জীবন কথা
সত্যেনদার দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে
লক্ষ্মী চক্রবর্তী
ভারতীয় উপমহাদেশে বার বার নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশ জাতি ও সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। এদেশে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, ’৫২র ভাষা আন্দোলন, পরবর্তীতে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। এই ধারাবাহিক ইতিহাসের প্রতিটি আন্দোলন ও সংগ্রামকে অগ্রসর করতে অনন্য সাধারণ ভূমিকা পালন করেছে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলন। আর প্রগতিশীল এই সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে সংগঠিত করার এক মহানায়কের নাম সত্যেন সেন, আমাদের ‘সত্যেনদা’।
তিনি ছিলেন এক অসীম কৃতিত্বের অধিকারী মানবতাবাদী নেতা। মনুষ্যত্বের সাধনা তাঁর কাছে ছিল এক আদর্শিক বিষয়। ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে ছিল তাঁর মানবিকতাবোধ। অসাম্প্রদায়িক, মুক্ত মানুষের মুক্ত স্বদেশ গড়তে গিয়ে জীবনের অনেকটা সময় জেলে কাটিয়েছেন সত্যেনদা।
’৬০ এর দশকের শেষ দিকে আমরা এক ঝাঁক তরুণ-তরুণী সংগঠিত হয়েছিলাম বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের মাঝে; কিন্তু এর সাথে একটি সাংস্কৃতিক টিমও গঠন করা হয়েছিল। সেই দলে নারায়ণগঞ্জের ১নং ঢাকেশ্বরী মিল ও সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে এক ঝাঁক তরুণ-তরুণী যুক্ত হয়ে গেল। রথীন চক্রবর্তী এবং কমরেড রবি নিয়োগীর কন্যা মঞ্জুশ্রী নিয়োগী এটি পরিচালনা করতেন। আর তখন সত্যেনদার পদচারণার অঞ্চল ছিল এই সুতাকল ও গ্রামাঞ্চলগুলো। তিনি গাইতেন– ‘গ্রাম থেকে জেগে ওঠো– শহর থেকে জেগে ওঠো’।
শ্রমিক অঞ্চল ও গ্রামাঞ্চলগুলোর সাথে সবসময় তাঁর একটা নিবিড় সম্পর্ক ছিল। তিনি গ্রামবাংলার পথে পথে ঘুরে মানুষের জীবনবোধকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাঁর রচনার মধ্যে গান, গল্প, কবিতা, উপন্যাস মানুষের অন্তরকে আকৃষ্ট করেছে।
পঞ্চাশ ও ষাটের দশক জুড়ে সত্যেনদা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে মানুষের মনের গভীরের অন্তর্দহন তাঁর সাহিত্য কর্মে স্থান দিতে পেরেছিলেন। কিন্তু আজ মানুষের অবমাননা হচ্ছে পদে পদে, তরুণ সমাজ বিভ্রান্ত হচ্ছে। সাহিত্য, সংস্কৃতি, সংগীতের মাধ্যমে চেতনাকে উন্নত করতে পারছে না। মাজার, মন্দির, গির্জা, ভাস্কর্য ভাঙার একটা উৎসব চলছে। বাঙালি সংস্কৃতিকে পদদলিত করার জন্য ব্যথিত হচ্ছে না। বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশকে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সংগীতের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সমাজকে ধাবমান করতে প্রত্যয়ী হতে হবে। বাঙালি জাতীয় শ্রেণিচেতনাকে বিকশিত করতে সত্যেনদার মতো সৎ ব্যক্তিদের রাষ্ট্র ও সমাজের ঊর্ধ্বস্থানে আসীন করা একান্ত প্রয়োজন।
সত্যেনদা শেরপুরে রবি নিয়োগীর বাড়িতে খুব যেতেন। তিনি একবার সংবাদ পত্রিকায় ‘আশ্চর্য মেয়ে’ শিরোনামে লিখেছিলেন জ্যোৎস্না নিয়োগী সম্পর্কে। সত্যেনদা ঘি এবং মধু খেতে খুব পছন্দ করতেন। তিনি তাঁদের বাড়ি গেলে বলতেন, ‘আমাকে ভাতে ঘি দিলেই চলবে’। সত্যেনদা নিজের বিষয়ে যথেষ্ট উদাসীন ছিলেন- তাঁর চুল, দাড়ি, নখ বড় হয়ে গেলেও কাটার উদ্যোগ থাকতো না। তবে জ্যোৎস্না মাসিমা সত্যেনদার এসব খুঁটিনাটি দিকগুলো দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতেন।
১৯৪৩-১৯৪৭ সালের বেশির ভাগ সময় পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক সংগঠকরা তাদেও কর্মকাণ্ডকে নানাভাবে বিকশিত করে তখনকার সময় প্রগতি লেখক সংঘ, শিল্পী সংঘকে একটি শক্তিশালী সংগঠন রূপে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়। সত্যেন সেন ও সাধন দাশগুপ্ত এই সংগঠনের সভ্য ছিলেন। এই সংগঠনের বদৌলতে জেলায় জেলায় শিল্পী, সাহিত্যিক, নাট্যকাররা যুক্ত হতে থাকে। এই সংগঠনের মাধ্যমে ‘প্রতিরোধ’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশিত হতো।
