সাঁওতাল বিদ্রোহ ও ইতিহাসের এক বীরত্বগাথা

মহসিন রেজা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন পলাশীর প্রান্তরে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। নবাবী শাসনের অবসানের পর ব্রিটিশ কোম্পানি শাসন বিভিন্ন ক্ষতিকর পদ্ধতিতে জনগণের ওপর কর, খাজনা আরোপ করে। লর্ড কর্নওয়ালিস চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন চালু করলে শাসন, শোষণ আর জমিদারদের অত্যাচার উৎপীড়ন বেড়ে যায়। সিপাহী বিদ্রোহ সংগঠিত হওয়ার পূর্বে ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন সাঁওতাল বিদ্রোহ শুরু হয়ে ১৮৫৬ সালের নভেম্বর মাসের দিকে শেষ হয়। এই যুদ্ধ ছিল এক অসম যুদ্ধ। সাঁওতালরা তীর-ধনুক ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বিদ্রোহ শুরু করলে তার বিপরীতে ইংরেজরা বন্দুক, কামান, ঘোড়া, হাতি যুদ্ধে ব্যবহার করেছিল। এ যুদ্ধে ব্রিটিশদের গতি যুদ্ধে রক্তের ইতিহাস লিখতে হয়। সৈন্যসহ প্রায় ২০ হাজার সাঁওতাল নিহত হয়। সাঁওতাল বিদ্রোহ ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল, যার ফলে সাঁওতাল বিদ্রোহ ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরব-এর নেতৃত্বে সাঁওতাল বিদ্রোহ ছিল অত্যন্ত গৌরবের। এই বিদ্রোহ ভারতবর্ষে স্বাধীনতার বীজ বপন করেছিল। শোষণ, বঞ্চনা ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে মহান সিধু, কানু, চাঁদ, ভৈরব ও দুই বোন ফুলমণি, কায়ামণি (ঝানো)-সহ আদিবাসীদের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ শুধু ভারতবর্ষের ইতিহাসে নয়, পৃথিবীর ইতিহাসে এক চিরস্মরণীয় ঘটনা। সাঁওতাল বিদ্রোহ ইংরেজদের বিরুদ্ধে হলেও এটা ছিল মূলত উচ্চবর্ণীয় জমিদার, জোতদার, অসৎ ব্যবসায়ী ও সুদখোর মহাজনদের বিরুদ্ধে। বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার সবচেয়ে বড় আদিবাসী উপজাতি ছিল সাঁওতালরা। পতিত, অনাবাদি জমি কঠোর শ্রম দিয়ে সাঁওতালরা আবাদিত করে ঘর তোলে। ফলে সাঁওতালদের ছিল নিজস্ব জমি-জায়গা। দীর্ঘদিন ধরে সাঁওতালরা এই অঞ্চলে সুখে শান্তিতে নিজেদের সমাজ ও সংস্কৃতিকে নিয়ে বসবাস করছিল। কিন্তু “চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত” এর ফলে সাঁওতালদের জমি উচ্চবর্ণের জমিদার, জোতদারদের হাতে চলে যায়। ফলে সহজ, সরল, শান্তিপ্রিয় সাঁওতালদের ওপর শুরু হয় উচ্চবর্ণের জমিদার, জোতদারদের শোষণ ও অত্যাচার। এর ফলে শান্তিপ্রিয় সাঁওতালরা জমিচ্যুত ও গৃহহীন হয়ে বিহারের হাজারীবাগ, মানভূম, ছোটনাগপুর, পালামৌ ও উড়িষ্যা থেকে বাংলা ও বিহারের সীমান্তবর্তী পার্বত্য এলাকা “দামিল-ই-কোহি” অঞ্চলে চলে আসে এবং বিহারের ভাগলপুর থেকে বাংলার বীরভূম পর্যন্ত বিশাল এলাকা জুড়ে সাঁওতালরা বসবাস শুরু করে। তারা পুনরায় অমানুষিক পরিশ্রমে জঙ্গল পরিষ্কার করে বসতি স্থাপন করে এবং পতিত জমি চাষ-আবাদ করে সোনার ফসল ফলিয়ে নতুন জীবন শুরু করে। কিন্তু চির বঞ্চিত, চির অবহেলিত সাঁওতালদের জীবনে এই সুখ বেশীদিন স্থায়ী হয় না, তাদের জীবনে নেমে এলো উচ্চবর্ণীয় জমিদার, জোতদার, সুদখোর মহাজনদের অত্যাচার, শোষণ। এমনকি তাদের নিজস্ব নিয়মনীতি, সংস্কৃতি, ধর্ম, সবকিছুই হুমকির সম্মুখীন হতো। উচ্চহারে খাজনা চাপায়; খাজনা দিতে