কমরেড আজিজুল হক

অশান্ত সাগর, লাল জাহাজ আর ভালোবাসার সওদাগর

পূর্ণেন্দু দে বুবাই

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

মনটা বিষণ্ন। সব কিছু কেমন ঘোরের মতো লাগছে। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রাণচঞ্চল শিশুগুলো হারিয়ে গেল, আর আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেল, কতটা অপরিকল্পিত, অদূরদর্শী ও অপরিণামদর্শী আমরা। মাইলস্টোন যখন চোখ কে ঝাপসা করে দিচ্ছে, তখন হঠাৎ সংবাদ পেলাম, বিশিষ্ট মার্ক্সবাদী চিন্তক, নকশালবাড়ি সংগঠকদের শেষ প্রতিনিধি, বিশিষ্ট লেখক-কবি কমরেড আজিজুল হক আর নেই। সালটা ১৯৯৪। খুলনার সিপিবি ও গণমানুষের প্রিয় নেতা প্রয়াত কমরেড ফিরোজ আহমেদ আর আমি কলকাতা তে গিয়েছিলাম। দক্ষিণ কলকাতার একটি বাড়িতে থাকি। একদিন ফিরোজ ভাই বললেন, চল, কমরেড আজিজুল হকের সাথে দেখা করে আসি। “কারাগারের আঠারো বছর”সহ আজিজুল হকের লেখা কয়েকটি বই সবে পড়েছি, ভেতরে দারুন একটা উত্তেজনা এবং রোমাঞ্চ। প্রবল আগ্রহে ছুটলাম। তথ্য সংগ্রহ করে জেনেছিলাম, কমরেড আজিজুল হক দক্ষিণ কলকাতার প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডের কোন একটা বাড়িতে থাকেন। সুনির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা জানা নেই। প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডের এক প্রান্ত থেকে হাঁটা শুরু। পা চলছে, হৃদয়ে স্বপ্ন ও রোমাঞ্চ। পথ চলতি মানুষকে জিজ্ঞেস করি, কেউ তেমন করে কিছু বলতে পারেন না। বুঝেছিলাম, ইট কাঠ পাথরের কংক্রিটের জঙ্গলে যান্ত্রিক মানুষগুলো কমরেড আজিজুল হককে চিনবেনই বা কেন? অবশেষে ভাবলাম, উষা ফ্যাক্টরিতে যাই, ওখানে নিশ্চয়ই কমরেড আজিজুল হককে চেনা মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে। উষা তখন বন্ধ। কিন্তু শ্রমিক কলোনিতে কিছু শ্রমিকের বসবাস। একজন বয়স্ক শ্রমিক কমরেড আজিজুল হককে চিনলেন। বাড়ি চিনিয়ে দিতে তিনি আমাদের সহযাত্রী হলেন। লোহার গ্রিলের ছোট্ট গেট, গেট পেরিয়ে দরজায় কড়া নাড়তেই একজন ভদ্রমহিলা বেরিয়ে এলেন। পরিচয়ে জানলাম, উনি কমরেড আজিজুল হকের স্ত্রী। আমাদের ঘরে নিয়ে বসালেন। একেবারে সাধারণ আটপৌরে একটা ঘর। কোন আতিশয্য চাকচিক্য নেই। তিনি জানালেন, কমরেড আজিজুল হক বাড়িতে নেই, তবে কিছুক্ষণ বাদেই ফিরবেন। শুরু হলো কমরেড আজিজুল হকের স্ত্রী, আমাদের মিনাক্ষী বৌদির সাথে আলাপচারিতা। তখনো বুঝে উঠতে পারিনি এতো বিস্ময় অপেক্ষা করছে। মিনাক্ষী বৌদি বলছিলেন, তার জীবনের গল্প। স্মৃতিতে ধুলো জমেছে, সেদিনের সব কথা সময়ের স্রোতে ঝাপসাও হয়েছে কিছুটা, কিন্তু যে কথাগুলো সেদিন হৃদয় গভীরে গেঁথে গিয়েছিল, তা ভুলিনি, ভোলাও হবে না কোনোদিন। একটি সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবারে তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। চিকিৎসক বাবা। পারিবারিক আর্থিক সচ্ছলতা যথেষ্ট। কিন্তু বৌদি সব কিছুকে পায়ে মাড়িয়ে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মহোত্তম দর্শনকে মুকুট করে নিয়ে ঘর ছেড়েছিলেন। বলছিলেন, পার্টি জীবন, পার্টির দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আত্মগোপনের জীবন, কমরেড আজিজুল হকের সাথে তার বিয়ে এবং জীবনের গল্প। আত্মগোপন জীবনে বৌদি বেঁচে থাকার তাগিদে অন্য বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ পর্যন্ত করেছেন। যত শুনছি, ততই বিমূঢ় হয়ে যাচ্ছি। মন্ত্রমুগ্ধের