
একতা প্রতিবেদক :
স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী কায়দায় ‘ন্যাক্কারজনক গণগ্রেপ্তার’ চালিয়ে সিলেটে ন্যায্য শ্রমিক আন্দোলন দমনের হীন কাণ্ডের উপযুক্ত জবাব অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন।
গভীর রাতে সিলেটের জালালাবাদের বাসভবন থেকে সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য ও সিলেট জেলা কমিটির নেতা অ্যাড. আনোয়ার হোসেন সুমনকে গ্রেপ্তার ও অন্তত নয়জন শ্রমিকনেতাসহ বাসদ জেলা কার্যালয় থেকে একযোগে ২২ জনকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে রাজধানীর পুরানা পল্টন মোড়ে আয়োজিত সমাবেশ থেকে তিনি এই হুঁশিয়ারি দেন।
গত ১ নভেম্বর বিকেলে সিপিবির আয়োজিত এই সমাবেশে পার্টির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দনের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য রাগীব আহসান মুন্না, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মণ্টু ঘোষ, সিপিবি ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি সাইফুল ইসলাম সমীর, রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুল কুদ্দুস, সাংগঠনিক সম্পাদক কফিল উদ্দিন মোহাম্মদ শান্ত, সিলেটের রিকশা শ্রমিকদের আন্দোলনের সংগঠক মনীষা ওয়াহিদ প্রমুখ।
সমাবেশ পরিচালনা করেন সিপিবি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সাদেকুর রহমান শামীম।
সমাবেশে নেতৃবৃন্দ বলেন, সিলেট শহরে দীর্ঘ ৪০ দিন যাবত ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এ অবস্থায় রিকশা মালিক ও চালকদের পরিবারগুলো অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে। পরিবারগুলোতে কিস্তি, ঘরভাড়া, দোকানদারের পাওনা ইত্যাদি মিলিয়ে এক মানবেতর পরিস্থিতি চলছে। এই অবস্থায় নিরুপায় শ্রমিকরা গত দুই সপ্তাহ ধরে যানবাহন নিবন্ধন, বিআরটিএ কর্তৃক লাইসেন্স প্রদান, অঞ্চলভিত্তিক রুট পারমিট প্রদান ইত্যাদি দাবি জানিয়ে আসছে।
সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলতে দেয়ার দাবিতে শ্রমিকদের এ আন্দোলনে আরোহী জনসাধারণসহ গণপরিবহন ব্যবহারকারী নাগরিকরাও সংহতি জানিয়েছেন।
তারা আরও বলেন, একটি চক্রান্তকারী মহল সংকটের সুরাহা করার পরিবর্তে ‘আবাদী হটাও, সিলেট বাঁচাও’ জিগির তুলে উগ্র আঞ্চলিকতাবাদী বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। সিলেটের প্রশাসন এই গোষ্ঠীর অনুগামী হয়ে চরম শ্রমিক নিপীড়ন ও গ্রেপ্তার-নির্যাতন পরিচালনা করছে।
সমাবেশ থেকে বক্তারা অবিলম্বে শ্রমিকদের বিরুদ্ধে চলমান জুলুম বন্ধের দাবি জানান।
অবিলম্বে গণগ্রেফতার বন্ধ করে কারাবন্দী নেতৃবৃন্দ ও শ্রমিকদের মুক্তি প্রদান না করা হলে ট্রেড ইউনিয়ন ঘোষিত দেশব্যাপী অবরোধ কর্মসূচিতে সমাবেশ থেকে সর্বাত্মক সমর্থন জানানো হয়।
সমাবেশ শেষে বিক্ষোভ মিছিল নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
সিলেটে গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তির দাবি বাম জোটের
সিলেটে বাসদ অফিসে ব্লক রেইড দিয়ে দলটির নেতাকর্মীসহ রিকশা ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদের ২২ জন এবং সিপিবি সিলেট জেলার নেতা আনোয়ার হোসেন সুমনসহ বিভিন্ন গ্যারেজ থেকে ১৫ জন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার ও মিথ্যা মামলা দায়েরের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। জোটের নেতৃবৃন্দ নেতাকর্মীদের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেছেন।
