বন্দর, জাতীয় সম্পদ নিয়ে ছিনিমিনি বন্ধ করো, গণতন্ত্র ফেরাও
রাষ্ট্র পরিচালনার যে মৌলিক নীতি প্রায় সর্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্যতা হলো জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা। কিন্তু দায়বদ্ধতা তখনই কার্যকর হয়, যখন জনগণ মতামত দেওয়ার সুযোগ পায়, তথ্য জানতে পারে এবং নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়াকে পর্যবেক্ষণ করতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে যেভাবে স্বাভাবিক প্রক্রিয়াগুলো সংকুচিত হয়ে পড়েছে, তাতে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে জাতীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় স্বচ্ছতা ও জনসংলাপের অভাব। উন্নয়নের অজুহাতে বা ত্বরিত সিদ্ধান্তের প্রয়োজন দেখিয়ে যদি জনঅংশগ্রহণকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তবে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি বাড়ে, এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সম্পদের প্রশ্নটি কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি রাজনৈতিক অধিকার, সার্বভৌমত্ব এবং সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নও। যেসব খাত রাষ্ট্রের রাজস্ব, বাণিজ্য ও কৌশলগত অবস্থানকে নির্দেশ করে-যেমন বন্দর-এসব ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। এখানে সতর্কতা বলতে কেবল গোপনীয়তা নয়; বরং সতর্কতা মানে হলো জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করা, পর্যাপ্ত তথ্য উদঘাটন করা এবং বিভিন্ন বিকল্পের মূল্যায়ন করার জন্য মুক্ত আলোচনার সুযোগ তৈরি করা।
গত এক মাসে লালদিয়ার বন্দরসহ দেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নিয়ে যেসব চুক্তি হয়েছে, বা সম্ভাব্য চুক্তির আলোচনা চলছে, সেগুলো জনগণের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা স্বাভাবিক। কারণ বন্দর একটি দেশের বাণিজ্যধমনী। এটির ব্যবস্থাপনা বা অধিকার পরিবর্তন হলে তা সরাসরি শ্রমবাজার, রাজস্ব, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নীতির ওপর প্রভাব ফেলে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে যেখানে সম্পদ সীমিত, সেখানে এর প্রতিটি ব্যবস্থাপনা সিদ্ধান্তই বহুস্তরীয় প্রভাব তৈরি করে। ফলে এই ধরনের সিদ্ধান্ত যদি পর্যাপ্ত জনমত সংগ্রহ ছাড়া নেওয়া হয়, তাহলে তা স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
অনির্বাচিত বা অপ্রতিনিধিত্বশীল শক্তির হাতে জাতীয় সম্পদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষমতা চলে গেলে বিপদের ঝুঁকি বেড়ে যায়। কারণ সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়াটি তখন জনগণের স্বার্থের বদলে অন্য কোনো গোষ্ঠী বা সীমিত বৃত্তের স্বার্থ নির্ভর হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্বব্যাপী বন্দর, জ্বালানি, পরিবহনসহ বড় অবকাঠামোর ক্ষেত্রে বহুপাক্ষিক সহযোগিতা যে আছে, তা তো আর লুকানো বিষয় নয়। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন সহযোগিতার শর্তাবলি জনগণের অজানায় থাকে, যখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতি অস্পষ্ট হয়, অথবা যখন আলোচনার ক্ষেত্রটিই সীমিত করে দেওয়া হয়। উন্নয়ন কোনোভাবেই জনগণের ওপর দায় চাপিয়ে বা তথ্য গোপন রেখে টেকসই হতে পারে না। বরং উন্নয়ন মানে এমন প্রক্রিয়া, যেখানে যারা প্রভাবিত হবে-তাদের মতামতই সিদ্ধান্তের ভিত্তি।
রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র সংকীর্ণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর চাপ, আলোচনা ও সমালোচনাকে সন্দেহের চোখে দেখা-এসব কারণে গুরুত্বপূর্ণ নীতি নিয়ে জাতীয় আলোচনাও গড়ে ওঠে না। ফলে নীরবতার ফাঁকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা বেড়ে যায়। অথচ জাতীয় সম্পদ নিয়ে সিদ্ধান্তে নীরবতা সবচেয়ে বড় শত্রু; নীরবতা ভুলকে লুকিয়ে রাখে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর অদৃশ্য বোঝা চাপিয়ে দেয়।
গণতান্ত্রিক পরিবেশের অভাব কেবল রাজনীতিতে সংকট সৃষ্টি করে না; এটি অর্থনীতিতে ভুল অগ্রাধিকার তৈরি করে। যেসব খাতের উন্নয়ন জনগণের জীবনমান উন্নত করে, সেসব খাত অবহেলিত থাকে; আর যেসব খাত কিছু গোষ্ঠীর স্বার্থে উপকারী, সেগুলো অগ্রাধিকার পায়। ফলে রাষ্ট্রের উন্নয়ন দিকবিভ্রান্ত হয়, ন্যায্যতার জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সম্পদের সুষম ব্যবহার ব্যাহত হয়।
এই সমস্যা কাটিয়ে ওঠার একমাত্র পথ হলো জনগণকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা।
সার্বিকভাবে বলা যায়, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ পুনঃপ্রতিষ্ঠা এখন রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি, সম্পদ নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের প্রশ্নেও জরুরি হয়ে উঠেছে। বন্দর বা অন্যান্য জাতীয় সম্পদ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তই জনপুঞ্জের অংশগ্রহণ ছাড়া বৈধ নয়।
সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ হল- এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সিদ্ধান্ত মানুষের কাছে ব্যাখ্যাত হবে, সমালোচনার জায়গা থাকবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনা সত্যিকারের প্রতিনিধিত্বমূলক হবে। মোটাদাগে, জাতীয় সম্পদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার প্রথম শর্তই হলো গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক চর্চা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ। কারণ গণতন্ত্রই পারে রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ রাখতে এবং সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ রাখতে।
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন