মাদক নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় করণীয়

আকমল হোসেন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

২৬ জুন ছিলো মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার এবং অবৈধ পাচার বিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস। ১৯৮৭ সালের ৭ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভার আলাকে ইউএনজিএ সংস্থার মাধ্যমে মাদকমুক্ত বিশ্ব গড়ার লক্ষ্যকে সামনে রেখে দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং ১৯৮৮ সাল থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশ সরকারও মাদকাসক্তি মুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করছে। ঊনবিংশ শতাব্দির প্রথম দিকে ব্রিটিশের দ্বারা চীনে আফিম পাচারের চেষ্টা চালায়, লিন জেক্সাস নামে একজন চীনা কর্মকর্তার চেষ্টায় সেটাকে প্রতিহত করা হয়, সেটার স্মরণেই উক্ত দিনটিকে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার এবং অবৈধ পাচার বিরোধী দিবসটি পালনের সূত্রপাত। এ বছরও বাংলাদেশের মতো সারা বিশ্বে দিবসটি পালিত হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে দিবসটি পালনের বিভিন্নমুখী কর্মসূচি পালিত হয়েছে তবে দিনটিতে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হওয়ার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেইভাবে দিবসটি পালনের সুযোগ ছিলো না। বাংলাদেশে মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য ১৯৯০ সাল, ২০১৮; ২০২০ সর্বশেষ সরকার মাদক নিয়ন্ত্রণ আইন-২০২৬ নামে জাতীয় সংসদে বিল আকারে উত্থাপন করেছে। আইন যেটাই আছে তা বাস্তবায়ন হলে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, যেমন সম্ভব হয়েছে সিঙ্গাপুরে। সঠিকভাবে সমস্যা শনাক্তকরণের ওপরই সমাধান নির্ভর করে–কথাটি বলেছিলেন বিশিষ্ট দার্শনিক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন। ১৯৭৩ সালে সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট লিউ কান ইয়ো, সিঙ্গাপুরের মূল সমস্যা হিসেবে মাদকাসক্তিকে শনাক্ত করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, মাদকাসক্তি সকল অপরাধের মা। মাদক দূরীকরণে মিজুজ অব ড্রাগ অ্যাক্ট আইন জারি ও তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং সিঙ্গাপুরকে মানুষের জন্য বসবাসের উপযোগী দেশে পরিণত করা সম্ভব হয়েছে। এশিয়ার সবচেয়ে বাসযোগ্য ও নিরাপদ শহর হলো সিঙ্গাপুর, যে দেশের মানুষের উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হয়েছে এবং মানুষের গড় আয়ু ৮৫ বছর। সাম্প্রতিক সময়ই শুধু নয়, বেশ পূর্ব থেকেই বিশেষ করে প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে জানা যাচ্ছে, মাদক ক্রয়ের টাকা না পেয়ে মা-বাবাকে অনেক সন্তান হত্যা ও নির্যাতন করছে। আবার অনেক বাবা-মা নেশাগ্রস্থ সন্তানকে মাদকমুক্ত করতে তাদের সন্তানদের আইন শৃংখলা বাহিনীর নিকট সোপর্দ করছে। দুটি ঘটনাই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার বিষয়। বাবা-মার নিকট সন্তানের চেয়ে বেশী প্রিয় আর কি হতে পারে? তবু এই প্রিয় মানুষগুলিকে পুলিশে দিচ্ছে একটাই উদ্দেশ্য সন্তানদের কল্যাণ, নিজে অপারগ হয়ে সন্তানকে ভাল করতে পুলিশের দ্বারস্থ হচ্ছে। কোন পিতা-মাতা এ ধরণের নেশার সাথে য্ক্তু থাকলেও তার সন্তানেরা নেশাগ্রস্থ হোক এটা কিন্তু সে চায় না। তামাক, বিড়ি, সিগারেট, গুল, আলা-পাতা, জর্দা প্রাথমিকভাবে এগুলি দিযে শুরু, ফেন্সিডিল, প্যাথেডিন, মদ, হিরোইন, সর্বশেষ ইয়াবা বড়িতে এসে পৌঁছেছে। মাদক বিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস আছে, মাদক নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তর আছে শিক্ষা কারিকুলামে মাদকের ক্ষতিকর ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন করার উদ্যোগ আছে। বিড়ি সিগারেট জর্দার প্যাকেটেও এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করার ব্যবস্থা আছে তবু কেন যেন, নিয়ন্ত্রনে আনা যাচ্ছে না, এর উত্তর নিয়ন্ত্রনকারী কর্তৃপক্ষই দিতে পারবেন। সর্বপরি এগুলি ব্যবহারের অপরাধে জেল জরিমানার আইনগত ব্যবস্থা আছে। সকল ব্যবস্থাই যেন রেজিস্ট্রেন্ট পাওয়ার হারিয়েছে।যেন কোনটাতেই কাজ হচ্ছে না। ক্রনিক ডিজিজের মত আরোগ্যযোগ্য নয় । সর্বশেষ মাদক ব্যবসায়ীদের ক্রস ফায়ারের মাধ্যমে হত্যর মধ্য দিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রনের ঘটনাই পূর্বের ঘটনার সত্যতা প্রমাণ করছে। আর এই ক্রস ফায়ার নিয়ে শুধু মানবাধিকার কর্মী, সচেতন জনতা, রাজনৈতিক দলই শুধু সোচ্চার নয়,স্বয়ং সরকার ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল সমর্থিত বুদ্ধিজীবীরাও সরব হয়েছেন মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে।।মাদক সেবন মাদক সেবিদের ধিরে ধিরে অসুস্থ ও কর্মহীন করে তুলছে। এতে ব্যক্তি ও পারিবারিক ক্ষতিই শুধু হচ্ছে না, দেশ জাতি বঞ্চিত হচ্ছে ঐ সকল মানুষের সামাজিক সেবা, উৎপাদনশীলতা থেকে। অজানা/অদেখা বা নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি মানুষের কৌতুহল একটু বেশী থাকে। যুব সমাজের অতি উৎসাহী মনোভাব, অভিভাবকের প্রাথমিক পর্যায়ে সন্তানদের প্রতি খেয়াল না করা, হাত খরচ বাবদ বেহিসেবি অর্থ সরবরাহ, ভাল সঙ্গের সাথে চলা ফেরা না করা, সর্বপরি মাদক প্রাপ্তির সহজ লভ্যতা এবং সামাজিক প্রতিরোধের ব্যবস্থা পর্যাপ্ত না থাকার কারণে মাদকের প্রতি ঝুকছে মানুষ। তামাক, জর্দার পণ্যে সরাসরি বিজ্ঞাপন প্রদানের ব্যবস্থা না থাকলেও তামাকজাত দ্রব্যের কোম্পানীগুলির বিক্রয় প্রতিনিধি হাটে-ঘাটে বাজারে নামিয়েছে ছোট খাট দোকান, বাস, স্টিমার, লঞ্চ, ফেরী ও ট্রেন লাইন জনবহুল এলাকায় ফেরি করে বিক্্ির করছে তাতে মাদকজাত দ্রব্রের সহজলভ্যতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। মাদকদ্রব্য ব্যবহারে পৃথিবীর মর্ধে প্রথম মাকিৃন যুক্তরাষ্ট্র আরঅবৈধ উদপাদন এবং পাচারের তালিকায় রয়েছে মায়ানমার ও আফগানিস্থান। দেশের কৃষি জমিতে উৎপন্ন হচ্ছে তামাক। কোম্পানীগুলি কৃষকদের তামাক চাষে উদ্বুদ্ধ করতে আগাম টাকা দিচ্ছে, পরে তামাক নিয়ে টাকা উসুল করছে। তামাক কোম্পানীর নিকট থেকে বড় অঙ্কের ট্যাক্স পাচ্ছে সরকার, এমনতর অজুহাতে তামাকের ব্যবসা রাষ্ট্রীয়ভাবেই সহায়তা পাচ্ছে। অন্যদিকে মাদকের ব্যবসার সাথে ইদানিং যারা জড়িত হয়েছে তাদের মধ্যকার শক্তিশালী ও নীতি নির্র্ধারণকারী, সমাজের কিছু সংখ্যক এলিট, রাজনীতিক, পুলিশ প্রশাসনের লোক। সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন মিডিয়ার অনুসন্ধানী রিপোর্টে সেটি আরও পরিষ্কার হয়েছে। মধ্য পর্যায়ে সন্ত্রাসী রাজনৈতিক কর্মী, বস্তিবাসী, ছিন্নমূল শিশুদের মাধ্যমে এগুলির বাজারজাত করছে। সব সময়ই দেখা যায় পুলিশ প্রশাসনের মুষ্টিমেয় মানুষের দ্বারা এবং ক্ষমতাসীন রাজনীতির কিছু লোকের কারণে এটা প্রতিরোধ কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় এবং প্রশাসনের হাতে ধরা পড়লেও ক্ষমতাসীনদের প্রভাবে বিচারকের কাঠগড়ায় যাওয়ার আগেই ছাড়া পেয়ে যায়। আইনের শাসনের ঘাটতি এমনকি প্রয়োগের অভাবে আজকে মাদকের ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যে কারণে মাদক ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রন করতে ক্রস ফায়ারের মত অবিচারিক পথ অনুসরণ করতে হয়েছে। একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশে বিচার ছাড়া মানুষ হত্যা, সে যত বড় অপরাধীই হোক কোনভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। পৃথিবীর অনেক দেশে বিচারের মাধ্যমেও মানুষকে হত্যার বিধানও রহিতকরণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে বিচারে মৃত্যুদন্ডের বিধান রয়েছে, সেখানে বিচার ছাড়া রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের মাধ্যমে হত্যার আশ্রয় নেওয়ার প্রয়োজন কেন? সত্যকে আড়াল করতেই এ উদ্যোগ কিনা,এমন প্রশ্ন সামনে এসেছে। তবে এ কথা সত্য, জ্ঞানীদের জ্ঞানী মনীষী সক্রেটিস বলে গিয়েছেন, “মানুষ জ্ঞানের আধার” - মানুষকেই নিয়ে পৃথিবীর সকল কর্মকান্ড। সেখানেই মানুষ মেরে নয়, বাঁচিয়ে রেখেই তাকে সংশোধন করতে হবে, এর জন্য আইন, বিচার, শাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তবে সেই সাথে বেশী যেটা প্রয়োজন সেটা হলো মানুষকে আত্ম উপলব্ধির জায়গায় আনার প্রয়োজন, সচেতন করার প্রয়োজন, নৈতিক শক্তিকে শানিত করার জন্য। সামাজিক সচেতনতা এবং নৈতিক শিক্ষা সকল অনাচার প্রতিরোধে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে। এ জন্য সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ক্লাব/সমিতিগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ জন্য এই সকল প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত শিক্ষক, মৌলবী, উন্নয়নকর্মী, সমবায়ী কর্মী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাদেরকে এ কাজে যুক্ত করা যেতে পারে। মাদক নিরসনে সামাজিক সচেতনতা আর প্রতিরোধই প্রধান উপায় হতে পারে। মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রনে পুলিশ প্রশাসনের কঠোর ব্যবস্থা এবং মাদকসেবী অথবা ব্যবসায়ীদের রাজনৈতিক শেল্টার প্রদান বন্ধ করা জরুরি। প্রশাসন আর রাজনৈতিক দল বিশেষ করে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল যদি মনে করে, সমাজ থেকে মাদক, চাঁদাবাজি নির্মূল করবে তাহলে কোনভাবেই এটা সমাজে থাকার কথা নয়। ফসল রক্ষায় বেড়া দেওয়া হলো, সেই বেড়াতেই যদি ফসল খায় তাহলে সেই ফসল রক্ষা সম্ভব না, তেমনি যাদের দায়িত এগুলি দমন করা ,তারাই যদি এ কাজে যুক্ত থাকে বা সহায়তা করে তাহলে মাদক নিয়ন্ত্রন সম্ভব নয়। মিডিয়ার অনুসন্ধানী রিপোর্টও পুলিশ প্রশাসনের তালিকায় মাদকের সাথে যুক্ত থাকায় যাদের নাম এসেছে তাদেরকেই আগে সংশোধন করা প্রয়োজন। কোন এমপি’র গাড়িতে ইয়াবার চালান গেলে সেটা ধরার ক্ষমতাও সাধারণ পুলিশের আছে কিনা-সে বিষয়টারও আইনি সুরাহা হওয়া দরকার। এ জন্য সরকার ও পুলিশ প্রশাসনের আন্তরিকতা আর সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষাই মাদকের ভয়াবহতা থেকে জাতি রক্ষা পেতে পারে। সভ্যতার কারিগর যুব সমাজ, যুগে যুগে সেটাই প্রমানিত হয়েছে, সেই কারিগরদের কৌশলে চেতনাহীন এবং শারিরীকভাবে অক্ষম করে দিলে সাময়িক সময়ের জন্য শাসক ও শোষকেরা রক্ষা পেলেও চূড়ান্ত বিচারে রক্ষা পাওয়ার কোন সুযোগ নেই, ইতিহাসই তার বড় উদাহরণ। বাংলাদেশে ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারের পতন, সর্বশেষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে গড়ে ওঠা গণজাগরণের আন্দোলন ও ২০২৪ সালে ফ্যাসিবাদের পতন,সেই সত্য প্রকাশ করে। যুব সমাজকে ভেবে দেখতে হবে, মাদকের নেশায় জীবনপাত বুদ্ধিমানের কাজ নয়, এ জীবনে অনেক ভাল কাজ করার তাগিদ আছে, তোমাদের প্রতি জাতির আকাঙ্ক্ষা আছে, তোমাদের পেছনে জনগণের বিনিয়োগ আছে,তোমাদের সেই ঋণ পরিশোধ এবং সুন্দর পৃথিবী গড়ার কাজে আগুয়ান হওয়া দরকার। মাদক সেবনে মৃত্যু আর বীরের মৃত্যু এক নয়, বিষয়টি ভেবেই মাদক থেকে দূরে থাকার দৃঢ় অঙ্গিকার এখনই নিতে হবে। দেশের বড়-বড় আবাসিক হোটেল, পর্যটন এলাকা এবং দেশের সীমান্ত এলাকা দিয়ে একদেশ থেকে অন্য দেশে মাদক পাচার হচ্ছে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রনে অবৈধ পাচারকেও রুখে দিতে হবে , কাজটি সম্পাদনের জন্য পরিবার,কমিউনিটি ( শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান,পুলিশ প্রশাসন আর রাজনৈতিক দলের সম্মিলিত উদ্যোগে সামাজিক আন্দোলন যেমন প্রয়োজন সেই সাথে প্রয়োজন আইনের শাসনের বাস্তবায়ন। লেখক : কলেজ অধ্যক্ষ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..