সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলনের ডাক

এক মেরুর আধিপত্যের বদলে বহু মেরুর নয়া বিশ্বব্যবস্থা

হাসান তারিক চৌধুরী

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
বিশ্ব যখন সাম্রাজ্যবাদের আরোপিত যুদ্ধ এবং আঞ্চলিক সংঘাতের দামামায় রক্তাক্ত, বিশ্ব অর্থনীতি যখন নিম্ন প্রবৃদ্ধি এবং উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির ভয়াবহ বিপদের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে, যখন বিশ্ব পুঁজিবাদের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তার জুলাই ২০২৫ বৈশ্বিক অর্থনীতির মূল্যায়নে অবিরাম নিশ্চয়তার বার্তা দিচ্ছে–তখন এরকম একটি সময়ে চীনের তিয়ানজিন শহরে ৩১ আগস্ট থেকে ১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও)-এর ২৫তম সম্মেলন। এ সম্মেলনের কথা শোনার সাথে সাথেই সাম্রাজ্যবাদের পোষা মিডিয়াগুলো সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার বিরুদ্ধে নানা গালমন্দ-অপপ্রচার ইত্যাদি শুরু করে। কেউ কেউ একে ভয়ানক বলেও মন্তব্য করে। যেমন ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “পশ্চিমা দেশগুলি যদি আরও সুসংহত বৈদেশিক নীতিতে জড়িত না হয় তবে তারা সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) কাছে ‘হেরে যেতে পারে’।” সুতরাং পশ্চিমা দেশগুলোর নেতাদের এরকম নেতিবাচক মন্তব্য থেকে অনুধাবন করা যায় আলোচ্য সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব কতখানি? কি এই সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলন? কেন এর প্রতিষ্ঠা? এর উত্তর আমাদের জানা থাকা দরকার। তা না হলে একে ঘিরে যে নানামুখী প্রচার চলে সেটি আমাদের বিভ্রান্ত করতে পারে। সকলেই কমবেশি জানেন যে, সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা মূলত এশিয়ার উল্লেখযোগ্য কিছু রাষ্ট্রসমূহের সহযোগিতামূলক আঞ্চলিক উদ্যোগের সফল পরিণতি। সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা বা সাংহাই চুক্তি ৯টি এশীয় রাষ্ট্রের সম্মিলিত জোট যা মূলত আঞ্চলিক উন্নয়ন ও সহযোগিতাকে উদ্দেশ্য করে গঠিত। সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয়ের পর নতুন বিশ্ব পরিস্থিতিতে এশিয়ার রাষ্ট্রসমূহ পশ্চিমা দেশগুলোর দিক থেকে আগত চ্যালেঞ্জ এবং তাকে মোকাবিলার ভাবনা থেকে এই চুক্তির পটভূমি উৎসারিত। কারণ, বিশ্ব তখন একটি এক মেরুর বিশ্বব্যবস্থার ঝুঁকি এবং এর অনুগামী ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতা প্রত্যক্ষ করতে শুরু করে। বিশেষ করে, ১৯৯০ সালের প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ, ১৯৯২ সালের বসনিয়ার যুদ্ধ এবং ১৯৯৮ সালের কসভোর যুদ্ধের মাধ্যমেই সারা দুনিয়ার জনগণ এক মেরুর বিশ্বব্যবস্থার ভয়াবহ বিপদকে আরো প্রবলভাবে অনুধাবন করতে সক্ষম হয়। দুনিয়ার দেশে দেশে নবায়িত রূপে শুরু হয় শান্তি ও নিরস্ত্রীকরণের গণআন্দোলন। শক্তিশালী হতে থাকে টেকসই শান্তি ও সহযোগিতার লক্ষ্যে বহু মেরুর বিশ্বের ধারণা। এরকম একটি প্রেক্ষাপটে চীন, কাজাখস্তান, কিরঘিজস্তান, রাশিয়া এবং তাজিকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধানগণের দ্বারা সীমান্ত অঞ্চলগুলিতে পারস্পরিক আস্থা ও সামরিক বিশ্বাসযোগ্যতা গড়ে তুলতে ২রা এপ্রিল ১৯৯৬ এ চীনের সাংহাইয়ে চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে সাংহাই ফাইভ গ্রুপিং তৈরি করা হয়। এরপর ২৪ শে এপ্রিল ১৯৯৭ তে একই দেশগুলি রাশিয়ার মস্কোয় একটি বৈঠকে সীমান্ত অঞ্চলগুলিতে সামরিক বাহিনী হ্রাস সংক্রান্ত চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। ২০০১ সালে, সাংহাইতে বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনটিতে পাঁচটি সদস্য দেশ প্রথমে