।
ফুলবাড়ী : এক জাগ্রত চেতনা
ফুলবাড়ীর গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তিনটি মৌলিক অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমত, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হবে। জীবন-জীবিকা, কৃষি, পানিসম্পদ ও পরিবেশ রক্ষা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জাতীয় সম্পদের ওপর বিদেশি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ থাকবে না, জাতীয় সম্পদের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ থাকবে জনগণের হাতে। তৃতীয়ত, দেশের কয়লা বিদেশে রপ্তানি করা যাবে না। জাতীয় সম্পদের পরিকল্পিত ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এই তিনটি অবস্থানের সংক্ষিপ্ত রূপ-‘উন্মুক্ত না, বিদেশি না, রপ্তানি না’।
ফুলবাড়ীর লড়াই আজও প্রাসঙ্গিক। কারণ, বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার সংকটের এখনও সমাধান হয়নি, জাতীয় সম্পদের ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত মৌলিক প্রশ্নগুলোর নিষ্পত্তি হয়নি এবং ২০০৬ সালে যে উন্নয়ন মডেলের বিরুদ্ধে মানুষ দাঁড়িয়েছিল, রাষ্ট্র এখনও সেই মডেল থেকে সরে আসেনি।
দুই দশক আগে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ফুলবাড়ী চুক্তি একটি সত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল-জাতীয় সম্পদ সম্পর্কে জনগণের মতামত ও স্বার্থকে উপেক্ষা করে কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে পারে না। ফুলবাড়ী শিখিয়েছে-উন্নয়নের নামে কোনো প্রকল্পের বৈধতা শুধু অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাব দিয়ে নির্ধারিত হতে পারে না; এর সঙ্গে জনগণের সম্মতি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নও অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।
‘উন্মুক্ত না, বিদেশি না, রপ্তানি না’-এটা কোনো আবেগঘন স্লোগান নয়। এর পেছনে রয়েছে জাতীয় সম্পদের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ, জনগণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার, জীবন-জীবিকা ও পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান। ফুলবাড়ী চুক্তির বাস্তবায়ন সম্পর্কে সরকারকে জবাবদিহি দাবি করতে হবে এবং জাতীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি নীতি সম্পর্কিত জনগণের প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। জনগণকে নতুন করে আন্দোলনের শপথ গ্রহণ করতে হবে।
ফুলবাড়ী অতীত নয়; ফুলবাড়ী আজও একটি জীবন্ত রাজনৈতিক অঙ্গীকার, একটি চলমান লড়াই। উন্মুক্ত কয়লাখনির উদ্যোগ ফুলবাড়ী রুখে দেবে। গণবিরোধী তৎপরতা ও চক্রান্তের বিরুদ্ধে ফুলবাড়ী এক জাগ্রত চেতনা।
ফুলবাড়ী জেগে আছে, জেগে থাকবে।
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন