সিপিবির পথ পরিক্রমণের তথ্য-কণিকা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একতা ডেস্ক : এই কলামটি সাপ্তাহিক একতার ৫৬ বর্ষের সংখ্যা-৩২ থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে। আজ মুদ্রিত হচ্ছে তার ১৮তম কিস্তি। (১৮) মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশের) কমিউনিস্ট পার্টির প্রচারিত গোপন লিফলেট- (বানানরীতি অপরিবর্তিত) হানাদার খতম করুন! বাংলাদেশকে মুক্ত করুন!! ভাইসব, পাকিস্তানের শোষকদের সীমাহীন শোষণ ও অত্যাচার হইতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য গত দুই মাসের অধিককাল যাবৎ এক বীরত্বপূর্ণ সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হইয়াছে। বাংলাদেশের জনগণ নিজেদের জাতীয় অধিকার ও গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘকাল যাবৎ গণতান্ত্রিক পথে বহু সংগ্রাম করিয়াছেন। নির্বাচনের মাধ্যমে বাঙালী জাতির ন্যায্য দাবী দাওয়া পূরণের আশা নিয়া বাংলাদেশের জনগণ গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ভোটও দিয়াছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানের শয়তান শোষকগোষ্ঠী গত ২৩ বৎসর যাবৎই বাংলাদেশের জনগণের সমস্ত ন্যায্য দাবীকে পশুশক্তি দ্বারা দমন করিয়াছে। পরিশেষে, নির্বাচনের পরে নির্বাচিত গণ প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করার বদলে ঐ শয়তানরা গত ২৫শে মার্চ হইতে বাংলাদেশের নিরস্ত্র জনগণের বিরুদ্ধে সশস্ত্র ও বর্বর যুদ্ধ শুরু করিয়াছে। এই অবস্থাতেই বাংলাদেশের মুক্তিফৌজ অতি ন্যায়সঙ্গতভাবে হাতিয়ার হাতে নিয়া পাকিস্তানের হানাদার সৈন্যদের বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়াইয়াছেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম চালাইতেছেন। বাংলাদেশের আম আপামর জনসাধারণ এই মুক্তি যুদ্ধে শরিক রহিয়াছেন ও ইহাকে সমর্থন জানাইতেছেন। ইহার জন্য বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি দেশের জনগণকে মোবারকবাদ জানাইতেছে এবং মুক্তি যুদ্ধে যাঁহারা প্রাণ দিয়াছেন তাঁদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাইতেছে। বাংলাদেশের জনগণের এই স্বাধীনতা সংগ্রামকে পিষিয়া মারার জন্য বর্বর ইয়াহিয়া-টিক্কা খানের হানাদার সৈন্যরা বাংলাদেশে গণহত্যা, শহর-গ্রামে হাজার হাজার ঘরবাড়ী পোড়ান, ব্যাপক লুটতরাজ ও আমাদের অগণিত মা-বোনদের উপর পাশবিক অত্যাচার প্রভৃতি নারকীয় কার্যকলাপ চালাইতেছে। ইহারা বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ জনগণকে দেশ হইতে তাড়াইয়া দিয়াছে। বিদেশী সাম্রাজ্যবাদীরা ঐ খুনী শয়তানদেরই অস্ত্র ও অর্থ জোগাইয়াছে ও জোগাইতেছে। চীনের নেতারাও ইহাদেরই ঢালাও সমর্থন জানাইয়াছে। তাহাদের সাহায্য ও সমর্থন পাইয়া পাকিস্তানের সামরিক শাসকচক্র আজ সোনার বাংলাকে শ্মশানে পরিণত করিয়াছে। বাংলাদেশের জনগণ এই নরপশুদের ক্ষমা করিতে পারে না। যে রক্তের বন্যা ইহারা বাংলাদেশে বহাইয়াছে তাহারা যোগ্য প্রতিশোধ নিতে হইবে। বাংলাদেশের জনগণের রক্তের ঋণ দুষমনদের রক্তেই পরিশোধ করিতে হইবে। বাংলাদেশের জনগণের সামনে আজ দুইটি পথ খোলা রহিয়াছে। হয় হানাদার সৈন্যদের নির্মূল করিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তি অর্জন করিতে হইবে, নতুবা সাড়ে সাত কোটি বাঙালীকে পাকিস্তানের শোষকদের গোলাম হইয়া থাকিতে হইবে। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ গোলামীর চাইতে মরণকে শ্রেয় বলিয়া মনে করেন। তাই, তাঁহারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রামের পথই বাছিয়া লইয়াছেন। বাংলাদেশের জনগণের এই সংগ্রাম হইল তাঁহাদের জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম, তাঁহাদের আকাঙ্খিত স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়িয়া তোলার সংগ্রাম। সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা সরবরাহকৃত অর্থ ও অস্ত্রবলে বলিয়ান পাকিস্তানী শোষকদের দখলকারী সৈন্যদের সশস্ত্র যুদ্ধ দ্বারা নির্মূল করিয়াই বাংলাদেশের জনগণের এই স্বাধীনতা সংগ্রাম বিজয়ী হইতে পারে। তাই এই সংগ্রামে বিজয়ের জন্য বাংলাদেশের জনগণকে আরও অনেক ত্যাগ স্বীকার ও কষ্ট সহ্য করার জন্য প্রস্তুত থাকিতে হইবে। কিন্তু, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি জনগণ আজ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও উহার জন্য সংগ্রামের পক্ষে দাঁড়াইয়াছেন। জনকয়েক দালাল ছাড়া বাংলাদেশের