
একদল ছাত্র নেতা-কর্মী বিরোধীদের পথ আটকে পেটাচ্ছে, পত্রিকায় এমন খবর বের হচ্ছে। পুলিশ কিছু বলছে না বা বলতে পারছে না। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে হোমোসেক্স প্র্যাকটিস এবং নানা রকম অনৈতিকতা সংঘটিত হওয়ার খবর বের হচ্ছে। এছাড়া মারামারি খুনোখুনি নিয়মিত ব্যাপার। এই নির্মমতা, অনৈতিকতা অভিভাবক পর্যায়ে দুটো দাবির জন্ম দিতে পারে। এক. ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করে দাও। দুই. ছাত্ররাজনীতি অব্যাহত থাকবে, তবে দলীয় লেজুড়বৃত্তি থেকে মুক্ত করো। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ইচ্ছায় কিছু হবে না, বাস্তব পরিবেশ এবং ছাত্র-জনতা এর সমাধান করবে।
এখন আমরা রাজনীতি কী, এ নিয়ে কিঞ্চিত আলোচনা করে নিই। পৃথিবীতে আদিকালে রাজনীতি বিষয়টা ছিলো না। মানুষ একটা সামাজিক চুক্তির অধীনে সম্প্রীতির সাথে অতি সরল ও অসহায় ধরনের জীবনযাপন করতো। তারপর একসময় এই সম্প্রীতি আর থাকলো না। কারণ উৎপাদনের উপকরণের মালিকানা সামাজিক পর্যায় থেকে ব্যক্তি পর্যায়ে চলে এলো। ব্যক্তি, মালিক হওয়ায় সে তার সম্পদ বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা করলো। সহায়ক হলো সংগঠন, বল প্রয়োগ ও কৃৎকৌশলগত অগ্রগতি। সব মিলিয়ে সমাজ প্রধানত দুভাগে বিভক্ত হয়ে গেলো। একদল শোষক যারা শাসক। অন্যদল শোষিত যারা শাসিত। এই বিভক্তি থেকেই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। দ্বন্দ্ব বিকাশের কারণ। যার ফলে মানুষ তিনটে শোষণমূলক সমাজ পার করলো। যেমন – দাসসমাজ, সামন্তসমাজ এবং পুঁজিবাদী সমাজ। মানুষে মানুষে স্বার্থ নিয়ে দ্বন্দ্ব সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হলো পুঁজিবাদী সমাজে। শোষক ও শোষিতের মাঝে বিরাজিত এই দ্বন্দ্ব বা সংঘর্ষের নামই রাজনীতি। আর শ্রেণি অবস্থান থেকেই মানুষ তৈরি করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল।
এখন আমরা ছাত্ররাজনীতি নিয়ে আলোচনা করে নিতে চাই, অবশ্য ছাত্ররাজনীতি মূল রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু না। এটা জানা কথা, পুঁজিবাদী আমলে জ্ঞান-বিজ্ঞানের ব্যাপক বিকাশ হয়েছে। তবে পুঁজিবাদের চরিত্র হচ্ছে সে জ্ঞান-বিজ্ঞানের ততোটুকু বিকাশ করতে রাজি থাকে যতোটুকুতে তার লাভ আছে অর্থাৎ শোষণে কাজে লাগে। জ্ঞান-বিজ্ঞান মানুষের মুক্তিতে কাজে লাগুক তা সে চায় না। আর মানুষ অবিরত বন্দিদশা থেকে মুক্তি চাইতে থাকে। এটাই মূল দ্বন্দ্ব। শিক্ষাঙ্গন সাধারণত ছাত্রছাত্রীদের মাঝে বিতরণ করে জ্ঞান। জ্ঞান তাদের শত বাধা ডিঙিয়ে আলোকিত করে। আবার কেউ কেউ হয়তো অন্ধকারেই থেকে যায় যাদের সংখ্যা নগণ্য। আলোকিত ছাত্রদের মাঝে বিবেক গড়ে ওঠে, অধিকারবোধ জন্মায়, জাগে মুক্তির কামনা যা তারা জনতার মাঝেও ছড়িয়ে দেয়। আমরা দেখেছি পাকিস্তান আমলের শুরুর সময়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা না করে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার চক্রান্ত এই অগ্রসর ছাত্রসমাজ জনতাকে সাথে নিয়ে রুখে দিয়েছিল। তারা এটা করেছিলো দ্বিজাতিতত্ত্বসৃষ্ট মুসলিম জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, অর্থাৎ ভাষাভিত্তিক প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার তাগিদ থেকে। এটি ছিলো আমাদের জাতিসত্তার মৌলিক দিক এবং গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু নিয়ে আন্দোলন। এখানে ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় আন্দোলন এক স্রোতে মিশে গেছে। ফলে ছাত্ররাজনীতি জাতীয় রাজনীতি থেকে যে বিচ্ছিন্ন কিছু না সেটা আমরা প্রত্যক্ষ করলাম। ছাত্ররাতো আসে আপামর জনতার মধ্য থেকেই। তাই তাদের সমস্যা জনতার সমস্যা, আর জনতার সমস্যা তাদের সমস্যা।
আবার ছাত্ররা কিন্তু একটা গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ও। তাই সব সময় তাদের কিছু সম্প্রদায়গত সমস্যা থেকেই যায় যা ছাত্ররাজনীতির আন্দোলনের ইসু হয়ে থাকে। যেমন- শিক্ষার সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করা, বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষানীতি প্রণয়ন, রাষ্ট্রীয় সহায়তা প্রাপ্তি (পুস্তক, অর্থ, আবাসিক সুবিধা, স্বাস্থ্যগত সুবিধা) এবং গবেষণা ও শিক্ষার মানোন্নয়ন প্রভৃতি। প্রতিনিয়ত এসব বিষয় নিয়েও তাদের লড়তে হয়। লড়তে গিয়েই তাদের সংগঠিত হতে হয়। থাকে নানা স্বার্থ ও নানা মত। তাই গড়ে ওঠে বিভিন্ন সংগঠন। তারাই আবার নিজেদের স্বার্থে, জাতীয় স্বার্থে একজোট হয় সব বিভেদ ভুলে গিয়ে। এমনটা আমরা দেখেছি ’৬৬-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন ও ৭১-এর সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে।
এখন আমরা পর্যালোচনা করলে দেখতে পাবো, ছাত্ররা ভাষার আন্দোলন করেছিলো বলেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ হয়েছিলো। আর জাতীয়বোধ থেকে জন্মেছিলো স্বাধিকার-চেতনা। এই স্বাধিকারবোধ বাঙালি জাতিকে ঠেলে দিয়েছিলো সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে। আমরা পেয়েছিলাম একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। যদি গভীরভাবে লক্ষ্য করি দেখবো এসব আন্দোলনে ছাত্ররাজনীতি কোনো দলের হয়ে অবদান রাখেনি, অবদান রেখেছিলো জাতির হয়ে। আমরা ছাত্ররাজনীতির এ সময়টুকুকেই বলি স্বর্ণযুগ। ছাত্ররাজনীতিতে আরো একটি বিষয় লক্ষ্য করার মতো, ছাত্ররা মেহনতি মানুষের পক্ষেও কাজ করেছিলো। বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা ছিলো স্বায়ত্তশাসনের দাবি। ছাত্ররা এর সাথে যোগ করেছিলো ১১ দফা। এই ১১ দফাতে মেহনতি মানুষের দাবিগুলো স্থান করে নিয়েছিলো। আহ্বান ছিলো স্বাধীন ভূখণ্ডে শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার। এর ফলে ৭২-এর সংবিধানে সন্নিবেশিত হলো চার মূলনীতি। যথা- গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ এবং সমাজতন্ত্র। সংবিধানে এগুলো এখনো কাটছাট হয়ে আছে, প্রয়োগে নেই। এখন ভোট ছাড়া ১৫৪ সাংসদ নির্বাচিত হয়ে যায়, দিনের ভোট রাতে হয়ে যায়, বিশ হাজার বিরোধী নেতাকর্মী জেলে পুরে এককভাবে নির্বাচন সংঘটিত হয়। মৌলবাদ দৃঢ়ভাবে সংগঠিত হচ্ছে, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। আবার মৌলবাদ আর বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মিলেমিশে নির্বাচন দৃষ্টি এড়ায় না। পাকিস্তানের প্রেতাত্মারা মাঠে বিচরণ করছে। সাম্রাজ্যবাদের ছত্রছায়ায় চলছে উলঙ্গ লুটপাটের অর্থনীতি। একভাগের হাতে