
ইতালো কালভিনোর জন্ম ১৯২৩ সালে হাভানার সান্তিয়াগো ডি লাস ভেগাসে। তার বাবা ছিলেন একজন কৃষিবিদ, যার বদৌলতে তার শৈশবের একটি অংশ কেটেছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোয়। আর মা ছিলেন একজন উদ্ভিদবিজ্ঞানী। পরবর্তী জীবনে কালভিনো যখন বিখ্যাত হয়ে উঠছেন আর বিশ্বের সামনে হাজির করছেন চির পরিচিত ভঙ্গিমায় অভিনব গল্প কথনশৈলী, তখন এ দুজনের উত্তরাধিকার হিসেবে তাকে খুব গভীরে শনাক্ত করা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ছিলেন ইতালির তুরিনে। সে সময় থেকেই বাম-বলয়ের সঙ্গে তরুণ কালভিনোর ওঠাবসা শুরু। যুদ্ধের পর যোগ দিয়েছিলেন কমিউনিস্ট পার্টিতে। কিন্তু পরে ১৯৫৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের হাঙ্গেরি আক্রমণের প্রতিবাদে পার্টি রাজনীতি থেকে সরে আসেন। মূলত ছোট গল্পই তার বিচরণ ক্ষেত্র। –নেলসন
তাদের দেখে থমকে দাঁড়ালাম। তখন রাত। আর এক নির্জন রাস্তায় একটি দোকানের শাটার নিয়ে কিছু একটা করছিল তারা। অনেক ভারি ছিল শাটারটি। একটি লোহার রড দিয়ে সেই শাটারকে আড় দিচ্ছিল সবাই। কিন্তু শাটারটির নড়ার কোনো নাম নেই।
আসলে আমি এদিক-ওদিক ঘোরাফেরা করছিলাম। নির্দিষ্ট কোথাও যাওয়ার ছিল না আমার। ফলে আমিও হাত লাগাতে চাইলাম। আর তারাও জায়গা করে দিল। ‘এক সাথে, হ্যাঁ’ চিৎকার দিয়ে বললাম, ‘আরো জোরে, হেঁইও।’ সঙ্গে সঙ্গেই আমার ডান দিকের জন আমাকে কনুইয়ের গুতা দিয়ে নিচু গলায় বললো, ‘পাগলা শালা, চুপ। হুনাইতে চাস সবাইরে?’ আমি এমনভাবে মাথা নাড়লাম, যেন মুখ ফসকে বলে ফেলেছি কথাটা।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের সবার ঘাম ছুটে গেল। তবে শেষ পর্যন্ত শাটারটা তোলা গেল, অন্তত ততটা, যতটায় কারো পক্ষে ভেতরে ঢোকা সম্ভব। অতঃপর পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে আমরা ভেতরে ঢুকলাম। আমার হাতে একটা বস্তা দেওয়া হলো। আর অন্যরা এতে বিভিন্ন জিনিস ভরতে লাগল।
পুলিশ দেখে তারা বললো, ‘ওইসব ইন্দুরের দল আবার দেইখা না ফেলে।’ আমিও সায় দিলাম, ‘ঠিক, ওইগুলা দেখতে ইন্দুরের মতোই!’
‘চুপ শালা’ তারা ঝাড়ি দিল, ‘পায়ের আওয়াজ হুনস না?’ কিছুটা ভয়ে ভয়ে কিছুক্ষণ কান খাড়া করে শুনে বললাম, ‘না, না হেরা না..’