উজবেকিস্তানকে সাংহাই ফাইভ প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত করে একে সাংহাই সিক্সে রূপান্তরিত করে। তারপরে সমস্ত ছয় রাষ্ট্রপতি ২০০১ সালের ১৫ ই জুন সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন। পরবর্তীতে সাংহাই ফাইভ প্রক্রিয়াটির তাঁদের গৃহীত ভূমিকার প্রশংসা করে এবং এটিকে আরো উচ্চ স্তরের সহযোগিতায় রূপান্তর করার লক্ষ্য নির্ধারণ করে। ফলশ্রুতিতে ২০০৫ সালের জুলাইয়ে কাজাখস্তানের আস্তানায় শীর্ষ সম্মেলনে ভারত, ইরান, মঙ্গোলিয়া এবং পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা প্রথমবারের মতো এর শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেয়। এরপর রাশিয়ার উফায় জুলাই ২০১৫ সালে সংস্থাটি সিদ্ধান্ত নেয় ভারত ও পাকিস্তানকে পূর্ণ সদস্য হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করার। উভয়ই জুন ২০১৬ সালে তাসখন্দ, উজবেকিস্তানে সম্মতি স্মারক স্বাক্ষর করে, যার ফলে সংস্থায় পূর্ণ সদস্য হিসেবে তাঁদের যোগদানের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। ৯ জুন ২০১৭, কাজাখস্তানের আস্তানায় একটি শীর্ষ সম্মেলনে, ভারত এবং পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে সংস্থায় পূর্ণ সদস্য হিসাবে যোগদান করে। ১৬-১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ তাজিকিস্তানের রাজধানী দুশানবেতে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার ২১তম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন সদস্যপদ প্রদান করা হয় ইরানকে। সংস্থাটির বর্তমানে মোট সদস্য ৯। এভাবে ধারাবাহিকভাবে ২০২২ সালে সমরকন্দে, ২০২৪ সালে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে এবং ২০২৫ সালে এবার চীনের তিয়ানজিনে এই সংস্থাটির সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো। এবারের সম্মেলন কেন এতো আলোড়ন তৈরি করলো? সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার এবারের সম্মেলনের পেক্ষাপট অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেকে বেশি ভিন্নতর। এর কারণ হলো, চীনের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চলমান বাণিজ্য সংঘাতের এই সময়ে চীনের মেহমানদারিতে চীনেরই মাটিতে রাশিয়া ও ভারতসহ বিশ্বের বেশকিছু ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের প্রধানদের সমবেত হওয়া। যা কি না মার্কিন আধিপত্যের এক মেরুর বিশ্বের তত্ত্বের বিরুদ্ধে যায়। ভারতের ওপর ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকারের চাপিয়ে দেয়া ৫০% শুল্কের মতো, মার্কিন নীতির ফলে নানাভাবে ক্ষাতিগ্রস্ত অনেক দেশই তিয়ানজিনের এই সম্মেলনে অংশ নেয়। এখানে যেমন ইউক্রেনের বিষয়ে মার্কিন নীতির বিরোধী রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন ছিলেন, তেমনই ছিলেন মার্কিন মদদে ক্ষতবিক্ষত ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। এই সম্মেলনের কাছাকাছি সময়ে চীন সফর করেন উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রপতি কিম জং উন। ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিশ্লেষকরা মন্তব্য করছেন যে, মার্কিন আধিপত্য ঠেকাতে বেশ কিছু ইস্যুতে এবার এক হয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এবং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত অতিরিক্ত শুল্কনীতির জবাব দিতে চীনের তিয়ানজিনে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন তারা। সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার এবারের সম্মেলনে সংস্থাটির অন্যান্য সদস্য দেশগুলোর নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ, বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কো, কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভ, উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শাভকাত মিরজিয়য়েভ, কিরগিজস্তানের প্রেসিডেন্ট সাদির জাপারভ এবং তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রাহমন। বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো খবর হলো, জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসসহ আরও বেশ কয়েকটি দেশের নেতারা এ সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন। এ বছর এমন একসময়ে এসসিও সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন বিশ্বজুড়ে ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধ শুরু হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধ চলছে, গাজায় ইসরাইলের গণহত্যা অব্যাহত আছে এবং দক্ষিণ এশিয়া ও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বেশ কিছুদিন থেকেই বিভিন্ন দেশের ওপর বারবার ট্রাম্পের শুল্ক আরোপে বিশ্বজুড়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা–এমন পরিস্থিতিতে এসসিও সম্মেলন চীনের সামনে নিজেদের একটি স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতে বড় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে। এই সম্মেলন দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলোকে একত্র করে পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় সক্ষম করে তুলবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। মূলতঃ এসব কারণে এবারের সম্মেলন বিশ্বে অনেক বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সম্মেলনে চীনের প্রস্তাবিত নয়া বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা কী? এবারের সম্মেলনে একটি নয়া বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার প্রস্তাব উত্থাপন করেন চীনের রাষ্ট্রপতি এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড শি জিন পিং। তিনি বলেন, “ আমি একটি বৈশ্বিক শাসন প্রস্তাব উপস্থাপন করতে চাই, আরও ন্যায়সঙ্গত ও যুক্তিযুক্ত বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সকল দেশের সাথে কাজ করতে চাই এবং মানবজাতির অভিন্ন লক্ষ্যের কমিউনিটি গড়ে তোলার দিকে যৌথভাবে এগিয়ে যেতে চাই। যার লক্ষ্য নিম্নরূপ: প্রথমত, সার্বভৌম সমতা বজায় রাখা। আমাদের অবশ্যই এই নীতিটি বজায় রাখতে হবে যে, আকার, শক্তি, দারিদ্র্য বা সম্পদ নির্বিশেষে সমস্ত দেশ বৈশ্বিক শাসনে সমান অংশগ্রহণ, সমান সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সমান সুবিধা উপভোগ করবে। আমাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গণতন্ত্রীকরণকে উৎসাহিত করতে হবে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব এবং কণ্ঠস্বর বৃদ্ধি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক আইনের শাসন মেনে চলা। আমাদের অবশ্যই জাতিসংঘ সনদের উদ্দেশ্য ও নীতিসহ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত মৌলিক নিয়মগুলো সম্পূর্ণরূপে, ব্যাপকভাবে মেনে চলতে হবে, আন্তর্জাতিক আইন এবং আন্তর্জাতিক নিয়মের সমান এবং অভিন্ন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, দ্বৈত মানদণ্ড থেকে বিরত থাকতে হবে এবং কয়েকটি দেশের ‘অভ্যন্তরীণ নিয়ম’ অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। তৃতীয়ত, বহুপাক্ষিকতা অনুশীলন করা। আমাদের অবশ্যই যৌথ পরামর্শ, যৌথ নির্মাণ এবং যৌথ উপভোগ করার বৈশ্বিক শাসন ধারণাকে সমর্থন করতে হবে, সংহতি ও সহযোগিতা জোরদার করতে হবে, একতরফাবাদের বিরোধিতা করতে হবে, জাতিসংঘের মর্যাদা এবং কর্তৃত্বকে দৃঢ়ভাবে রক্ষা করতে হবে এবং বিশ্বব্যাপী শাসনে এর অপূরণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা কার্যকরভাবে পালন করতে হবে। চতুর্থত, জনগণ-কেন্দ্রিক পদ্ধতির পক্ষে বিশ্বব্যাপী শাসনব্যবস্থার সংস্কার ও উন্নতি করতে হবে, যেন সব দেশের মানুষ বিশ্বব্যাপী শাসনে অংশগ্রহণ করে এবং ভাগ করে নেয়, মানবসমাজের সম্মুখীন অভিন্ন চ্যালেঞ্জগুলো আরও ভালভাবে মোকাবিলা করে, উত্তর-দক্ষিণ উন্নয়নের ব্যবধান আরও ভালোভাবে দূর করে এবং সমস্ত দেশের অভিন্ন স্বার্থ আরও ভালভাবে সুরক্ষিত করে। পঞ্চমত, কর্মমুখী উন্নয়নের ওপর মনোনিবেশ করা। পদ্ধতিগত পরিকল্পনা এবং সামগ্রিক অগ্রগতি মেনে চলতে হবে, বৈশ্বিক কর্মকাণ্ডের সমন্বয় সাধন করতে হবে, সকল পক্ষের সম্পদ সম্পূর্ণরূপে একত্রিত করতে, আরও দৃশ্যমান ফলাফল তৈরি করতে হবে এবং বাস্তবসম্মত সহযোগিতার মাধ্যমে শাসনের পিছিয়ে পড়া এবং বিভক্তি এড়াতে হবে। “রাশিয়া, ভেনিজুয়েলাসহ সম্মেলনে উপস্থিত পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা চীনের এই প্রস্তাব সমর্থন করেন। এবারের সম্মেলনের অর্জন কী? আমার মতে এবারের সম্মেলনের বড় অর্জন হলো, সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য তথা এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে বহুকেন্দ্রিক বিশ্বের স্বপক্ষে এ সম্মেলন বিশ্ব সম্প্রদায়ের উদ্দ্যেশ্য এক শক্তিশালী বার্তা দিয়েছে। কারণ, সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলন এখন সারা দুনিয়ার ৪৩ শতাংশ জনগণের এবং ২৩ শতাংশ বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির প্রতিনিধিত্ব করছে। যে কারণে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেন, ‘সম্মেলনে সদস্য ও অংশীদার দেশগুলোর উচ্চমাত্রার উপস্থিতিই প্রমাণ করে, সংগঠনটির বহুমাত্রিক কার্যক্রমে বিশ্বজুড়ে আসল আগ্রহ ও মনোযোগ রয়েছে। পুতিন স্মরণ করিয়ে দেন যে, ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এসসিও ইউরেশীয় মহাদেশে শান্তি ও নিরাপত্তা, আস্থা ও সহযোগিতার পরিবেশ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালিয়ে এসেছে। তিনি বলেন, “আমার বিশ্বাস, বর্তমান পরিস্থিতিতে এসসিও একটি আরও ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা গঠনের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে পারে।” পুতিনের মতে, এই সংস্থা এখন আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে, কারণ কিছু দেশ এখনো বৈশ্বিক রাজনীতিতে আধিপত্য বজায় রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’ এবারের সম্মেলনের আরও একটি বড় অর্জন হলো, এশিয়া অঞ্চলের দুটি বড় দেশ ভারত ও চীনের মধ্যকার বিরোধের মাত্রা হ্রাসের সূচনা করা। এ সম্মেলন উপলক্ষ্যে দীর্ঘ সাত বছর পর চীন সফর করেন মোদি। সম্মেলনের একদিন আগেই চীনে পৌঁছান তিনি। সম্মেলনের এক ফাঁকে শি জিন পিং এর সঙ্গে বৈঠক করেন মোদি। বৈঠকের শুরুতে করমর্দন করেন তারা। শি বলেছেন, ‘ড্রাগন ও হাতির’ (চীন ও ভারত) আজ এক মঞ্চে আসা প্রয়োজন। চীন ও ভারতকে দুই প্রাচীন সভ্যতার দেশ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেছেন, তারা বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশও। এই দেশ দুটি গ্লোবাল সাউথের অংশ। শি মনে করেন, এই দেশ দুটির বন্ধু হওয়া বিশেষ প্রয়োজন। বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও সংবেদনশীলতার ভিত্তিতে ভারত-চীন সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ তিনি। এছাড়া মোদি কৈলাস মানসসরোবর যাত্রা পুনরায় চালু করা এবং ভারত-চীনের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট চালুর বিষয়ে গুরুত্বারোপও করেন। তিনি বলেছেন, ‘দুই দেশের ২৮০ কোটি মানুষের স্বার্থ আমাদের পারস্পরিক সহযোগিতার সঙ্গে জড়িত। ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়াল জানিয়েছেন, তার দেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘মাথা নত’ করবে না এবং নতুন বাজারের সন্ধান চালিয়ে যাবে। ২৯ আগস্ট নয়াদিল্লিতে এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেছেন, যদি কেউ আমাদের সঙ্গে একটি মুক্তবাণিজ্য চুক্তি করতে চায়, তাহলে ভারত সর্বদা প্রস্তুত। কিন্তু ভারত কারও কাছে মাথা নত করবে না, কখনো দুর্বলতা দেখাবে না।’ এবারের সম্মেলনের উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নেতারা চীনের তিয়ানজিন শহরে অনুষ্ঠিত শীর্ষ সম্মেলনে একটি যৌথ ঘোষণা গ্রহণ করেছেন। এতে সংস্থার উন্নয়ন, সামরিক সহযোগিতা, জাতিসংঘ সংস্কার, মাদকবিরোধী পদক্ষেপ এবং ক্রীড়াক্ষেত্রে বৈষম্যহীন অংশগ্রহণসহ নানা ইস্যু অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গত সোমবার (১ সেপ্টেম্বের) এক প্রতিবেদনে এ খবর দিয়েছে রুশ বার্তা সংস্থা তাস। ঘোষণার মূল দিকগুলোতে বলা হয়, এসসিও একটি উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করবে। পাশাপাশি টেকসই উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়াতে শিল্প, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি সংরক্ষণ ও পরিচ্ছন্ন শক্তি ব্যবহারে একযোগে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন সদস্য দেশগুলো। এছাড়া কৃষি, ই-কমার্স, পর্যটন ও চিকিৎসা খাতেও অংশীদারত্ব জোরদার করা হবে। ঘোষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় সহযোগিতা এবং বিজ্ঞান-প্রযুক্তি উদ্ভাবন জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ডিজিটাল কাস্টমস, ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ এবং ‘স্মার্ট কাস্টমস’ ব্যবস্থার বিকাশকে স্বাগত জানানো হয়। একই সঙ্গে উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিম করিডরসহ নতুন পরিবহন রুট নির্মাণ ও বিদ্যমান রুটের আধুনিকায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে এসসিও দেশগুলো পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) এবং রাসায়নিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ কনভেনশনের পূর্ণ মেনে চলার আহ্বান জানায়। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দ্বিমুখী মানদণ্ডের নিন্দা করা হয়। এছাড়া জাতিসংঘকে বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়। নাজিবাদের মহিমাকীর্তন প্রতিরোধে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবকে স্বাগত জানানো হয়। ঘোষণায় আরও বলা হয়, মাদকপাচার দমনে কার্যকর সহযোগিতা বাড়ানো হবে। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে সংঘটিত অপরাধ এবং নতুন মাদকদ্রব্যের বিস্তার প্রতিরোধেও একযোগে কাজ করবে এসসিও। সবশেষে, ক্রীড়াক্ষেত্রে বৈষম্যহীন প্রতিযোগিতা আয়োজন এবং সবার জন্য উন্মুক্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়। সুতরাং আমার মতে, এবারের এই সম্মেলন উল্লিখিত ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং এই ঘোষণার সফল বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে গ্লোবাল সাউথের সামনে এক বিরাট ইতিবাচক এবং আশাব্যঞ্জক উদাহরণ সৃষ্টি করবে। “বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রসমূহের উচিত হবে জাতীয় স্বার্থের সুরক্ষা এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য এধরনের মার্কিন একাধিপত্যের বিরোধী আন্তর্জাতিক উদ্যোগের সাথে শামিল হওয়া। আজ বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার কমিউনিস্ট, গণতান্ত্রিক শক্তির জন্য এই সাংহাই সহযোগিতার সঙ্গে থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন মনোপলি ভেঙে দেয়ার কৌশল গ্রহণ করার সুযোগ এসেছে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..