ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিবাদী পদ্ধতি ইতিহাস ও সময়ের প্রেক্ষিতে
কানাই দাশ
৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফ্যাসিবাদ ও সংস্কার–এ দুটি শব্দ এত বেশি উচ্চারিত হচ্ছে যে, এ নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
১৯৪৫ সালে ইতিহাসের নিকৃষ্টতম হিটলারী ফ্যাসিবাদের পরাজয়ের ৩০তম বার্ষিকী ১৯৭৫ সালের মে মাসে সারা বিশ্বের বাম গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহ বিশেষ করে তদানিন্তন সোভিয়েত রাশিয়া ও সমাজতান্ত্রিক বলয়ের দেশগুলোতে ব্যাপকভাবে উদযাপিত হয়। লক্ষণীয় বিষয় ছিল যুক্তরাষ্ট্রসহ পুঁজিবাদী বিশ্বের কোথাও বাম দলগুলো ছাড়া কোনো দেশের কোনো বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক দল বা ধর্মভিত্তিক মতাদর্শের কোনো দল বা শক্তি ফ্যাসিবাদ পতনের এই বিজয় বার্ষিকী পালন করেনি বা এ নিয়ে নিশ্চুপ ছিল। কেননা ফ্যাসিবাদ ও পুঁজিবাদ মর্মগতভাবে সমার্থক। ১৯৭৫ সালের মে মাসে গণমানুষের সাপ্তাহিক পত্রিকা “একতা’য় ফ্যাসিবাদবিরোধী বিজয়ের ৩০তম বার্ষিকী উপলক্ষে একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। সেই প্রথম আমি “ফ্যাসিবাদ” শব্দটির সাথে পরিচিত হই। সেই সংখ্যায় মনে পড়ে পার্টির দুই বিশিষ্ট তাত্ত্বিক ও একতার নিয়মিত লেখক কমরেড অনিল মুখার্জি ও কমরেড রতন সেনের লেখা ফ্যাসিবাদের ওপর দুটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। সেই সময়ের আমার পড়া ঐ দুটি নিবন্ধ আমাকে ফ্যাসিবাদ তথা পুঁজিবাদের আগ্রাসী রূপের ঐতিহাসিক তাৎপর্য নিয়ে ধারণা দেয়–বিশেষ করে কমরেড রতন সেনের লেখা ফ্যাসিবাদের সংজ্ঞাটা এখনো স্পষ্টভাবে মনে গেঁথে আছে। তিনি লিখেছিলেন- “ফ্যাসিবাদ হলো একচেটিয়া পুঁজি তথা ফিন্যান্স ক্যাপিটেলের সবচেয়ে আগ্রাসী, উগ্র জাতিবিদ্বেষী এমনকি ধর্মান্ধ প্রতিক্রিয়াশীল রূপ–যা বস্তুত পুঁজিবাদেরই এক হিংস্র রূপ।” “একতা” সেদিন চমৎকারভাবে বলেছিল ফ্যাসিবাদ মানে হত্যা, ধ্বংস, বিভীষিকা, ফ্যাসিবাদ মানে মুনাফার যূপকাষ্ঠে মানবতার বলিদান।
ফ্যাসি শব্দটি মূলত একটি ইতালীয় শব্দ, যার অর্থ হলো সর্বাত্মকবাদ, বা সহিংস সর্বাত্মক তৎপরতা। ১৯১৫ সালে মুসোলিনি ইতালিতে প্রথম এ শব্দটি ব্যবহার করেন ও ’২১ থেকে ’৪৪ পর্যন্ত তিনি ইতালিতে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৩৩ সালে হিটলার জার্মানিতে ফ্যাসিবাদ কায়েম করেন। ফ্যাসিবাদ মূলত সংকটাপন্ন পুঁজিবাদের হিংস্রতম রূপ। পুঁজিবাদের অসম বিকাশের (ঁহবাবহ ফবাবষড়ঢ়সবহঃ ড়ভ পধঢ়রঃধষরংস-খবহরহ) অনিবার্য পরিণতির ফলে এর উদ্ভব হয়। বিশ্বব্যাপী উপনিবেশের একচেটিয়া মালিক ইঙ্গো-ফরাসি ও স্পেন প্রভৃতি ইউরোপীয় দেশের ঔপনিবেশিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রথম বিশ্বযুদ্ধ জয়ী ইঙ্গো ফরাসি ঔপনিবেশিক শক্তির ইচ্ছায় পরাজিত জার্মানির ওপর চাপিয়ে দেয়া ভার্সাই চুক্তির অবমাননাকর শর্ত জার্মানিতে তীব্র ক্ষোভ ও জাত্যাভিমানী জনমত তৈরি করে ক্ষমতায় আসে জার্মান