নয়া যুক্তফ্রন্টের সন্ধানে : ত্রয়োদশ কংগ্রেস-উত্তর সিপিবির রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ

আরিফুল ইসলাম নাদিম

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
জাতীয় সংসদে এখন এক নতুন দৃশ্যপট। ধানের শীষের বিএনপি সরকারি দল, দাঁড়িপাল্লার জামাত প্রধান বিরোধী দল। উপর থেকে দেখলে এই দুই শক্তির মধ্যে দ্বন্দ্ব তীব্র মনে হলেও, অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রশ্নে এই বিরোধ মৌলিক নয়, বরং সাময়িক ও আপসযোগ্য প্রকৃতির। এই বিশ্লেষণ থেকেই পার্টির নতুন রণকৌশল তৈরি হয়েছে, যার মূল কথা হলো ক্ষমতাসীন ও আনুষ্ঠানিক বিরোধী দল দুই পক্ষের বিরুদ্ধেই সমান জোরে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া। গত বছরের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত সিপিবির ত্রয়োদশ কংগ্রেস পার্টি সদস্যদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে। কংগ্রেসের নির্দেশনার ভিত্তিতে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় কমিটি পার্টির সকল সদস্যের কাছে একটা বিস্তারিত আহ্বান পাঠিয়েছে, যেখানে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ এবং সাংগঠনিক কর্তব্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই দলিল সিপিবির অভ্যন্তরীণ চিন্তাভাবনার একটা স্পষ্ট জানালা খুলে দেয়। তিনটি শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই কেন্দ্রীয় কমিটির বিশ্লেষণে একটা গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, দেশি-বিদেশি শাসকশ্রেণি একটা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি করতে চায়–হয় ধানের শীষ বনাম দাঁড়িপাল্লার নতুন বিন্যাস স্থায়ী করা, নয়তো নৌকাকে ফিরিয়ে এনে পুরনো দ্বি-দলীয় কাঠামোয় ফেরা। এই প্রক্রিয়ায় এনসিপির মতো নতুন শক্তিকে কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সে দিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। এই শক্তিগুলোর জনতুষ্টিবাদী বক্তব্য, বিরাজনীতিকরণের প্রলোভন বা সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা সৃষ্টির প্রচেষ্টা–কোনোটাই দেশের মৌলিক অর্থনৈতিক সংকটের সমাধান দেবে না। এপ্রিলে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্লেষণে বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথমবার প্রধান সংসদীয় বিরোধী দলের আসনে এমন একটা শক্তি বসেছে, যে শক্তি স্বাধীনতাবিরোধী, উগ্র সাম্প্রদায়িক ও ফ্যাসিস্ট ভাবধারার বলে চিহ্নিত। ফলে সরকারি দলের পাশাপাশি এই বিরোধী দলের বিরুদ্ধেও রাজপথে জোরদার লড়াইয়ের আহ্বান জানানো হয়েছে। সঙ্গে তৃতীয় একটা ফ্রন্টের কথাও বলা হয়েছে–পতিত আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের বিরুদ্ধে সতর্কতা, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো–ক্ষমতা ধরে রাখতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও বাহিনীকে ব্যবহার করে বিরোধীদের ওপর জুলুম নির্যাতন, গুম খুন, আন্দোলনকারীদের নির্বিচারে হত্যা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে দলীয় সম্পত্তিতে রূপান্তরের চেষ্টা। এই প্রেক্ষাপটে দলটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে একটা স্বতন্ত্র মার্কসবাদী ন্যারেটিভ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে। নয়া যুক্তফ্রন্টের রণকৌশল গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষ যে শোষণমুক্ত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রত্যাশা করেছিল, তা এখনও অধরা। অন্তর্বর্তীকালীন বন্দোবস্তের প্রবক্তারাও অর্থনৈতিক নীতির মৌলিক প্রশ্নে কিছু স্পর্শ করেননি, বরং পুরনো বুর্জোয়া কাঠামোই কার্যত টিকিয়ে রাখছেন। এই শূন্যতা থেকেই পার্টির কংগ্রেসে নতুন রণধ্বনি নির্ধারণ করেছে–বাম-গণতান্ত্রিক শক্তির নেতৃত্বে নয়া যুক্তফ্রন্ট গড়া এবং শোষণ-বৈষম্যবিরোধী গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা। এই রণকৌশল বাস্তবায়নের জন্য তিনটি সমান্তরাল কাজে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, যার তিনটি সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা–পার্টি গড়ো, ফ্রন্ট গড়ো, লড়াই করো। পার্টি গড়ার অর্থ লেনিনীয় নীতি অনুসরণ করে সংগঠন মজবুত করা, গণসংগঠন বিস্তৃত করা এবং কমিউনিস্ট ঐক্য প্রতিষ্ঠা। ফ্রন্ট গড়ার অর্থ বাম-গণতান্ত্রিক বিকল্প শক্তি সংগঠিত করে তার নেতৃত্বে সরকার গঠনের উদ্যোগ নেওয়া। আর লড়াই করার অর্থ স্থানীয় থেকে আন্তর্জাতিক- সব স্তরে শ্রেণিসংগ্রাম অব্যাহত রাখা। দলটি স্বীকার করছে, বর্তমানে এমন কোনো একক দৃশ্যমান বামপন্থি শক্তি নেই যা একা এই পরিবর্তন আনতে পারে, তাই জোটবদ্ধ প্রচেষ্টার ওপরই সব জোর দেওয়া হচ্ছে। সাংগঠনিক দুর্বলতার খোলামেলা স্বীকৃতি ত্রয়োদশ কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় কমিটির রিপোর্টে পার্টির ভেতরের সমস্যাগুলো নিয়ে একটা অস্বাভাবিক রকম খোলামেলা আত্মসমালোচনা দেখা যায়। