
[পূর্ব প্রকাশের পর]
কৃষক আন্দোলন : উনবিংশ শতকের শেষভাগে জমিদার জোতদার বিরুদ্ধে বিভিন্ন এলাকায় শতঃস্ফুর্ত আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে ওঠে। কৃষকরা আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে উপলব্ধি করেন জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ করা আশু প্রয়োজন, কিন্তু বৃটিশ শাসন বিলোপ ছাড়া জমিদারকে উচ্ছেদ করা সম্ভব নয়। সুতরাং কৃষক আন্দোলন জাতীয় আন্দোলনেরই অংশ। ইতিমধ্যে নীলকরদের অত্যাচার শোষনের বিরুদ্ধে কৃষকেরা লড়াই করেছে। বাগেরহাটের মোরেলগন্জ্ঞের প্রভাবশালী জমিদার মোরেল সাহেবের অত্যাচার খুলনার নীলকর রেণু সাহেবের বিরুদ্ধে কৃষক আন্দোলন এ অঞ্চলের কৃষকরা অংশগ্রহন করেছে।
১৯২৩-২৪ সালে জাতীয়তাবাদী উদারপন্থী নেতা সৈয়দ নওশের আলী, ওলিয়ার রহমানের নেতৃত্বে নড়াইলের কয়েকটি এলাকায় তেভাগা দাবীতে আন্দোলন শুরু করা হয়। এই আন্দোলনের ফলে মাত্র একবার তেভাগা আদায় করা সম্ভব হয়েছিল। পরবর্তীতে স্হানীয় জমিদার বর্ণ হিন্দুরা জমির মালিক ও পুলিশের সহায়তায় তাহা বেশি দূর এগুতে পরেনি।
১৯২৭-২৮ সালে যশোর খুলনা যুব সংঘের নেতৃস্থানীয় কর্মী প্রমথ ভৌমিক ও তার সহযোগী কর্মীরা সমাজতন্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার পর কৃষকদের মধ্যে কাজ করার প্রতি আকৃষ্ট হন। নেতৃবৃন্দের পরামর্শে যুব সংঘের কর্মী বিষ্ণু চ্যাটার্জি, সুধীর কর্মকার দাকোপের সুতার খালী,জেলে খালী,পাইকগাছার হড্ডা, কুমখালী গ্রামে কাজ শুরু করেন। তাদের এ কাজে সহযোগিতা করেন প্রমথ ভৌমিকের বন্ধু বিশ্বেশ্বর দাস। তিনি জেলে খালী গ্রামের পাঠশালার শিক্ষক ছিলেন। সেখানে গ্রামে গ্রামে নিরক্ষরতা দুরিকরনের জন্য পাঠশালা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২৮ সালে বাগেরহাটের রামপালে কৃষকদের মধ্যে কাজ শুরু করা হয়। রামপালে একটি কৃষক সভা আহবান করা হয় সেখানে বাগেরহাটের কংগ্রেস নেতা ক্ষেত্রনাথ মিত্র, যুব সংঘের প্রমথ ভৌমিক বিভুতি ঘোষ,সচীন বসু,বৈদ্যনাথ কর,জীবন গুহ, ও মনিন্দ্র অধিকারী উপস্থিত ছিলেন।
১৯৩৪ সালে যুব সংঘ কর্মী শচীন বসু, অনীল ঘোষ মৌভোগ ডোবা, বোলুটী, মোল্লাহাটের চুনখোলায় কৃষকদের মধ্যে কাজ শুরু করেন । চুনখোলার হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক কানাই বিশ্বাস তাদের সাথে যুক্ত হন। চিতলমারীতে কুমুদ রানা,বিমল রানা,আনন্দ বাগচি শচীন বসুর সাথে যুক্ত হন।
১৯৩৫-৩৬ সালে কমরেড সুকুমার মিত্র, যুব সংঘের নেতা কৃষ্ণ বিনোদ রায় এবং তাদের সহকর্মী অধীর ঘোষ, অধীর ধর, অমল সেন, গোবিন্দ কুন্ডু, শান্তিময় ঘোষ (বাচ্চু) প্রমূখ নেতৃবৃন্দ বৈঠক করে কৃষকদের মাঝে কাজ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সেই মত গ্রামে গ্রামে কৃষকদের মধ্যে গ্রাম বৈঠক সভা সমাবেশ চালিয়ে যেতে থাকেন। ১৯৩৫ সালে যশোরের ট্রেডিং ব্যাংক ময়দানে প্রথম কৃষক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির বঙ্গীয় প্রদেশিক কমিটির উদ্যোগে ১৯৩৬ সালে কলিকাতার