পুঁজিবাদের উগ্র ও আগ্রাসী অংশের প্রতিনিধি হিটলার। নিজেদের আর্য জাতির উত্তরাধিকারী প্রচার করে হিটলার বলে যে এড়ফ ঈৎবধঃবফ এবৎসধহং ঃড় ৎঁষব ঃযব ড়িৎষফ। বৈদিক সভ্যতার চিহ্ন স্বস্তিকা, হিটলারের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল বা নাৎসি দলের প্রতীক হিসাবে তুলে ধরা হয়। ইতোপূর্বে ইতালিতেও ঠিক একই কায়দার মুসোলিনি রোম সাম্রাজ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার তীব্র জাতীয়তাবাদী আবেগ তৈরি করে ক্ষমতা দখল করে এবং ১৯২১-৪৪ সাল পর্যন্ত ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করে। ১৯৩৩ সালে হিটলার ক্ষমতায় এসে ষড়যন্ত্রমূলক ভাবে জার্মান পার্লামেন্ট ভবন রাইখস্টাগে আগুন দিয়ে কমিউনিস্টদের দোষারোপ করে পার্টির ওপর তীব্র আক্রমণ পরিচালনা করে। ইউরোপের ৬০ লক্ষ সদস্যের সবচেয়ে শক্তিশালী জার্মান কমিউনিষ্ট পার্টির হাজার হাজার সদস্যকে হত্যা করে। তীব্র জনমত উপেক্ষা করে বুখেন ওয়াল্ডের কারাগারে তীব্র নির্যাতন করে হত্যা করা হয় পার্টির চেয়ারম্যান, পার্লামেন্ট সদস্য কমরেড আর্নেস্ট থ্যালমেনকে। পার্টিকে নিশ্চিহ্ন করতে হিটলার তীব্র জাতিদম্ভ ও ঘৃণার বাতাবরণ তৈরি করে। ঠিক এ সময়েই জামার্নি সফররত কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের মধ্য ইউরোপের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা বুলগেরিয়ার কমিউনিস্ট নেতা জর্জি দিমিত্রভকে হিটলারী প্রশাসন গ্রেপ্তার করে ও প্রকাশ্য বিচারের মুখোমুখি করে। হিটলারের আদালতে দাঁড়িয়ে বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের সেই অকুতোভয় নেতা ফ্যাসিবাদের চরিত্র ও স্বরূপ ব্যাখ্যা করে যে ঐতিহাসিক জবানবন্দি দেন তা-ই বিশ্বব্যাপী গৃহীত ফ্যাসিবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের ত্রয়োদশ প্লেনামের ফ্যাসিবাদ নিয়ে গৃহীত সিদ্ধান্তের আলোকে তিনি “ফ্যাসিবাদের শ্রেণিচরিত্র” নামক প্রবন্ধে লেখেন ফ্যাসিবাদ হলো সবচেয়ে জাতিদাম্ভিক এবং সাম্রাজ্যবাদী লগ্নিপুঁজির সবচেয়ে প্রকাশ্য সন্ত্রাসবাদী একনায়কত্ব। তিনি স্পষ্টতই বলেন- ফ্যাসিবাদ হলো লগ্নি পুঁজিরই এক আগ্রাসী শক্তি। এ হলো শ্রমিকশ্রেণি, কৃষক ও বুদ্ধিজীবীদের বিপ্লবী অংশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদী প্রতিহিংসার সংগঠন, ফ্যাসিবাদ হলো জাতি ও ধর্ম বিদ্বেষের নগ্নতম রূপ, যা অপরাপর জাতি ও সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে পাশাবিক ঘৃণার প্ররোচনা দেয়। ফ্যাসিবাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো জনগণের ওপর বল্গাহীন শোষণ কায়েম করা। লুটেরা বুর্জোয়া, ফিনান্স ক্যাপিটেলের মালিক ও ধনকুবেরদের বিরুদ্ধে মেহনতি জনগণের তীব্র ঘৃণা নিয়ে ফ্যাসিবাদ অতি সুকৌশলে, পুঁজিবাদ বিরোধী বুলি কপচিয়ে ও রাজনৈতিকভাবে অপরিণত জনগণের কাছে এক একটি সময়ের লোভনীয় স্লোগান নিয়ে হাজির হয়।
