জাতীয় স্বার্থ-বিরোধী চুক্তি বাতিল করতে হবে
একতা ডেস্ক :
(মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত অসম বাণিজ্য চুক্তিসহ জাতীয় স্বার্থ-বিরোধী সকল বৈদেশিক চুক্তি জনসম্মুখে প্রকাশ ও সংসদে উত্থাপন করে বাতিলের দাবিতে এবং ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা, ফিলিস্তিনে চলমান গণহত্যা ও সারা বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন-যুদ্ধ বন্ধের জন্য সংসদে নিন্দা প্রস্তাবের দাবিতে গত ২৭ এপ্রিল সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট সংসদ অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল ও স্পিকারের কাছে স্মারকলিপি দেয়। স্পিকারের কাছে দেওয়া সেই স্মারকলিপির বক্তব্য পাঠকদের জন্য দেওয়া হলো।)
শ্রদ্ধাভাজনেষু
দেশের ১৩টি বাম-গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত ‘সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট’-এর পক্ষ থেকে আপনাকে সশ্রদ্ধ শুভেচ্ছা। আপনি নিশ্চয়ই অবগত আছেন, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নির্বাচনের মাত্র তিনদিন আগে গত ৯ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ‘রেসিপ্রোকাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট-আরটিএ’ নামে একটি বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এ চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছে নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট বা গোপনীয়তা-চুক্তির ভিত্তিতে। আমরা মনে করি, দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে অন্য রাষ্ট্রের সাথে এ ধরনের চুক্তি স্বাক্ষরের এখতিয়ার অনির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেই। তাই, এ চুক্তিসংক্রান্ত আলোচনা চলাকালে আমরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে দাবি জানিয়েছিলাম- নির্বাচিত সরকার আসার আগে তাড়াহুড়ো করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যেন এ চুক্তি স্বাক্ষর না করে। কিন্তু, অধ্যাপক ইউনুসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমাদের উদ্বেগ-আপত্তি গ্রাহ্য করেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউজ এবং মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তরের ওয়েবসাইটে চুক্তিটি প্রকাশিত হওয়ার পর আমাদের দেশের সংবাদমাধ্যমেও চুক্তির খুঁটিনাটি প্রকাশিত হয়েছে। বিশিষ্টজনেরা চুক্তির নানাদিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে মতামত ব্যক্ত করেছেন। তাতে দেখা যায়, এ চুক্তিটি অসম-অন্যায্য ও বাংলাদেশের জন্য অধীনতামূলক। চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে আমাদের দেশ শুধু অর্থনেতিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বও ক্ষুণ্ন হবে।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এলএনজি আমদানি করতে হবে। আমাদের প্রয়োজন থাকুক বা না থাকুক, বেশি দামে গম, সয়াবিন, তুলা, মাছ, মাংস, ফলমূলসহ বিভিন্ন পণ্য কিনতে হবে। এর ফলে আমাদের কৃষি ও শিল্পখাত মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। বিভিন্ন সেক্টরে কর্মরত অনেক মানুষ বেকার হয়ে যাবেন। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বিনা-দরপত্রে মার্কিন কোম্পানি বোয়িং-এর কাছ থেকে উড়োজাহাজ কিনতে হবে। কিনতে হবে সামরিক সরঞ্জামও। বাংলাদেশের বাজারে যুক্তরাষ্ট্র ৬ হাজার ৭১০টি পণ্যে শুল্ক-সুবিধা পাবে। এর ফলে বাংলাদেশ বছরে ১৩২৭ কোটি টাকার রাজস্ব হারাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। পক্ষান্তরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ সুবিধা পাবে মাত্র ১ হাজার ৬৩৮টি পণ্যে। এর মধ্যে অধিকাংশ পণ্য রপ্তানির সুযোগ ও সামর্থ্য বাংলাদেশের নেই। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যস্বার্থ ক্ষুণ্ন হয় এরকম কোনো দেশের সাথে অর্থাৎ চীন, রাশিয়া ইত্যাদি দেশের সাথে বাংলাদেশ কোনো বাণিজ্যচুক্তি করতে পারবে না। এ শর্ত আমাদের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের উপর সরাসরি হস্তক্ষেপের শামিল।