এ্ঢ়ালবার্ট হলে বিভিন্ন জেলার প্রতিনিধি নিয়ে বঙ্গীয় কৃষক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে একটি সাংগঠনিক কমিটি করা হয়। এই সভায় খুলনা থেকে সচীন বসু, অনীল ঘোষ, সহদেব মন্ডল, কানাই বিশ্বাস, বিমল রানা, বিভুতি রায় (১৯৫৪ সালে এমএলএ), সুবল মিত্র, মহেন্দ্র খাঁ, মধু মোল্লা প্রমুখ ও যশোর থেকে সুশীল বসু,অধীর ঘোষ,অধীর ধর সহ কয়েকজন যোগদান করেন। প্রেসিডেন্সী বিভাগের জেলা গুলিতে কৃষক সমিতি গড়ে তোলার জন্য শচীন বসু ও অধীর ঘোষের উপর দায়িত্ব দেওয়া হয়। এতেই স্পষ্ট হয় অবিভাক্ত বাংলায় কৃষক আন্দোলনে যশোর খুলনার অগণী ভুমিকা ছিল।
কলিকাতা থেকে ফিরে এসে শচীন বসু এবং তার সহযোগীগন কৃষক আন্দোলন সংগঠিত করার জন্য ১৯৩৭ সালে মৌভোগে প্রথম খুলনা জেলা কৃষক সম্মেলন আয়োজন করেন। সম্মেলন কেন্দ্র করে জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ চাই,লাঙ্গল যার জমি তার শ্লোগান কৃষকদের ঘরে ঘরে পৌছে যায়। কোলকাতা থেকে ড. ভুপেন্দ্রনাথ দত্ত, বন্মিম মুখার্জি, নীহারেন্দু দত্ত, শ্রমিক নেতা শিবনাথ ব্যানার্জী বাগেরহাটের জাতীয়তাবাদী নেতা উকিলউদ্দীন খোন্দকার উপস্থিত ছিলেন। মৌভোগ খেলার মাঠে প্রায় দশ হাজার কৃষক উপস্থিত হন।
যশোরে প্রথম কৃষক সম্মেলন : ১৯৩৭ সালে অধীর ঘোষ, অধীর ধর,পরিতোষ বসু, গোবিন্দ কুন্ডু,শান্তিময় ঘোষ,অমল সেন, জগদীশ বসু প্রমুখ নেতাদের পরিশ্রমে জেলা বোর্ড ময়দানে কৃষক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে প্রয় পঞ্চাশ হাজার কৃষক যোগদান করেন। সম্মেলনে কৃষক সভার সর্বভারতীয় নেতা বঙ্কিম মুখার্জি বক্তব্য রাখেন, সভাপতিত্ব করেন কুমিল্লার কৃষক নেতা আব্দুল ওয়াহেদ।
সাতক্ষীরা মহাকুমা পাটকেল ঘাটায় এক বড় কৃষক সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান বক্তা ছিলেন কৃষক নেতা সুজাত আলী মজুমদার, শচীন বসু, অনিল ঘোষ,সুবল মিত্র প্রমুখ।
হাটে বাজারে তোলা বন্ধে আন্দোলন : ১৯৪৯-৪০ সালে যশোর খুলনায় হাট বাজারে তোলা বন্ধের আন্দোলন শুরু হয় অচিরেই তাহা ব্যাপকভাবে প্রসার লাভ করে।
যশোরের মনিরামপুর, কেশবপুর, কালীগঞ্জ, নড়াইলের রুপগন্জ্ঞ, তুলারামপুর। খুলনা জেলার ডুমুরিয়া থানার চুকনগর, বটিয়াঘাটা, দাকোপ, পাইকগাছা, বাগেরহাটের ফকিরহাটের মানসা, মোল্লার হাটের চুনখোলা সহ বিভিন্ন হাটে বাজারে এই আন্দোলন বিতৃতি লাভ করে।
আরও কয়েকটি আন্দোলন সংগ্রাম : খুলনার চুকনগর বাজারে জমিদারের ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালীরা ডুমুরিয়া থানার চুকনগর বাজারে সিনেমা প্রদর্শনের আয়েজন করে। গ্রামের গরীবের ছেলেরা বাড়ির ঘটি বাটি বিক্রি করে সিনেমা দেখার জন্য হুড়মি খেয়ে পড়ে তাহাছাড়া এলাকয় চুরি ডাকাতি বেড়ে যায়। কৃষক নেতা বিষ্ণু চ্যাটার্জি নেতৃত্বে সিনেমা বন্ধের জন্য আন্দোলন শুরু হয়। একদিন হাটের দিন গ্রামের লোকজন নিয়ে মিছিল শুরু হয়। জমিদারের লাঠিয়ালরা বিষ্ণু চ্যাটার্জি মাথা ফাটিয়ে দেয়। জনসাধারণের প্রচন্ড বিক্ষোভে কতৃপক্ষ সিনেমা বন্ধ করতে বাধ্য হয়।
