জয়দিয়া বাওড় থেকে উচ্ছেদের শিকার শতশত নিরন্ন জেলে পরিবার

সুজন বিপ্লব

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
জনপদের নাম জয়দিয়া। এ জনপদের বিশেষত্ব হচ্ছে জয়দিয়া বাওড় ও জেলেদের জীবন। আলোচ্য বাওড়টি ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার অন্তর্গত সাফদারপুর ইউনিয়ন পরিষদের জয়দিয়া গ্রামসহ কয়েকটি গ্রামজুড়ে বিস্তৃত রয়েছে। এ বিশাল জলাভূমি আয়তনে ৪৬৪.৮৫ একর। ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলায় বাওড়, নদ-নদী, বিলসহ মোট ১০টি জলাশয়ের অস্তিত্ব জানা গেলেও বাকিসব অনুসন্ধানে কোনো তথ্যাদি পাওয়া যায়নি। কোটচাঁদপুরের ১০টি জলমহালের মধ্যে অন্যতম জয়দিয়া বাওড়ের বর্তমান পরিস্থিতি, জেলেদের দাবিদাওয়া, আন্দোলনের ন্যায্যতা সম্পর্কে সংগঠকের বয়ানে যথাযথ কর্তৃপক্ষ ও দেশবাসীকে অবহিত করতে আলোচনাটির গুরুত্বপূর্ণ আবেদন রয়েছে। ২০২৩ সালে বাওড়ে চালু মৎস্য নীতির ফলে জয়দিয়া বাওড় পাড়ের হালদার সম্প্রদায়ের জীবিকার্জনের পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। এখানে ৫ শতাধিক মৎস্যজীবী পরিবারভুক্ত ৫ হাজারের অধিক সদস্যের জীবনকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধান বাওড়গুলো মধ্যে জয়দিয়া বাওড় উল্লেখযোগ্য জলাকার। বিশ্বব্যাপী নিও-লিবারেলিজম অর্থনীতির দর্শনে চালিত বাণিজ্যিক কৃষি আর বাণিজ্যিক মৎস্যচাষের বিস্তার প্রবলভাবে খণ্ডবিখণ্ড করেছে জয়দিয়া বাওড়ের প্রাণ-প্রকৃতি ও বাস্তুতন্ত্র। এমনকি এর সঙ্গে হারিয়ে গেছে বাওড়পাড়ের জেলেজীবনের বহু লোকজ্ঞান, কৃত্য-রীতি এবং লোকায়ত ব্যবস্থাপনাগত দর্শন। এই জলাশয়গুলো আমাদের প্রাকৃতিক মৎস্য-সম্পদের সিংহভাগের উৎস এবং নানা ধরনের জলজ সবজি ও পাখির আবাসস্থল। তাছাড়াও শীত মৌসুমে উত্তর গোলার্ধ থেকে আগত অতিথি পাখিদের নির্ভরযোগ্য আশ্রয়ের ইতিহাস এখন অতীত। সর্বগ্রাসী মুনাফা আর লোভের কারণে হারিয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদ, অনিরাপদ পাখির আবাসস্থল, দেশজ মাছ এবং গ্রামীণ জনগণের খাদ্যের উৎস কচু, শাপলা, কলমী জাতীয় জলজ সবজির বিলুপ্তি ঘটছে। অতিথি পাখিদের আনাগোনা আগের মতো নেই, অনেকাংশে কমে গেছে। বাওড়ের অধিকার ফিরে পেতে সর্বমহলে আবেদন, নিবেদন, সভা, সমাবেশ, মিছিল, মানববন্ধনসহ নানাবিধ আন্দোলন কর্মসূচির মাধ্যমে গণঅবস্থান করেছেন জয়দিয়া হালদার পাড়ার বাসিন্দারা। জয়াদিয়া বাওড় পাড় থেকে কোটচাঁদপুর, জেলা শহর ঝিনাইদহ এবং রাজধানী ঢাকায় জেলেজীবন সুরক্ষা আন্দোলনে সমবেত হলেও দৃষ্টিগোচরে আসেনা। বেঁচের থাকার আজন্মকালের অবলম্বন বাওড়ের ওপর নিরঙ্কুশ প্রথাগত স্বত্বাধিকারী জেলে সম্প্রদায়ের দাবিকে কর্ণপাত করা হয় না। ২০২৩ সালের ১৩ এপ্রিল জয়দিয়া বাওড়ের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। সে প্রেক্ষিতে বিগত ২০২৩ সালের ১৪ এপ্রিল বাওড় থেকে উচ্ছেদের শিকার জেলে সম্প্রদায়। এ ঘটনায় বিপাকে পতিত বাওড় পাড়ের হালদার সম্প্রদায়ের মানুষেরা এই সরকারি সিদ্ধান্তকে বাতিলে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। জয়দিয়া বাওড় পাড়ের ৫ সহস্রাধিক নারী-পুরুষ বাওড় তীরেই কর্মসংস্থানের দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রামের সূচনা ঘটায়। আন্দোলনকারী জয়দিয়া সুফলভোগী সমিতির সদস্য রসিক হালদার দৃঢ়ভাবে জানান, ‘বাওড় পাড়ে ৫ শতাধিক মৎসজীবী সম্প্রদায়ের ঘর-বসতি আছে। শতাব্দি কাল ধরে বংশপরম্পরায় বাপ-দাদার আমল থেকে এ বাওড়ে কাজ করে তাদের জীবন-জীবিকা চলছিল। একটা প্রভাবশালী মহল বাওড় ইজারা নিয়েছেন।’ জয়দিয়া গ্রামের জেলেপাড়ায় সাক্ষাতে জগবন্ধু হালদার, প্রশান্ত হালদার, সন্তোষ হালদার, কার্তিক হালদার, শ্রীদাম হালদার, মাধব হালদার, পদ্ম রাণী হালদার, শংকরী হালদার, অনিমা রাণী হালদার, পুষ্প রাণী হালদার, যমুনা হালদার, কালু হালদার, জগন্নাথ হালদার প্রমুখ বলেন, ‘বাপ-দাদার আমল থেকে এ বাওড়ে কাজ করে আসছি। এখন বাওড় ইজারা দেওয়ায় তা হাতছাড়া হয়ে গেছে। বাওড় হারিয়ে আমরা কর্মহীন হয়ে পড়েছি। দ্রুত বাওড়ের ইজারা বাতিলের দাবি জানাই। একইসাথে বাওড় ফিরে পেতে চাই।’ বংশপরম্পরায় শ্রীরাম হালদারের বাবা মুরারী হালদার ও তার বাবা রায়চরণ হালদারও বাওড়ের জীবিকার্জনে উদরপূর্তি করেছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম একই পেশায় থাকা শ্রীরাম বলছিলেন, মৎস্যজীবী হালদার সম্প্রদায় শেষতক জেলাপ্রশাসকের সঙ্গে দেখা করে বলে এসেছে ‘হয় বিষ দ্যান না হয় বাওড়ের মালিকানা দ্যান।’ বাপ-দাদার থেকে প্রাপ্ত কর্মক্ষেত্র জয়দিয়া বাওড় ফিরে না পাওয়া গেলে স্বেচ্ছায় আত্মহুতির কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবেন বলেও জানান এ মৎস্যজীবী সম্প্রদায়। তাদের ভাষ্য, ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমল থেকে তারা বাওড়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। সবগুলো জেলে পরিবার বাওড়ের আয়ের উপর নির্ভরশীল। অনেকে জীবনসায়াহ্নে এসে তাদের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন বাওড়ের মালিকানা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। তথ্য সূত্রে, জেলা প্রশাসন টেন্ডারের মাধ্যমে বাওড়গুলো ইজারা দিচ্ছে। ফলে কর্ম হারিয়ে কখনো আধপেটা আবার অনাহারে প্রহর গুণছেন বাওড়পাড়ের হাজারো মৎস্যজীবী পরিবার। কান্নায় ভেঙে পড়া শুধু লালন হালদার নয়, তার মতো বাওড় পাড়ের গ্রামগুলোতে জেলাপাড়ার পরিবারের উনুনে অন্নের সংস্থান হয়না। জয়দিয়া বাওড়ের উপর নির্ভরশীল প্রায় পাঁচ সহস্রাধিক মানুষের মাঝে নেমে এসেছে চরম হতাশা। মৎস্যজীবীরা জানান, ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ঝিনাইদহের সব জলাশয়-বাওড় ইজারার আওতায় চলে গেছে। মৎস্যজীবীরা সরকারের ‘জাল যার জলা তার’ এই নীতির ওপর ভর করে সেই ১৯৭৯ সাল থেকে বাওড়ে মাছ ধরে আসছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধ পূর্বাপর তথা সুপ্রাচীন আমল থেকে জয়দিয়া বাওড় জনপদের জেলে জনজাতি এখানে জীবিকায়নের মাধ্যমে দিনানিপাত করে চলছিল। বাওড়গুলো ইজারা দিয়ে সরকার এককালীন টাকা পাচ্ছে, কিন্তু হালদার পরিবারগুলো কোথায় যাবে? এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আড়ালে লুটপাট ও কমিশন বাণিজ্যে নিশ্চয় মৎস্যচাষীর কোন লাভ হবেনা। জয়াদিয়া