মতো বৌদির কথা শুনছি আর ভাবছি, নীতি-আদর্শের প্রশ্নে দৃঢ় এবং অবিচল সাহসী, ত্যাগী মিনাক্ষী বৌদিরাই আমাদের শক্তি, আমাদের প্রেরণার উৎস। মিনাক্ষী বৌদির সাথে কথা বলতে বলতে, কমরেড আজিজুল হক এলেন। শীর্ণকায় দেহ, মুখ ভর্তি অবিন্যস্ত দাঁড়ি, পড়নে খাদির একটা ফতুয়া আর ঢিলেঢালা পায়জামা, কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ। কমরেড আজিজুল হক? পশ্চিমবঙ্গের হাওড়াতে একটি জমিদার পরিবারে জন্ম নেয়া সেই ছেলেটি!! সম্বিত ফিরতেই বুঝলাম, হ্যাঁ, এ মানুষটিই তো কমরেড আজিজুল হক হবার কথা। মাত্র সতের বছর বয়সে যে ছেলেটি অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হয়েছিলেন, জীবনের প্রায় চব্বিশ বছর যার জীবন কেটেছে কারান্তরালে, চোখের সামনে যে মানুষটি শত শত সহযোদ্ধা কমরেডদের শাসকশ্রেণির হাতে হত্যা হতে দেখেছেন, আদর্শচ্যুত হয়নি নিজের লক্ষ্য থেকে, এমন নিরাভরণ তিনি হবেন, এটাই তো স্বাভাবিক। কমরেড আজিজুল হক যুক্ত হলেন আমাদের আলোচনায়। শীর্ণকায় দেহের এ মানুষটির কণ্ঠস্বর কি উদাত্ত এবং রাসভারী। উচ্চারিত শব্দগুলো মনে হচ্ছিল তপ্ত বারুদের একেকটা বুলেট। কমরেড আজিজুল হক বলে চললেন, নকশালবাড়ি, কমরেড চারু মজুমদারের সাথে তার সম্পৃক্ততা- সখ্যতার কথা, আত্মগোপন ও জেলজীবনের কথা, অমানুষিক কারা নির্যাতনের কথা, ব্যক্তিজীবনের গল্প ছাড়িয়ে তিনি বললেন, পশ্চিমবঙ্গের তদানীন্তন বামফ্রন্ট সরকারের সবলতা-দুর্বলতার কথা, আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলন, বাংলাদেশসহ উপমহাদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনার কথা, সাম্প্রদায়িক বাড়বাড়ন্ত নিয়ে উদ্বেগ ও লড়াইয়ের কথা। সেদিনের সেই দিনটা আমার জীবনে এক পরম পাওয়া। তারপর কলকাতা গেছি। কমরেড আজিজুল হকের সাথে দেখা হয়েছে। বাড়িতে তো বটেই, তবে পথ চলতি পথে, দেখতাম, একটা লাঠি ভর দিয়ে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন, বাসের অপেক্ষায়, কখনো যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপরীতে এইট বি বাসস্ট্যান্ডে বা আনোয়ার শাহ রোডের কোনো বাসস্টপে। এগিয়ে গিয়ে কথা বললেই, সহাস্যে কত কথা যে বলতেন। সমাজ সংস্কৃতি রাজনীতি যেমন বোঝাতেন, আবার তিনি শুধু বক্তাই নন, শুনতেন, বুঝতে চেষ্টা করতেন আমার কথা, আবেগের প্রকাশটা। ষাটের দশকে পশ্চিমবঙ্গে তখন উত্তাল বামপন্থি রাজনীতির উত্থান। এক ঝাঁক সম্ভাবনাময় তরুণ যুবক কমিউনিস্ট পার্টি ও বামপন্থি আন্দোলনে যুক্ত, যাদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন, পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী প্রয়াত কমরেড বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, সিপিআইএম পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সম্পাদক প্রয়াত কমরেড অনিল বিশ্বাস প্রমুখ। আনন্দবাজার পত্রিকার চিফ রিপোর্টার সুদেব বাবু একবার কমরেড বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সাথে আলাপকালে জেনেছিলেন, সেই ষাটের দশকে প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্ত , যিনি সাতাত্তরে প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান ছিলেন, অন্য সব ছাত্র-যুব নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে স্নেহ ও ভালবাসতেন কমরেড আজিজুল হককে। জহুরী জহর চেনে। কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্ত সেদিনের সেই তরুণ আজিজুল হককে চিনে ছিলেন, আজিজুল হকের ভেতরের আগুনটা বুঝতে পেরেছিলেন, সেই চাপা আগুনটা শ্রেণি বিক্ষোভে উস্কে দিয়েছিলেন, তীব্র থেকে তীব্রতর করতে সাহায্য করেছিলেন। আমৃত্যু কমরেড আজিজুল হক সে ভালবাসার মর্যাদা রক্ষা করে গেছেন। ভারতীয় ইলেকট্রনিক মিডিয়া জি ২৪ ঘণ্টার এডিটর অনির্বাণ চৌধুরীর সাথে এক সাক্ষাৎকারে কমরেড আজিজুল হক, আজকের প্রজন্মের ছাত্র-যুবদের কাছে একটি বার্তা দিয়ে বলেছিলেন, সমাজের খেটে খাওয়া মেহনতী মানুষই আমাদের শেকড়। আমরা যে ভাত খাই, সে চাল আমরা উৎপাদন করি না, করে কৃষক। যে বস্ত্র পরিধান করি, সে বস্ত্র উৎপাদন করে কোনো শ্রমিক, যে গৃহে বসবাস করি, সেটাও তৈরি করে কোনো শ্রমিক। সুতরাং মানুষ হিসেবে এইসব শ্রমজীবী মানুষের ঋণ আমাদের পরিশোধ করতে হবে। আর সে ঋণ শোধ করতে হলে, মানুষকে ভালবাসতে হবে, পাগলের মতো ভালবাসতে হবে। এই ভালবাসা, তীব্র শ্রেণি ঘৃণাকে ভিত্তি করেই এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আজকে যখন দেখি, ব্যক্তিজীবনে মধ্যবিত্ত চর্চাকে বলবৎ রেখে বাক চাতুর্য্যের মাধুরী মিশিয়ে বিপ্লবী নেতা হয়ে উঠবার প্রবল প্রবণতা, তখন মনে হয়, আজকের এ দুঃসময়ে কমরেড আজিজুল হককে বড় বেশি প্রয়োজন ছিল। কর্পোরেট পুঁজির সর্বগ্রাসী কুৎসিত খেলায়, যখন কমরেড আজিজুল হকের অনেক সহযোদ্ধাই স্লোগান দিয়ে মানুষ চিনতে গিয়ে একেবারে সেই কর্পোরেট পুঁজির সেবাদাস রাজনীতির কোলে চড়ে বসেছেন, কমরেড আজিজুল হক তখন ব্যতিক্রম। আজীবন তিনি বামপন্থায় আস্থাশীল থেকেছেন। ব্যক্তিগত সুবিধাবাদ, লোভ, আত্মকেন্দ্রিকতার কাছে আত্মসমর্পণ করেননি। লালায়িত হননি রাজনৈতিক সুবিধাবাদ আর পদ-পদবির জন্য। দীর্ঘদিন তিনি কোনো বিশেষ বামপন্থি রাজনৈতিক দলের সাথে সক্রিয় যুক্ত ছিলেন না। কিন্তু তা বলে নিষ্ক্রিয়ও ছিলেন না। গতানুগতিক স্লোগান আর বক্তব্য দেয়াটাই শুধু বামপন্থি কর্মীর কাজ নয়। সমাজ বিপ্লবের কাজ এগিয়ে নেবার ক্ষেত্র বহুমুখী। সে বহুমুখী ক্ষেত্রের নানা বিষয়ে কমরেড আজিজুল হক আমৃত্যু তার বিচরণ অব্যাহত রেখেছিলেন। আবার তিনি সচরাচর দেখা কথিত বুদ্ধিজীবী দলভুক্তও নন। বুদ্ধিজীবী তো তিনি, যিনি স্রোতের বিপরীতে দাঁড়াতে পারেন, যিনি বাজার অর্থনীতিজাত যে বাজারি রাজনীতি-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে পারেন, অন্ধ দলদাস নন। স্ত্রোতের বিপরীতটাকেই জীবনের পাথেয় করে নিয়েছিলেন কমরেড আজিজুল হক। ঘোর অন্ধকার। জাতপাত-ধর্ম-বর্ণ-ভাষা, মানুষে মানুষে বিভেদ-বিভাজন, শাসক শ্রেণির অপ ও কূটকৌশল। পুঁজির সর্বগ্রাসী রূপ, সাম্প্রদায়িক শক্তি আর তার প্রভু সাম্রাজ্যবাদবাদের এতো ভয়াবহ হিংস্র পৈশাচিক আগ্রাসন ও উত্থানকালে, এ ঘোর অমানিশায় কমরেড আজিজুল হককে যখন বড় বেশি প্রয়োজন ছিল, তখন তার এ চলে যাওয়া অপূরণীয় ক্ষতি। তীব্র শ্রেণি ঘৃণা আর ক্ষোভে ফুঁসে উঠে, শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের ঋণ পরিশোধে মানুষকে ভালবাসায় এমন “ক্ষ্যাপাটে পাগল” মানুষগুলো ক্রমশ কমছে, এ শূন্য-রিক্ত সময়ে কেবলই মনে হয়, আজিজুল হক বা আজিজুল হকদের মতো মানুষ গুলো আবার কবে ফিরবে, জানি না। তবে শুধু এটুকুই জানি, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এ ঘোর আঁধার কাটবেই, লাল টুকটুকে দিন আসবেই, দিন আসবেই সমতার। প্রকৃতির কোলে শান্তিতে ঘুমান কমরেড। কমরেড আজিজুল হক লাল সালাম। লেখক : রাজনৈতিক কর্মী

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..