জোটের কেন্দ্রীয় পরিচালনা পরিষদের সমন্বয়ক ও বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ, সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন, সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, বাসদ (মার্কসবাদী)’র সমন্বয়ক মাসুদ রানা, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক পার্টির নির্বাহী সভাপতি আব্দুল আলী গত ১ নভেম্বর সংবাদপত্রে পাঠানো বিবৃতিতে এ দাবি জানান।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অফিসে পুলিশী অভিযান ও মিথ্যা হয়রানী মামলায় বিরোধী নেতাকর্মীদের এবং শ্রমজীবী মানুষের উপর নির্যাতন নিপীড়ন চালানো হতো। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও রাজনৈতিক দলের অফিসে পুলিশী হামলা, মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার নির্যাতন দেশবাসী প্রত্যাশা করে নাই। বর্তমান সরকারের আমলে একদিকে নতুন কর্মসংস্থান নাই, শত শত কারখানা বন্ধ হয়ে শ্রমিক বেকার হচ্ছে। স্ব কর্মসংস্থানে যে সব মানুষ রিকশা, হকারি করে জীবন জীবিকা নির্বাহ করছে সেই রিকশা উচ্ছেদ করে শ্রমজীবী মানুষদের জীবন জীবিকার পথ বন্ধ করে তাদের পরিবার পরিজনসহ অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিচ্ছে।
শ্রমিকরা যখন তাদের জীবিকা ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে প্রতিবাদ বিক্ষোভ করছে তখন হামলা-নির্যাতন চালিয়ে তাদেরকে গ্রেফতার করছে, মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করছে। এ ঘটনা প্রমাণ করে দেশ একটা পুলিশী রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়েছে, বলে মন্তব্য নেতৃবৃন্দের।
ইতিপূর্বে বাসদ সিলেট জেলার আহ্বায়ক আবু জাফর ও সদস্য সচিব প্রণব পালসহ ৪ জন মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার ও দীর্ঘ ১ মাস কারাবরণের পর জামিনে মুক্তি পেয়েছে।
নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে গ্রেফতারকৃত নেতৃবৃন্দের নিঃশর্ত মুক্তি এবং সকলের মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের জোর দাবি জানিয়েছেন।
আঞ্চলিকতার বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে সিলেট প্রশাসন
সিলেটে ব্যাটারিচালিত রিকশা শ্রমিকদের ওপর চলমান অত্যাচার ও সীমাহীন হয়রানির বিরুদ্ধে আন্দোলনরত শ্রমিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতারের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়ন।
৩১ অেেক্টাবর দিবাগত গভীর রাতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য অ্যাড. আনোয়ার হোসেন সুমনকে নিজবাসভবন থেকে গ্রেফতার করা হয়। এছাড়াও ইতোমধ্যে রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের অন্তত নয়জন নেতাকর্মী এবং বাসদ সিলেট জেলা কার্যালয় থেকে ২২ জন নেতাকর্মীকে গ্রেফতারের ঘটনায় হুঁশিয়ারি জানিয়ে অবিলম্বে সকলের মুক্তি দাবি করা হয়েছে।
রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি শ্রমিকনেতা আব্দুল কুদ্দুস ও সাধারণ সম্পাদক শ্রমিকনেতা আব্দুল হাকিম মাইজভান্ডারি এক বিবৃতিতে বলেন, সরকার যখন সারাদেশে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের লাইসেন্স ও চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সেসময় সিলেটে স্থানীয় প্রশাসন এবং স্বার্থান্বেষী মহল এই ধরনের যানবাহনের ওপর দমন-পীড়ন শুরুর মাধ্যমে সমাধান হতে যাওয়া একটি সমস্যাকে আরও ঘনীভূত করেছে। এই সমস্যায় ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন শ্রমিকনেতাকে গ্রেফতার করে কারান্তরীণ রাখা হয়েছিল। ইতিমধ্যে তারা জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর এবং শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য দাবিতে আন্দোলন শুরু করায় নতুন করে গণগ্রেফতার শুরু করা হয়েছে। যা সমস্যাকে আরও প্রকট করে তুলবে।
এ বিষয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার বিদ্বেষপ্রসূত ও ঔদ্ধত্যমূলক বক্তব্য দিয়েছেন যা বাংলাদেশের অখণ্ডতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ও দেশের নাগরিকের আন্দোলন করার সাংবিধানিক অধিকারকে পদদলিত করার হীন প্রচেষ্টা।
অবিলম্বে গ্রেফতারকৃত নেতৃবৃন্দ ও শ্রমিকদের নিঃশর্ত মুক্তি দেয়া না হলে দেশব্যাপী সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ারি জানিয়েছেন নেতৃবৃন্দ।
ব্যাটারিচালিত রিকশা শ্রমিকদের অত্যাচার-নিপীড়নের প্রতিবাদ উদীচীর
সিলেটে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারসহ ১১ দফা দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের উপর দমন-পীড়ন এবং তাঁদের সমর্থনে কর্মসূচি পালনকারী সিপিবি নেতা আনোয়ার হোসেন সুমনসহ রিক্সা শ্রমিক ও অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের গ্রেফতার ও হয়রানীর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী।
সেই সাথে গ্রেফতারকৃত সকল শ্রমিক নেতা ও রাজনৈতিক কর্মীর অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেছে উদীচী।
এক বিবৃতিতে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাবিবুল আলম ও সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন বলেন, সারাদেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করলেও সিলেট শহরে প্রায় ৪০ দিন ধরে ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধ করে রাখা হয়েছে। ফলে রিকশা মালিক ও শ্রমিকগণ তাদের পরিবার নিয়ে অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে। এই অবস্থায় শ্রমিকরা যখন বিষয়টির সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য সমাধানের জন্য যানবাহনের নিবন্ধন, বিআরটিএ’র মাধ্যমে লাইসেন্স প্রদান, রুট পারমিট প্রদান সহ নানা দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে আসছে তখন সিলেটের প্রশাসন সুষ্ঠু সমাধানের বদলে শ্রমিকদের উপর নিপীড়ন ও গ্রেফতার-নির্যাতনের মাধ্যমে আন্দোলন দমনের পথ বেছে নিয়েছে। তারা বলেন, শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ করার অধিকার শ্রমিকদের সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকার। তাদের সে অধিকারকে অস্বীকার করে তাদের উপর দমন-নিপীড়ন চালিয়ে, কারারুদ্ধ করে প্রশাসন যে দমননীতি গ্রহণ করেছে, তা নয়া ফ্যাসিবাদের আরেক রূপ।
নেতৃবৃন্দ বলেন, যে বৈষম্য বিলোপের জন্য ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতন ঘটানো হয়েছিল, অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই বৈষম্যকেই আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানে সবচেয়ে বেশী ত্যাগ স্বীকার করেছে যে শ্রমজীবী মানুষ এই সরকার দ্বারা সেই শ্রমজীবী মানুষেরাই সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত হয়েছে। তারা অবিলম্বে শ্রমিকদের উপর চলমান নিপীড়ন- নির্যাতন বন্ধ ও গ্রেফতারকৃতদের নিঃশর্ত মুক্তি দাবী করেন।
উদীচী নেতৃবৃন্দ মনে করেন, দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের স্ব-উদ্যোগে কর্মসংস্থান হয়েছে যে শিল্পের মাধ্যমে তা এভাবে জোর জবরদস্তির মাধ্যমে বন্ধ করে দেয়া যাবে না। এভাবে শ্রমিকদের উচ্ছেদের মাধ্যমে তাদের জীবিকা কেড়ে নেয়া সম্পূর্ণভাবে একটি অমানবিক কাজ। বরং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নের মাধ্যমে এই শিল্পকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় এনে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার নিশ্চিত করাই হবে সকলের জন্য মঙ্গলজনক।