বাওড়ের মৎস্যজীবী কৃষক ও ক্ষেতমজুর শ্রেণির মানুষের জন্য ইজারা হল কর্মসংস্থান থেকে ছাঁটাই এবং কাঠামোবদ্ধ হত্যাকাণ্ডের নামান্তর। ভালো নেই হালদার সম্প্রদায়, জয়দিয়া বাওড়ের ওপর নির্ভরশীল পাশ্ববর্তী কয়েকগ্রামের হাজার-হাজার জেলে পরিবার মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। এ অবস্থার অবসানে বিকল্প কোন ব্যবস্থা এবং পুনর্বাসনের বিষয়টি নিয়ে আর কতটা মানবিক বিপর্যয় ঘটলে দায়িত্বশীলদের সদ্ভাবনা জাগ্রত হবে? যশোর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া ও ফরিদপুর জেলাকে দেশের বাওড় অঞ্চল বলা হয়। ঝিনাইদহ ও যশোরের ৬টি বাওড় পাড়ের জেলে সম্প্রদায় কোনপ্রকার আর ভালো নেই। তাদের ভালো থাকার একমাত্র সম্বল বাওড়। সেটা বিগত ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে ভূমি মন্ত্রণালয় কেড়ে নিয়ে ইজারা দিয়েছে। যে কারণে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে বেকারত্বের দূর্দশায় ভুগছে। তাদের মধ্যে কোটচাঁদপুরের জয়দিয়া বাওড়ের বাসিন্দাদের আর্থিক দূর্গতির সীমা নেই। তাদের নেই একখণ্ড আবাদি জমি ও ভিন্ন পন্থায় উপার্জনের কোন সুযোগ। ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরের বলুহর ও জয়দিয়া, মহেশপুরের কাঠগড়া ও ফতেপুর, কালীগঞ্জের মরজাত এবং যশোরের চৌগাছা উপজেলার বেড়গোবিন্দপুর বাওড়ে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সাথে মৎস্য অধিদপ্তরের চুক্তির মাধ্যমে ১৯৭৯ সাল থেকে মৎস্য উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে মাছ চাষ শুরু হয়। তখন থেকে বাওড়ে জেলে সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যগত আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার খর্বের ধারা চল হয়। তারপরেও এখানে মোটাদাগে সুবিধাভোগীরা ছিলেন বাওড় পাড়ের জেলেরা। ১৯৮৬ সাল থেকে বাওড়গুলি রাজস্ব খাতে পরিচালিত হয়। এর মধ্যে আরও কয়েক দফা চুক্তি বৃদ্ধি করে ভূমি মন্ত্রণালয়। ইজারা দেয়া বাওড়ে উৎপাদিত মাছের ৩৫ শতাংশ পেতো মৎস্য অধিদপ্তর, ২৫ শতাংশ ভূমি মন্ত্রণালয় এবং জেলে সম্প্রদায় পেতো ৪০ শতাংশ। প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত রাণি মাছের একশ’ ভাগই পেতো বাওড় পাড়ের জেলেরা। ভূমি মন্ত্রণালয়ের সাথে মৎস্য মন্ত্রণালয়ের চুক্তির মেয়াদ পরে আর ভূমি মন্ত্রণালয় চুক্তি বৃদ্ধি না করে আগের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে এই ছয়টি বাওড় ইজারা প্রক্রিয়া শুরু করে। ২০২৩ সালের এপ্রিলে ইজারাদারদের বাওড় বুঝিয়ে দেয়া হয়। জলমহল ইজারা প্রদানের জন্য বিজ্ঞপ্তিতে নিবন্ধনকৃত ও প্রকৃত মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির আবেদনের কথা বলা হলেও এখানে একাধিক মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির বিরুদ্ধে আর্থিক সুবিধা নিয়ে মৎস্যজীবী নয় এমন ব্যক্তিদের বাওড় ইজারা পাইয়ে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি ইজারাদাররা বাওড়গুলিতে কৃত্রিম উপায়ে মাছ উৎপাদন করায় জীববৈচিত্র্য ও দেশি জাতের মাছ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে। যশোর