ইতিহাস

কমিউনিস্ট দৈনিক ‘স্বাধীনতা’

স্বর্ণেন্দু দত্ত

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

অবিভক্ত ভারতে উনিশশো ছেচল্লিশের নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ওই নির্বাচনের প্রাক্কালে কমিউনিস্ট পার্টি দৈনিক সংবাদপত্র প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৪৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর প্রকাশিত হয় ‘স্বাধীনতা’। মাস্ট হেডের তলায় লেখা হতো- কমিউনিস্ট পার্টির দৈনিক পত্রিকা। কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের সূচনালগ্ন থেকেই বাংলায় বারে বারে পার্টির পত্রিকা প্রকাশের চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু দৈনিক সংবাদপত্র এই প্রথম। একটি পূর্ণাঙ্গ দৈনিক পত্রিকা চালাতে যে বিপুল মূলধন, পরিকাঠামো প্রয়োজন- তার কোনোটাই কমিউনিস্ট পার্টির ছিল না। বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি সেদিন দৈনিক প্রকাশের দুঃসাহসিক কাজের জন্য আস্থা রেখেছিল কেবলমাত্র মেহনতি জনতার ওপরেই। বর্তমানে করপোরেট নিয়ন্ত্রিত এবং শাসকের মুখপত্রে পরিণত হওয়া মিডিয়ার বিপরীতে সামান্য কিছু ‘বিকল্প’ সংবাদমাধ্যম টিকে থাকার লড়াই চালাচ্ছে। এমন সময়ে একবার ফিরে দেখা যেতে পারে কিভাবে চলেছিল ‘স্বাধীনতা’। ঔপনিবেশিক শাসনে প্রবল প্রতিকূলতায় কিভাবে লড়েছিল একটি বিকল্প ভাষ্যের সংবাদপত্র। মেহনতির মুখপত্র সাপ্তাহিক ‘জনযুদ্ধ’ পত্রিকায় প্রথম আবেদন প্রকাশিত হয়- ‘‘কমিউনিস্ট পার্টির দৈনিক কাগজ ও ছাপাখানার জন্য তিন লক্ষ টাকা চাই’’। পরে প্রচারপত্রও হয়। কমিউনিস্ট পার্টি সম্পর্কে প্রচার এবং পার্টি বিরোধী কুৎসার জবাব দেওয়ার জন্য দৈনিক কাগজের প্রয়োজনীয়তার উল্লেখ করে শ্রমিক, কৃষক, ছাত্রছাত্রী, মহিলাদের প্রতি পত্রিকা তহবিলে সাহায্যের আবেদনে বলা হয়- এই পত্রিকা বাস্তবিক অর্থেই তাদের মুখপত্র হবে। সরকারের থেকে সংবাদপত্রের অনুমতি তখনও মেলেনি, স্থির হয়নি পত্রিকার নাম। তারমধ্যেই কলকাতায় বড় বড় সমাবেশে শ্রমিকরা তাঁদের নিজেদের পত্রিকা প্রকাশের দাবি জানাতে থাকেন সরকারের কাছে। কলকাতার ট্রাম শ্রমিক, বেলঘরিয়ার পটারি কারখানার শ্রমিকরা, বাঁকুড়ার বিড়ি শ্রমিকরা পার্টি দৈনিকের জন্য অর্থ দিয়েছেন। কাঁকুড়গাছি বস্তির ঠোঙা তৈরির মজুররা ঈদের নমাজের পরে পাঁচশো জনের থেকে অর্থ তুলেছেন। দারোয়ান, ঝাড়ুদার, সামরিক যোদ্ধা, চট্টগ্রামের দুর্ভিক্ষ পীড়িত মৎস্যজীবী, হাজং চাষি-মেয়েরা, শিল্পী, সাহিত্যিক, শিক্ষক; দু’আনা- চার