পাট চাষ আইন অমান্য আন্দোলন : সরকার আইন করে যে নির্ধারিত জমি ছাড়া অন্য জমিতে পাট চাষ করা যাবে না। আইন অমান্য করে পাট চাষ করলে সেই পাট ধ্বংস করে দেওয়া হতো। কৃষক সমিতি এর বিরুদ্ধে আইন অমান্য আন্দোলন শুরু করে। ডুমুরিয়া শোভনা ও তার আশেপাশে দশ গ্রামে এই আইন অমান্য করে কৃষক পাট চাষ করে। বিষ্ণু চ্যাটার্জি আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।
বাঁধ বাধা -খালকাটা আন্দোলন : খুলনার ডুমুরিয়ার শোভনা সাহস এলাকায় তখন লবণ পানিতে কৃষকের জমি প্লাবিত হয়ে য়েত ফলে জমি অনাবাদি থাকতো। ১৯৪০ সালে কমরেড বিষ্ণু চ্যাটার্জি নেতৃত্বে শাক বেকি নদীতে বাধ দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করে কৃষক সমিতি। সমিতির পতাকা তলে হাজারো কৃষক সমাবেত করে বাঁধ বাধার প্রস্তুতি প্রায় শেষ তখন বাদসাধে প্রতাপশালী জমিদার শৈলেন্দ্র নাথ ঘোষ ১৪৪ ধারা জারী করান। কৃষকরা থেমে থাকিনি রাতের অন্ধকারে দুই শতাধিক হ্যাজাক লাইট জ্বালিয়ে পনেরো শত সেচ্ছাসেবী নিয়ে ৩০ ঘন্টা বিরামহীন কাজ করে যখন বাঁধের কাজ শেষ তখন পুলিশ ১৪৪ ধারা ভঙ্গকারীদের গ্রেপ্তার করতে আসে কিন্তু ঘঠনাস্হলে বিশাল লোক সমাগম দেখে ফিরে চলে যায়। এই বাধের ফলে প্রায় তিন হাজার বিঘা জমিতে ব্যাপক ফসল হয়।
১৯৪২ সালে শোভনার নবাঁকী নদী আবাও বাঁধ বাধার প্রস্তুতি চলাকালে জমিদারের নির্দেশে একই ব্যবস্থা করা হয়। সবকিছু উপেক্ষা করে হাজার হাজার কৃষক খরস্রোতা নবাঁকী নদীতে বাধ দিতে সক্ষম হন। এই নদীতে বাধ দেওয়ার পর উদ্ধার হয় প্রায় ষোল হাজার বিঘা জমি। বিষ্ণু চ্যাটার্জি লাঙ্গল যার জমি তার ভিত্তিতে জমি বন্টন করলেন। কৃষকের কঠোর পরিশ্রমে সোনার ফসল ফললো জমিতে। এই দেখে জমিদার নতুন ষড়যন্ত্র করলো। লাঠিয়াল পুলিশ দিয়ে ধান কাটার কথা চিন্তা করতে লাগলো। কৃষক সমিতি পাঁচ হাজার স্বেচ্ছাসেবী তৈরি করে পাহারা বসালো দিনরাত। একদিন কৃষকরা ধান কাটা শুরু করলো জমিদার তা ঠেকাতে ১৪৪ ধারা জরী করে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করে বিষ্ণু চ্যাটার্জি সহ শতাধিক কৃষক কর্মীকে গ্রেপ্তার করলো। সশস্ত্র পুলিশ গ্রামে ডুকে অকথ্য নির্যাতন করলো।
পরের দিন ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার, গ্রেফতারকৃত নেতৃবৃন্দের মুক্তির দাবীতে প্রায় ত্রিশ মাইল পথ পায়ে হেটে প্রায় তিন হাজার কৃষক খুলনা শহরে উপস্থিত হয়ে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কাছে আরজি পেশ করেন। এই আন্দোলনে জমিদার পক্ষের লাঠিয়াল ধানিবুনিয়ার অক্ষয় মন্ডল,হীরালাল বাইন, কোমর সর্দার, সতীশ বাইন, শরৎ সর্দার, চাঁদমনি মন্ডল, কালীচরণ বিশ্বাসসহ আরও অনেকে কৃষক সমিতির পক্ষে আসেন।
এই গঠনায় জমিদার নতি স্বীকার করে কৃষক সমিতির কথামত জমি বন্টন ও মামলা তুলে নেওয়ার ব্যবস্থা করে।
যশোরে বাধ বাধার আন্দোলন : শোভনার বাঁধ বাধার সাফল্য উৎসাহিত হয়ে কেশবপুর থানার আড়িয়াল খাল বাঁধার আন্দোলন সংগঠিত করেন কৃষক সমিতির যশোরের নেতা অধীর ঘোষ। শোভনা থেকে কৃষকরা সমবেত হন এই বাঁধের কাজে। যশোর খুলনা রিলিফ কমিটি কিছু অর্থ সাহায্য করেন।