সমস্ত মানুষই আজ পাকিস্তানের সামরিক সরকারকে মনে প্রাণে ঘৃণা করেন। সামরিক শাসকচক্রের কোন সমর্থনই বাংলাদেশে নাই। পশ্চিম পাকিস্তানের শোষিত জনগণ ও নিপীড়িত জাতিগুলি তাহাদের গণতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসনের জন্য পাকিস্তানের শাসকচক্রের বিরুদ্ধে অনেক সংগ্রাম করিয়াছেন এবং ভবিষ্যতেও করিবেন। পাকিস্তানের যে শাসকচক্রের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণ আজ সংগ্রাম করিতেছেন সেই শাসকচক্র পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণেরও শত্রু। তাই বাংলাদেশের সংগ্রামের প্রতি তাহাদের সমর্থনও পাওয়া যাইবে। ইহা ছাড়া, দুনিয়ার প্রগতিশীল জনগণ বাংলাদেশে পাকিস্তানের শোষকচক্রের গণহত্যা প্রভৃতি অমানুষিক কার্যকলাপের তীব্র নিন্দা করিয়া বাংলাদেশের জনগণের প্রতি তাহাদের সমর্থন ও সহানুভূতি জানাইয়াছেন। তাই হানাদার সৈন্যদের হাতে আজ যত অস্ত্রই থাকুক না কেন, ইহারা বাংলাদেশের জনগণের উপর যত অত্যাচারই করুক না কেন উপরোক্ত তিনটি কারণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের জয় সুনিশ্চিত। স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয়ের এই দৃঢ় আস্থা নিয়েই আজ বাংলাদেশের জনগণকে দৃঢ়ভাবে সংগ্রাম চালাইয়া যাইতে হইবে। যে কোন মূল্যেই হোক বাংলাদেশের স্বাধীনতা কায়েম করিতে হইবে। এই সংগ্রামে জয়ের জন্য আজ সবচেয়ে প্রয়োজন হইল শত্রু বিরুদ্ধে বাংলাদেশের শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, মধ্যবিত্ত, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি প্রভৃতি সকল শ্রেণী ও সম্প্রদায়ের এবং আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও সমস্ত সংগ্রামী শক্তির অটুট একতা ও সংঘবদ্ধতা। এরূপ একতা স্বাধীনতা সংগ্রামে জয়ের জন্য অবশ্য প্রয়োজন। দুষমনদের বিরুদ্ধে আজ গণ ঐক্যের লৌহদৃঢ় প্রাচীর গড়িয়া তুলিতে হইবে। তাই বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি দেশের জনগণের নিকট আবেদন জানাইতেছে যে, (১) সকলে ঐক্যবদ্ধ হইয়া দুষমনদের বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়ান। শহরে পাড়া ও গ্রামগুলিকে এক একটি দুর্ভেদ্য যুদ্ধ ঘাঁটিতে পরিণত করুন। সেজন্য শহরে পাড়ায়-পাড়ায় ও গ্রামে গ্রামে দলমত নির্বিশেষে বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের নিয়া গোপনভাবে মুক্তি সংগ্রাম কমিটি গড়িয়া তুলুন। (২) জনগণের মধ্যে ফাটল ধরাইয়া স্বাধীনতা সংগ্রামকে নষ্ট করার জন্য ইয়াহিয়া সরকার ও তাহাদের দালাল মুসলিম লীগ, জামাতে-ইসলাম প্রভৃতিরা সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত হানাহানি উস্কানি দিতেছে এবং বহু স্থানে লুটতরাজ প্রভৃতি করাইতেছে। সকল মিলিয়া ইহা প্রতিরোধ করুন। পাড়ায় বা গ্রামে কোন দুষ্কৃতিকারী যাহাতে লুটতরাজ, খুনাখুনি করিতে না পারে তাহার জন্য মুক্তি সংগ্রাম কমিটির পক্ষ হইতে গোপনভাবে স্থানীয় বাহিনী গঠন প্রভৃতি ব্যবস্থা অবলম্বন করুন এবং দুষ্কৃতিকারীদের উপযুক্ত শাস্তি দিন। (৩) হানাদার সৈন্যদের সাথে সবদিক দিয়া অসহযোগিতা করুন এবং ইয়াহিয়া সরকারের সকল প্রকার কাজকর্মের প্রচেষ্টা অচল করিয়া দিন। যে সব দালাল হানাদার সৈন্যদের সহিত সহযোগিতা করে ও করিবে মুক্তি সংগ্রাম কমিটিতে তাহাদের বিচার করুন ও তাহাদের খতম করিয়া দিন। (৪) মুক্তিফৌজ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সকল প্রকার সাহায্য করুন। ইহাদের সম্পর্কে সকল খবরাখবর সম্পূর্ণ গোপন রাখুন। অন্যদিকে শত্রুদের সকল খবর মুক্তি যোদ্ধাদের নিকট পৌঁছাইয়া দিন। পরিশেষে বাংলাদেশের যুব সম্প্রদায়ের নিকট কমিউনিস্ট পার্টি আহ্বান জানাইতেছে যে, হানাদার সৈন্যরা যখন আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে শ্মশানে পরিণত করিতেছে ও আমাদের মা-বোনদের ইজ্জত নষ্ট করিয়া দিতেছে তখন আপনারা চুপ করিয়া বসিয়া থাকিতে পারেন না। আপনারা ইহার বদলা নিন। হাজারে হাজারে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীতে যোগদান করুন এবং সশস্ত্র সংগ্রাম দ্বারা হানাদার সৈন্যদের নিশ্চিহ্ন করিয়া স্বাধীন ও নতুন বাংলা গড়িয়া তুলুন। স্বাধীন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ জিন্দাবাদ পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশের) কমিউনিস্ট পার্টি তাং ২৫শে মে ’৭১ ঢাকা নিজে গোপনে পড়ুন–দশজন বন্ধুবান্ধবকে পড়ান। (চলবে)

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..