মাননীয় স্পিকার
দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী গণআন্দোলনের পর দেশে জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি জাতীয় সংসদ গঠিত হয়েছে। সংসদের প্রথম অধিবেশনের কার্যক্রম চলছে। সংবিধানের ১৪৫ (ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত সব চুক্তি সংসদে উত্থাপন করা আবশ্যক। আমরা চাই, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত বাণিজ্যচুক্তিসহ অতীতের সকল আন্তর্জাতিক চুক্তি সংসদে উত্থাপন করা হোক এবং জাতীয় স্বার্থবিরোধী সকল অসম চুক্তি বাতিল করা হোক।
দ্বিতীয়বার মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন দেশের উপর বর্ধিত হারে আমদানি শুল্ক আরোপ করেছিলেন। তারপর চাপ প্রয়োগ করে অসম চুক্তি সম্পাদনে বিভিন্ন দেশকে বাধ্য করেছিলেন। সে চাপের মুখে বাংলাদেশের নতজানু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। গত ফেব্রুয়ারি মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের একতরফা শুল্কনীতি অসাংবিধানিক ঘোষণা করে বাতিল করে দিয়েছে। এর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে সম্পাদিত বাণিজ্যচুক্তি বাতিলের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। মালয়েশিয়া ইতোমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যচুক্তি বাতিল করেছে। ভারত স্থগিত করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও চুক্তি স্বাক্ষর থেকে বিরত রয়েছে।
মাননীয় স্পিকার
বর্তমান সংকটময় বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কেও আপনি অবগত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যৌথ সামরিক হামলা চালিয়ে সে দেশের প্রধান ধর্মীয় নেতা আলী খামেনিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিক ও সামরিক কর্মকর্তাকে হত্যা করেছে। হত্যা করেছে শিশু ও নারীসহ কয়েক হাজার বেসামরিক নাগরিককে। স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতালসহ অসংখ্য বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংস করেছে। জেনেভা সনদ অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদদে জায়নবাদী ইসরায়েল বছরের পর বছর ফিলিস্তিনে গণহত্যা চালাচ্ছে। তেলসহ বিরল খনিজসম্পদ দখল করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দস্যুর মতো হানা দিয়ে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে সস্ত্রীক অপহরণ করে নিয়ে গেছে। অবরোধ-নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে কিউবাকে পদানত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এক কথায়, সারা বিশ্ব এখন মার্কিন সামরিক ও অর্থনৈতিক আগ্রাসনের মুখে। আমরা চাই, ইরানে হামলা, ফিলিস্তিনে গণহত্যাসহ বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের নিন্দা জানিয়ে জাতীয় সংসদে প্রস্তাব গ্রহণ করা হোক। আমাদের সংবিধানের ২৫ (গ) অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে ‘সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিকতাবাদ বা বর্ণবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করিবেন।’
মাননীয় স্পিকার
আপনি দেশের একজন বরেণ্য রাজনীতিক ও বার বার নির্বাচিত সংসদ সদস্যই শুধু নন, আপনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। দেশের স্বার্থবিরোধী বৈদেশিক চুক্তি এবং বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন নিয়ে আমাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আপনি নিশ্চয়ই অনুধাবন করতে পারছেন। আমাদের প্রত্যাশা-জাতীয় সংসদে উপর্যুক্ত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার জন্য, জাতীয় স্বার্থবিরোধী সকল বৈদেশিক চুক্তি বাতিল করার জন্য এবং দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় সংসদে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করার জন্য আপনি আপনার অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ উদ্যোগ গ্রহণ করবেন।
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন