দারিদ্র্য ও বৈষম্য

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
দেশে দারিদ্র্যতা কমছে না বরং ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। কিন্তু সরকার বলছে দেশে দারিদ্র্যতা কমছে। আবার সাধারণ মানুষ বলছে, আগের মতো দিন চালানোই এখন দায় হয়ে পড়েছে। সমাজে জনগণের এক বিশাল অংশ জীবন-জীবিকার এসব উন্নত উপকরণ ও প্রাচুর্যের খুব সামান্যই ভোগ করার মতো সামর্থ্য রাখে। ‘আদিম মানব সমাজে’ জীবন সংগ্রামের প্রচণ্ড কষ্ট থাকলেও, সমাজে কোনো ‘ধনী’ না থাকায় সেকারণে ‘দারিদ্র্যের’ কোনো উপলদ্ধি সে সময় ছিল না। সেই উপলদ্ধি জন্ম নেয়ার সুযোগ কেবল তখনই সৃষ্টি হয়েছিল যখন সমাজে উদ্ভব ঘটেছিল ধন-বৈষম্য ও শ্রেণি-বৈষম্যের। বাংলাদেশে ধন-বৈষম্য শ্রেণি-বৈষম্য এখন অতি কুৎসিত রূপ ও আকার ধারণ করেছে। জাতীয় আয় ও মাথাপিছু আয় বাড়লেও, সম্পদের বণ্টন হয়ে পড়েছে প্রচ-ভাবে অসম। ধনী-গরিবের ফারাক কল্পনাতীত পরিমাণে বেড়েছে। উল্লম্বিক সামাজিক স্থানান্তরের সুযোগ প্রায় রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। শরীরের ৯৯ ভাগ অংশের প্রায় সব রক্ত মুখমণ্ডলে নাসিকার চতুর্দিকের ১ ভাগের মধ্যে এসে জমা হয়েছে। সমাজ এক লাল-মুখো কুৎসিত জন্তুর রূপ লাভ করেছে। দেশের একেকজন লুটেরা ধনিক বছর-বছর ৯৯ শতাংশ দেশবাসীকে শোষণ-বঞ্চনা-প্রতারণা করে হাজার-হাজার কোটি টাকা কুক্ষিগত করছে। এর প্রধান অংশ তারা বিদেশে পাচার করে দিচ্ছে। তারা পাল্লা দিয়ে বিলাসিতার চোখ ধাঁধানো জৌলুসে লিপ্ত থাকছে। বিয়েতেও এমনকি ছোটখাটো অনুষ্ঠানাদিতে ১০/২০ কোটি টাকা করে খরচ করেছে। বিদেশ থেকে তেল-সাবান, খাওয়া-খাদ্য থেকে শুরু করে সবকিছু কেনাকাটা করা, মায় প্যারিস থেকে পানীয় জলের বোতল কিনে আনা, মাসে মাসে হীরার গয়নাসহ দামী জুয়েলারি কিনে লকার ভরাট করা, অনুষ্ঠানাদির জন্য চীনের কুনমিং শহর থেকে বিমানযোগে তাজা ফুল নিয়ে আসা– লুটেরা ‘লাল-মুখোদের’ মাঝে চলছে এসব কারবার। ইটালিয়ান পাথর ও বেলজিয়াম-সুইজারল্যান্ডের ক্রিস্টাল সামগ্রী দিয়ে সুসজ্জিত তাদের একটি বিলাসী টয়লেটের পেছনে তারা খরচ করছে ৭০/৮০ লক্ষ টাকা। এই টাকার লক্ষ ভাগের এক ভাগ অর্থ, মাত্র ৭০-৮০ টাকার ঔষুধের অভাবে হয়তো দরিদ্র পিতার অসুস্থ শিশু পুত্রকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হচ্ছে। কি নিষ্ঠুর ও অমানবিক এক বাস্তবতা দেশকে আজ গ্রাস করেছে! সংখ্যাতত্ত্বের মারপ্যাচে দারিদ্র্যের ক্রমবর্ধমান এই বিভৎসতার প্রকৃত চিত্র আড়াল করার চেষ্টা বৃথা। দেশে রয়েছে ৯৯ শতাংশ ‘ভাগ্যাহত’ দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্তের দল। সেই দরিদ্র মানুষের প্রকৃত সংখ্যাও কম করে দেখানোর প্রচেষ্টা হয়ে থাকে। সরকার ও বিশেষ কিছু সংস্থা সংখ্যাতত্ত্বের ব্যবহারে নানা ছল-চাতুরির আশ্রয় নিয়ে একধরনের ভুল চিত্র হাজির করার চেষ্টা করে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার, শিশুর মৃত্যুর হার, দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানকারীদের হার, চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষের হার, মূল্যস্ফৃতির হার ইত্যাদি কম করে দেখানো; আর প্রবৃদ্ধির হার, স্বাক্ষরতার হার, গড় প্রত্যাশিত আয়ু ইত্যাদি বেশি করে দেখানোর জন্য বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করা হয়। বিদেশে ও দেশের মানুষের মাঝে সরকারের মেকি সাফল্যের চিত্র তুলে ধরার জন্য প্রায়সই ‘ফরমায়সি’ তথ্য হাজির করা হয়। ২০০৫ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪০ শতাংশ বলে জানানো হয়েছিল। ২০১০ সালে খানা জরিপে দেখানো হয়েছিল যে সেই হার তখন কমে ৩১.৫ শতাংশ হয়েছিল। কিন্তু এই তথ্য বিশ্বাসযোগ্যতা পায়নি। কারণ, দেখা গিয়েছিল যে, পরিসংখ্যান বিভাগ দেশের মোট ‘খানার’ সংখ্যা সম্পর্কে যে তথ্য দিয়েছিল সেটিই ছিল ত্রুটিপূর্ণ। তখনই অভিযোগ উঠছিল যে, ফাঁকিবাজির শিকার হয়ে প্রায় ২ কোটি মানুষ গণনাকারিদের হিসেবের বাইরে রয়ে গিয়েছিল। ধারণা করাটা খুবই স্বাভাবিক যে দারিদ্র্য সীমার নিচে অবস্থানকারী মানুষের সংখ্যা হিসেব করার ক্ষেত্রে এখনও এ ধরনের নানা অসৎ পন্থা অবলম্বন করা হচ্ছে। তাছাড়া দারিদ্র্যের হিসাব কিসের ভিত্তিতে করা হবে তা নিয়েও বিতর্কের শেষ নেই। দারিদ্র্যের সংজ্ঞায়ন এদিক-ওদিক করলেই তার হার উঠিয়ে-নামিয়ে দেখানো যায়। তুলনা করার ভিত্তি-বছর এদিক-ওদিক করার দ্বারাও তা করা যায়। সংখ্যাতত্ত্বের এসব মারপ্যাচ এবং পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে দেশ-বিদেশের অধিকাংশ বিশেষজ্ঞই সন্দেহ প্রকাশ করে থাকেন। দেশের পনের আনা মানুষ আজ অভাবের মধ্যে বাস করছে। অভাব বোধই হলো ‘দারিদ্র্যের’ একটি প্রধান উপসর্গ। তাছাড়া, সব ধরনের তথ্য একথারই প্রমাণ দেয় যে সমাজে ‘বৈষম্য’ হু হু করে বাড়ছে। বৈষম্য বাড়লে দারিদ্র্যও বাড়তে বাধ্য। কারণ, দরিদ্র তো বৈষম্যেরই উপজাত! তাই, সবাই যেহেতু একবাক্যে একথা স্বীকার করেন যে দেশে বৈষম্য বাড়ছে, তাই ‘দারিদ্র্য’ কমছে বলে সরকারের দাবি করা সত্য হতে পারে না।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..