খুলনার মৌভোগের বড় জলা খাল খনন : তৎকালীন খুলনা সদরের মধ্য মৌভোগের পার্শে বড়জলা খালের ভরাটের কারনে পানি নিষ্কাশনের সমস্যা দেখা দেয়। কয়েক গ্রামের কৃষকেরা একসাথে বসে খাল খননের দাবীতে আন্দোলন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। বাগেরহাটের মৌভোগ মানসা ও খুলনা সদরের বলোটী, ডোবা, ঘাটভোগ, শিয়ালী, সিন্দুরডাংগা, পিঠে ভোগ, আলাইপুর গ্রামের হাজার হাজার বিঘা জমি পতিত হয়ে গিয়েছিল। কৃষক সমিতির পক্ষ থেকে জেলা নেতা সত্যেন্দ্র প্রসাদ সেনকে সভাপতি ও শচীন বসু কে সম্পাদক করে বড়জলা খাল কাটা কমিটি করা হয়। কমিটির উদ্যোগে এক হাজারের বেশি কৃষককে নিয়ে বিশ মাইল পথ পায় হেটে খুলনা শহরে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কাছে খাল কাটার জন্য অর্থ বরাদ্দের জন্য ধর্না দিয়েছেন। পরে অবশ্যই কিছু টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। বাকী টাকা কৃষক সমিতি গ্রামে গ্রামে গিয়ে কৃষকের কাছথেকে সংগ্রহ করে। কৃষক সমিতি, ছাত্র ফেডারেশন, মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি এবং কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীরা স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী গঠন করে প্রায় এক মাস ধরে লাগাতার কাজ করে খাল খনন সমাপ্ত হয়। শচীন বসুর সাথে যারা সামনে ছিলেন বিভুতি রায়(১৯৫৪ যুক্ত ফ্রন্টের এম এল এ হয়েছিলেন), বিষ্ণু চ্যাটার্জি, অধীর ঘোষ প্রমুখ।
যশোর কৃষক সমিতির উদ্যোগে আলতাপোল, মঙ্গল কোটে খাল কাটার জন্য আন্দোলন সংগঠিত হয়। সরকার পরবর্তীতে টাকা বরাদ্দ দেয়। কৃষক সমিতি নিজস্ব সেচ্ছাসেবী দিয়ে খাল কাটায়। নড়াইলের আউলিয়ার খাল খননের উদ্যোগ গ্রহণ করেন কৃষক নেতা অধীর ঘোষ।
যশোরের পাঁজিয়ায় ৪র্থ বঙ্গবীর প্রাদেশিক কৃষক সম্মেলন : ১৯৪০ সালে পাঁজিয়ায় ৪র্থ প্রাদেশিক কৃষক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। অধীর ঘোষ, অধীর ধর, সুধীর মিত্র, পাঁজিয়ার কৃষক নেতা সুনীল বসুর নেতৃত্বে যশোর জেলা কৃষক সমিতি সম্মেলন আয়োজন করে। কমরেড মুজাফফর আহমদ, বন্মিম মুখার্জি, অধ্যাপক গোপাল হালদার, সৈয়দ নওশের আলী বক্তব্য রাখেন। এছাড়া খ্যাতনামা সাংবাদিক সত্যেন্দ্র নাথ মজুমদার, অধ্যাপক হীরেন মুখার্জি এবং সুরেন গোস্বামী উপস্থিত ছিলেন। প্রকাশ্যে সমাবেশে পঞ্চাশ হাজার কৃষক উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলনে পর খুলনা যশোরের কৃষক কর্মীরা ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে কাজ শুরু করেন।