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, সদস্যদের আদর্শগত মান ও শৃঙ্খলায় ঘাটতির কারণে পার্টিতে অকমিউনিস্টসুলভ সংস্কৃতি অনুপ্রবেশের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধির হার কম, এবং তরুণ, নারী ও শ্রমিকশ্রেণি থেকে আগত সদস্যদের অনুপাত প্রত্যাশার তুলনায় অনেক নিচে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সমস্যা হলো বুনিয়াদি সংগঠন-শাখা পর্যায়ের নিষ্ক্রিয়তা। রিপোর্টে স্বীকার করা হয়েছে, কোনো কোনো শাখার কার্যক্রম শুধু সদস্যপদ নবায়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে, মাঝখানে নিয়মিত সভা বা কাজকর্ম হচ্ছে না। ফলে অনেক সদস্য পার্টির রাজনীতি নিয়ে আপডেট থাকতে পারছেন না, এবং ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের সঙ্গে তলার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এই বাস্তবতা থেকেই কেন্দ্রীয় কমিটি ষোলোটি সাংগঠনিক কর্তব্য নির্ধারণ করেছে, যার মধ্যে আছে সমালোচনা-আত্মসমালোচনার চর্চা বাধ্যতামূলক করা, গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা অনুসরণ, কঠোর শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভ্যন্তরীণ বিষয় প্রকাশ বন্ধ করা। দলিলে নেতৃত্ব নির্বাচন প্রসঙ্গে একটা গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত অবস্থানও স্পষ্ট করা হয়েছে- ব্যক্তির প্রতি আনুগত্য নয়, পার্টির প্রতি আনুগত্যই হওয়া উচিত মূল মূল্যবোধ, এবং নেতৃত্বকে শ্রদ্ধা অর্জন করতে হবে, তা দাবি করে নেওয়া যাবে না। পাশাপাশি বড় জেলায় অন্তত তিনজন এবং ছোট জেলায় অন্তত একজন সার্বক্ষণিক সংগঠক নিয়োগের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী দুই বছরের মধ্যে। তাৎক্ষণিক কর্মসূচি কংগ্রেস-পরবর্তী সময়ে পার্টি যে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছে তার শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সম্পাদিত বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তোলা, যাকে দলটি দেশবিরোধী বলে চিহ্নিত করছে। এই আন্দোলন একক পার্টির পরিসরে না রেখে বৃহত্তর বাম-গণতান্ত্রিক জোটের মাধ্যমে তৃণমূলে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। অন্যান্য অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সতর্কতা, সংস্কার বিতর্কে প্রগতিশীল প্রস্তাব নিয়ে সক্রিয় থাকা, চাঁদাবাজি-লুটপাটের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়া, এবং আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনে সংহতি জানানো। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের দুর্নীতি নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবিও তোলা হয়েছে। সাংগঠনিক কর্মসূচির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- পার্টির মুখপত্র সাপ্তাহিক একতার প্রচার সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ, একটা নতুন নারী সংগঠন গঠনের প্রক্রিয়া, এবং বিভক্ত গণসংগঠনগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রচেষ্টা। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে জেলাগুলোকে উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ের প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, এবং দলীয় প্রতীক কাস্তে সব প্রচারণা সামগ্রীতে ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পর্যবেক্ষণ পার্টির এই নির্দেশনা একটা পার্টির অভ্যন্তরীণ চিন্তা-প্রক্রিয়ার বিরল প্রকাশ্য নমুনা। একদিকে পার্টি একটা বৃহৎ রণনৈতিক লক্ষ্য–বাম-গণতান্ত্রিক জোটের নেতৃত্বে বিকল্প সরকার নির্ধারণ করেছে, অন্যদিকে নিজেদের সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে যে স্পষ্টতার সঙ্গে কথা বলেছে, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তুলনামূলকভাবে ব্যতিক্রমী। তবে লক্ষ্য আর বাস্তবতার মধ্যে দূরত্ব এখনও স্পষ্ট–পার্টি নিজেই স্বীকার করছে, এখনও এমন কোনো একক দৃশ্যমান বাম শক্তি নেই যা ঘোষিত লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে পারে। আগামী দিনে পার্টি সদস্যদের প্রচেষ্টায় এই ফাঁক কতটা পূরণ হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে সিপিবির ‘নয়া যুক্তফ্রন্ট’ স্লোগান নিছক আকাঙ্ক্ষা থেকে রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপান্তরিত হবে কি না। লেখক : সংগঠক, সিপিবি, কেন্দ্রীয় কমিটি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..