জ্বালানি নীতি : ফুলবাড়ি থেকে রামপাল ভুলের মাশুল জনগণ দেবে না
ডা. মনোজ দাশ
দেশে গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিদ্যুতের লোডশেডিং বেড়েছে। কলে-কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই জ্বালানি সংকটকে কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি, গ্যাসের স্বল্পতা কিংবা আমদানি ব্যয়ের সমস্যা হিসেবে দেখলে এর গভীরতর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক চরিত্রটি আড়াল হয়ে যায়। দেশের জ্বালানি সংকটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাষ্ট্রের উন্নয়ন-দর্শন, জ্বালানি নীতি, পরিবেশ নীতি, বিদেশ নির্ভরতা, রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর জনগণের অধিকার এবং সর্বোপরি– উন্নয়নের সুফল ও ব্যয়ের বোঝা কে বহন করবে সেই প্রশ্ন।
এই বাস্তবতায় ফুলবাড়ি থেকে রামপাল বাংলাদেশের জ্বালানি নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইতিহাস। ফুলবাড়ি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জাতীয় সম্পদ ব্যবহারের প্রশ্নে প্রাণ-প্রকৃতি ও মানুষের জীবন-জীবিকা বাদ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। আর রামপাল দেখিয়েছে– বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজন থাকলেও তার জন্য এমন উন্নয়ন মডেল গ্রহণ করা যাবে না, যার পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি বহন করতে হবে সাধারণ মানুষকে।
২০০৬ সালের আগস্টে দিনাজপুরের ফুলবাড়িতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলন বাংলাদেশের জ্বালানি ও জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে। ফুলবাড়ির মানুষের আশঙ্কা ছিল– উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করলে কৃষিজমি, বসতভিটা, পানির স্তর ও স্থানীয় পরিবেশের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছিল, বাংলাদেশের খনিজ সম্পদ ব্যবহারের নীতি কী হবে এবং সেই সম্পদের মালিকানা ও সুবিধা শেষ পর্যন্ত কার হাতে থাকবে। ফুলবাড়ির আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই– প্রাকৃতিক সম্পদ কেবল ভূগর্ভে থাকা একটি ‘পণ্য’ নয়; তার সঙ্গে মানুষের জীবন, জীবিকা, জমি, পানি, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থ জড়িত। একটি দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় তাই প্রশ্ন শুধু ‘কত টন কয়লা উত্তোলন করা যাবে’ তা নয়; বরং প্রশ্ন হচ্ছে– কী পদ্ধতিতে, কার স্বার্থে, কী মূল্যে এবং দীর্ঘমেয়াদে তার সামাজিক ও পরিবেশগত ফলাফল কী হবে?
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে বিতর্কও মূলত এই বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশের বিদ্যুতের প্রয়োজন আছে– এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু ‘বিদ্যুতের প্রয়োজন’– এই সত্য থেকে ‘যেকোনো মূল্যে বিদ্যুৎ চাই’– এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। উন্নয়ন বনাম পরিবেশকে পরস্পরের শত্রু হিসেবে দাঁড় করানো একটি ভুল পদ্ধতি। বাস্তবে জনগণের জন্য প্রয়োজন এমন উন্নয়ন, যা অর্থনৈতিক উৎপাদন বাড়াবে কিন্তু মানুষের জীবন ও প্রকৃতিকে ধ্বংস করবে না। বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি, জ্বালানির ধরন, প্রকল্পের স্থান নির্বাচন, অর্থায়ন, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং প্রকল্পের মালিকানা– সবকিছুই জনস্বার্থের আলোকে বিচার করতে হবে। রামপালকে ঘিরে সুন্দরবনের পরিবেশগত নিরাপত্তা নিয়ে যে দীর্ঘ বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটি তাই নিছক ‘বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষে-বিপক্ষে’ বিতর্ক নয়। এটি উন্নয়ন পরিকল্পনার দর্শন নিয়ে বিতর্ক।