এতে স্পষ্ট হয় ফ্যাসিবাদ মূলত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক বৈরী ও আধিপত্যলিপ্সু মুনাফা লোভী রাজনৈতিক অর্থনীতির ফসল। এর সাধারণ বৈশিষ্ট্য হল সাধারণ জ্ঞান বিজ্ঞান, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা বন্ধ করে দেয়া, প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল বিশেষ করে বাম ও কমিউনিস্ট ভাবধারা ও সংগঠনের প্রতি তীব্র বৈরী ভাবাপন্ন, জাতি বিদ্বেষী আগ্রাসী এক ব্যবস্থা কায়েম করা। বিংশ শতাব্দির পুঁজিবাদের সংকট থেকেই এর উৎপত্তি, বিকাশ ও পরিণতি।
পুরো ইউরোপ দখল করে ১৯৪১ সালে ২২ জুন গভীর রাতে হিটলার সোভিয়েত রাশিয়া আক্রমণ করে। পৃথিবীর প্রথম সমাজতান্ত্রিক দেশ সোভিয়েত রাশিয়া বলতে গেলে একাই অকল্পনীয় ত্যাগ, ধ্বংস ও মৃত্যুর বিনিময়ে ফ্যাসিবাদী জার্মান যুদ্ধযন্ত্রকে স্তব্ধ করে দেয়। পরাজিত হিটলার আত্মহত্যা করে। রাইখস্টাগে উড়ে সমাজতন্ত্রের লাল পতাকা। ১৯৪৫ সালে মে মাসে ফ্যাসিবাদ পরাজিত হয়। এটাই ফ্যাসিবাদের উৎপত্তি ও ধ্বংসের ইতিহাস। এতে দুর্বল হয়ে পড়ে বিশ্ব পুঁজিবাদ। অতি দ্রুত ভেঙে পড়ে ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা। এতে করে সেদিন ইউরোপ ও বিশ্ব পরিসরে ফ্যাসিবাদের বিলুপ্তি ঘটে কিন্তু রয়ে যায় ফ্যাসিবাদী শাসন পদ্ধতি। পুঁজিবাদ এর পর কিছুদিন উদার গণতন্ত্র ও কেইনসীয় মিশ্র অর্থনীতির পথে হাঁটে ও দ্রুত এগুতে থাকে অর্থনৈতিক বিকাশের পথে। কিন্তু ১৯৭০ এর দশকের মাঝামাঝি বিশ্বপুঁজিবাদ তার বিকাশের নিয়মেই আবার তীব্র সংকটে পড়ে যা মন্দা নামে খ্যাত। স্থবিরতা ও মূল্যস্ফীতির কবলে পড়ে বিশ্ব পুঁজিবাদ। এই সংকট থেকে মুক্তির জন্য ফ্রেডরিক হায়েক ও ফ্রিডম্যান নামে দুই মার্কিন অর্থনীতিবিদের সুপারিশে ও বিশ্ব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় নয়া উদারবাদী বা লুটেরা অর্থনীতির নবতর প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক অর্থনীতির পর্বে প্রবেশ করে বিশ্ব পুঁজিবাদ। ১৯৯০ সালে সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের বিপর্যয় ও ব্যর্থতা এই লুটেরা পুঁজির ধারা ও দুর্বৃত্তায়িত রাজনৈতিক অর্থনীতিকে বেগবান ও বিশ্বব্যাপী সাময়িক ভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলে।
অনুন্নত সদ্য স্বাধীন দেশগুলোকে তথাকথিত “ওয়াশিংটন সম্মতি’র” আলোকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ মিলে হত্যা, ক্যু, অর্থসাহায্য বন্ধের চাপ সহ নানা উপায়ে রেজিম চেঞ্জের মাধ্যমে এই নয়া উদারবাদী বা লুটেরা মুক্তবাজার অর্থনীতি অনুসরণ করতে বাধ্য করা হয়। সে সব দেশের অর্থনীতির সরকারী মালিকানায় থাকা আর্থিক ব্যবস্থা তথা ব্যাংক, বিমা, কল-কারখানা কাঠামোগত সংস্কারের নামে স্রফে নাম মাত্র মূল্যে কিছু প্রভাবশালী লুটেরা ব্যবসায়ীর হাতে ছেড়ে দেয়া হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সকল জনকল্যাণমুখী খাতে সরকারি ব্যয় একদম কমিয়ে বেসরকারিকরণ বা বিরাষ্ট্রীয়করণ করা হয়। ফলে বাণিজ্যায়ণ ও পণ্যায়ণের কারণে দ্রুত অবনমন ঘটে এই দুই গুরুত্বপূর্ণ খাতের। এই সরকারি সম্পত্তি পেয়ে যাওয়া মুনাফালোভী ব্যক্তিরা রাতারাতি হয়ে উঠে শতকোটি টাকার মালিক, শুধুমাত্র লুটপাট আর পুকুরচুরির মাধ্যমে। পরে তারাই পরিণত হয় স্ব স্ব দেশের শক্তিশালী ফিনান্স লগ্নিপুঁজির একচ্ছত্র অধিপতি। তারা নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আর্থিক খাত, প্রচার মাধ্যমসহ পুরো দেশ ও ক্রমে দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা। ১৯৮০’র দশকে এরশাদের সামরিক স্বৈরশাসনামলে আমাদের দেশে এই লগ্নিপুঁজির একচেটিয়া বিকাশ ঘটে। এই দুর্বৃত্তায়িত রাজনৈতিক অর্থনীতির অনুষঙ্গ হিসাবে আমাদের মত অনুন্নত দেশগুলোর জনমানসে অদৃষ্টবাদিতা, পারলৌকিকতা ও ধর্মান্ধতার রাজনীতির দ্রুত বিস্তার ঘটে। মার্কিনী সুপারিশে চালু এই নয়া উদারবাদী লুটেরা অর্থনীতির শাসন আমাদের মত দেশে চালাতে গেলে গণঅসন্তোষের মুখে অবশ্যই শাসকদল ও গোষ্ঠীকে ফ্যাসিবাদী পদ্ধতি তথা গণতন্ত্রহীনতা, নির্বাচনী প্রহসন, জবরদস্তি, মত প্রকাশের ও মিডিয়ার স্বাধীনতা খর্ব করতেই হবে। জাতি ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন চালিয়ে জনমত বিভ্রান্ত করতে হবে। জয়গা করে দিতে হবে ধর্মীয় সংখ্যাগুরুবাদের একদর্শী মতান্ধতার ফ্যাসিবাদী পদ্ধতি। গত ১৫ বছর ধরে এটাই করা হয়েছে নির্মমভাবে। এটা সম্প্রতি আরো জোরদার হয়েছে। এই আর্থ রাজনৈতিক ব্যবস্থা বদলের কথা না বলে এই ব্যবস্থার সৃষ্ট জঞ্জাল নিয়ে মাতামাতি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এটাই হলো আমাদের দেশে ফ্যাসিবাদ নয় ফ্যাসিবাদী পদ্ধতির প্রকোপ। এরি ধারাবাহিকতায় পাকবাহিনী ও তাদের এদেশীয় সহযোগীদের নজিরবিহীন গণহত্যা, চরম মানবতা বিরোধী অপরাধের ইতিহাসকে মুছে দেবার, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ’৭১ কে আড়াল বা লঘু ও গুরুত্বহীন করার দূর্বৃত্তায়িত অপচেষ্টা গত ৫৪ বছর ধরে চলেছে এবং হাসিনা সরকারের পতন পরবর্তী সময়ে তা পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রশক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় যে করা হচ্ছে তা স্পষ্ট। মুক্তিযুদ্ধ এককভাবে পারিবারিক অবদানের ফসল, দল হিসাবে আওয়ামী লীগ ও এর সরকারের এই মিথ্যা বয়ান মুক্তিযুদ্ধের ক্ষতি করেছে সব চেয়ে বেশি। এটাই মুক্তিযুদ্ধের মূল পরিচালক ও দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী মোহমুক্ত, প্রাজ্ঞ নেতা তাজউদ্দীনকে দল ও সরকার থেকে বের করে দেয়ার এবং দেশকে আজকের বিপর্যয়কর অবস্থায় নিয়ে আসার প্রধান কারণ। মুক্তবাজার অর্থনীতিই আজকের গণতন্ত্রহীনতা, লুটেরাতন্ত্র, ক্লেপ্টোক্র্যাসি বা চোরতন্ত্রের জন্ম দিয়েছে, তৈরি করেছে স্বৈরশাসনের দানব।