বিল-বাওড়-মৎস্য উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় এ বাওড়গুলো ৪২ বছর ছিল। সে সময় বাওড় পাড়ের জেলেদের আর্থসামাজিক মান উন্নয়নে কাজ করে গেছে প্রকল্পটি। বাওড়গুলো ভূমি মন্ত্রণালয় ইজারা দিয়ে দিয়েছে। যে কারণে বাওড়পাড়ের জেলেরা বেকার হয়েছে, বাওড় সংশ্লিষ্ট ১৩০ থেকে ১৪০ জন দৈনিক মুজুরি ভিত্তিক কর্মীও বেকার হয়ে গেছে। বর্তমানে এ বাওড় কেন্দ্রিক জনজীবন সম্পূর্ণ বেকার ও অন্যকোন কাজও নেই। বাওড়জুড়ে শোকের দীর্ঘ কালো ছায়া আর নিরন্ন জেলে পরিবারে ক্ষুধায় যন্ত্রণাকাতর অবুঝ শিশুদের কান্নার আওয়াজ থামানোর ব্যর্থ চেষ্টা, এ যেন ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ বা ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসের জীবন্ত চরিত্র- জয়দিয়ার জীবনকাহিনী। পূর্বে বাওড় গুলিতে মাছ চাষ করা হতো মৎস্য অধিদপ্তর কর্তৃক কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন প্রজাতির মাছের সাইজ ও সংখ্যা বিবেচনা করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে। মাছ ধরার সময়ও নির্ধারণ করা থাকতো, ছোট মাছ ধরা হতোনা। একইসাথে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করার জন্য তথা বিলুপ্ত প্রায় মাছ সংরক্ষণ ও প্রজনন বৃদ্ধির জন্য অভয়াশ্রম করা হতো। সেই সাথে প্রজননকালীন সময় মাছ ধরা বন্ধ রাখা হতো। ফলে একদিকে বিপন্ন প্রজাতির মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পেতো, অন্যদিকে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষিত হতো। বর্তমান ইজারাদারা এ বিষয়ে যত্মশীল না হয়ে অধিক মুনাফার জন্য কৃত্রিম উপায়ে মাছ চাষ করছেন। যখন তখন মাছ ছাড়ছেন এবং ধরছেন। যে কারণে দেশি মাছ ও জীববৈচিত্র্য বাওড়গুলি থেকে একেবারে ধ্বংস হতে বসেছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, ‘কোটচাঁদপুরে বাওড় সংলগ্ন সরকারি মৎস্য হ্যাচারি কমপ্লেক্সসহ বাওড়গুলো আশপাশে আবাদী জমির পানি স্যালো পাম্পের মাধ্যমে বাওড় থেকে নেয়া হতো। ইজারাদাররা এই পানি বাওড় থেকে নেয়া বন্ধ করতে বিভিন্ন ফন্দি ফিকিরি করছেন।’ একাধিক আবাদী জমির মালিক আশংকা প্রকাশ করে বলেছেন, বাওড় থেকে পানি নেয়া বন্ধ করে দিলে একদিকে যেমন শ’শ’ একর জমি চাষ বাধাগ্রস্ত হবে, অন্যদিকে সরকারি মৎস্য হ্যাচারি কমপ্লেক্সও পড়বে পানি সংকটে।’ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববাংকের অর্থায়নে মৎস্য অধিদপ্তর, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে বাওড় মৎস্য উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় চাষ শুরু করেন। বিগত ২০২৩ খ্রিস্টাব্দের ১৩ এপ্রিল সেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। এ অবস্থায় মৎস্য অধিদপ্তর ওই চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেন। এদিকে মেয়াদ পূর্তির আগেই বাওড় ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেন সংশ্লিষ্টরা। যা ইতোমধ্যে সম্পন্নও হয়েছে। একারণ বাওড় পাড়ের হালদার সম্প্রদায়ের মানুষেরা পড়েছেন বিপাকে। সেই থেকে বাওড় ফিরে পেতে বাওড় পাড়ের যুবক লালন হালদার বলেন, ‘কিছু কুচক্রী মানুষ, সমাজের প্রভাশালীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে বাওড় নিয়ে টালবাহানা শুরু করেছেন। এ বাওড় আমাদের মা। আর মাকে রক্ষা করতে আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাবো।’ জয়দিয়া বাওড় বিষয়ে কোটচাঁদপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার জনাব উছেন মে বলেন, ‘ল্যান্ডমিনিস্ট্রি থেকে ইজারার বিষয়টা এসছে- ওটা ডিসি অফিস দেখবে। আমরা লোকাল অথরিটি এখানে আমাদের কিছু করার নেই। আমাদের দায়িত্ব ছিল বুঝিয়ে দেওয়ার, আমরা বুঝিয়ে দিয়েছি।’ এক সময় স্লোগান ছিল ‘জাল যার জলা তার’। এখন জেলে সম্প্রদায়ের জাল থাকলেও জলা নেই। জেলার বাওড়গুলো মৎস্যজীবীরা দখল হারিয়েছেন। বিগত ২০২৩-এর এপ্রিল মাসে ভূমি মন্ত্রাণালয় বাওড়গুলো কেড়ে নিয়ে ইজারা দিয়েছে। ফলে ঝিনাইদহ ও যশোরের ৬টি বাওড় অমৎস্যজীবীদের দখলে চলে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছে জেলে সম্প্রদায়। প্রায় ৩০ হাজার জেলে পরিবার কর্ম হারিয়ে বেকারত্বের দূর্ভোগ পোহাচ্ছে। অথচ তাদের ভালো থাকার একমাত্র সম্বল ছিল এই বাওড়। এদিকে বাওড়গুলো ইজারা প্রদান করায় কৃত্তিম উপায়ে মাছ উৎপাদনের ফলে জীববৈচিত্র্য ও দেশীয় প্রজাতির মাছ ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে পৌঁছেছে। ‘জাল যার জলা তার’ নীতি প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় জয়দিয়াসহ প্রায় সকল বাওড়েই প্রবেশাধিকার হারিয়েছেন বাওড়পাড়ের জেলেরা। ক্ষমতার গণিত আর ইজারাপ্রথার প্রবলপ্রতাপে ছয়টি বাওড়ের হাজার-হাজার মানুষ আজ দিশেহারা। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যমতে, দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে একতরফাভাবে জয়দিয়া বাওড় নিজেদের মতো ভোগদখল করে সরকারি রাজস্ব লোকসান করছে দখলকারীরা। দখলকারীদের দুর্নীতি ও লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ায় ভূমি মন্ত্রণালয় জয়দিয়া বাওড়টি মৎস্য বিভাগের কাছে নবায়ন না করে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ইজারা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০২৩ সালে হালদার সম্প্রদায়ের আন্দোলনের বার্তা ক্ষমতাসীনদের নজরে পড়েনি, সহায়সম্বলহীন অনাহারী জেলেদের জীবনে নানান নির্যাতন-নিপীড়ন চালিয়ে মূক ও বধির বানিয়ে রাখার অপচেষ্টা চলছে। সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক দেউলিয়া হয়ে পড়া বাওড়ের মানুষদের পুনর্বাসনের জন্য কোনো রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ বা প্রণোদনা নেই। সীমাহীন অভাব ও চরম কষ্টে থাকা জয়দিয়ার আদিবাসিন্দা হালদার জনগোষ্ঠীর দুর্দিন যেন পিছু ছাড়ে না। বিভিন্ন এনজিও, সংস্থা ও মাধ্যমের ঋণের বোঝায় জর্জরিত জয়দিয়া বাওড়ের বাসিন্দারা পৈতৃক ভিটামাটি বন্ধকী ও বিক্রয় করতে বাধ্য হচ্ছে। অনেকে দেশত্যাগের কথাও ভাবছেন। সংসারের বেহাল দশা ও দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে দিনাতিপাত করা জেলেজীবনের শোষণমুক্তির অন্বেষা কোন পথে? লেখক : সংগঠক

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..