জমছে সম্পদের পাহাড়। এই পাহাড় থেকে ছুইয়ে-পড়া সম্পদ দিয়ে চলছে নিরানব্বই ভাগ মানুষ। চরম বেইনসাফের রাজত্ব। যারাই ক্ষমতায় যাচ্ছেন তাদের ছাত্র সংগঠন মেতে ওঠছে টেন্ডারবাজিতে, ধর্ষণ, খুন, রাহাজানিতে; জুয়া, নারীপাচার, নির্মমতা ও ভোগবিলাস এখন তাদের আদর্শ। তারা এসব করছে তাদের অভিভাবক রাজনৈতিক নেতাদের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে। সুতরাং ছাত্ররাজনীতির কলুষতার দায় থেকে শাসকদল কোনোক্রমেই মুক্ত নয়। যারা ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবি তুলছেন তাদের এখন মূল রাজনীতি বন্ধের দাবিও তুলতে হয়। কিন্তু আমরা বলেছি যতোদিন শোষক ও শোষিত থাকবে ততোদিন রাজনীতি বন্ধ হবে না। কেউ চেষ্টা করলেও হবে না। আর ছাত্ররাজনীতিতো মূল রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় না।
তাহলে দাবি তুলতে হয় লুণ্ঠনের রাজনীতি বন্ধ কর, রাজনীতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ফিরিয়ে আনো। ছাত্ররাজনীতিকে তার স্বর্ণযুগে ফিরিয়ে নাও, দলীয় লেজুড়বৃত্তি থেকে মুক্ত করো। প্রশ্ন জাগে তাহলে ছাত্ররা কি দলীয় রাজনীতি করবে না? অবশ্য করবে। কিন্তু শিক্ষাঙ্গনে যে ছাত্রসংগঠনটি সে করবে সেটি কোনো রাজনৈতিক দলের নির্দেশে চলবে না, স্বাধীনভাবে চলবে। এই বিষয়টি আইনে পরিণত করার জন্য রাষ্ট্রের সহায়তা প্রয়োজন। অর্থাৎ নিয়ম হতে হবে কোনো ছাত্র সংগঠন কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন হবে না। তাহলে দুর্বৃত্তের কোনো আশ্রয় থাকবে না। তখন নিষ্ঠুর কার্যকলাপের আগে দুর্বৃত্তরা বারবার ভাববে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুন্দর পরিবেশ ফিরে আসবে, অল্প কিছু দুর্বৃত্তের জন্য বৃহত্তর ছাত্ররাজনীতি কলঙ্কিত হবে না।
এই মুহূর্তে ছাত্রদের দাবি তোলা উচিত শিক্ষাঙ্গনে প্রকৃত নির্বাচন দিতে হবে। জোর দাবি তুলতে পারে দেশকে মুক্তিযুদ্ধের ধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে, অগ্রসর করতে হবে আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিকে। ইতোমধ্যে জাতীয় পর্যায়ে গণতন্ত্রকে বৃত্তের মধ্যে আটকানো হয়েছে, এখানে মেহনতি মানুষদের নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ নেই। ছাত্রসমাজকে প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবিকে সামনে নিয়ে আসতে হবে। শোষণমূলক শাসন উৎখাতের মানসে ছাত্র সমাজকে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির লক্ষ্যে কৃষক-শ্রমিক তথা মেহনতি মানুষের দাবিগুলোর সাথে একাত্মতা ঘোষণা করতে হবে। কারণ, গণতন্ত্র আর ভাত-কাপড়ের দাবি বিচ্ছিন্ন কিছু না। মনে রাখতে হবে ছাত্ররা গণমানুষের সচেতন অংশ। সঠিক বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তা ও কর্মসূচির মাধ্যমে ছাত্ররা তাদের স্বর্ণযুগে আবার ফিরে যেতে পারে এবং তাদের তা-ই করতে হবে। সেজন্য ছাত্রসমাজকে সকল বিভেদ ভুলে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে তথা নিজেদের স্বার্থে ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। আর একাজের উদ্যোগ নেয়ার দায়িত্ব বর্তায় প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের ওপর এবং ইতিহাস সে কথাই বলে।
লেখক: কলামিস্ট