মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননা রুখে দাঁড়াও

ভাষ্যকার

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর অদম্য সাহস ও সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে ঢাকা সেনানিবাসে ১৯৭৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্থাপিত হয় ‘শিখা অনির্বাণ’ স্মৃতিস্তম্ভ। মুক্তিযুদ্ধে জীবন উৎসর্গকারীদের স্মৃতি চির উজ্জ্বল রাখার উদ্দেশ্যে এই শিখাটি সার্বক্ষণিক প্রজ্জ্বলন করে রাখা হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সরকারের মিতব্যয়িতা কর্মসূচির অংশ হিসেবে এ বছরের ২ মে থেকে ‘শিখা অনির্বাণ’ এর শিখা প্রজ¦লন বন্ধ রাখা হয়েছে। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অস্থিতিশীলতা এবং এর ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকারের মিতব্যয়িতা ও জ্বালানি সাশ্রয়ী পদক্ষেপের অংশ হিসেবে শিখা অনির্বাণ অবিরাম জ্বালিয়ে না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেনাকর্তৃপক্ষ। বর্তমান নির্দেশনা অনুযায়ী জাতীয় দিবস, রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা নিবেদন, সামরিক আনুষ্ঠানিকতা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অনুষ্ঠানের সময় শিখাটি প্রজ্বলিত করা হবে। অন্য সময় এটি জ্বালিয়ে রাখা হবে না। সেনানিবাসের অভ্যন্তরে অবস্থিত শিখা অনির্বাণ প্রজ¦লন বন্ধ রাখা হলেও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্থাপিত একই ধরণের স্মৃতিস্তম্ভ ‘শিখা চিরন্তন’ বরাবরের মতই অবিরাম প্রজ¦লিত রয়েছে। ফলে এটি স্পষ্ট সরকারি সিদ্ধান্তে নয় সেনা কর্তৃপক্ষের নিজস্ব সিদ্ধান্তেই শিখা অনির্বাণ অবিরাম প্রজ¦লন বন্ধ রাখা হয়েছে। ১৯৭৭ সালের বিজয় দিবসে স্থাপিত হওয়ার পর শিখা অনির্বাণ দেশের সামরিক ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। সেই স্মৃতিস্তম্ভ তথাকথিত জ্বালানি সাশ্রয় ও মিতব্যয়িতার নামে প্রজ্জ্বলিত না রাখা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মদান, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অবমাননার শামিল। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)সহ প্রগতিশীল রাজনৈতিক জোট ও দলসমূহ এ সিদ্ধান্তে ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়ে বরাবরের মত শিখা অনির্বাণ অবিরাম প্রজ¦লিত রাখার জন্য দাবি জানিয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন শক্তি-গোষ্ঠী ও ব্যক্তি নিজেদের মতো করে মুক্তিযুদ্ধের নতুন নতুন ন্যারেটিভ তুলে ধরছে। কোনো কোনো ন্যারেটিভের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকে সরাসরি অস্বীকার করার চেষ্টাও করা হয়েছে ও হচ্ছে। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দেশে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত হয়েছিল। সেটিকে জামাত-এনসিপির পক্ষ থেকে বিপ্লব আখ্যায়িত করার অপচেষ্টা চলছে। কেউ কেউ এটিকে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ বা ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ হিসেবে প্রচার করে। আসলে এটি বিপ্লব, দ্বিতীয় স্বাধীনতা, সেকেন্ড রিপাবলিক কোনটাই না এটি একটি গণঅভ্যুত্থান ছিল। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের কাউন্টার হিসেবে দ্বিতীয় স্বাধীনতার ন্যারেটিভ সামনে আনা ইতিহাসকে উল্টে দেয়ার একটি ভয়ঙ্কর অপচেষ্টা। এই অপচেষ্টা মুক্তিযুদ্ধের শক্তির সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নস্যাৎ করে দিতে হবে। ২০২৪ এর ৫ আগস্টের পর মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি মুক্তিযুদ্ধের স্মারকচিহ্ন, ভাস্কর্য ভেঙে দেয়, বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাড়িসহ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃবৃন্দের ঐতিহাসিক বাড়ি-ঘর ভেঙে দেয়। তাদের নাম বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের থেকে মুছে দেয়া হয়। এগুলো উদ্দেশ্যমূলক প্রতিহিংসা। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি মুছে দেয়ার প্রতিটি ফৌজদারি অপরাধের সাথে জামাত-শিবিরসহ ’৭১-এর যুদ্ধপরাধীদের বিভন্ন দল ও অঙ্গ সংগঠনসমূহ যুক্ত রয়েছে। এ সকল অপরাধীদের কোনো ক্ষমা নাই। অন্তর্বর্তী সরকার ও তার প্রধান অধ্যাপক ইউনূসের নির্লিপ্ততা ও নিষ্ক্রিয়তার কারণে এ ধরনের অপরাধীরা আস্কারা পেয়েছে এবং তারা নিবিঘ্নে এই অপরাধগুলো সংঘটিত করেছে। সেই কারণে অধ্যাপক ইউনূস ও তার উপদেষ্টামণ্ডলীকেও এ দায় গ্রহণ করতে হবে। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও মুক্তিযুদ্ধকে এককভাবে আত্মসাৎ করা হয়েছিল। যা জাতির কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। সেই আমলে মুক্তিযুদ্ধের প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা কমরেড মণি সিংহ, ন্যাপ সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, কমরেড মোহম্মদ ফরহাদ, কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, ন্যাপনেতা পংকজ ভট্টাচার্যসহ ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়ন গেরিলা বাহিনীর সদস্যদের মুক্তিযোদ্ধা তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছিল। উচ্চ আদালতের রায় নিয়ে তাদেরকে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হতে হয়েছে। জাতীয় সংসদ কর্তৃক ১০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে পাশকৃত জাতীয় মুক্তিযুদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) আইন, ২০২৬ মুক্তিযুদ্ধকে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস, শান্তি কমিটি তথা মুসলিম লীগ, জামায়াত ও নেজামে ইসলাম পার্টির বিরুদ্ধে পরিচালিত বাঙালি জাতির যুদ্ধ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। ফলে এ সকল শত্রু শক্তির কাছে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিষবত। এদের হাত বাংলাদেশের মানুষের রক্তে রঞ্জিত। এরা দুই লাখ নারী ধর্ষিত হওয়ার অপরাধের সাথে যুক্ত। তারা কথায় কথায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে অবমাননা করার ঔদ্ধত্ব প্রদর্শন করে। মুক্তিযোদ্ধাদের অপদস্ত করার চেষ্টা করে। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় গৌরব। মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের বীর সন্তান। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধদের অবমাননা চেষ্টা রুখে দিতে হবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..