বিশেষ সম্পাদকীয়

হামে শিশুর মৃত্যু : চরম বৈষম্যেরও প্রতিচ্ছবি

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
বেশ কিছুদিন ধরে দেশে স্বাস্থ্যখাতের সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হামে শিশুর মৃত্যু। হঠাৎ ছড়িয়ে পড়ার পর কয়েক মাসের মধ্যে বিপুলসংখ্যক শিশুর মৃত্যু নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠছে। অন্তত গত দুই দশকে বাংলাদেশে হামে এত মৃত্যু এবং এত বেশি রোগীর সংখ্যা দেখা যায়নি। শিশুদের এভাবে অকালে মারা যাওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তবে দেশের অন্যান্য খবরের ভিড়ে হামে মৃত্যুর জনস্বাস্থ্য সংকটটি আড়ালে চলে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মার্চ থেকে শুরু হওয়া হামের প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত (২০ আগস্ট) ৯২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হামের উপসর্গে ৮২৬ জন এবং হামে আক্রান্ত হয়ে ৯৯ জন মারা গেছেন। এই শিশুদের মৃত্যু কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি ৯২৫টি পরিবারেরও কান্না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া যায় না। হাম ভাইরাসজনিত ও অত্যন্ত ছোঁয়াচে একটি রোগ। একজন হাম রোগী ১৮ জনকে আক্রান্ত করতে পারে। এটি কেবল সাধারণ জ্বর বা শরীরে ফুসকুড়ি ওঠার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। হাম শিশুর শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস করে দেয়। ফলে সঠিক সময়ে চিকিৎসা ও পুষ্টির অভাব হলে এটি শিশুর শরীরে মারাত্মক নিউমোনিয়া, তীব্র ডায়রিয়া, অপুষ্টি এবং মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো মারাত্মক জটিলতা তৈরি করে। একইসঙ্গে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগ। এর হাত থেকে বাঁচতে ৯ মাস এবং ১৫ মাস বয়সে হামের দুটি ডোজ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো শিশু বাদ পড়লে তাকে দ্রুত ক্যাচ-আপ টিকার আওতায় আনতে হবে। একই সাথে আক্রান্ত শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো এবং দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। তাহলে কেন এতো শিশুর মৃত্যু হয়েছে, হচ্ছে? বিশেষজ্ঞদের মতে, চারটি বড় ভুলের কারণে পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হয়েছে। এগুলো হলো ২০২৪ সালে হাম-রুবেলার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি না করা, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়মিত টিকাদানে গাফিলতি, চলতি বছরে ব্যাপক সংক্রমণের পরও হামকে জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা না করে গতানুগতিক পদ্ধতিতে পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং সর্বশেষ গণটিকা কর্মসূচিতে প্রায় ৪০ লাখ শিশু বাদ পড়ে যাওয়া। সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে টিকাদানে একসময় বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত ছিল। নিয়মিত টিকাদান ও জাতীয় পর্যায়ের বিশেষ কর্মসূচির কারণে হামসহ বিভিন্ন রোগের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব এড়ানো সম্ভব হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিকাদানের ঘাটতিকেই বর্তমান সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হামে মৃতদের ৯০ শতাংশ এ রোগের কোনো টিকা পায়নি। মৃতদের ৭ দশমিক ৯ শতাংশ হামের এক ডোজ টিকা পেয়েছে; আর ২ দশমিক ১৯ শতাংশ হামের দুই ডোজ টিকা পাওয়ার পরও মারা গেছে। হামে মারা যাওয়া মানুষের বয়সভিত্তিক বিভাজনও করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তাতে দেখা যাচ্ছে, মৃতদের ২০ শতাংশের বয়স ৬ মাসের কম; আর ৬ থেকে ৯ মাস বয়স ৩১ শতাংশের। অর্থাৎ হামে মৃতদের ৫১ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম। এদের কারও টিকা দেওয়ার বয়সই হয়নি। এই সংকটের মূলে টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতির পাশাপাশি পুষ্টিহীনতা এবং অসচেতনতাও দায়ী। যেসব শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে এবং মারা যাচ্ছে, তাদের বেশিরভাগই দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের। এসব পরিবারের আর্থিক সঙ্কটের কারণে শিশুরা সুষম খাবারের অভাবে অপুষ্টির শিকার হচ্ছে। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের শরীরে হামের ভাইরাস দ্রুত ফুসফুস ও মস্তিষ্কে সংক্রমণ ছড়ায়। এসব শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় তারা দ্রুত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। এছাড়া মাঠপর্যায়ে রোগ নির্ণয় এবং আক্রান্ত শিশুদের জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আমাদের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এই বিপর্যয় থেকে উত্তরণে সরকারের আরো বেশি উদ্যোগী ভূমিকা হাতে নেওয়া প্রয়োজন। দেশের একটি বড় অংশের শিশুদের মধ্যে প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবারের অভাব রয়েছে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পাওয়া এবং চিকিৎসা সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় জন্ম নেওয়া শিশুর হামে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। তাই বলা যায় হাম শুধু যে একটি ভাইরাসজনিত রোগ, তা কিন্তু নয়। এটি সমাজে সৃষ্টি হওয়া চরম বৈষম্যেরও প্রতিচ্ছবি।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..