না পারায় সুদখোর মহাজনদের নিকট চড়া সুদে টাকা ধার নিয়ে সর্বস্বান্ত হতে থাকে। ধীরে ধীরে একদিকে যেমন জমির মালিকানা হারাতে থাকে, অপর দিকে উচ্চবর্ণীয় জমিদার ও তাহার কর্মচারী, জোতদার, মহাজনদের দ্বারা সাঁওতাল নারীদের ইজ্জত-মহত্ত্বের ওপর, আদিবাসী সংস্কৃতির ওপর আঘাত আসতে থাকে। এসব কারণে আদিবাসীরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। কিন্তুতারা এই অঞ্চল ছেড়ে চলে না গিয়ে উচ্চবর্ণীয় জমিদার মহাজনদের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়। আর মহান বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য এগিয়ে আসেন মহান বীর সংগ্রামী সিধু-কানু দুই ভাইসহ চাঁদ মুর্মু, ভৈরব মুর্মু, ডোমন মাঝি প্রমুখ। ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন ‘হুল’ বা ‘বিদ্রোহ’ ঘোষণা করা হলো। এই বিদ্রোহে সাঁওতালদের মাঠে অন্য আদিবাসী সমাজসহ বিস্তীর্ণ এলাকার কামার, কুমার, তাঁতি, ছুঁতার, দরিদ্র মুসলমানসহ নিম্নবর্ণের মানুষেরা কৃষকেরা যোগদান করেন। এই বিদ্রোহে সিধু-কানুর নেতৃত্বে আদিবাসীদের কাছে প্রথমে তিনবার জমিদার ও জোতদাররা চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়। এরপর জোতদার-জমিদাররা ইংরেজদের কাছে আশ্রয় নেয়। জমিদার আর ইংরেজদের যৌথবাহিনীর কাছে আদিবাসীদের পরাজয় ঘটলেও শত্রুপক্ষও সহজে জয় পায়নি। ভারতের প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলন ও গণসংগ্রামের নাম সাঁওতাল বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহ ছিল আদিবাসী ভূমিপুত্রদের জমি রক্ষার আন্দোলন বা কৃষক আন্দোলন। বর্তমানে ২০১০ সাল থেকেই জাতিসংঘের ১৮৪ টি দেশ হুল দিবস সম্মানের সাথে পালন করা হয়। বিপ্লবী সিঁদু কানু ফুলমনি লাল সালাম। দীর্ঘ এক বছর পাঁচ মাসের এই যুদ্ধে ইংরেজদের হাতি-ঘোড়া সমন্বিত, আধুনিক কামান, বন্দুক সুসজ্জিত বিশাল বাহিনীর কাছে সাঁওতালরা পরাজিত হয়। তবে এটা যুদ্ধ হলেও যুদ্ধ ছিল না, ছিল ইতিহাসের হত্যাকাণ্ড। এই যুদ্ধের বিস্তীর্ণ ভূমি আদিবাসীদেও রক্তে ভিজে গিয়েছিল, যেখানে সেখানে আদিবাসী নর-নারী-শিশুর লাশ পড়ে ছিল। দাহ করার মতোও কেউ ছিল না। ১৭৫টি আদিবাসী গ্রাম সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়। প্রায় ৩০ হাজার আদিবাসী সাঁওতাল এই যুদ্ধে নিহত হয়। সিধুকে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এবং কানু, চাঁদ ও ভৈরব মূর্মূসহ অন্য অনেককে ফাঁসি দেওয়া হয়। সাঁওতাল বিদ্রোহে আদিবাসী নারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে এবং পুরুষদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করে। নেতৃত্ব দেয় সিধু, কানুর বোন ফুলোমণি ও ঝুলোমণি। এই বিদ্রোহে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অত্যাচার নেমে আসে সাঁওতাল নারীদের ওপর। প্রায় ১২ হাজার নারী ও যুবতী ধর্ষিতা হন এবং তিন হাজার নারী ধর্ষকসহ খুন হন। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মাতঙ্গিনী হাজরা, প্রীতিলতা, সরোজিনী নাইডুদের পাশাপাশি ফুলোমণি, ঝুলোমণিদের মতো বীরাঙ্গনা নারীদেরও নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। লেখক : সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..