
একতা ক্রীড়া প্রতিবেদক :
এবারের বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেওয়া ইরান অনেক অপ্রিয় সত্য সামনে নিয়ে এসেছে। ফিফা, বিশ্বকাপ, যুক্তরাষ্ট্র তাদের সঙ্গে কতটা অন্যায্য আচরণ করেছে সেটা স্পষ্ট হয়ে গেছে। বিশ্বকাপের শুরু থেকেই টুকটাক বলছিলেন ইরান দলের প্রতিনিধিরা। মিশর ম্যাচের পর যেন বিস্ফোরণ ঘটান অধিনায়ক মেহদি তারেমি। তারকা ফরোয়ার্ড দাবি করেন, তাদের মহাভোগান্তি লাঘবে কোনো ভূমিকা নেননি ফিফা প্রধান জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। এখন পর্যন্ত এই অভিযোগের কোনো জবাব দেননি তিনি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হুট করে ইরানে আক্রমণ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। মেরে ফেলে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে। এরপর বিশ্বকাপে ইরানের খেলা নিয়ে প্রবল সংশয় জাগে। তারা নিজেদের ম্যাচ যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানায়। কিন্তু তাতে কান দেয়নি ফিফা। বরং ইরানের বেইস ক্যাম্প যুক্তরাষ্ট্রের টুকসান থেকে সরিয়ে নেয় মেক্সিকোর তিহুয়ানায়।
এতে ম্যাচ খেলতে প্রতিবার মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ভেন্যুতে যেতে হয় ইরান দলকে। ভ্রমণ বিধিনিষেধে পরিস্থিতি হয় আরও সঙ্গীন। শুরুতে ম্যাচের আগের দিন আসার অনুমতি পেতে ইরান, শেষ ম্যাচের আগে পেয়েছে দুই দিন সময়। কিন্তু ফিরে যেতে হবে ম্যাচের দিন! অন্যদিকে লজিস্টিক দলের কেউ যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাননি, তাতে খেলোয়াড়দের নিজেদের জিনিসপত্র আনা, নেওয়ার কাজ হয় বহুগুণ কঠিন।
তারেমি অভিযোগ করেছেন, ইরান দলকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাখেননি ফিফা প্রধান, “এটা বিপত্তির বিশ্বকাপ, এটা মহাবিপত্তি। মানে, ফিফা বলেছিল তারা প্রতিটা সমস্যার সমাধান করবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে শুরু থেকে কোনো সমস্যার সমাধান করেনি। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের পর আমাদের ড্রেসিংরুমে এসেছিলেন ইনফান্তিনো এবং বলেছিলেন, ‘এটা কেবল শুরু...’ কিন্তু আগামীকাল গ্রুপ পর্ব শেষ হয়ে যাবে।”
“এখানে আমাদের লজিস্টিকের লোকজন নেই- তাদের ভিসা নেই। প্রতিবার তিহুয়ানা থেকে ভ্রমণ কীভাবে সম্ভব? আমরা তিহুয়ানার মানুষদের ভালোবাসি, আমরা মেক্সিকোকে ভালোবাসি। তারা ভদ্র, তাদের ভালোবাসি আমরা। কিন্তু পেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে একটি পেশাদার প্রতিযোগিতায় এটা ঠিক নয়।”
“এটা ন্যায্য নয়। আমাদের মত হলো, এটা ন্যায্য নয়, ফিফা, এটা কী ন্যায্য? ঠিক আছে। কিন্তু এটা ন্যায্য নয়। কে আমাদের সাহায্য করতে চায়? যদি তারা আমাদের সঙ্গে এমনটাই চায়, তো ঠিক আছে। চলো বেরিয়ে যাওয়া যাক। কিন্তু এটা ন্যায্য নয়। আমাদের রিকোভারির সুযোগ কিংবা সাহায্য করার জন্য লজিস্টিকের লোকজন নেই। আমরা সবসময়ই এটা নিয়ে অভিযোগ করছি কিন্তু একজনও আমাদের সাহায্য করেনি, কেউ না।”
মিশরের বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হওয়া তারেমির কাছে নির্দিষ্ট করে জানতে চাওয়া হয়, ইরান দল কী এই টুর্নামেন্টে নিজেদের অনাকাক্সিক্ষত মনে করছে কিনা।
“এখানে আমাদের সব কিছুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হচ্ছে। আমি জানি না মানুষজন কী চায়। আমরা নিজেদের দৃষ্টিকোণ থেকে যা দেখছি তাতে হ্যাঁ, ব্যাপারটা এমনই মনে হয় আমার... এটা কীভাবে সম্ভব যে আমরা এখানে ৯০ মিনিট খেললাম আর এখনি আমাদের তিহুয়ানা ফিরে যেতে হবে?”
ইরান কোচ আমির গালেনোই ফিফার প্রতি দাবি জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে কোনো স্বাগতিক দেশ যেন কোনো দলের প্রতি এমন আচরণ করতে না পারে।
“স্বাগতিক দেশ আমাদের সঙ্গে খুবই অন্যায্য আচরণ করেছে। যদি তারা আমাদের দুই সপ্তাহ আগে আসার সুযোগ দিত, আরও বেশি প্রস্তুতির সুযোগ দিত... আমরা আরও ভালো অবস্থায় থাকতাম, শারীরিক ও মানসিকভাবে। যাইহোক, তারা আমাদের সেই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করেছে।”
“আমি ভেবেছিলাম, আমরা কেবল পুরোপুরি নিপীড়িত একটি দল। কিন্তু এই তিন ম্যাচের পর আমি লক্ষ্য করলাম, আমাদের একই সঙ্গে কপালও খারাপ। ফিফার প্রতি আমার দাবি, ভবিষ্যতে আর কখনও কোনো দলের সঙ্গে যেন এই আচরণ করতে না পারে স্বাগতিকরা।”
বিশ্বকাপ থেকে মাথা উঁচু করেই বিদায় নিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে তারা হারেনি কোনো ম্যাচ। বরং এতো বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে দুর্দান্ত লড়াইয়ে অনেকের হৃদয় জিতে নিয়েছে।
এদিকে বিশ্বকাপ যাত্রা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই ইরানের সব খেলোয়াড়ের ভিসা বাতিল করেছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ।
সেই উচ্ছ্বাস ধরা পড়েছে মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি মার্কওয়েন মুলিনের কণ্ঠে, “আমি খুব খুশি যে ওদের বিশ্বকাপ পর্ব এখানেই শেষ, ওরা আর ফিরে আসছে না।”
এরপরের মন্তব্যগুলো আরও বর্ণবাদী, “আমরা যখন তাদের ভিসা বাতিল করতে পারলাম এবং তাদেরকে আমেরিকার মাটি ছাড়তে বলতে পারলাম, তখন আমি এত খুশি হয়েছিলাম যে খুশিতে নেচেছি এবং দু-একটা গানও গেয়ে ফেলেছি।”