শুনে ওদের একজন বললো, ‘বেখেয়াল হইলেই হেরা আসে...।’ আমিও সায় দিয়ে বললাম, ‘ল সবাইরে মাইরা ফালাই।’ এর পর কেউ আসে কিনা দেখার জন্য তারা আমাকে বাইরে পাঠাল।
বাইরে গিয়ে কিছু লোককে দেয়ালের কাছে ঘাপটি মেরে থাকতে দেখলাম। কাছে আসতেই আমিও তাদের সঙ্গে যোগ দিলাম। দোকানগুলো দেখিয়ে আমার পাশ থেকে একজন বললো, ‘ওইদিক থেকে শব্দ আসছে।’ তার দিকে তাকাতেই সে ঝাড়ি দিয়ে বললো ‘গাধা, মাথা নিচে নামা। তারা দেখলেই আবার পালাবে।’
উত্তরে আমিও ‘দেখছিলাম’ বলে মাথা নিচু করে দেয়ালের পাশ দিয়ে এগিয়ে গেলাম।
পেছনে ছিল আরেকজন। সে বললো, ‘চুপচাপ ঘিরে ফেলতে পারলেই শয়তানগুলারে ফাঁদে ফেলা যাবে। সংখ্যায় কিন্তু বেশি না।’
সেই মতো আমরাও পা টিপে এগিয়ে গেলাম। এমনকি শ্বাসের শব্দও হলো না আমাদের। একেবারে শুনশান। এমনকি শুধু ইশারা দিয়েই আমরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলাম।
আর পালাইতে পারব না- বললাম আমি।
এই শুনে কেউ একজন বললো, ‘এইবার চান্দুরা ধরা পড়ব।’
হ, আরেকটু সময় খালি- আমি বললাম।
‘হারামির দল, এইভাবে চুরি..’ কেউ একজন বললো।
হারামির বাচ্চা- বললাম আমি।
এ পর্যায়ে পরিস্থিতি বুঝতে তারা আমাকে দোকানের ভেতরটা দেখতে বললো। কিন্তু আমি ভেতরেই ঢুকে গেলাম। সেখানে একজন নিজের পিঠে বস্তা তুলতে তুলতে বললো- ‘হেগো সাধ্যি কি আমগোরে ধরে?’ আরেকজন বললো, ‘জলদি চল, পিছন দিয়া বাইর হই। ওই দিক দিয়া, একবারে তাগো নাকের ডগা দিয়া পগার পার, হা হা হা।’ আমাদের সবার ঠোঁটে মুহূর্তেই হাজির হল দিগি¦জয়ের হাসি।
‘এইবার এক্কেবারে তাগো পিত্তি জ্বইলা যাইবো’ বললাম আমি। আর আমরা দোকানের পিছন দিয়ে পালিয়ে গেলাম।
‘গর্দভগুলারে আবারো মদনা বানাইছি, কি কস?’ তারা বললো।
‘থাম’ ঠিক তখনই একটি কণ্ঠ বলে উঠলো ‘কে ওখানে?’ আর তখনই বাতিগুলো জ্বলে উঠল। আর আমরা এক সঙ্গে কিছু একটার পেছনে নিজেদের আড়াল করার চেষ্টা করলাম। ভয়ে আমরা পরস্পরের হাত ধরলাম। আর আমাদের মুখগুলো হয়ে উঠলো ফ্যাকাশে। ওরা পেছনের দিকে আসলো। কিন্তু দেখল না আমাদের। ঠিক সে সময় আমরা পাগলের মতো দৌড় শুরু করলাম। আর ‘জিতছি’ বলে সমস্বরে চিৎকার করলাম। কিন্তু আমি দুইবার হোঁচট খেয়ে পেছনে পড়ে গেলাম। টের পেলাম, আমি ঠিক তাদের মধ্যে এসে পড়েছি, যারা আমার আগের দলটিকে ধরার চেষ্টায় ছুটছিল।
‘তাড়াতাড়ি, এইবার ধরা পড়বে শালারা’ বললো তারা। আর সবাই ওই সরু রাস্তা দিয়ে ছুটে গেল তাদের ধরতে।
‘এইদিকে, ছোটো, না না, ওইদিকে..’ আমরা বললাম। তারাও খুব বেশি দূরে ছিল না। তাই আমরা চিৎকার করে বললাম, ‘জলদি, তারা বেশি দূর যেতে পারবে না।’
আমি তাদের একজনকে প্রায় ধরে ফেললাম। সে আমাকে বললো, ‘সাবাশ, তুই পলাইছস। এই দিকে আয়। তাগোরে কাচকলা দেখামু এইবার।’ আর আমি তার সঙ্গে গেলাম। কিছুক্ষণ পর টের পেলাম একটা এঁদো গলিতে আমি একা দাঁড়িয়ে। আর কোথা থেকে একজন ছুটে এসে নিচুস্বরে বললো, ‘জলদি, এইদিকে, আমি দেখেছি। তারা খুব বেশি দূরে না।’ আমি তার দিকে কিছুটা ছুটে গেলাম।
তারপর আমি থেমে গেলাম। ভীষণ ঘেমে গেছি। আর কেউ অবশিষ্ট নেই। আমি আর কোনো চিৎকার শুনতে পাচ্ছি না। পকেটে হাত ঢুকিয়ে দাঁড়ালাম কিছুক্ষণ। তারপর নিজের মতো হাঁটতে শুরু করলাম, কোনো গন্তব্য ছাড়াই।