হামে শিশুদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একতা ডেস্ক : [দেশে চলমান হামের পরিস্থিতিকে ‘মহামারি’ হিসেবে ঘোষণা করে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস প্ল্যাটফর্ম ফর পিপলস হেলথ (ডিপিপিএইচ)। সম্প্রতি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে (ডিআরইউ) ‘হামে শিশুমৃত্যু: জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে করণীয়’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ সম্মেলনে পঠিত বক্তব্য পাঠকদের জন্য দেওয়া হলো। ] এ বছরের ১৫ মার্চ থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে যে ২৬৪ জন শিশু হামে মৃত্যুবরণ করেছে, তাদের মধ্যে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছে ৪৭ জন; বাকিরা হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। এ সময়ে হামে আক্রান্ত হয়েছে ও এখনও ভুগছে ৩৫,০০০-এরও বেশি মানুষ, হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে প্রায় ২৪,০০০ জন। এছাড়া সারা দেশে ৪,৮৫৬ জন শিশুর মধ্যে হাম নিশ্চিত করা হয়েছে। এসব তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে প্রাপ্ত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডঐঙ) ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, হাম পৃথিবীর অন্যতম সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যার R. (basic reproduction number) ১২-১৮; অর্থাৎ একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। বাংলাদেশে এই সংক্রমণ হার আরও দ্রুত বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে, বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ নগর ও প্রান্তিক এলাকায়। চিকিৎসকদের মতে, হামে সব বয়সের মানুষ আক্রান্ত হতে পারে; তবে শিশুদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। বয়স বাড়ার সাথে সাথে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পেলেও অপুষ্টি, ভিটামিন ‘এ’-এর অভাব এবং অসম্পূর্ণ টিকাদান শিশুদের মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলে। হামের র্যাশ দেখা দেওয়ার চার দিন আগ থেকেই সংক্রমণ ছড়াতে শুরু করে, ফলে একটি আক্রান্ত শিশু পুরো কমিউনিটিতে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারে। হামের জটিলতা অত্যন্ত ভয়াবহ নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অন্ধত্ব, এমনকি মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) পর্যন্ত হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, হাম সংক্রমণের পর শিশুদের শরীরের পূর্ববর্তী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে যাকে ‘immune amnesia’ বলা হয়-ফলে তারা অন্যান্য সংক্রমণের প্রতিও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়; এটি একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকট, যা আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা এবং টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতিকে উন্মোচিত করেছে। জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি (ঊচও) একসময় বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সাফল্যের প্রতীক হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিকার কভারেজ ৯৫% থেকে কিছু ক্ষেত্রে ৮০%-এর নিচে নেমে এসেছে যা হামের মতো রোগের পুনরুত্থানের জন্য যথেষ্ট। যা আরও উদ্বেগজনক, তা হলো হামের ভাইরাস এখন এমন শিশুদেরও সংক্রমিত করছে যারা পূর্বে টিকা নিয়েছে, এবং ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদেরও আক্রান্ত করছে। এটি ‘herd immunity’ ভেঙে পড়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত। এই পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ- টিকা সংগ্রহে গাফিলতি, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, টিকা নিয়ে গুজব ও ভুল ধারণা, এবং সর্বোপরি জনস্বাস্থ্যের প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা। এর ফলে একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ আজ মহামারির রূপ নিয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় অবিলম্বে সমন্বিত ও জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, সারাদেশে জরুরি ভিত্তিতে গণটিকাদান কর্মসূচি চালু করতে হবে। কোনো শিশুই যেন টিকার বাইরে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে ঘনবসতি, দুর্গম অঞ্চল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে উপজেলা থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। দরিদ্র পরিবারগুলোকে সামাজিক সুরক্ষা দিতে হবে, যাতে চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে তারা নিঃস্ব না হয়ে পড়ে। বর্তমানে দেখা যায়, প্রান্তিক পরিবারের শিশুরা প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা পায় না। জটিল অবস্থায় তারা সর্বস্ব বিক্রি করে ঢাকামুখী হয়। এই প্রবণতা বন্ধ করতে হলে চিকিৎসা ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে। তৃতীয়ত, মহানগরীতে স্বাস্থ্যসেবার স্তরভিত্তিক পুনর্গঠন করতে হবে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও তৃতীয় পর্যায়ের চিকিৎসা একই হাসপাতালে দেওয়ার বিশৃঙ্খল ব্যবস্থা বন্ধ করতে হবে। এতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে এবং জটিল রোগীর চাপও কমবে। চতুর্থত, প্রতিটি হাসপাতালে ‘হাম কর্নার’ বা সংক্রামক রোগ ইউনিট চালু করতে হবে এবং পর্যাপ্ত ওষুধ ও ভিটামিন ‘এ’ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। বিভাগীয় শিশু হাসপাতালগুলো দ্রুত পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা অপরিহার্য। পঞ্চমত, টিকা নিয়ে গুজব ও ভুল ধারণা দূর করতে গণমাধ্যম, ধর্মীয় নেতা ও সামাজিক নেতৃত্বকে সম্পৃক্ত করে ব্যাপক জনসচেতনতা কার্যক্রম চালাতে হবে। ষষ্ঠত, ‘হাম নির্মূল কৌশলপত্র’ পুনরায় সক্রিয় করে একটি শক্তিশালী রোগ নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে এবং প্রয়োজন হলে জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে হবে। ভবিষ্যতের জন্য ‘Standing Order on Public Health Emergency’ প্রণয়ন জরুরি। সবশেষে, ভ্যাকসিন সরবরাহ চেইন শক্তিশালী করা এবং দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথ (IPH)-এর ভ্যাকসিন উৎপাদন পুনরুজ্জীবিত করা এখন সময়ের দাবি। শেষ কথা এই সংকট আমাদের জন্য একটি কঠিন সতর্কবার্তা। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। প্রতিটি শিশুমৃত্যু শুধু একটি পরিসংখ্যান নয় এটি আমাদের সমষ্টিগত ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর আহ্বান জানাই এই সংকটকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিন। পাশাপাশি অভিভাবক, সমাজের নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি এবং গণমাধ্যম সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে, যাতে প্রতিরোধযোগ্য এই রোগে আর কোনো শিশুকে প্রাণ হারাতে না হয়।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..