পুঁজিবাদী শক্তির বিরুদ্ধে বব লড়েছেন ফুটবল আর গান নিয়ে

শুভ চন্দ্র শীল

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

তৃতীয় বিশ্ব থেকে উঠে আসা সুপারস্টার হচ্ছেন বব মার্লে। যিনি রক গানকে মানুষের কাছে তুলে ধরেছেন পুঁজিবাদী শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা আর সৃজনশীল সংস্কৃতি হিসেবে। ৭০ দশকে ঝাঁকড়া চুল, গিটার হাতে মঞ্চে গান গাওয়ার যে সংস্কৃতি বিশ্বে স্থান পেয়েছিল তার অন্যতম এক কারিগর বব মার্লে। তবে, ববকে আমরা সবাই শুধু শিল্পী, সুরকার, গায়ক আর বিপ্লবী হিসেবে জানি। এর বাইরেও তার অন্যতম এক পরিচয় হচ্ছে তিনি ফুটবল খেলতে ভালোবাসতেন। ফুটবলকে তিনি শিল্প মনে করতেন। এককথায় ফুটবলপ্রেমী ছিলেন। জাদুকরী এ গায়ক একবার বলেছিলেন, “যদি আমাকে সত্যিই চিনতে চাও, তবে আমার আর আমার ব্যান্ডের বিপক্ষে একবার ফুটবল খেলে দেখো।” এই একটা কথা থেকেই বোঝা যায়, ফুটবল তার কাছে কেবল বিনোদন ছিল না, ছিল বেঁচে থাকার বড় শক্তি। কষ্ট আর বৈষম্য থেকে মুক্তি পেতে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ফুটবল আর গানকে। তিনি মনে করতেন, মাঠের লড়াইয়ে কে সাদা আর কে কালো- তা বড় কথা নয়; কে ভালো খেলছে সেটাই আসল। ফুটবল তাকে শিখিয়েছিল সবাইকে সমান চোখে দেখতে। মানুষকে মানুষ হিসেবে ভাবতে। খেলার মাঠে বব মার্লে ছিলেন লড়াকু খেলোয়াড়। তাকে বলা হতো ‘মিডফিল্ড জেনারেল’। খুব বড়সড় শরীর না হলেও তিনি ছিলেন ক্ষিপ্র। কাছে বল থাকলে তাকে আটকানো ছিল কঠিন কাজ। পায়ে সবসময় থাকত পছন্দের ‘অ্যাডিডাস কোপা মুন্ডিয়াল’ বুট। তার বন্ধু ও আলোকচিত্রী ডেনিস মরিস একবার বলেছিলেন, “মার্লে যখন ফুটবল খেলতেন, তখন তিনি ছবি তোলা বন্ধ রাখতেন। কারণ ফুটবল খেলার সময় মার্লের মুখে যে আনন্দ দেখা যেত, তা ক্যামেরায় বন্দি করার চেয়ে সরাসরি দেখা ছিল অনেক বেশি প্রশান্তির।” বব মার্লে ছিলেন ব্রাজিল ফুটবলের মস্ত বড় ভক্ত। প্রিয় ক্লাব ছিল সান্তোস আর আদর্শ ছিলেন ‘ফুটবল সম্রাট’ পেলে। তবে শুধু ব্রাজিল নয়, তিনি ইংলিশ ক্লাব টটেনহ্যাম হটস্পারেরও সমর্থক ছিলেন। বিশেষ করে দলটির আর্জেন্টাইন তারকা অসি আর্দিলসের খেলা তিনি পছন্দ করতেন। গান গাওয়া, ফুটবল খেলার বাইরেও মার্লের একটি অজানা শখ ছিল বাঁশি বাজানো। তিনি সুন্দর বাঁশি বাজাতে পারতেন। বিশ্বাস করতেন, বাঁশি বাজালে ফুসফুস ভালো থাকে এবং মন পরিষ্কার হয়। পুঁজিবাদী শক্তির বিরুদ্ধে বব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী ব্লকের (প্রথম বিশ্ব) বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক ব্লকের (দ্বিতীয় বিশ্ব) যুদ্ধ যখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে তখন বেনি বাঁধা লম্বা জটা চুলের ববের কণ্ঠে জেগে ওঠার গান পুঁজিবাদী শক্তির ‘হুমকি’ হয়ে দাঁড়ায়। তার লড়াই ছিল- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী ব্লকের বিরুদ্ধে। জ্যামাইকার এক বস্তিতে জন্ম নেয়া এই শিল্পী বর্ণবিদ্বেষের শিকার হয়েছিলেন জন্মের শুরু থেকেই। কৃষ্ণাঙ্গ মায়ের সন্তান বলে ঠাঁই মেলেনি শ্বেতাঙ্গ সমাজে। শ্বেতাঙ্গ বাবার সন্তান বলে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল কৃষ্ণাঙ্গ সমাজও। সাদা-কালোর দ্বন্দ্ব নিয়ে বড় হওয়া বব সবসময় একটা কথা বলতেন- “যতদিন পর্যন্ত আফ্রিকান মানুষ শান্তি খুঁজে না পাবে ততদিন পর্যন্ত যুদ্ধ চলবে।” যুদ্ধ থামাতে ববের ‘অস্ত্র’ গান সহিংসতা-যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে কর্নসার্ট আয়োজন করত বব। তার প্রতিবাদী গান অনুপ্রেরণা হিসেবে গাওয়া হতো আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে। সংগীতের ক্যারিয়ারে সব মিলিয়ে প্রায় ৫০০ গান লিখেছেন, সুর করেছেন বব মার্লে। এর মধ্যে বিবিসি ‘ওয়ান লাভ’ গানটিকে শতাব্দীর সেরা গান হিসেবে নির্বাচিত করেছে। এছাড়া ১৯৯৯ সালে টাইম ম্যাগাজিন বব মার্লে অ্যান্ড দ্য ওয়েইলার্স অ্যালবামটিকে বিশ শতকের সেরা অ্যালবাম নির্বাচিত করে। জীবনঘনিষ্ঠ গান গাইতেন বলে তিনি পেয়েছেন আকাশ ছোঁয়া জনপ্রিয়তা। মানবতার কথা, সামাজিক ন্যায় আর সুবিচারের পক্ষে লড়েছেন আজীবন। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিতে হয় বিপ্লবী এই শিল্পীকে। তবে মৃত্যুর চার দশক পেরিয়ে আজও বব মার্লের গান বার বার মনে করিয়ে দেয় ‘যুদ্ধ’ বন্ধে তিনি লড়াইয়ের প্রতীক।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..