মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে রুখবে বাংলাদেশের জনগণ

রাগীব আহসান মুন্না

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
বাণিজ্য করার নামে ব্রিটিশ এদেশে এসেছিল কিন্তু তারা বাণিজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। দুইশত বছর দেশের শাসন ক্ষমতা তাদের হাতে ছিল। তাদের প্রধান কাজ ছিল দেশের সম্পদ লুণ্ঠন। বাংলাসহ ভারতবর্ষ তাদের ‘করদ রাজ্যে’ রূপান্তরিত হয়েছিল। পৃথিবীর অনেক দেশের মতো আমরাও তাদের উপনিবেশে পরিণত হয়েছিলাম। ব্রিটিশ শাসকরা আমাদের দমন করেছে নিপীড়ন দিয়ে, অত্যাচার করে, ভয় দেখিয়ে। তারা এদেশের মানুষ দিয়ে নিজেদের সামরিক শক্তি গড়ে তুলেছিলো, সেই শক্তিকে তারা নির্মমভাবে ব্যবহার করেছে দেশের মানুষের ন্যায়সঙ্গত প্রতিবাদ দমনে। পরাধীন করে রাখতে দেশের বিচার ব্যবস্থা ছিল তাদের হাতে। কিন্তু বিচারকের আসনে বসে প্রতিবাদী বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে দ্বীপান্তর অথবা ফাঁসির রায় ঘোষণা করাকেই তারা আদালতের মূল কাজ করে তুলেছিল। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যাবে, ক্ষুদিরাম, ভগৎ সিংদের মতো শত শত বিপ্লবীকে ফাঁসি আর দ্বীপান্তরের শাস্তি দেওয়া হয়েছে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে দমন করতে। ব্রিটিশরা যে চাপ দিয়ে শাসন চালিয়ে নিজেদের নিরাপদ করতে পেরেছে তা কিন্তু একেবারেই নয়। এদেশের মানুষ বারবার বিদ্রোহ করেছে তাদের এদেশ থেকে বিতাড়িত করতে। যে সৈনিক তারা উপনিবেশিক লুণ্ঠনকে অব্যাহত রাখার জন্য গড়ে তুলেছিল, ১৮৫৭ তে সেই সৈনিকই বিদ্রোহ করেছে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে। সিপাহিদের এই বিদ্রোহকে মহামতি কার্ল মার্ক্স ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য প্রথম বিদ্রোহ হিসেবে গণ্য করেছেন। এরপর ফকির বিদ্রোহ, নীল চাষিদের বিদ্রোহ, বাঁশের কেল্লা তৈরি করে বিদ্রোহ করেছিল এ দেশের বীর সন্তান তিতুমীর। ইতিহাস দেখেছে সেই সকল বিদ্রোহকে কিভাবে দমন করা হয়েছে। স্বাধীনতার দাবিতে একের পর এক বিদ্রোহ উপনিবেশিক শাসকদের ভিতকে দুর্বল করে ফেলেছিল। বিদ্রোহ দমিত হয়েছিল কিন্তু ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি আর টিকল না। ফলে বাংলা ও ভারতবর্ষ শাসনের ভার গ্রেট ব্রিটেনের অধীনে চলে গেল। তারপরও কী জনগণের সংগ্রাম থেমেছে, থামেনি। আর সে কারণেই নির্মম আর পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছিল জালিওনাবাগে ১৩ এপ্রিল ১৯১৯ সালে। উপনিবেশ শাসনের ইতিহাস আমাদের জানা আছে, আর আছে অভিজ্ঞতার বিশাল ভাণ্ডার। অথচ আজকের মতো সেদিনও কিছু মানুষ ব্রিটিশ শাসনের ফলে কী কী উপকার ও সহায়তা আমরা পেয়েছি তার ফিরিস্তি দিয়েছিল। তাদের যুক্তি ছিল সাদা চামড়া এসেই নাকি আমাদের এই অঞ্চলে শিক্ষার ব্যবস্থা করেছে, সংস্কৃতিতে আধুনিকতার জোয়ার এসেছে। ইউরোপের সংস্কৃতি জীবনধারায় কিছুটা বৈচিত্র এনেছে ঠিকই, বিনিময়ে আমাদের সম্পদ লুণ্ঠিত হয়ে গেছে। যদিও অনেক আগে থেকেই এই অঞ্চলের শিক্ষাক্ষেত্রে বৌদ্ধবিহারগুলোর গুরুত্ব কোনো অংশেই কম ছিল না। যেটা বিদেশি শাসনের কারণে আর এগোতে পারেনি। উপনিবেশ শাসন শুধু সম্পদ লুণ্ঠনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, শিক্ষা সংস্কৃতি সব কিছুর ওপরেই তার আধিপত্য বিস্তার করতে হয়। সেটাই ব্রিটিশ করেছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সাথে একটি বাণিজ্য চুক্তি করেছে, যা বাংলাদেশকে আমেরিকার দাসত্বের অধিনস্ত করবে এমন ধারণা করা যায়। এটা যে একটা গোলামীর চুক্তি তা বলতে কোনো ধরনের দ্বিধা নেই। এ চুক্তি অনুযায়ী চললে বাংলাদেশ পুনরায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের উপনিবেশিক রাষ্ট্রে পরিণত হবে। কিন্তু সেজন্য যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক শক্তি দিয়ে দখল নিতে হবে না। এখানে তাদের পক্ষের যে দোসররা কাজ করছে তারাই বাংলাদেশকে আমেরিকার উপনিবেশ করতে চায়। যারা এই চুক্তি সই করেছে তারা দেশের স্বার্থে সেটা করেনি, সেটা আমেরিকার স্বার্থকেই সুরক্ষিত করেছে এবং বিবেচিত হয়েছে নিজেদের স্বার্থ। ২০২৪-এর জুলাই মাসে অনেক রক্ত ঝরিয়ে দেশের মানুষ শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী সরকারকে দেশ থেকে বিতাড়িত করেছে। দেশের মানুষের স্বপ্ন ছিল একটি বৈষম্যহীন সমাজের। রাজপথে স্লোগান ছিল- আমরা দিল্লি অথবা পিন্ডির শাসন চাই না, চাই ঢাকার নিজস্ব স্বাধীন শাসন ব্যবস্থা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তির নামে আমরা যে চুক্তি করেছি তা আমাদের দেশে ওয়াশিংটনের শাসনকে প্রতিষ্ঠিত করবে। সবার আগে বাংলাদেশ থাকবে না, থাকবে আমেরিকা। আমরা আমাদের সার্বভৌমত্ব হারিয়ে কার্যত একটি উপনিবেশিক ব্যবস্থার মধ্যে আটকে যাবো। এই পরিণতির দিকে আমাদের দেশকে যারা সেই চুক্তি করেছে, যারা নির্বাচিত হয়ে দেশের এত বড় সর্বনাশ মেনে নিতে চাচ্ছে এবং যারা সংসদে বিরোধী আসনে বসে দেশের স্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত ও নীতির প্রতি সমর্থন দিয়ে চলেছে (যুদ্ধাপরাধী জামাত-শিবির চক্র) তাদের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে সম্পাদিত দেশের স্বার্থবিরোধী বাণিজ্যচুক্তি রুখতে সিপিবিসহ বাম প্রগতিশীল দেশপ্রেমিক শক্তিকে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। রাজপথই হবে অধিকার বঞ্চিত মানুষের মুক্তির ঠিকানা। লড়াই করেই জনগণকে ঠেকাতে হবে সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসন।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..