সিপিবি ঢাকা দক্ষিণের মশাল মিছিল

তীব্র গ্যাস সংকট এলএনজি আমদানির চক্রান্তের অংশ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

সারা দেশে তীব্র গ্যাস সংকট নিরসনের দাবিতে ২৮ জুলাই সন্ধ্যায় ঢাকার পুরানা পল্টনে মশাল মিছিল করে সিপিবি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জেলা কমিটি
একতা প্রতিবেদক : রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে তীব্র গ্যাস সংকট নিরসনের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জেলা। এই দাবিতে ২৮ জুলাই সন্ধ্যা ৭টায় ঢাকার পুরানা পল্টনে মশাল মিছিল করেছে তারা। মশাল মিছিল পূর্ব সমাবেশে পার্টির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন বলেন, গ্যাস সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত হওয়ার পরেও সরকার সংকট নিরসনে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। তিনি অভিযোগ করে বলেন, দীর্ঘ মেয়াদে এলএনজি আমদানি চুক্তি প্রক্রিয়া ও আলোচনা চলমান। বাংলাদেশের উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় এলএনজি কেনার স্বার্বভৌম অধিকার রয়েছে। ইতোমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাধ্যতামূলক এলএনজি আমদানি বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি ক্রয় চুক্তি করতে নানা প্রকার চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সৃষ্ট গ্যাস সংকটের সাথে চলমান এলএনজি আমদানি-কেন্দ্রিক চক্রান্তের সংযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, অবিলম্বে তীব্র গ্যাস সংকট নিরসন করে জনজীবনের স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে হবে। একইসঙ্গে দেশীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠানসমূহকে শক্তিশালী করার মধ্য দিয়ে দেশের জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি দ্রুত কক্সবাজারের মহেশখালীতে ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান টার্মিনালটি মেরামত এবং দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে বহুজাতিক কোম্পানিটির প্রভাবমুক্ত, স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করে তদন্ত প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশের দাবি জানান। সিপিবি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জেলা কমিটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম সমীরের সভাপতিত্বে ও সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য আক্তার হোসেনের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত এ সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন, জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুর মঈন, সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হাসিনুর রহমান রুশো, ত্রিদিব সাহা, জেলা কমিটির সদস্য মণিষা মজুমদার, ফিরোজ আল মামুন, জাহিদ নগর প্রমুখ। সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন, সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য রফিকুজ্জামান লায়েক, এসএ রশীদ, আমিনুল ফরিদ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জেলা কমিটির সদস্য আবু তাহের বকুল, জাহিদ হোসেন খান, মুর্শিকুল ইসলাম শিমুল, আব্দুল কুদ্দুস,মো. গোফরান প্রমুখ। সমাবেশে মঞ্জুর মঈন বলেন, গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে পরপর ক্ষমতাসীন তিনটি সরকারই পরিকল্পিতভাবে দেশের জ্বালানি খাতকে দেশীয় সম্পদনির্ভর নীতি থেকে সরিয়ে আমদানিনির্ভর ও এলএনজি-নির্ভর করে তুলেছে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না করে ধারাবাহিকভাবে ব্যয়বহুল আমদানিনির্ভর নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। এর ফলে গুটিকয়েক আমদানিকারক ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর মুনাফা নিশ্চিত হলেও দেশের গৃহস্থালী জ্বালানি, শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ খাত এবং পরিবহন ব্যবস্থা ক্রমেই তাদের নিয়ন্ত্রণ ও স্বার্থের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। এই নীতি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা দুর্বল করার পাশাপাশি অর্থনীতিকে আরও আমদানিনির্ভর ও সংকটাপন্ন করে তুলেছে। তিনি বলেন, পেট্রোবাংলাকে শক্তিশালী করে দেশের তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ খাতকে বিদেশি কোম্পানি এবং গুটিকয়েক দেশীয় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ (মনোপলি) থেকে মুক্ত করতে হবে। সমাবেশে অন্যান্য বক্তারা বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে সারাদেশে, বিশেষ করে ঢাকায়, তীব্র গ্যাস সংকট চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে এই জনদুর্ভোগ ও সংকট নিরসনে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। তারা বলেন, গ্যাস সংকটে ঢাকার অধিকাংশ এলাকায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বাসাবাড়িতে রান্নাবান্না কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও চুলা নিভু-নিভু জ্বলছে, আবার কোথাও একেবারেই জ্বলছে না। কেউ কেউ বিদ্যুৎচালিত চুলা কিনছেন, আর নিম্ন আয়ের মানুষ মাটির চুলায় লাকড়ি দিয়ে রান্নার চেষ্টা করছেন। সাধারণ মানুষকে বাইরের খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। যেসব রেস্তোরাঁ পাইপলাইনের গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, তারাও চুলা জ্বালাতে পারছে না। ফলে সংকট প্রতিদিন আরও প্রকট হচ্ছে। সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাস নিতে গাড়ির সারি দীর্ঘ হচ্ছে। দেশে উৎপাদিত গ্যাসের সবচেয়ে বড় অংশ ব্যবহৃত হয় বিদ্যুৎ উৎপাদনে। ফলে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট কমে গেছে। এতে বিদ্যুৎ ঘাটতির শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিদ্যুতের পর সবচেয়ে বেশি গ্যাস ব্যবহার করে শিল্পকারখানা। গ্যাস সংকটে ইতোমধ্যে কিছু কিছু শিল্পকারখানার উৎপাদন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বক্তারা আরও বলেন, জ্বালানি সংকট নিরসন এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)-কে শক্তিশালী করতে হবে। বিদেশি কোম্পানির ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। বাপেক্স, এসজিএফএল ও পেট্রোবাংলার অনুসন্ধান ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত এবং দেশীয় জনবল ও প্রযুক্তির বিকাশ ছাড়া জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। পাশাপাশি তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বহুমাত্রিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে দেশীয় অর্থায়নে গবেষণা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট থেকে উত্তরণের কোনো কার্যকর উপায় নেই। সমাবেশ শেষে একটি মশাল মিছিল পল্টন মোড় হয়ে বিজয়নগরসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কসমূহ প্রদক্ষিণ করে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..