আনা থেকে দু’শো-পাঁচশো টাকা তুলে দিয়েছেন পত্রিকা তহবিলের জন্য। ২৫ ডিসেম্বর প্রকাশিত হয় চার পাতার দৈনিক ‘স্বাধীনতা’। মুজফ্ফর আহমদ, সোমনাথ লাহিড়ী, প্রমোদ দাশগুপ্ত এবং নৃপেন চক্রবর্তীকে নিয়ে সম্পাদকমণ্ডলী। সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি সোমনাথ লাহিড়ী। ম্যানেজার প্রমোদ দাশগুপ্ত। সম্পাদক রমনীমোহন সরকার। প্রথম পাতায় পত্রিকার নামের নিচে সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি সোমনাথ লাহিড়ীর নাম প্রকাশিত হত। ‘স্বাধীনতা’ প্রকাশের দিন পনেরোর মধ্যেই প্রতিদিন ৭ হাজার কপি ছাপানো হতো। শুরুতে শ্রমিক মহল্লাতেই অধিকাংশটা বিক্রি হতো। তহবিলের জন্য গণউদ্দীপনা ‘স্বাধীনতা’-য় শুরু থেকেই অর্থ সংগ্রহের খবর লিখতেন মুজফ্ফর আহমদ। কারা, কিভাবে অর্থ দিচ্ছেন তার বিবরণ তুলে ধরতেন। সংগৃহীত অর্থ ‘স্বাধীনতা’য় পাঠানো হত মুজফ্ফর আহমদের নামেই। দৈনিকের তহবিল গড়তে পার্টি কিভাবে গণউদ্দীপনা তৈরি করেছিল স্থানাভাবে সেই রোমাঞ্চকর বিবরণ বিস্তৃত দেওয়া সম্ভব নয়। শুধু একটি ঘটনার কথা বলা যাক- ঢাকা জেলার এক তহবিল সংগ্রহ সভায় উপস্থিত হয়েছিলেন এক মুসলীম লীগ কর্মী। তাঁর বিবরণীটি হুবহু- ‘‘দেখলুম শ্রমিক দিচ্ছে তার এক এক মাসের মজুরী; ছাত্রকর্ম্মী দিচ্ছে তার কলম, পেন্সিল; মেয়েরা দিচ্ছে তাদের অলঙ্কার। আশ্চর্য্য হয়ে গেলুম, এঁরা কেউ বড়লোক নয়, গরীব; আমার চেয়েও গরীব। ভেবেছিলাম, কমিউনিস্ট পার্টিকে টাকা দেব না। কিন্তু জানিনা কি করে পাঁচ টাকা দিয়ে এলুম, যদি আরো থাকতো হয়তো আরো দিতুম।’’ মনে রাখা প্রয়োজন, সময়টা বিশ্বযুদ্ধ-মন্বন্তর-মহামারীর আঘাতে দীর্ণ। তারমধ্যে বাংলার পীড়িত-মুর্ছিত জনগণই এগিয়ে এসেছিলেন পত্রিকার তহবিল গড়তে। মানুষের আবেগ, দান, ত্যাগেও সবটা হলো না। ডিসেম্বরের মধ্যে প্রয়োজনীয় ৩ লক্ষ টাকার লক্ষ্যমাত্রার ধারে কাছে পৌঁছানো গেল না। মূলত নির্বাচন সামনে থাকায় কাগজ প্রকাশ করে দেওয়া হয়। ছাপাখানা তখনও হয়নি। মে মাসের শুরুতেই পার্টি জানালো- নির্বাচন এবং প্রেস চালাতে গিয়ে প্রাদেশিক কমিটির আর্থিক পরিস্থিতি অতি গুরুতর সঙ্কটে পৌঁছেছে। পার্টির ইতিহাসে এমন গুরুতর আর্থিক সঙ্কটে কখনও পড়তে হয়নি বলেও জানালো প্রাদেশিক কমিটি। পত্রিকা প্রকাশের ক্ষতির হাত থেকে বাঁচতে প্রাদেশিক কমিটির বৈঠকের পরে ‘স্বাধীনতাকে বাঁচান’ শিরোনামে শাখা স্তর পর্যন্ত সার্কুলার দিয়ে বলা হয়- পার্টিকে পরিশ্রমসাধ্য চেষ্টা করতে হবে যাতে নির্দিষ্ট পরিমাণ বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করা যায়। কোন কোন ক্ষেত্র থেকে বিজ্ঞাপন পাওয়া সম্ভব তা সুনির্দিষ্ট উদাহরণ দিয়ে বলা হল- ‘‘ঢাকার কমরেডরা শক্তি এবং সাধনা ঔষধালয়ের বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করতে পারেন। কুমিল্লা এবং অন্যান্য জেলার কমরেডরা বিভিন্ন ব্যাঙ্ক এবং স্থানীয় স্তরের সামগ্রীর বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করতে পারেন।’’ সার্কুলারে পার্টি বলল- ‘‘আমাদের দৈনিক চালাতেই হবে। তার জন্য বিজ্ঞাপন আমাদেরই নিশ্চিত করতে হবে। এটা এখন সমস্ত পার্টি সদস্য এবং দরদীদের উপর নির্ভর করছে যে তাঁরা ‘স্বাধীনতা’য় প্রকাশযোগ্য বিজ্ঞাপন কিভাবে সংগ্রহ করবেন। ...আমাদের কাগজ একটি কমিউনিস্ট দৈনিক। নিজেদের উদ্যোগেই আমাদের বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করতে হবে।’’ প্রত্যাশা মত বিজ্ঞাপন না মিললেও বাড়লো অনেকখানিই। বিড়ি কোম্পানি থেকে বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে থাকা ব্যাংকের বিজ্ঞাপন, কটন মিল, বীমা, সুগন্ধী-প্রসাধনী, বই- প্রকাশনা সংস্থা, সিনেমার বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হতে থাকলো। জুন মাস থেকেই কাগজে বিজ্ঞাপনের পরিমাণ বাড়লো অনেকটাই। সার্কুলারে উল্লেখিত ঢাকার শক্তি এবং সাধনা ঔষধালয়ের বিজ্ঞাপনও এলো। জেলার নেতা-কর্মীরা যেমন স্থানীয় সামগ্রির বিজ্ঞাপন জোগাড় করলেন, তেমনই টাটা স্টিলের বড় আকৃতির বিজ্ঞাপনও পেল ‘স্বাধীনতা’। যৌনব্যাধি নিয়ে সচেতনতার বিজ্ঞাপন দিল মেডিকেল কলেজ। ‘বাংলা গভর্মেন্ট কর্তৃক প্রচারিত’ বিজ্ঞাপনও রয়েছে ‘স্বাধীনতা’র পাতায়। ব্রিটিশের কোপে স্বাধীনতা ক্রমশ জনসাধারণের ‘নিজের কাগজ’ হয়ে উঠলো। ক্যাবিনেট মিশন, কংগ্রেস-মুসলিম লীগ সংঘাত, বন্দী মুক্তি আন্দোলন, রশিদ আলি দিবস, নৌ-বিদ্রোহ, ডাক-তার ধর্মঘট- ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের নির্ণায়ক বাঁকের সাক্ষী হয়ে রয়েছে ‘স্বাধীনতা’। ছেচল্লিশের আগস্ট থেকে সাতচল্লিশের স্বাধীনতা পেরিয়ে দেশভাগ; সাম্প্রদায়িকভাবে বিভাজিত হয়ে যাওয়া তখনকার বাংলার সংবাদপত্রের মধ্যে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম ‘স্বাধীনতা’। তেভাগার অবিস্মরণীয় সংগ্রামেরও কথাকার। সূচনার শ্রমিক মহল্লা থেকে ‘স্বাধীনতা’ পৌঁছেছে বাংলার গ্রামগঞ্জে। পত্রিকার বিষয়বস্তুই মধ্যবিত্ত কেরাণী, বুদ্ধিজীবী, ছাত্রছাত্রীদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল ‘স্বাধীনতা’-কে। এক বছর পূর্তির সময়ে প্রচার সংখ্যা দাঁড়াল ১৬ হাজার। ‘স্বাধীনতা’ যত মানুষের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ততই শাসকের আক্রমণ বেড়েছে; ব্রিটিশের এবং অন্তর্বর্তী সরকারের। প্রকাশের চার দিনের মাথায় প্রকাশিত সংবাদে জানা যাচ্ছে, কংগ্রেসের প্রাদেশিক কমিটির দপ্তর থেকে ‘স্বাধীনতা’য় বিজ্ঞাপন বন্ধ করার ‘নির্দেশ’ এসেছে। যারা ‘স্বাধীনতা’য় বিজ্ঞাপন দেয়, তাদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। পিছিয়ে রইলো না মুসলিম লীগ পন্থি ‘আজাদ’ পত্রিকা। লাগাতার টার্গেট করলো ‘স্বাধীনতা’কে। ব্রিটিশ আমলের গোয়েন্দা বিভাগের নথি থেকে দেখা যাচ্ছে স্বাধীনতা সম্পর্কে উপর মহলে বারংবার রিপোর্ট পাঠানো হচ্ছে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে। পরিণতিতে ক্রমশ স্বাধীনতার উপর সরকারি আর্থিক জরিমানা, কাগজ বাজেয়াপ্ত করা, মামলা, খানাতল্লাশি, জেলায় জেলায় রিপোর্টার এবং এজেন্টদের গ্রেপ্তারের মাত্রা বাড়তে থাকলো। চিঠিপত্র আটক এবং সেন্সর করা হল। এমনকি জেলবন্দী বিপ্লবীদের স্বাধীনতা তহবিলে পাঠানো টাকাও আটক করা হলো। সাতচল্লিশের শুরু থেকে এই আক্রমণের মাত্রা বৃদ্ধি পেল বহু গুণ। ভারতীয় সৈন্যদের দুর্দশা সম্পর্কে গোপন রিপোর্ট প্রকাশ করায় জরিমানা, ট্রাম শ্রমিকদের ধর্মঘটের সমর্থনে সংবাদ লেখায় পত্রিকা দপ্তরে খানাতল্লাসি হয়। তেভাগা আন্দোলন দমনে বাংলা সরকারের গোপন সার্কুলার প্রকাশ করে দেওয়ার পরে সোমনাথ লাহিড়ীকে গ্রেপ্তার করা হয়। ‘সুসং চাষিদের উপরে বোমাবর্ষণের সংবাদ’ এবং ‘ব্যাস্টিনের নেতৃত্বে হাজং অঞ্চলে বর্বরতার অভিযান’- প্রকাশ করার জেরে বিপুল অর্থ জরিমানা করা হল। বাংলা সরকারের অতিরিক্ত স্বরাষ্ট্র সচিব আর কে মিত্র হুশিয়ারি দিয়ে বলেন- ‘‘আপনাদের কাগজ বন্ধ করিয়া দেওয়ার কথাই ভাবিতেছিলাম। ভবিষ্যতে সাবধান হইবেন।’’ পত্রিকা বিক্রি করতে গিয়েও প্রায়শই শারীরিক ও অন্যান্য আক্রমণের মুখে পড়তে হয়। সিভিল সাপ্লাই মোটর ট্রান্সপোর্ট বিভাগের মাঝেরহাট গ্যারাজের দুই জন ড্রাইভার রঘুনাথ সিং এবং মহম্মদ রফিককে বরখাস্ত করা হয় স্বাধীনতা বিক্রির অপরাধে। পত্রিকার হকার, এজেন্টদের উপর আক্রমণের খবর মাঝেমাঝেই ‘স্বাধীনতা’র পাতায় প্রকাশ হয়েছে। বিকল্প সংবাদ মাধ্যমের উপর শাসকের আক্রমণের এই সব পন্থা এখনও অতি প্রিয়। অপূর্ব ত্যাগস্বীকার মালিকের পত্রিকার বিপরীতে কি ছিল শ্রমিকের পত্রিকার কর্মী নীতি? ‘স্বাধীনতা’ কর্মীদের ভাতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে ১৯৪৭ সালের ১০ জানুয়ারি মুজফ্ফর আহমদ লিখছেন- ‘‘এক বন্ধু জানতে চেয়েছেন- ‘স্বাধীনতা’র কর্মীরা মাইনে পান কত? জবাব শুনলে তিনি খুশীই হবেন। কারণ এখানেও দেখতে পাবেন অপূর্ব ত্যাগস্বীকার। কাগজের সম্পাদনা এবং বিজ্ঞাপন বিভাগে ৭৪ জন কাজ করেন। তারমধ্যে ১০ জন বিনা পারিশ্রমিকে নির্দিষ্ট কাজ নিয়মিতভাবে করে যাচ্ছেন। আর ৬৪ জন মিলে প্রতি মাসে মোট মাইনে নেন মাত্র ২৫৫০ টাকা। অর্থাৎ গড়ে দাঁড়ায় মাথাপিছু মাসে ৩৯ টাকার কিছু বেশী। এর ভিতর কেউ নেন কমিউনিস্ট কর্মীদের সাধারণ মাসিক মজুরী তিরিশ টাকা। আবার কেউ বা পরিবার প্রতিপালনের জন্য নিতান্তই যেটুকু বেশী না নিলে চলে না তাই নেন। “এখানে বলা দরকার যে, ‘যুগান্তর’ প্রভৃতি কাগজের সাব-এডিটরদের মাসিক ভাতা সহ ন্যূনতম বেতন ১৩৫ টাকা। ‘স্বাধীনতা’ কাগজের প্রধান সম্পাদক, সহ-সম্পাদকরা, জেনারেল ম্যানেজার, সহকারী ম্যানেজার- এরা প্রত্যেকে কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী হিসাবে মাসিক মজুরী তিরিশ টাকা করেই নেন। তাছাড়া গণশক্তি প্রেসকে মাসে ৩ হাজার টাকা করে দিতে হয় ‘স্বাধীনতা’ কম্পোজ করা, ছাপানোর খরচ বাবদ। ছাপার কাগজের দাম, ডাক মাশুল, রেল মাশুল, নিউজ এজেন্সি, রিপোর্টারদের টেলিগ্রাম ও রাহা খরচ, ফটো ব্লক ইত্যাদি বাবদ খরচ ধরলে মাসে সবশুদ্ধ খরচ হয় ২৬০০০ টাকা। এইসব খরচ কমানো যায় না। যেখানে কমান সম্ভব, তা হচ্ছে কর্মীদের মাইনে। বর্তমানে তা এত অল্প যে তাকে আর কমান অসম্ভব।’’ অসাধ্য সাধন ছেচল্লিশের আগস্টের কলকাতা থেকে নোয়াখালী হয়ে পুরো বছরটাই চলে যায় ভয়াবহ দাঙ্গার কবলে। গোয়েন্দা রিপোর্ট জানায় দাঙ্গার কারণে কমিউনিস্ট পার্টির স্বাভাবিক কাজকর্ম বন্ধ হয়ে গেছে। শুধুমাত্র ‘স্বাধীনতা’ আর ‘পিআরসি’ কাজ চালাচ্ছে। ফলে সাতচল্লিশের শুরুতেই ফের অর্থের জন্য আবেদন করতে শুরু করলেন মুজফ্ফর আহমদ। এমনকি নিয়মিত তহবিলের বাইরে সরকারের চাপিয়ে দেওয়া জরিমানার জন্য অতিরিক্ত অর্থও চাইতেন। নিজেই বলেছেন- ‘মানুষের কাছে আমাদের বারে বারে হাত পাতিতেই হইবে। এ ছাড়া শ্রমিক-কৃষকের কাগজকে বাঁচাবার অন্য কোনো পথ নাই। হাত পাতলে মানুষ কখনও নিরাশ করেনি। সঙ্কটের সময়ে ত্রাতা হয়ে দাঁড়িয়েছেন মেহনতীরাই। দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছেন, ‘স্বাধীনতা’ কে বন্ধ হইতে দিব না।’ মুজফ্ফর আহমদ এমন সব ঘটনা প্রসঙ্গে বলেছেন- “এইভাবেই সমাজের সমস্ত অংশ থেকে ‘স্বাধীনতা’ তার জীবনী শক্তি অর্জন করিতে থাকিবে।” পার্টির তহবিল নেই। পত্রিকার নিজস্ব সম্পদ নেই। দৈনিক চালানোর অতীত কোনো অভিজ্ঞতা নেই। এত নেই-এর মধ্যে অগ্রাধিকার ছিল। কেন দৈনিক চালাতেই হবে কমিউনিস্ট পার্টিকে- তা নিয়ে কোনো দ্বিধা ছিল না। তাই অর্থ থেকে বিজ্ঞাপন সংগ্রহ, পত্রিকার প্রচার, বিক্রি- সমগ্র পার্টিকে যুক্ত করা হয়েছিল এই কাজে। পার্টি সদস্য, কর্মীরা সেই কাজ করছেন কিনা তার নিয়মিত নজরদারি ছিল। পত্রিকা কর্মীদের পরিশ্রম, ত্যাগ সম্পর্কে ছিল গভীর মমত্ব, শ্রদ্ধাবোধ। সব থেকে বড় সম্পদ ছিল মানুষের উপর বিশ্বাস। স্বাধীনতা প্রকাশ এবং তাকে চালিয়ে নিয়ে যেতে যে গণউদ্দীপনা পার্টি তৈরি করেছিল এবং ধারাবাহিকভাবে বজায় রেখেছিল- তা অতীতে কোনো সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে হয়নি। এই সব মিলিয়েই অসাধ্য সাধন করেছিল ‘স্বাধীনতা’, কমিউনিস্ট পার্টি। করপোরেট ও সরকারের অনুদান বিবর্জিত আজকের বিকল্প সংবাদপত্রগুলিকে সেই অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে পথ দেখাতে পারে। লেখক : সাংবাদিক, দৈনিক গণশক্তি (১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে পশ্চিমবঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হলে দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ বন্ধ করে দেওয়া হয়। পার্টির ওপরে নিষেধাজ্ঞা ওঠার পরে ১৯৫১ সালে ফের প্রকাশিত হয় দৈনিকটি। সবশেষ ১৯৬২ সাল পর্যন্ত প্রকাশনা চালু রাখতে পেরেছিল এ পত্রিকাটি।)
বিশেষ রচনা
ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের শ্রেণি চরিত্রের পরিবর্তন হয়নি
একতার জন্য প্রত্যয়
সত্যেনদার দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে
যুদ্ধ ও করণীয়
অধিকারের সংগ্রামে অদম্য ‘একতা’
চব্বিশের কাঠগড়ায় বুর্জোয়া রাজনীতি এবং শ্রমিক শ্রেণির শিক্ষা
সংবাদপত্র ও রাজনীতি
একতার লড়াই চলছে, চলবে
পার্টি ও গণসংগঠনের মিথস্ক্রিয়া
শাসকদের ‘উন্নয়ন’ থেকে জনগণের অভ্যুত্থান এবং তারপর
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তি কি ঔপনিবেশিক অর্থনীতির নতুন রূপ?
বাংলাদেশে নয়া উদারবাদ উৎপত্তি-বিকাশ ও সংকট
একতা পড়ো, শ্রমিক শ্রেণির একতা গড়ো, শোষণ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করো
ইতিহাস কাউকেই ছাড় দেয় না
কমিউনিস্ট পার্টি ও কার্ল মার্কসের প্রাসঙ্গিকতা
একতার অবিচল পথচলা শেষ হয় না
গণমাধ্যমের গলায় দড়ি
সকল বাধা মোকাবিলা করে একতা এগিয়ে যাবেই

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..