আজ বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট আমাদের সামনে একটি কঠিন বাস্তবতা হাজির করেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, কিন্তু জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত; বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে, কিন্তু সবসময় সেই সক্ষমতা কাজে লাগানো যায় না; গ্যাসের সংকট আছে, তরল জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা রয়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপ জ্বালানি খাতকে আরও দুর্বল করে তুলেছে।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত এখনও বহুজাতিক ও দেশি লুটেরাদের কবল থেকে বের হতে পারেনি, এখনও নীতি নির্ধারণী অবস্থানে তারাই আছে। এখানে একটি মৌলিক বিষয় সামনে চলে এসেছে– বহুজাতিক ও দেশি লুটেরাদের স্বার্থে বিগত সরকারগুলো এমন একটি জ্বালানি কাঠামো তৈরি করেছে, যা বিদেশ- নির্ভর এবং ব্যয়বহুল। এভাবে যদি বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশের জন্য আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেই দেশের অর্থনীতি চাপের মুখে পড়ে। ডলারের বিনিময় হার বাড়লে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়ে। বৈদেশিক মুদ্রার সংকট দেখা দিলে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। আর শেষ পর্যন্ত সেই ব্যয়ের বড় অংশ জনগণকেই বহন করতে হয়– বিদ্যুতের দাম, পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন ব্যয় এবং পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে। অর্থাৎ জ্বালানি সংকট কেবল বিদ্যুৎ না থাকার সমস্যা নয়; এটি মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের সঙ্গেও যুক্ত।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট পরিস্থিতিতে সরকার এলএনজি টার্মিনাল মেরামত এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহে বিদ্যমান কারিগরি দুর্বলতা মোকাবিলায় গুরুতর অদক্ষতা দেখিয়েছে। সরকার নিজেদের অদক্ষতা আর ব্যর্থতার দায় সাধারণ মানুষের উপর চাপানোর চেষ্টাই শুধু করেনি, অযৌক্তিক বাড়তি বিল চাপিয়ে মানুষের বোঝা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং সংকটের সুযোগ নিয়ে দেশি-বিদেশি কিছু ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর অ্যাজেন্ডা পূরণে সক্রিয়তা দেখাচ্ছে।
জাতীয় স্বার্থবিরোধী ভুল নীতির মাশুল জনগণ আর দিতে রাজি নয়। রাষ্ট্র যদি একদিকে নিজস্ব গ্যাস ও খনিজ সম্পদের যথাযথ ব্যবহার, অনুসন্ধান ও ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদে ব্যর্থ হয় এবং অন্যদিকে আমদানিনির্ভর জ্বালানি কাঠামো তৈরি করে, তাহলে তার দায় জনগণের ওপর চাপানো যায় না। আবার যদি জ্বালানি খাতে পরিকল্পনার পরিবর্তে প্রকল্পকেন্দ্রিকতা প্রাধান্য পায়– অর্থাৎ কোন প্রকল্পে কত টাকা বিনিয়োগ হবে, কে নির্মাণ করবে, কীভাবে বিদ্যুৎ কেনা হবে– এসব প্রশ্ন যদি জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তাহলেও শেষ পর্যন্ত জনগণই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জ্বালানি খাতের প্রকল্প মানেই উন্নয়ন নয়। প্রকল্পের সামাজিক লাভ, অর্থনৈতিক লাভ, পরিবেশগত ব্যয় এবং জনগণের ওপর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়– সব হিসাব একসঙ্গে করতে হবে।
দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ জনগণের সম্পদ। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় সম্পদে জনগণের কোনো মালিকানা নেই। এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, বাস্তবে সম্পদ ব্যবস্থাপনায় জনগণের অংশগ্রহণ কতটুকু? বড় প্রকল্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থানীয় জনগণের মতামত কতটা গুরুত্ব পায়? পরিবেশগত প্রভাবের মূল্যায়ন কতটা স্বাধীন? চুক্তির শর্তগুলো কতটা জনসম্মুখে প্রকাশিত হয়? এসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কেবল ‘উন্নয়ন’ শব্দটি উচ্চারণ করলে গণতান্ত্রিক জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হয় না। বিশেষ করে জাতীয় সম্পদ ও জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা অত্যন্ত জরুরি। কোন প্রকল্পে কত বিনিয়োগ হচ্ছে, কী দামে জ্বালানি কেনা হচ্ছে, বিদ্যুৎ কেনার চুক্তির দায় কত বছরের, রাষ্ট্রের আর্থিক ঝুঁকি কত– এসব তথ্য জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।
ফুলবাড়ি থেকে রামপাল পর্যন্ত বিতর্কের কেন্দ্রে তাই একটি মৌলিক প্রশ্নই ফিরে আসে– উন্নয়ন কার জন্য? জনগণের জন্য উন্নয়ন হলে জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষা পরস্পরের বিরোধী হতে পারে না। বরং একটি গণমুখী রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে এমন জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, পরিবেশসম্মত এবং জনগণের নিয়ন্ত্রণাধীন।
কয়লা কোনো সমাধান হতে পারে না।
বর্তমান জ্বালানি সংকটের সময়ে কেউ কেউ আবার ফুলবাড়ির কয়লাকে এই মুহূর্তের সহজ সমাধান হিসেবে সামনে আনতে চাইছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো– ফুলবাড়িতে কি আবার উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলার আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে? কয়লা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা সম্ভব? কয়লার ক্ষেত্রে পরিবেশগত ক্ষতি, আমদানি নির্ভরতা, পরিবহন ব্যয়, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তরের বাস্তবতা বিবেচনা করতে হবে। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশে জ্বালানি পরিকল্পনায় পরিবেশ ও জলবায়ু ঝুঁকিকে উপেক্ষা করা আত্মঘাতী হতে পারে।
বাংলাদেশের জ্বালানি নীতিতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও জনস্বার্থভিত্তিক পরিকল্পনা। প্রথমত, দেশের নিজস্ব গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানি সম্পদের বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ও ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি কমাতে হবে। তৃতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করতে হবে। চতুর্থত, বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়াতে হবে। পঞ্চমত, জ্বালানি খাতে দুর্নীতি, অপচয় ও অস্বচ্ছতা বন্ধ করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো– জ্বালানি নীতিকে বেসরকারি মুনাফা বা স্বল্পমেয়াদি প্রকল্পের বাইরে এনে জাতীয় অর্থনীতি ও জনগণের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। বাংলাদেশের জাতীয় খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর জনগণের শতভাগ মালিকানা নিশ্চিত রাখতে হবে।
আজকের জ্বালানি সংকট আমাদের সেই পুরোনো ভুলগুলো নতুন করে দেখার সুযোগ দিয়েছে। এই সুযোগ যদি কাজে লাগানো না হয়, তাহলে সংকট আরও গভীর হবে। আর তার মাশুল দিতে হবে সেই জনগণকেই। তাই জনস্বার্থভিত্তিক, পরিবেশসম্মত ও আত্মনির্ভর জ্বালানি নীতির জন্য নতুন করে আন্দোলন শুরুর এখনই সময়।
প্রথম পাতা
বঙ্গবন্ধুর অবদান ও শাসনামলের নির্মোহ মূল্যায়ন উভয়ই জরুরি
নিরাপদ কর্মস্থল ও শ্রম আইন কার্যকর করার দায়িত্ব সরকারের
বাংলাদেশ জাসদ অফিস উচ্ছেদ পরিকল্পনার নিন্দা ও প্রতিবাদ
নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে সিপিবির অভিনন্দন
ছাত্র ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দের ওপর ছাত্রদল কর্মীদের হামলা, সিপিবির প্রতিবাদ
‘সততার নমুনা’
হামে শিশুর মৃত্যু : চরম বৈষম্যেরও প্রতিচ্ছবি
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন