গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা প্রাপ্তি ও করণীয়

কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
চব্বিশের জুলাই-আগস্টে সংগঠিত হয়েছে ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থান। দুর্বার গণজোয়ারে পতন হয়েছে এক যুগেরও বেশি চেপে বসা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী শাসনের। সহস্রাধিক ছাত্র-জনতার আত্মবলিদান এবং গুলির মুখে বুক পেতে থাকা ছাত্র-শ্রমিক-জনতার রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই বিজয় অর্জিত হয়েছে। একটানা চলতে থাকা সুদীর্ঘ আওয়ামী দুঃশাসনকালের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ এবং তার বিরুদ্ধে চলতে থাকা বিভিন্ন গণতান্ত্রিক, রাজনৈতিক শক্তিসমূহ এবং শ্রেণিপেশার মানুষের সংগ্রাম গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি রচনা করেছিল। এই আওয়ামী ফ্যাসিস্ট দুঃশাসনের বিরুদ্ধে দেশবাসীর মনে যে তীব্র ক্ষোভের আগুন পুঞ্জীভূত হয়েছিল তা বিস্ফোরিত হয়ে এই গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের মুখে হাসিনা সরকারের পতন শুধুমাত্র একটি শাসন ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং তা রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সমাজের কাঠামো পরিবর্তনে ছাত্র-জনতার আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। ছাত্র-জনতা বিশেষ করে তারুণ্যের জাগরণ বাংলাদেশে একটি নতুন জনপরিসর তৈরি করেছে। কেউ কেউ এটাকে বিপ্লব দ্বিতীয় স্বাধীনতা বলার চেষ্টা করছেন। এটা বিপ্লবও না দ্বিতীয় স্বাধীনতাও না। এটা ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান। এই গণঅভ্যুত্থানে ব্যাপক সংখ্যক ছাত্র তরুণ ও শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণ থাকলেও এই আন্দোলন বিকশিত হয়েছিল মূলত স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ওপর ভিত্তি করে। অতীতের মতো এই আন্দোলনেও অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন শক্তির মধ্যে সাংগঠনিক ও ভাবাদর্শগত পার্থক্য ছিল। সিপিবির গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কিত মূল্যায়নে বলা হয়েছে–“গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ও সম্ভাবনাকে সংহত ও বাস্তবায়ন করার প্রশ্নে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শক্তিসমূহ তাদের নিজ নিজ মত ও ভাবনা নিয়ে অগ্রসর হতে হবে এটাই স্বাভাবিক। একটি সাধারণ লক্ষ্যে আন্দোলন পরিচালিত হলেও আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী, অংশগ্রহণকারী ও আন্দোলনে সুবিধাভোগীদের মধ্যে নানামাত্রিক দ্বন্দ্ব ছিল এবং আছে, থাকবে।” ফ্যাসিবাদ ও তার শাসন কাঠামো টিকে ছিল সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র লুটেরা মাফিয়া ব্যবসায়ী এবং সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদী শক্তির সমর্থনে। হাসিনার ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের পতন হলেও তার ভিত্তি ও কাঠামো এখনো টিকে আছে। টিকে থাকা এই ভিত্তি ও কাঠামো, শাসকশ্রেণির অন্য অংশ এবং ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলসহ তার অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের সাথে গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য হচ্ছে এবং বৃদ্ধি পাচ্ছে। সব পক্ষের বর্তমান লক্ষ্য ও ভাবাদর্শগত অবস্থান উন্মোচিত হয়েছে। এই আন্দোলন চলাকালে ভূ-রাজনীতির প্রভাব এবং সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যবাদী শক্তিসমূহ আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সম্পৃক্ততাও ছিল, এটাও প্রতীয়মান হয়েছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ অতীতের মতো এবারও তার প্রভাব বাড়ানোর প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে। অপরদিকে ভারতীয় আধিপত্যবাদও তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য নানা ধরনের ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে। শেখ হাসিনার ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনকে মদদ জুগিয়েছে। প্রহসনের মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখতে হাসিনা সরকারকে সহায়তা করেছে। বাংলাদেশের ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানকে মেনে নিতে পারেনি ভারত। ফ্যাসিবাদের পতনের পরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের নিয়ন্ত্রণের পুরো ছক ছিন্ন হয়ে গেলেও বাংলাদেশকে ঘিরে বঙ্গোপসাগর এলাকায় ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা থেমে নেই। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থরক্ষার জন্য রাখাইনে মানবিক সহায়তার নামে করিডোর দেয়া, চট্টগ্রামে নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল বিদেশিদের দেয়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দেশবিরোধী গোপন চুক্তির প্রয়াসও অব্যাহত রেখেছে। গণঅভ্যুত্থান-উত্তর মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তি মুক্তিযুদ্ধকে প্রশ্নবিদ্ধ করার নানা পায়তারা করছে। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানকে ৭১’এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সংবিধান পুনর্লিখনের নামে ৭২’এর চার মূলনীতি নিয়ে ষড়যন্ত্র অব্যাহত আছে। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত-অস্বচ্ছতা-সীমাবদ্ধতা-ত্রুটি-বিচ্যুতি ও ব্যর্থতা এবং নির্বাচন প্রশ্নে তাদের অস্পষ্ট অবস্থান দেশের জনগণের সাথে দ্বন্দ্ব ক্রমশ বাড়িয়ে তুলছে। নির্বাচনের সময়সীমা সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলেও সাধারণ মানুষের মনে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি, জামাতসহ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের অনেকটা আনুকূল্য পেয়ে ক্ষমতার ভরকেন্দ্র হিসেবে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। বিএনপি তার অবস্থান থেকে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নানা ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে পতিত স্বৈরাচার ফিরে আসার চক্রান্তও অব্যাহত রেখেছে। রাজনীতির ক্ষেত্রে নানা টানাপোড়েনের সৃষ্টি হয়েছে, যা দেশের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ৬টি কমিশন গঠন করে সংস্কারের বিষয় সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সরকারের আলোচনা চলছে। বামপন্থি কমিউনিস্টরা রাষ্ট্র ও সমাজের আমূল বিপ্লবী সংস্কারের কথা শুরু থেকেই বলে এসেছে। সংস্কারের ক্ষেত্র ও পরিসর নির্ধারণের সময় খেয়াল রাখতে হবে সংস্কারের পরিসর যেন আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক চেতনা ও ২৪’র গণঅভ্যুত্থানের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে- এমন ধরনের কোনো সংস্কার এদেশের সাধারণ মানুষ কখনো মেনে নেবে না। যদিও ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এসেছে, ফলে তার কাছে খুব বেশি প্রত্যাশা করাও সমীচীন হবে না। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার লুটেরা শাসকশ্রেণিরই প্রতিনিধিত্ব করে। শাসক শ্রেণির ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতা বহির্ভূত কোনো অংশই সমাজ পরিবর্তনের জন্য রাজনীতি করে না। তারা প্রভুত্ব সম্পদেরে মালিক শোষক-শাসক শ্রেণির স্বার্থের পাহারাদার হিসেবেই তাদের রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করে সেই বুঝ-বিবেচনা কমিউনিস্ট বামপন্থিদের রয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে শোষণ-বৈষম্যবিরোধী যে গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নতুন আকাঙ্ক্ষা ও সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে সেখানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মূল দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কার করে একটি অবাধ-সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। এটা যত প্রলম্বিত হবে সরকার ও দেশের সংকট ক্রমাগত বৃদ্ধি পাবে। যা মুক্তিযুদ্ধ ও ২৪’র গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করবে। এমন অবস্থায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ওপর নির্ভর করে বসে থাকা কোনোমতেই সঠিক হবে না। সঠিক ধারার প্রকৃত গণসংগ্রাম অব্যাহত না রাখতে পারলে গণঅভ্যুত্থানের গণআকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যাভিমুখী গতিপথ পাল্টে যেতে পারে। গণঅভ্যুত্থানের ধারাকে তার লক্ষ্য অভিমুখে অব্যাহত রাখাটাই এই মুহূর্তের একটি অপরিহার্য কর্তব্য হিসেবে গণ্য করতে হবে। ফ্যাসিবাদের পতনের পর শোষণ দুর্নীতি ও বৈষম্যবিরোধী একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও সরকার মানুষ দেখতে চায়। গত ৫৪ বছর ধরে দেশ পরিচালিত হয়েছে লুটেরা বুর্জোয়া ধারার দল ও শক্তি দ্বারা। ফলে প্রত্যাশিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও সরকারের দেখা পাওয়া যায় নি। তাই বুর্জোয়া ধারার মেরুকরণের বাইরে বাম গণতান্ত্রিক বিকল্প গড়ে তোলার বিষয়টি গণঅভ্যুত্থান-উত্তর নতুন পরিস্থিতিতে দেশের রাজনীতিতে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। এজন্য বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাম গণতান্ত্রিক বিকল্প শক্তির প্রয়োজনীয়তা আগের তুলনায় আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে। কিন্তু মানুষের সামনে এখনই দৃশ্যমান বামপন্থি গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল এমন কোনো একক শক্তি নেই, যে শক্তি এ ধরনের ব্যবস্থা ও সরকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে। তবে আশার দিক হলো ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর সে ধরনের একটি বিকল্প রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি সমাবেশ গড়ে ওঠার ক্ষেত্রগুলো স্পষ্ট হয়েছে। ৭১’র মহান মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করে যেসব বাম ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দল সংগঠনসমূহ প্রগতিশীল ছাত্র-শ্রমিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক নাগরিক সংগঠন এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ গণঅভ্যুত্থানে ভূমিকা রেখেছেন তাদের সকলের একটি সাধারণ লক্ষ্য ছিল শোষণ দুর্নীতি ও বৈষম্যবিরোধী গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। এজন্য তাদের সবাইকে নিয়ে নতুন রাজনৈতিক-সামাজিক বিন্যাস ও মেরুকরণের ঐতিহাসিক প্রয়োজন ও সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। শক্তির ভারসাম্য মুক্তিযুদ্ধ ও গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার অনুকূলে নিয়ে আসার ঐতিহাসিক প্রয়োজন ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে শোষণ বৈষম্যবিরোধী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নির্মাণের দিকে অগ্রসর হওয়া ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। কমিউনিস্ট ও বামপন্থি প্রগতিশীলদের ধারাবাহিকভাবে শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, ভোটাধিকারসহ গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। এর ভিতর দিয়েই দেশে একটি শোষণ বৈষম্যবিরোধী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে।
প্রথম পাতা
অগ্নিকাণ্ডের কারণ উদঘাটন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন করুন
‘মেহেরবানি’
আরপিও’র অগণতান্ত্রিক সংশোধনী এবং নির্বাচনী ব্যয় বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাতিল কর
শোষণ-বৈষম্যবিরোধী গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান
‘রাষ্ট্রের চরিত্র বদল না হওয়ায় শ্রমিক হত্যাকাণ্ডের বিচার হচ্ছে না’
বন্দর ইজারার সিদ্ধান্ত না পাল্টালে ৪ ডিসেম্বর প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন অভিমুখে বিক্ষোভ
দেশের সংকট-নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান
সংশোধনী
পীর-ফকির-বাউলদের ওপর হামলায় পুলিশকে সন্ত্রাসের পক্ষে ব্যবহার করছে সরকার
পোল্যান্ডের কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে নিবর্তনমূলক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে যৌথ বিবৃতি
লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে চা-শ্রমিকদের অধিকার আদায় করে নিতে হবে

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..