প্রগতি লেখক সংঘের মাধ্যমে সোমেন চন্দের মৃত্যু দিবস মর্যাদার সাথে পালিত হতো। এই সংগঠন গণমানুষের জীবন সংগ্রামকে সুতীক্ষè করার প্রয়াসে তাঁরা বহু গান রচনা করেন এবং জেলায় জেলায় স্কোয়াড গঠন করে সভা, সমাবেশ, সম্মেলনসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সেসব সংগীত পরিবেশন করা হতো। এই সংগঠনের মাধ্যমে কলকাতা থেকে আইপিটিএর দল এসে অনুষ্ঠান করে। এর পাশাপাশি কলকাতা থেকে চিত্ত প্রসাদ ও মণি রায় এখানে সংগঠক ও শিল্পীদের প্রশিক্ষণ দান করেন।
পার্টি কমরেডরা ঐ সময় বিভিন্ন অঞ্চলে যুক্ত হয়ে প্রতিভাবান ব্যক্তিদের সংগঠিত করতে থাকে। ঢাকা জেলার বিক্রমপুর, নারায়ণগঞ্জ ও মানিকগঞ্জ জেলায় এর প্রভাব পড়ে। শ্রমিক কমরেডদের উদ্যোগে সুতাকল শ্রমিক ইউনিয়ন বিভিন্ন বাদ্য যন্ত্রে সুসজ্জিতভাবে সাংস্কৃতিক স্কোয়াড গঠন করে। এই স্কোয়াডগুলো মুক্ত মানুষের মুক্ত সমাজ গঠন করার লক্ষ্যে গ্রাম গ্রামান্তরে ঘুরে ঘুরে সংগীত, নাটক পরিবেশন করতো।
সত্যেনদার সাথে আমার পরিচয় হয় ১৯৭২ সালের প্রথম দিকে। আমার ছোটবেলার খেলার সাথী, পাঠ্য শ্রেণির সাথী, ছাত্র ইউনিয়ন ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথী প্রীতিকণা দাস নূপুরের দিদি মেট্রিক পরীক্ষা দিবেন। কিন্তু পরীক্ষা দিতে ঢাকায় যেতে হবে। দিদি কী করবে, কোথায় থাকবেন- তা নিয়ে খুব দুঃশ্চিন্তায় ছিল তাঁদের পরিবার। পরে রথীন চক্রবর্তী সত্যেনদার সঙ্গে যোগাযোগ করে দিদিকে পুরানো ঢাকার সূত্রাপুরে করিম ভাইয়ের বাসায় থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন।
এরই মধ্যে একদিন আমি ও নূপুর করিম ভাইয়ের বাসায় গেলাম। বাড়িটি ছিল পুরানো হলুদ রঙের, দরজা-জানালাগুলো কাঠের সবুজ রঙ করা। আমরা দরজায় কড়া নাড়তেই খুব সুশ্রী এক মহিলা দরজা খুলে আমাদের ভিতরে আহ্বান করলেন।
ঘরটির এক পাশে একটি ছোট খাট, হাতলওয়ালা কাঠের চেয়ার, একটি টেবিল। টেবিলের পাশে চেয়ারে বসা ছিমছাম চেহারার এক সুশ্রী বয়স্ক লোক, কালো ফ্রেমের চশমা, গায়ে হাতাকাটা পাতলা সাদা গেঞ্জি, সামনে কাগজ কলম। বোঝা গেল অপর পাশের চেয়ারে বসে যে ভদ্রমহিলা লিখছিলেন, তিনি করিম ভাইয়ের স্ত্রী হেলেনা ভাবী।
সত্যেনদা শেষদিকে চোখে দেখতেন না, তাই অন্যের সাহায্য নিয়ে লিখতে হতো। এই লেখার কাজের দায়িত্ব হেলেনা ভাবী পালন করতেন। ভাবীর আতিথেয়তা আজও ভোলার নয়।
মানবতাবাদী সত্যেন সেন তাঁর সাহিত্য কর্মে, সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্যে সমাজ সভ্যতার পথপ্রদর্শক হয়ে জাগরুক থাকবেন। তাঁর গড়ে তোলা উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী দেশব্যাপী বিস্তার লাভ করেছে। এই সংগঠনের মন্ত্রে দীক্ষিত শিল্পী, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিসেবীদের মহান আত্মত্যাগী হয়ে ঝড় তুফানকে উপেক্ষা করে সত্যেনদার আদর্শকে আত্মস্থ করে এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের সমাজের অন্ধকার, কুসংস্কার দূর করার জন্য সমাজ সভ্যতার পথপ্রদর্শক কমরেড সত্যেন সেন পথ ও পাথেয় হয়ে থাকবেন।
কমরেড সত্যেন সেন- লাল সালাম।
লেখক : সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি
বিশেষ রচনা
একতার লড়াই চলছে, চলবে
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তি কি ঔপনিবেশিক অর্থনীতির নতুন রূপ?
ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের শ্রেণি চরিত্রের পরিবর্তন হয়নি
কমিউনিস্ট দৈনিক ‘স্বাধীনতা’
ইতিহাস কাউকেই ছাড় দেয় না
যুদ্ধ ও করণীয়
একতার অবিচল পথচলা শেষ হয় না
চব্বিশের কাঠগড়ায় বুর্জোয়া রাজনীতি এবং শ্রমিক শ্রেণির শিক্ষা
সকল বাধা মোকাবিলা করে একতা এগিয়ে যাবেই
পার্টি ও গণসংগঠনের মিথস্ক্রিয়া
শাসকদের ‘উন্নয়ন’ থেকে জনগণের অভ্যুত্থান এবং তারপর
একতার জন্য প্রত্যয়
বাংলাদেশে নয়া উদারবাদ উৎপত্তি-বিকাশ ও সংকট
একতা পড়ো, শ্রমিক শ্রেণির একতা গড়ো, শোষণ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করো
অধিকারের সংগ্রামে অদম্য ‘একতা’
কমিউনিস্ট পার্টি ও কার্ল মার্কসের প্রাসঙ্গিকতা
সংবাদপত্র ও রাজনীতি
গণমাধ্যমের গলায় দড়ি
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন