বিপ্লবীধারার নারী সংগঠন, বাস্তবতা এবং করণীয়

সুতপা বেদজ্ঞ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
বর্তমান সময়ে পুঁজিবাদী শাসকশ্রেণি তাদের শোষণের হাতিয়ার হিসেবে গোটা সমাজকে নানা শ্রেণিতে বিভক্ত করে ফেলেছে। একই সাথে পুঁজিবাদ গড়ে তুলেছে পুরুষ-আধিপত্যের সংস্কৃতি। তাই আজকের পুরুষ আধিপত্যের সমাজ ও সংস্কৃতির মধ্যে নারীমুক্তি আন্দোলনকে বিশেষভাবে দেখা প্রয়োজন। শ্রেণিবিভক্ত সমাজে একেক শ্রেণি একেকভাবে শোষিত হলেও নারীদের শোষণ ও বঞ্চনার মাত্রা বরাবরই কিছুটা ভিন্ন। সমাজ কাঠামোয় আজ পর্যন্ত নানা ধরনের পরিবর্তন আসা সত্ত্বেও নারীদের সম্পর্কে সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গির তেমন কোনো পরিবর্তন এখনো সমাজে দৃশ্যমান নয়। প্রতিমুহুর্তে ঘরে বাইরে নারীরা আতংক ও নিরাপত্তহীনতার মধ্যে বসবাস করছে। যে সকল নারীরা বাইরে কাজ করছেন তাদের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা কিছুটা নিশ্চিত হলেও চলাফেরা সমাজে একাকী বসবাসের স্বাধীনতা বা সম্পত্তিতে সমান অধিকার অর্জিত হয়নি। কেবল তাই-ই নয় এদেশের প্রতিটি নারী এখন পর্যন্ত প্রতিমুহূর্তে শারিরীক ও মানসিক নির্যাতন ও নিপীড়নের ঝুঁকিতে দিন যাপন করছেন। এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির নেতিবাচক প্রভাব গোটা সমাজে বিদ্যমান। ভাবনার বিষয় হলো এই নারীরা এখন পর্যন্ত তাদের এ অবস্থাকে ভাগ্যের লিখন বা স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে মেনে নিতেই অভ্যস্ত। এ বাস্তবতায় নারীদের রাজনীতি সচেতন করা, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ করার শিক্ষা এবং সর্বক্ষেত্রে পুরুষের সমান অধিকারের আকাঙ্খা জাগিয়ে তোলা কোনো সহজ কাজ নয়। প্রয়োজন আলাদা ও বিশেষ যত্ন, প্রয়োজন বিপ্লবী ধারার উপযুক্ত নারী সংগঠন। নারীমুক্তি প্রশ্নে আমাদের দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা হচ্ছে নারীর সমান অধিকার, নারীর মর্যাদা, নারীর ক্ষমতায়ন, নারীবান্ধব রাজনীতি, নারীবান্ধব কর্মসূচি, রাজনীতিতে নারীর প্রাসঙ্গিকতা এরূপ নানা গালভরা কথা এদেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে এবং সুশীল নামক জনগোষ্ঠীর মুখে প্রায়শই শোনা যায়। রাজনীতির ক্ষেত্রে বুর্জোয়া ও মধ্যপন্থী ধারার রাজনৈতিক দলগুলোতে নারীদের উপস্থিতি থাকলেও এই দলগুলো পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা বহন করার কারণে এখানে নারীরা কেবল ব্যবহৃত হয়, মর্যাদা ও সমানাধিকারের প্রশ্নে দলগুলো নিশ্চুপ থাকে বা এড়িয়ে যায়। অন্যদিকে ধর্মভিত্তিক দলগুলো নারীর সমানাধিকারে বিশ্বাস করে না। এরা পশ্চাৎমুখি। নারীর সমানাধিকারের প্রশ্নটি কেবলমাত্র বামপন্থি রাজনীতিতেই বাধাহীনভাবে উচ্চারিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু রাজনীতিতে এবং প্রচার-প্রপাগাণ্ডায় প্রান্তিক অবস্থানে থাকার কারণে ‘বামপন্থিরা নারীর সমঅধিকারের পক্ষে’ এই বার্তাটি আজো পর্যন্ত বাংলাদেশের নারীদের কাছে পৌঁছানো যায়নি। স্বাধীনতার পর পর প্রগতিশীল নারীদের নিয়ে বামপন্থি ও গণতন্ত্রীদের উদ্যোগে গঠিত হয়েছিল নারীদের গণসংঠন ‘বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ’। এটি সিপিবির নারী গণসংগঠন হিসেবেই পরিচিত ছিল। প্রথম থেকেই বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কমিটিতে শ্রমজীবী নারীদের অংশগ্রহণ ছিল না বললেই চলে। তারা নারী মুক্তির কথা বললেও কোনো নির্দিষ্ট আদর্শের কথা প্রচার করতো না বা শ্রমজীবী নারীদের নির্দিষ্ট আদর্শের শিক্ষা দিয়ে প্রগতিশীল রাজনীতিতে টেনে আনার চেষ্টা করা হতো না। তা সত্ত্বেও মহিলা পরিষদ নারীদের এগিয়ে নিতে সরকারের সাথে বেশ কিছু প্রশ্নে দেন দরবার করেছে। সন্তানের বাবার নামের সাথে সাথে মায়ের নামের ব্যবহার বিষয়টি মহিলা পরিষদ দাবি আকারে উত্থাপন করেছিল এবং সরকার তা মেনে আইন করেছিল। ‘ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড বা অভিন্ন পারিবারিক আইন’ বিষয়ে আন্দোলন মহিলা পরিষদের একটি অন্যতম কাজ ছিল (যদিও তা অর্জিত হয়নি)। মহিলা পরিষদ গত প্রায় তিন দশক ধরে বিদেশি অর্থায়ন গ্রহণের মধ্যদিয়ে প্রকল্পভিত্তিক কাজের মধ্যে সংগঠনটি নিজেদের সীমিত করে ফেলে। বর্তমানে নারীদের পক্ষে কিছু দাবি দাওয়া উত্থাপন, ইস্যুভিত্তিক কিছু আন্দোলন এবং দরিদ্র-সুবিধাবঞ্চিত নারীদের সহযোগিতার সংগঠন হিসেবে এখনো টিকে আছে। কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শ চর্চা না থাকায় বর্তমানে এটি সুবিধাভোগী সিভিল নারীদের কেন্দ্র বললেও বোধকরি ভুল হবে না। ফলে প্রগতিশীল নারী আন্দোলন রাজনীতিতে প্রগতিশীল নারীদের আগমন, শ্রমজীবী নারীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে একটি শূণ্যতা তৈরি হয়। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির দ্বাদশ কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় কমিটির রিপোর্টে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সম্পর্কে বলা হয়েছিল- ‘এই নারী গণসংগঠন দেশের সর্ববৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী নারী সংগঠন হলেও, লড়াকু গণসংগঠনটি এখন এনজিওতে পরিণত হয়েছে। নারীমুক্তির লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে সংগঠনটি মূলত প্রকল্পভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রতিক্রিয়াকেন্দ্রিক কিছু কর্মসূচি পালন ছাড়া এই সংগঠনের পক্ষে আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব নয়। সাংগঠনিক ও রাজনৈতিকভাবে কমিউনিস্ট বিরোধিতা আছে। প্রতিকূল অবস্থায় পার্টির কমরেডদের এই গণসংগঠনে কাজ করতে হচ্ছে। সংগঠনকে আন্দোলনের ধারায় ফিরিয়ে আনার বিষয়ে গণসংগঠনে কর্মরত কমরেডদের প্রচেষ্টা সফল হয়নি এবং এক্ষেত্রে অবস্থার বরং আরও অবনতি ঘটে চলেছে। সংগঠনটিকে প্রগতিশীল আন্দোলনের ঐতিহ্যের ধারায় ফিরিয়ে আনা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। নারী গণসংগঠনের ক্ষেত্রে আমাদের নতুন পদক্ষেপ নিতে হবে। নারী মুক্তি যে মানবমুক্তি– এই উপলব্ধি ও ভিত্তিকে অবলম্বন করে নতুন নারী গণসংগঠন গড়ে তোলার কাজ শুরু করার এখন সময় এসেছে। এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ ও প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।’ কিন্তু তখনকার কেন্দ্রীয় কমিটি এটা বাস্তবায়ন করেনি। ত্রয়োদশ কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় কমিটির রিপোর্টে এজন্য বলা হয়েছে- ‘বিগত দুটি কংগ্রেসে বিপ্লবী ধারায় নারী আন্দোলন গড়ে তোলাসহ নারীদের মধ্যে পার্টির কাজকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য বিপ্লবী ধারার নারী গণসংগঠন গড়ে তোলার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও এবং পার্টির সর্বস্তরের কমরেডদের ঐক্যমত্য থাকা সত্ত্বেও নারী সংগঠন গড়ে তোলা যায়নি। নারী ইস্যুতে নারী সেলের মাধ্যমে আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তোলা তো দূরের কথা, সারা দেশে নারী সেলই গঠন করা সম্ভব হয়নি। এ সময়ে নারী সাব ও নারী সেল একীভূত হয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছে। নারীদের নিয়ে গণসংগঠনের সমস্যার কারণে নারী গণসংগঠনের বিকল্প হিসেবে কখনও নারী সেল এককভাবে, কখনও বাসদ-এর নারী সংগঠনের সঙ্গে যৌথভাবে কর্মসূচি পালন করেছে। নারী গণসংগঠনে কর্মরত কমরেডদের সঙ্গে বিপ্লবী ধারার নারী সংগঠন গড়ে তোলার বিষয়ে ফ্যাকশন সভা করা হয়। ........ সবশেষে বলা আছে বিপ্লবী ধারার নারী সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। সুতরাং এখন কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা অনুসরণ করে আমাদের একটি বিপ্লবী ধারার নারী সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে, কী হবে সেই বিপ্লবী ধারার নারী সংগঠনের রূপ? কবে ও কীভাবে তা আত্মপ্রকাশ করবে? কী হবে তার ঘোষণা-কর্মসূচি ও গঠনতন্ত্র? কমরেড মহামতি লেনিন বিপ্লবী ধারার নারী সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গে বলেছিলেন- ‘আমি সর্বহারা নারীদের কথাই শুধু ভাবছি না, কারখানাতেই কাজ করুক অথবা বাড়িতেই কাজ করুক, সব নারীদের কথাই ভাবছি। গরিব কৃষক নারী, মধ্যবিত্ত নারী, তারাও তো পুঁজিবাদের শিকার...। এইসব নারীদের অরাজনৈতিক অবস্থান, সামাজিক পশ্চাদপদ মানসিকতা, ধর্মীয় কুসংস্কারে আবদ্ধ থাকা, তাদের কর্মক্ষেত্রের বিচ্ছিন্ন পরিধি, তাদের জীবনের সমস্ত ধরনধারণ এই সবগুলিরই বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণ প্রয়োজন। ...তাদের মধ্যে কাজ চালিয়ে যাবার জন্য প্রয়োজন উপযোগী সংগঠন, বিশেষ ধরনের প্রচার পদ্ধতি এবং সংগঠনের স্বতন্ত্র ধরন, তার নাম নারীবাদ নয়– এ হলো কার্যকরী বাস্তব বৈপ্লবিক প্রয়োজন।’ লেনিন কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে বিপ্লবী ধারার নারী সংগঠন গড়ে তুলে নারীদের শ্রেণি সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করে তোলার কথা বার বার তুলে ধরেছেন। লেনিন বলছেন- ‘যখন কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে শ্রমজীবী নারীদের গণআন্দোলন সৃষ্টি করবার কাজ পড়ে রয়েছে তখন আলস্যে সময় কাটানো কমিউনিস্টদের কাজ নয়।... এ রকম একটা গণআন্দোলন গড়ে তোলা ও তার ব্যবস্থা করা সমগ্র পার্টির কাজেরই একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ, বাস্তবিকই, পার্টির সাধারণ কাজের অর্ধেক। একটি শক্তিশালী স্বচ্ছ কমিউনিস্ট নারী আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা ও মূল্য সম্বন্ধে সাময়িক স্বীকৃতি, কেবলমাত্র নিষ্পৃহ ও মৌখিক স্বীকৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এর প্রতি সদা সর্বদা দৃষ্টি ও দায়িত্ববোধের পরিচয় দিতে হবে।’ কমরেড লেনিনের সাথে সহমত পোষণ করে ক্লারা বলছেন- নারীদের মধ্যে প্রচার আন্দোলনের কাজ, তাদের সচেতন ও বিপ্লবী করে তোলা শুধুমাত্র যেন নারী কমরেডদের ব্যাপারই না হয়। কারণ অনেক পুরুষ কমরেডও দুর্ভাগ্যবশত নারীদের সম্পর্কে সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। তাদের মধ্যে কাজ করে পুরাতন প্রভূত্বের ধারণা।’ নারীদের গণআন্দোলনে যুক্ত করা প্রসঙ্গে কমরেড লেনিন বলছেন- ‘গ্রাম-শহরের হাজার হাজার শ্রমজীবী নারীদের আমাদের দিকে জয় করে আনতেই হবে।... নারীদের ছাড়া সত্যিকারের কোনো ধরনের গণআন্দোলন হতে পারে না।’ বিপ্লবীধারার নারী সংগঠন পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রথমেই আমাদের এ সত্যটির প্রতি সহমত পোষণ করতে হবে। তাহলে এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেমন হবে সেই উপযোগী সংগঠন, কেমন হবে সংগঠনের স্বতন্ত্র ধরন? লেনিনের ধারণা অনুযায়ি বিপ্লবী ধারার নারী সংগঠন মানে– প্রথমত, এমন একটি নারী সংগঠন যা শ্রেণি সংগ্রামের অংশ; দ্বিতীয়ত নারী সংগঠনটি কমিউনিস্ট রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকবে; তৃতীয়ত এটা প্রথাগত গণসংগঠন হবে না; চতুর্থত নারীদের বাস্তব জীবন বদলানোর চেষ্টা থাকতে হবে এবং পঞ্চমত নারীদের কেবল সমর্থক নয়, বরং সংগঠক, নেতা ও বিপ্লবের সক্রিয় কর্মী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষে কাজ করবে। এক্ষেত্রে আমরা রুশ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে পারি। এখানে নারী সংগঠন ছিলো কমিউনিস্ট পার্টির অঙ্গ সংগঠন। আর লেনিন নারী সংগঠনের স্বতন্ত্র ধরন বলতে এমন এক পদ্ধতি ও বিশেষ কাঠামোকে বুঝিয়েছেন যা পার্টি সংগঠনের মতো একরৈখিক নয়, বরং নারীদের বাস্তব অবস্থান ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আলাদা করে গড়ে তোলা। অর্থাৎ এটা আলাদা রাজনীতি নয়, বরং একই বিপ্লবী রাজনীতির ভিন্ন সংগঠনগত রূপ। ‘স্বতন্ত্র ধরন’ এর কয়েকটি বৈশিষ্টের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। (১) আলাদা সাংগঠনিক রূপ থাকবে (২) নমনীয় সদস্য পদ্ধতি (৩) কাজের ভিন্ন পদ্ধতি যেমন- ঘরে ঘরে, কর্মস্থলে, কারখানাভিত্তিক কাজ। অর্থাৎ নারীদের বাস্তব অবস্থার সাথে মানানসই বিশেষ পদ্ধতি কাঠামো ও কৌশল ব্যবহার করে তাদের বিপ্লবী রাজনীতিতে সংগঠিত করা। বিপ্লবীধারার নারী সংগঠনে নারীদের যুক্ত করার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে– প্রথমত, নারীসমাজকে দায়িত্বশীল ও গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করার জন্য তাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষাগত ও মানসিক উন্নয়নের চেষ্টা করা। এই উদ্দেশ্যে তাদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ক সমস্ত প্রগতিশীল চিন্তাধারার সঙ্গে বিশেষত যে শ্রেণিশোষণহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারী-পুরুষের প্রকৃত সমানাধিকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে সেই সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার সাথে