মুক্তিযুদ্ধে গেরিলা বাহিনীর অবদান ও নতুন প্রজন্মের করণীয়

অ্যাড. রাজেন্দ্র প্রসাদ আগরওয়ালা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
বাঙালির শত বছরের গৌরবময় ইতিহাসে ধারাবাহিক পর্যালোচনা করলে দেখতে পাই, মার্চ মাস যেন এ জাতির অহংকার, আর শত অর্জনের মাস। মার্চ কখনো বেদনা ও আনন্দের হলেও শেষ পর্যন্ত বাঙালির আত্মপ্রতিষ্ঠার মাহেন্দ্রক্ষণ। ১৯৭১ এর মার্চ মাসকে আমরা কখনো ভুলতে পারবো না। কারণ মার্চ মাস হচ্ছে স্বাধীনতার মাস। রক্ত ঝরার মাস ও শপথ নেয়ার মাস। ভাষা আন্দোলনের বিজয়ের সূত্র ধরেই বাঙালি জাতি স্বপ্ন দেখছিলো স্বাধীনতার। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা। এভাবেই বিশ্বের মানচিত্রে স্থান করে নিলো স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হলো বাঙালি জাতি। মার্চ আমাদের শুধু স্বাধীনতার মাস নয়- আমাদের গৌরবের মহান স্মৃতি ধারণ করে আছে এই মাস। তাই স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর শহীদের প্রতি জাতি এই মাসে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে। ’৭১-র সেই ৭ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) যে ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেছিলেন, সেই সময় থেকে বাম গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতাকর্মীরা মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনের উদ্দেশ্যে গেরিলা ট্রেনিং নেয়ার জন্য প্রতিবেশী দেশ ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তখন বালুরঘাট ডাঙ্গা বিজয়শ্রী ক্যাম্প প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে বাম গণতান্ত্রিক মুক্তিযোদ্ধাদের বালুঘাটের সীমান্ত সংলগ্ন ডাঙ্গি নামক স্থানে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির অফিস অস্থায়ী ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এই ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির বালুরঘাট শাখা এবং রাজ্য শাখার সদস্য কমরেড সুবোধ লাহেড়ী, তার বাড়ি ছিল বগুড়া জেলার শেরপুরে। একাত্তরের ২৪ এপ্রিল আক্কেলপুর থেকে আমি (এই নিবন্ধের লেখক) ও আমার বন্ধু ফজলার রহমান বাংলাদেশ থেকে পায়ে হেঁটে কামারপাড়া হয়ে বালুরঘাটের ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির অস্থায়ী ক্যাম্প ডাঙ্গিতে পৌঁছি এবং সেখানে কয়েকদিন আবস্থান করি। ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়ন পরিচালিত বালুরঘাট ডাঙ্গা বিজয়শ্রী স্কুলে ট্রেনিং ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করে রাজনৈতিক ক্লাসের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং শুরু করে। এই ক্যাম্পের মূল দায়িত্বে ছিলেন জয়পুরহাটের পাঁচবিবির আন্দামানবন্দি ডাঃ আব্দুল কাদের চৌধুরী, বগুড়ার নৌবাহিনীর আবসরপ্রাপ্ত নন কমিশন্ড অফিসার সৈয়দ মাজহারুল ইসলাম (সোহরাব), কমরেড মখলেছুর রহমান, ছাত্র নেতা আব্দুর রাজ্জাক, বদিউল আলম, স্বপন গুহ রায়, হায়দার আলী, ন্যাপ নেতা হারুনুর রশীদ, অ্যাড: মীর ইকবাল, নওগাঁর এম, এ রকিব, ডা: আজিজার রহমান, জয়পুরহাটের খয়বর আলী, পাঁচবিবির মীর শহিদ মন্ডল, আমিনুল হক বাবুল, আক্কেলপুরের কবি আতাউর রহমান, মন্তাছার রহমান, কাজী গোলাম রব্বানী, আঃ ছাত্তার চৌধুরী, মোহাম্মদ আলী লস্কর, কাজী বেলাল হোসেন, সাহাদত আলী লস্কার, আহাদ আলী লস্কার, ফজলার রহমান, সাদেকুর রহমান, জাহাঙ্গীর আলম, বজলুর রশিদ মন্টু, এমএইচএম ফারুক, আমজাদ লস্কার, ঔঙ্কার দা, মতিউর রহমান প্রাং, আকতার হোসেন, মন্তাজুর রহমান আকবর, মোস্তফা লস্কর, আধির চন্দ্র দাস রাজু প্রমুখ নেতাগণ। পার্টির পরিচয় গোপন রেখে এই ক্যাম্প থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের উচ্চতর ট্রেনিং নেয়ার জন্য বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো হতো। পরবর্তীতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সহিত যোগাযোগ করে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির সহিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কথা বিশদভাবে আলোচনা তথা মুক্তিযুদ্ধে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা জানানোর পর সোভিয়েত সরকার, ভারতীয় সরকারের সহযোগিতায় ও প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদনে ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধাদের সব সেক্টরে ট্রেনিং চালুর ব্যবস্থা করেন। ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন থেকে হাজার হাজার তরুণ ট্রেনিং গ্রহণ করে। ১৯৭১ এর ২৮ মে ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ গেরিলা বাহিনী গঠিত হয়। ভারতের আসামের তেজপুর নিকটবর্তী সালানবাড়ী নামক স্থানে কেন্দ্রীয় ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। প্রথম ব্যাচ ২০০ জন, পরের ব্যাচ ৪০০ জন, এভাবে প্রশিক্ষণ শুরু হয়। এই ক্যাম্পগুলো বেইস ক্যাম্প হিসেবে পরিচিত। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্যরা মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং সহায়তা করতেন। মূল দায়িত্বে ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ। বাংলাদেশে স্বাধীনতা পঞ্চাশ বছর “স্বাধীনতার সুর্বণজয়ন্তী” উদযাপিত হচ্ছে। এই সুদীর্ঘ সময়ে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ কতটুকু আমরা আামদের হৃদয়ে ধারণ করতে পেরেছি, তা আজ হিসাব করতে হবে। আজ বিরোধী শক্তি ৭১ এর দালালরা, রাজাকার, আলবদর, আলশামসরা ঐক্যজোট করছে। ঠিক অতখনই আমাদের প্রগতিশীলদের ভেতর ঐক্যের ফাটল সৃষ্টি হচ্ছে। এই ফাটলের কারণে দেশ ও জাতি পিছিয়ে যেতে পারে। সম্প্রতি দেশে স্বাধীনতা বিরোধী মৌলবাদী ও ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর তাণ্ডব বেড়েছে। এরাই ছিল আমাদের ভাষা আন্দোলনের বিরোধী শক্তি। ভাষা আন্দোলনে তারা পরাজিত হয়েছে, ৭১ এ মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত হয়েছে, সেই পরাজিত শক্তি ভেতরে ভেতরে সংঘবদ্ধ ও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। বিভিন্ন সরকারের আমলে বিশেষ করে বিএনপির আমলে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে তাদের নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হয়েছে। এটা কেনা জানে। কিন্তু এখন তারা আবার মরিয়া হয়ে ওঠেছে। ইতিহাসের চাকা আবার পেছনের দিকে ঘুরিয়ে দেয়ার জন্য। ধর্মের নামে তারা খর্ব করতে চায় নারীর অধিকার। নারীকে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করে পর্দার ভেতর রাখতে। মৌলিক মানবাধিকারসহ কল্যাণের সব পথ রুদ্ধ করতে চায়। স্বাধীনতার ৫০ বছরে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালিত হবে, তখন স্বাধীনতার মাসে আমাদের প্রতিশ্রুতি হওয়া উচিত ঐক্যবদ্ধভাবে এই অপশক্তিকে প্রতিহত করার। ১৯৭১ সালে শত্রুদের ছেড়ে দিয়ে আমরা যে ভুল করেছিলাম তাতে জাতির ক্ষতি হয়েছে এ কথা অনস্বীকার্য। এই ভুলের জন্য আজ রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীর সদস্যরা তথা সেই হানাদার পাক বাহিনীর একান্ত সহচর জামাতের দালালরা ষড়যন্ত্র করছে দেশের বিরুদ্ধে। এদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। এদের বিষ দাঁত ভেঙে দিতে হবে চিরদিনের মতো। আমাদের মনে রাখতে হবে এ দেশ হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধার, মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে কোন ষড়যন্ত্র এদেশে চলবে না। আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম, এদেশে অন্ন, বস্ত্র, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আশ্রয়ের সংস্থান হবে সকলের। এটাই ছিল ৭১ এর স্বপ্ন। নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের আকুল আকুতি- তোমরা তোমাদের পূর্বজদের মত করে দেশমাতৃকার চেতনায় আবার একত্রিত হয়ে গর্জে উঠো। এদেশ আমার/আমাদের। এখানে কোনো দেশবিরোধীদের স্থান নেই। আরো বলব, তোমরাই পারো বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার অসমাপ্ত কাজকে এগিয়ে নিতে। তোমাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের শিক্ষায় ও আদর্শে গড়ে উঠতে হবে। মার্চ মানে যুদ্ধে যাবার শপথ, মার্চ মানে অস্ত্র হাতে প্রতিবাদ, মার্চ মানে নয় পরাজয়-পরাভব, মার্চ মানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রাঘাত। লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..