সাম্রাজ্যবাদ

যুদ্ধ ও করণীয়

হারুন-অর-রশিদ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

বাংলাদেশের জন্মই হয়েছে একটা চাপিয়ে দেওয়া একটা যুদ্ধের বিরোধিতার মাধ্যমে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে যোগদান করে, সেটিও যুদ্ধ বিরোধিতা। ১৯৭১ সালে সংখ্যাগরিষ্ঠ আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার উপায় হিসেবেই ২৫ মার্চ ঢাকায় গণহত্যা শুরু করে পাকিস্তানি সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান।নিরস্ত্র জনতার উপরে এই ঘৃণ্য আক্রমণ রুখে দেয় বাংলাদেশের শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র ও আপামর জনগণ। চাপিয়ে দেয়া এই যুদ্ধে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে বাঙালি তার বিজয়গাঁথা রচনা করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে উপনিবেশ বিরোধী জাতীয়তাবাদী লড়াইয়ে এশিয়া-আফ্রিকার যে দেশগুলোর জন্ম হয় তারাই যুদ্ধ বিরোধী ‘জোট নিরপেক্ষ’ আন্দোলন গড়ে তুলেন। একদিকে ছিল সাম্রাজ্যবাদের ন্যাটো জোট ও অন্যদিকে সোভিয়েতের নেতৃত্বে ওয়ারস্ জোট। এই দুই জোটের বাইরেই জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন। বাংলাদেশ জন্মের পরই জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে যুক্ত হয়। সময়ের সাথে বাংলাদেশেও নানা ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল সংসদীয় সরকারের মধ্যমে। কিন্তু খুব দ্রুতই রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালিত হতে শুরু হয়। শুরুতেই হোঁচট। পরপর দুজন রাষ্ট্রপতিকে বিপথগামী সেনাদের হাতে জীবন দিতে হয়। আরেকজন রাষ্ট্রপতিকে সরাতে হয়েছে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। নতুন করে আবার সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা ৯০ এর গণঅভ্যুত্থানের পরে। সেটাও সহজ হয়নি। তার আড়াই দশক পর ২০২৪ এ নানা ঘটনা-অঘটনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে এনজিও প্রধান, মার্কিন ঘনিষ্ঠ ড. মুহাম্মদ ইউনুস। তিনি শপথ গ্রহণের আগেই ভারতের সেভেন সিস্টারস সম্পর্কে যে বক্তব্য রেখেছেন তাতে নানা প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। এ ধরনের কথা তিনি আরও বিভিন্ন সময়ে বলেছেন। এই জনতুষ্টিবাদী বক্তব্যের মাধ্যমে ভারতের সাথে আমাদের সম্পর্কে ক্রমাগত খারাপ হতে থাকে। ইউনুস তার ক্ষমতার শেষ সময় মার্কিনের সাথে যে বাণিজ্য চুক্তি করেন তাতে দেশ শুধু বাণিজ্যে মার্কিনের উপর নির্ভরশীল হয়েছে তাই নয়, ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রেও আমেরিকা যাকে নিষেধাজ্ঞা প্রদান করবে বাংলাদেশকেও তাই করতে হবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ তার নিরপেক্ষতা হারিয়েছে। এই মুহূর্তে মধ্য ইউরোপে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চলছে, কয়েক বছর ধরেই চলছে। এর আগে মার্কিনের নেতৃত্বে পশ্চিমারা ইরাক আক্রমণ করে ঠুনকো অজুহাতে। ফিলিস্তিনের গাঁজা আক্রমণ ও গণহত্যা হয়েছে মার্কিনের ছত্রছায়ায়। এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরান আক্রমণ করে। ইসরায়েল-মার্কিন অক্ষশক্তির ধারণা ছিল কদিনেই ধরাশায়ী হয়ে পড়বে ইরান। যুদ্ধের পূর্বেই ইরান অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধে বিভক্ত ছিল। আক্রমণকারিরা এটাকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। কিন্তু ইরানের প্রধান নেতৃত্ব যুদ্ধে জীবন দিয়ে সমগ্র ইরানের জনগণকে একতাবদ্ধ করে। ইরান তাদের ভূখণ্ড জীবন বাজি রেখে রক্ষা করে চলেছে। এ যুদ্ধে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ রণকৌশল হলো মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার ঘাঁটিগুলোতে ইরান আক্রমণ করেছে। এটা মার্কিন বা তাদের আরব মিত্রদের হিসেবেই ছিল না। আমেরিকা অনেক চেষ্টা করার পরেও কোনো দেশই ইসরায়েল-আমেরিকার পক্ষে ইরান আক্রমণ করেনি। শুধুমাত্র কদিন আগে আমেরিকা ও সৌদি আরব একত্রে ইরাক আক্রমণ করেছে। বরং স্পেন ও ইতালি দৃঢ়তার সাথে ইসরায়েল ও আমেরিকার এই যুদ্ধ প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেছে। ইরান তার নিজের ভূখণ্ড রক্ষা করেছে, অন্য কোনো দেশে আক্রমণ করতে যায়নি। মজাটা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন কোনোভাবেই ইরানের সাথে পেরে উঠছে না তখন সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটা নতুন যুদ্ধ জোট গঠিত হয়েছে ১৪টি রাষ্ট্র নিয়ে; বাংলাদেশও আছে এই জোটে। জোটের কারণ ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগর, বাব আল মান্দেল, এডেন সাগর হয়ে আরব সাগরের সাথে যোগাযোগে বাধা প্রদান করেছে। এতে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই জোটে আমেরিকা-ইউরোপ নেই ঠিকই কিন্তু বাস্তবে এটা আমেরিকার মদদপুষ্ট একটি জোট ভিন্ন কিছু নয়। বাংলাদেশ এই যুদ্ধ জোটে জড়িয়ে বাংলাদেশ গঠনের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধী অবস্থান নিয়েছে। এতদিন পর্যন্ত বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি ছিল সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারোর সাথে শত্রুতা নয়। এই যুদ্ধ জোটে যোগদানের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার নিরপেক্ষতা হারিয়েছে। যদি ভবিষ্যতে কখনো ইরান আমাদের আক্রমণ করলে আমাদের বলার কিছু থাকবে না। আমেরিকার সাথে বাণিজ্য চুক্তি, যুদ্ধ জোটে যোগদান একই সূত্রে গাঁথা! এটা হলো দুনিয়াব্যাপী মার্কিনের অবাধ লুণ্ঠনের লাইসেন্স প্রদান করা। শুধু কিউবা নয়, এই মুহূর্তে ভেনেজুয়েলার তেলসহ বিভিন্ন সম্পদ লুটে নিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনো রকম বিরোধিতা ছাড়া। ফিলিস্তিনের মানুষের অবস্থা আরও ভয়াবহ। বাণিজ্য চুক্তির ফলে আমাদের দেশে গরু, ছাগল, মাছ ও দুগ্ধ খামারিদের পথে বসতে হবে। বন্ধ হতে পারে ঔষধ কারখানা। ফলে দেশে বেকারত্ব আরও বাড়বে। গ্রামীণ নারীরা যারা এই খামারে কর্মরত তারাও কাজ হারাবে। জনগণ হারাবে তার ঔষধের প্রাপ্যতা। এই সময়ে আরও কয়েকটি বিষয়ে আমাদের নজর দেওয়া জরুরি, কিউবার উপর নিষেধাজ্ঞা প্রদান করে কিউবাকে বিদ্যুৎহীন একটা দেশে পরিণত করেছে আমেরিকা। ক্ষুধা সেখানে আজ নিত্যদিনের বিষয়। ভেনেজুয়েলার উপর নিষেধাজ্ঞা ও পরবর্তীতে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতিকে সস্ত্রীক হাইজ্যাক করে আমেরিকায় তুলে নেয়ার ফলে তাদের চরিত্র আরও উন্মোচিত হয়েছে। এধরনের বিষয়ে বাংলাদেশসহ এশিয়া, ইউরোপের দেশগুলো মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। বাস্তবে এগুলোও যুদ্ধের অংশ। ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে ভেনেজুয়েলাকে লুণ্ঠনের একটা ক্ষেত্রে পরিণত করেছে। একই কর্মসূচির অংশ হিসেবে ট্রাম্পের নয়া শুল্ক ও বাণিজ্যনীতি। যার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে ইউনুস সরকার; সায় দিয়েছে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি। গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে আমেরিকার বিশ্বব্যাপী দাপিয়ে বেড়ানো সম্ভব হয়েছে সোভিয়েতের অনুপস্থিতিতে। সোভিয়েতের পতন হয়েছে মার্কিন দালাল গর্বাচেভ ও ইয়েলিৎসনের চক্রান্তের ফলে, পিছনে কলকাঠি নেড়েছে আমেরিকা। সাথে আছে বিশ্বব্যাপী কমিউনিস্ট আন্দোলনের দুর্বল অবস্থান ও বিভক্তি। এখানকার গণতান্ত্রিক শক্তিকে তার অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। সকল কমিউনিস্ট, বামপন্থি ও গণতান্ত্রিক শক্তিকে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে। এজন্য নিরলস প্রচেষ্টা থাকতে হবে। শুধু এতেই হবে না, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আমাদের বন্ধুদের সাথেও যোগাযোগ বাড়াতে হবে। আজ প্রয়োজন পৃথিবীর সকল কমিউনিস্ট ও ওয়ার্কার্স পার্টির নতুন কর্মকৌশল গ্রহণ করা। কারণ বিচ্ছিন্নভাবে লড়াই আমাদের জয়ী করবে না। এজন্য আমরা শুধু ইউরোপ আমেরিকার দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না; বাংলাদেশের কমিউনিস্টদেরও উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হতে পারে। আজ বাণিজ্য চুক্তি যেমন আমাদের সাম্রাজ্যবাদের কাছে পদানত করতে চায়, তেমনি যুদ্ধ জোটের মাধ্যমে মার্কিনের হয়ে যুদ্ধ করতে বাধ্য করতে চায়। বাংলাদেশের জনগণের ফিলিস্তিন ও ইরানের জনগণের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন রয়েছে। কিন্তু আজ যদি আমরা মার্কিন বা সৌদি প্ররোচনায় মার্কিনের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করি সেটা হবে মূলত ফিলিস্তিন ও ইরানের জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। বর্তমান সরকারের কোনো যথাযথ নৈতিক অবস্থান নেই, তারা যেমন বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে মার্কিনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, তেমনি যুদ্ধ জোটের ক্ষেত্রেও গণবিরোধী অবস্থানে নিয়েছে। তাই আজকের দিনে কমিউনিস্ট-বামপন্থিদের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী না হবার কোনো সুযোগ নেই। এটা কমিউনিস্টদের আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতারও অংশ। এই প্রতিরোধ আন্দোলনের কারণ ও লক্ষ্য আমাদের স্পষ্ট হওয়া জরুরি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় রাশিয়ার জনগণ সীমাহীন দুর্দশায় নিপতিত হয়। সৈনিকদের রসদ কমতে থাকে। তাই পিতৃভূমি রক্ষা চাইতে শান্তির প্রশ্ন ছিলো রাশিয়ার শ্রমিকশ্রেণির প্রধান আকাঙ্ক্ষা। বলশেভিক পার্টি তাই জমি, খাদ্য ও শান্তির দাবিকে অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে নিয়ে আসে। তারা আরও নিশ্চিত করেন শ্রমিক শ্রেণির রাষ্ট্র ক্ষমতায় না গিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও জাপ বিরোধী লড়াই সামনে চলে আসে। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি এই কর্তব্য নিজেদের কাঁধে তুলে নেয়, এবং একই সাথে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। আজকের দিনে তাই বাংলাদেশের কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের দায়িত্ব সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করা ও ক্ষমতা দখলের কৌশল খুঁজে বের করা। চাই নিপীড়িত জাতি ও জনতার ঐক্য। দুনিয়ার মজদুর এক হও! লেখক : সাধারণ সম্পাদক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী পরিষদ
বিশেষ রচনা
সংবাদপত্র ও রাজনীতি
একতার লড়াই চলছে, চলবে
পার্টি ও গণসংগঠনের মিথস্ক্রিয়া
ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের শ্রেণি চরিত্রের পরিবর্তন হয়নি
একতার জন্য প্রত্যয়
সত্যেনদার দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে
একতা পড়ো, শ্রমিক শ্রেণির একতা গড়ো, শোষণ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করো
অধিকারের সংগ্রামে অদম্য ‘একতা’
চব্বিশের কাঠগড়ায় বুর্জোয়া রাজনীতি এবং শ্রমিক শ্রেণির শিক্ষা
গণমাধ্যমের গলায় দড়ি
সকল বাধা মোকাবিলা করে একতা এগিয়ে যাবেই
শাসকদের ‘উন্নয়ন’ থেকে জনগণের অভ্যুত্থান এবং তারপর
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তি কি ঔপনিবেশিক অর্থনীতির নতুন রূপ?
বাংলাদেশে নয়া উদারবাদ উৎপত্তি-বিকাশ ও সংকট
কমিউনিস্ট দৈনিক ‘স্বাধীনতা’
ইতিহাস কাউকেই ছাড় দেয় না
কমিউনিস্ট পার্টি ও কার্ল মার্কসের প্রাসঙ্গিকতা
একতার অবিচল পথচলা শেষ হয় না

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..