মৌভোগে তেভাগা আন্দোলন : ১৯৪০ সালে খুলনার মৌভোগ ও পাশ্ববর্তী এলাকায় তেভাগার দাবীতে কৃষক সমিতির উদ্যোগে প্রচারপত্র বিলি করা হয়। এই আন্দোলন সংগঠিত করার জন্য শচীন বসু,অনিল ঘোষ, সুবল মিত্র, প্রভাত মুখার্জির পাশে এসে দাঁড়ান গরিব কৃষক বিভুতি রায়, মহেন্দ্র খা, মধু মোল্লা প্রমুখ। প্রথমে বলোটী গ্রামের ভাগ চাষিরা ধান কেটে নিজেদের ওঠানে তোলেন। শীতের রাতে মশাল জ্বালিয়ে পাঁচ শত কৃষক ধান কাটেন। এর ফলে স্বপ্প জমির মালিকদের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। কৃষক সমিতির পক্ষ থেকে স্থানীয় হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও স্বল্প জমির মালিকদের নিয়ে এক বৈঠকের মাধ্যমে অল্প জমির মালিকদের উপর থেকে তেভাগার দাবী পত্যাহার করা হয়। ফলে। এর ফলে সহজে দাবী আদায় সম্ভব হয়। এই আন্দোলনে বিজয়ের ফলে ব্যাপক গরীব কৃষক সমিতিতে অন্তর্ভুক্ত হয়।
খুলনার নারীমুক্তি আন্দোলন : খুলনা অঞ্চলে নারীদের নিয়ে তিরিশের দশকে অনেক লড়াই সংগ্রাম গড়ে তোলা হয়। নারীমুক্তি তথা নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নারী নেত্রীরা সোচ্চার ছিলেন। ১৯৪১ সালের ডিসেম্বর মাসে কোলকাতায় জাপানের বোমা হামলার পর সারাদেশের মানুষ জাপানি আক্রমণের আশঙ্কায় খুবই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। সেই সময় পার্টির উদ্যোগে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি নামে নারীদের সম্ভাব্য প্রতিরক্ষার জন্য সংগঠিত করা হয়।
খুলনা শহরে চারুলতা ঘোষ, বিপ্লবী নেত্রী ভানু দেবী, অনু সেন প্রমুখ নারী নেত্রীদের প্রচেষ্টায় প্রথমে সাংগঠনিক কমিটি পরে খুলনা জেলা মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি গঠন করা হয়। সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত হন সরলা ঘোষ ও ভানু দেবীকে (ভানু চ্যাটার্জি) সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। খুলনা শহরে এক বড় নারী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে প্রাদেশিক কমিটির নেত্রী রেণু চক্রবর্তী বক্তব্য রাখেন। কয়েক বছরের মধ্যে খুলনা শহরসহ জেলার প্রতিটি প্রান্তে সংগঠন বিস্তৃতি লাভ করে। বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় সংগঠন গড়ে তোলা হয়।
পরবর্তী জেলা সম্মেলনে প্রাদেশিক নেত্রী মণিকুন্তলা সেন, যুঁইফুল রায় উপস্থিত ছিলেন। কমিটি গরিব মেয়েদের শিক্ষার জন্য অনেকগুলো প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। পঞ্চাশের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ও মহামারির সময় ত্রাণ সহায়তা, চিকিৎসা সেবা প্রদান করে। মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি শুরু থেকেই নারীদের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা আদায় ও পুলিশের নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রাম অব্যাহত রাখে। ফলে নারী নেত্রী ভানু দেবীসহ অনেককেই জেলে যেতে হয়।
তিরিশের দশকে যশোরে সমাজ ও রাজনীতি সচেতন বহু নারী তরুণী ও ছাত্রীরা সংগঠিত হয়ে লাবণ্য প্রভা মিত্রকে সভানেত্রী ও চারুশীলা ধরকে সম্পাদিকা করে “নারী মঙ্গল সমিতি” গঠন করেন। এই সংগঠনের মাধ্যমে সামাজিক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক নানা কাজ করা হয়। নড়াইল, ঝিনাইদহ, মাগুরায় সংগঠন বিস্তৃত লাভ করে। জ্যোতির্ময়ী সেন, ক্ষণপ্রভা নাগ, আমিনা খাতুন, চারুলতা ঘোষ, মলিনা নিয়োগী, আঞ্জুমান বেগম, ছাত্রীদের মধ্যে প্রীতিলতা, কনক দাশগুপ্ত, সাধনা দাশগুপ্ত, গৌরী মিত্র, গীতা রায়চৌধুরী (মুখার্জি), নিভা মজুমদার, রেণু দত্ত প্রমুখ নেতৃবৃন্দ সামনের কাতারে ছিলেন।
