‘বাংলাদেশি’ তকমার রাজনৈতিক অর্থনীতি

ইন্দ্রনীল দাশগুপ্ত

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য থেকে বাংলাদেশি আর বাঙালি শ্রমিক ট্যাগ দিয়ে অসন্তোষ তৈরির চেষ্টা চলছে। যার নেপথ্যে কাজ করছে বিজেপি সরকার। সেই ঘটনার প্রেক্ষিতে ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের (আইএসআই) অধ্যাপক ইন্দ্রনীল দাশগুপ্তের বিশ্লেষণমূলক একটি আলোচনা তুলে ধরা হলো- ‘বাংলাদেশি’ ও ‘মুসলিম’- এই দু’টি শব্দবন্ধ হচ্ছে বঙ্গভাষী পরিযায়ী শ্রমজীবী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে বৈরিতার ভাষ্য নির্মাণে বিজেপির একটি উদ্ভাবনী অবদান। এই অনন্য অবদানটি ওই ভাষ্যে যোগ করেছে একটি ভয়ঙ্করতর মাত্রা। এমনিতেই, বিগত ১০-১৫ বছর ধরে বঙ্গদেশ থেকে গণহারে স্রোতের মতো হাজির হওয়া অদক্ষ, অথবা আধা-দক্ষ শ্রমিকদের বিরুদ্ধে অসন্তোষ তৈরি করা হচ্ছিল। আমার ধারণা, নতুন করে এই বিদ্বেষের ভাষ্যটি প্রকৃতপক্ষে দূর রাজ্যের পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেওয়া, কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া শ্রমিকদের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া সেই অসন্তোষের বৃহত্তর ভাষ্যকে আরও জোরালো করার একটি কৌশল। সুরাতের মতো জায়গাতেও ২০১১ সালে কায়িক-পেশায় বাঙালি বহিরাগত কর্মীদের যে নগণ্য উপস্থিতি ছিল, সেটা এখন ৭-৮ লক্ষের এক বিস্ফোরক আয়তন নিয়েছে। এটা ঘটেছে যখন শ্রম বাজারে যথেষ্ট মন্দা। আর এমন সময়ে, বঙ্গদেশ থেকে গণহারে শ্রমিকদের বহিরাগমন- ওই গন্তব্য অঞ্চলের মজুরিকে স্থির রাখতে সহায়ক হয়েছে। এটা তুলনায় একটি নতুন ঘটনা। ৮০-র দশকের শেষ থেকেই দক্ষতাসম্পন্ন বাঙালিরা পালে পালে বাংলা ছেড়েছে। অন্যদিকে, ২০০০-র দশকের গোড়া অবধি অদক্ষ শ্রমিকদের নিশ্চিন্ত গন্তব্য ছিল পশ্চিমবঙ্গ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সময়ে বিহার, উত্তর প্রদেশ ও রাজস্থানের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গও ভারতের অদক্ষ শ্রমিক রপ্তানির ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এই বহিরাগমন– ওই বাজারগুলিতে মজুরি নিম্নমুখী করেছে। অথবা, অন্তত তার ঊর্ধ্বমুখী হওয়া ঠেকিয়েছে। এমন ঘটনার ফলাফল পৃথিবীর কোনও দেশেই শুভকর হয়নি। এর ফলে অসন্তোষ ও বৈরিতার জন্ম হয়। বিহার ও উত্তর প্রদেশ থেকে বাইরের রাজ্যে যাওয়া শ্রমিকরা এমন ধরনের অসন্তোষ, বৈরিতার শিকার হয়েছেন। এমনকি হিংসারও মুখোমুখি-ও হয়েছেন। যেমন উত্তর প্রদেশ, বিহার, রাজস্থান ও ওড়িশা থেকে বঙ্গদেশে আসা শ্রমিকরা অন্তত একশ বছর ধরে এখানেও এই একই ধরনের বিষাক্ত অসন্তোষ ও বৈরিতার মুখোমুখি হয়েছেন। বাংলায় আসা অভিবাসী শ্রমিক জনগোষ্ঠীর প্রতিটির জন্য বাংলা ভাষায় ভিন্ন ভিন্ন শব্দ ব্যবহৃত হয়, যার প্রতিটি বৈরিতা এবং তাচ্ছিল্যের অভিব্যক্তি। বাঙালি শ্রমিকরা যখন অপেক্ষাকৃত উন্নত রাজ্যে গিয়ে বিহার ও উত্তর প্রদেশের মতো রাজ্য থেকে যাওয়া শ্রমিক-জনতার সাথে যুক্ত হয়েছেন, তখন উত্তর প্রদেশ, বিহার থেকে আসা শ্রমিকদের বিরুদ্ধে এতদিন ধরে চলে আসা অসন্তোষ ও বৈরিতা তাঁদের বিরুদ্ধেও শুরু হয়ে যায়। এছাড়া, বিহার, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান অথবা দিল্লির জাতীয় রাজধানী অঞ্চলে শ্রমজীবী বাঙালি শ্রমিকরা ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত বৈশিষ্ট্যের জন্যেও হিন্দিভাষী শ্রমিকদের সাপেক্ষে ভিন্নভাবে দৃশ্যমান হয়ে থাকেন। এই অসন্তোষ ও জাতিগত বৈরিতাকে বিজেপি তার রাজনৈতিক লক্ষ্যপূরণে এক ভয়ঙ্কর সর্বনাশের দিশায় ঘুরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু মূলগত কারণটা শুধুমাত্র বিজেপিতে সীমাবদ্ধ নয়। যেখানে বিজেপি-র উপস্থিতি যৎসামান্য, সেখানেও এই পরিস্থিতি রয়েছে। এমনকি, আগামীদিনে বিজেপি অপসারিত হলেও এই বিষয়টি অন্তর্হিত হবে না। এটা হল সেই বৈরিতা, যা মানুষ কপর্দকহীন দূরসম্পর্কের আত্মীয় তার ঘাড়ে এসে পড়লে প্রকাশ করেন। ওই লজ্জাবনত আশ্রিতরা যতই ঘরের কাজে অবদান রাখুক, তাতে তাঁদের প্রতি বৈরিতার হেরফের হয় না। এটা এক ধরনের ক্ষমতাতন্ত্র, সময়ান্তর বিশেষে যার হিংস্র বিস্ফোরণ ঘটে। এর মাধ্যমে ‘আশ্রিত’কে তার প্রকৃত অবস্থানটি বুঝিয়ে দেওয়া হয়। দুনিয়াজোড়া অভিবাসন নিয়ে মাইক ডেভিসের মতো পণ্ডিতদের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক লেখালেখির মত বাংলা সাহিত্যেও রয়েছে এ ধরনের ক্ষমতাতন্ত্রের প্রচুর বিবরণ। এর একটাই সমাধান। পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিকে এমনভাবে গড়ে তোলা হোক, যাতে বাংলার শ্রমিকদের বাঁচার জন্যে রাজ্য ছেড়ে বাইরে পাড়ি দিতে না হয়। যে সমস্ত বাঙালি শ্রমিকরা বাইরে যাবেন, তাঁরা দক্ষতার কৃতিত্বের শিরোপার সুবাদে অধিকতর মর্যাদার কর্মক্ষেত্রে যাবেন। দূরদেশে একজন সহায়-সম্বলহীন জঞ্জালকুড়ানি বা সাফাইকর্মী বা অটোচালক বা গৃহকর্মী হিসেবে নয়। কিন্তু তার জন্যে প্রয়োজন বাংলার শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশাসন ও সর্বোপরি রাজনীতির আগাপাশতলা বদল।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..