পরিচিত করানো এবং নারী সমাজের মধ্যে তার জন্য আগ্রহ সৃষ্টি করা। দ্বিতীয়ত রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, পারিবারিক, অর্থনৈতিক অধিকারের প্রতিটি ক্ষেত্রে এবং শিক্ষা-সংস্কৃতি, জীবন-জীবিকা ও ব্যক্তিগত দায়িত্ব ও অধিকারের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকার যাতে আইনগতভাবে ও বাস্তবক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয় তার জন্য ধারাবাহিক প্রচেষ্টা অব্যহত রাখা। তৃতীয়ত শ্রমিক-কৃষক ও অন্যান্য নারীদের কাজের নিরাপত্তা, ছাঁটাই বন্ধ, সমান মজুরি, প্রসূতিকালীন সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, শিশু রক্ষণাগারের ভালো ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসম্মত বিশ্রামকক্ষ, শৌচাগার, চিকিৎসা, বাসস্থান প্রভৃতি ব্যবস্থা অর্থাৎ তাদের সুস্থ ও মানবিক জীবন যাপনের সাথে জড়িত প্রতিটি ইস্যু নিয়ে আন্দোলন সংগঠিত করতে তাদের পাশে থেকে উদ্বুদ্ধ করা। চতুর্থত সমাজের পশ্চাৎপদ অংশের নারীদের জন্য বিশেষ করে আদিবাসী, সংখ্যালঘু ও সমাজে নিচু কাজের নামে এখনও যারা সকল সুযোগ থেকে বঞ্চিত প্রচলিত ভাষায় মুচি, মেথর, ডোম, বেদে তাদের অধিকার সচেতন করে তোলার সাথে সাথে বয়স্ক শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে নানামুখি সরকারি বেসরকারি কর্মসংস্থানের সাথে যুক্ত হতে সহযোগিতা করা। পঞ্চমত নারী সমাজের সাংস্কৃতিক ও মানসিক বিকাশের জন্য ক্লাব, লাইব্রেরি, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, পত্র-পত্রিকার ব্যবস্থা করতে হবে। নারীদের মধ্যে খেলাধূলা ও শরীরচর্চার সুবিধার জন্য শহরে ও গ্রামে প্রতিষ্ঠান গঠনে সাহায্য করা। ষষ্ঠত সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের সর্বক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান দায়িত্ব ও অধিকারের সাম্যবাদী আদর্শ ও জীবনের মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য সামাজিক উৎপাদন ও সংগঠনের দায়িত্বগুলির মধ্যে যেমন ব্যাপকভাবে নারীসমাজকে টেনে আনতে হবে, তেমনি পারিবারিক কাজের দায়িত্বগুলির মধ্যেও পুরুষকে সমানভাবে সহযোগী হিসেবে অংশগ্রহণ করতে হবে। একথা বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন সমাজে গণতন্ত্রহীনতা, জবাবদিহিতা ও বিচারহীনতা থাকলে এবং ক্রমাগত আক্রমণের আশংকা বিদ্যমান থাকলে অসংগঠিত নারী-পুরুষ বিশেষ করে নারীরা অধিকার আন্দোলনে অংশ নিতে ভয় পায়। তাদের ভয় কাটিয়ে দায়িত্ব ও অধিকার সচেতন করে তোলার কাজটি করতে হয় সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে। সেক্ষেত্রে দেশের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক চিন্তাধারার অগ্রগামী নারী সমাজ ও তাদের সংগঠনের সাথে ঐক্য ও সৌহার্দ স্থাপন করা জরুরি। সাথে সাথে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সমাজতন্ত্র ও জাতীয় মুক্তির আদর্শের জন্য সংগ্রামরত নারীসমাজ ও সংগঠনের সাথে জীবন্ত সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারলে এ কাজ অগ্রসর করে নিয়ে যাওয়া সহজ হবে। লেখক: কলামিস্ট ও নারী অধিকার কর্মী

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..