১৯৩৮ সালে জেলা মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি গঠন করা হয়। তখন বন্দি বিপ্লবীদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য আন্দোলন চলছে। যশোর ট্রেডিং ব্যাংক ময়দানে এক বিরাট সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন গোলাপ কামিনী রায়চৌধুরী (গীতা মুখার্জির পিতামহী)। যশোর-খুলনার নারীদের লড়াই সংগ্রাম পূর্ব বাংলা ছাড়িয়ে কোলকাতা পর্যন্ত পৌঁছায়। এ অঞ্চলের নারীনেত্রী কনক দাশগুপ্ত, গীতা মুখার্জি, ইলামিত্র, জুঁইফুল রায় পরবর্তীতে সারা ভারতের নারী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
শ্রমিক আন্দোলন : খুলনা শহরে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র কটন মিল ছাড়া আর কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছিল না। সুধীর চ্যাটার্জি (বুধু) এখানে অনেক চেষ্টা করে কর্মরত শ্রমিকদের নিয়ে ইউনিয়ন গড়ে তোলেন। শ্রমিকদের মধ্যে থেকে অমূল্য সরকারসহ কয়েকজন নেতৃত্বে উঠে আসেন। পরবর্তীতে পার্টি থেকে রতন সেন শ্রমিক আন্দোলনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এছাড়া রিকশা শ্রমিক ইউনিয়ন, বিড়ি শ্রমিক ইউনিয়ন ও নৌকার মাঝি শ্রমিক ইউনিয়ন গড়ে তোলা হয়।
যশোরে কয়েকটি চিরুনি কারখানা ছাড়া আর কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছিল না। চিরুনি শ্রমিকদের মধ্যে ইউনিয়ন গড়ে তোলা হয়। পরবর্তীতে খুলনা-যশোরে রেল শ্রমিক নিয়ে সংগঠন গড়ে তোলা হয়; যা একসময় সারা বাংলায় বৃহত্তর সংগঠনে পরিণত হয়।
১৯০৮ সালে কুষ্টিয়ায় মোহিনী বস্ত্রকল প্রতিষ্ঠা হয়। মোহিনী মিলে বর্ধমান থেকে দায়িত্ব নিয়ে নিত্যানন্দ মজুমদার শ্রমিকদের সঙ্গে কাজ করতে আসেন। তিনি বেশকিছু শ্রমিককে সংগঠিত করেন। ১৯৩২ সালে শেখ রওশন আলী শ্রমিক হিসেবে মিলে যোগ দেন। শেখ রওশন আলীর প্রচেষ্টায় ১৯৩৪ সালে মোহিনী বস্ত্রকলে মজদুর ইউনিয়ন গঠিত হয়। মজদুর ইউনিয়ন একসময় শ্রমিকদের প্রাণের সংগঠন হয়ে ওঠে এবং শেখ রওশন আলী হন এ অঞ্চলের অবিসংবাদিত শ্রমিক নেতা।
এভাবে ১৯২৫ সাল থেকে দেশভাগ পর্যন্ত পূর্ববঙ্গের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে কমিউনিস্ট পার্টি ও বিভিন্ন গণসংগঠন গড়ে ওঠে এবং লড়াই সংগ্রামে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করে।
(লেখার জন্য যেসব বইয়ের সাহায্য নেয়া হয়েছে: ‘ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে যশোর খুলনা’, ‘অমর কৃষক নেতা বিষ্ণু চ্যাটার্জি’, ‘ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ও আমরা’, ‘ডাক দিয়ে যাই’, ‘জীবন সংগ্রাম’)।
লেখক : সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, সিপিবি