৫ আগস্ট ’২৪ পরবর্তী সময়ে বহুল কথিত ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা, “নয়া বন্দোবস্ত” ও “সংস্কার”সহ কতক শব্দ রাজনীতিতে সব দলই বিশেষ করে এনসিপি, জামায়াতসহ মূলত ’৭১ কে গুরুত্বহীন করে দেখানো দলগুলো বেশি উচ্চারণ করছে। কেউ কিন্তু ঐ ব্যবস্থা বদলের কথা বলছে না। ফ্যাসিবাদের উৎপত্তি, এর বিশ্বজনীন প্রেক্ষিত নিয়ে আলোচনা নেই। হাসিনার সরকারের পতনের এক বছর পরেও কি ড. ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার কথিত ফ্যাসিবাদের উৎপত্তির উৎস বন্ধ করেছে বা বন্ধ করতে সচেষ্ট আছে? সংস্কার সংস্কার করে এক বছর কাটল। কিন্তু কিছু মৌলিক ও অতি প্রয়োজনীয় সংস্কারমূলক কাজ যেমন বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের পৃথকীকরণ, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার স্বশাসন নিশ্চিত করা, বাক, ব্যক্তি ও সংবাদ মাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা, নির্বাচন কমিশনের নির্বাচনকালীন সময়ে পূর্ণ ক্ষমতায়ন, নির্বাচনকে অর্থ, পেশী ও সাম্প্রদায়িক প্রচারণামুক্ত করার ব্যবস্থা সুশাসনের জন্য, ফ্যাসিবাদী পদ্ধতি প্রতিরোধে কার্যকর করার এককভাবে সরকারি ঘোষণা (ঢ়ৎড়পষধসধঃরড়হ) দিয়ে দেশকে নির্বাচনের পথে তথা গণতন্ত্রহীনতার কবল থেকে বের করে আনার ব্যবস্থা করা যেত। কেননা এই সব বিষয় কোন দল গোপনে অপছন্দ করলেও প্রকাশ্যে দ্বিমত করতে পারতো না। অবাধ নির্বাচন, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসন, একটি স্থায়ী পদ্ধতি হিসাবে গড়ে তোলার এই সুস্থ বন্দোবস্ত ছাড়া যারা “নয়া বন্দোবস্তের” কথা বলছেন তারা মূলত মধ্যপন্থার নামে ’৭১কে আড়াল করে ’৭২ এর রক্তে ভেজা সংবিধান বাতিল করে ধর্ম ভিত্তিক জাতিরাষ্ট্রের বন্দোবস্ত কায়েম করার কথা যে বলছেন তা তো স্পষ্ট। অন্তবর্তী সরকার ও এর আর্শীবাদ পুষ্ট এনসিপি, জামায়াত বা বিএনপি কেউ তো স্বৈরতন্ত্রের মূল উৎস প্রচলিত রাজনৈতিক অর্থনীতি বা লুটেরা মুক্তবাজার অর্থনীতি, তথা নয়া উদারবাদী অর্থনীতির বিপক্ষে তো এ পর্যন্ত কিছু বলতে বা করতে দেখা গেল না এক বছরে। অন্যদিকে “ফ্যাসিবাদ” উচ্ছেদ করার দাবিদার দলগুলো মব সহিংসতার মাধ্যমে ইতোমধ্যে সংঘটিত হত্যা, লাঞ্ছনা ও ভিন্নমত ও সংস্কৃতি সহ্য না করার তথা ফ্যাসিবাদী তৎপরতায় যুক্ত শক্তির পক্ষেই কথা বলছে। হাসিনার সরকার পতনের দীর্ঘ এক বছর পরেও মবোক্র্যাসি বা মব সহিংসতাকে সরকারি মুখপাত্র জনরোষ বলছেন। নারী, সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ, যত্রতত্র ধর্ম অবমাননার নামে মন্দির মাজার ভাঙার শত শত ঘটনার একটির বিরুদ্ধেও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। লালন ও বাউলরা কি ফ্যাসিবাদের দোসর? ময়মনসিংহ শহরের শশী লজের শতাব্দির প্রাচীন ভেনাসের মূর্তি কি মুজিববাদের প্রতীক? মূলত ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠবাদী জবরদস্তির ফ্যাসিবাদী তাণ্ডব চলছে। সর্বশেষ বিএনপি সমর্থকদের চাঁদাবাজির ফলে নারকীয় হত্যাকাণ্ড ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্লিপ্ততা, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার ফাঁকা বুলি কি দুঃশাসনের অবসানের ন্যূনতম লক্ষণ দেখায়? এ কথা বললে কি অত্ত্যুক্তি হবে যে ফ্যাসিবাদের রাজনৈতিক অর্থনীতি আড়াল করে, এর প্রগতিবিরোধী চরিত্র স্পষ্ট না করে, এক মন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টা ফেসবুকে অন্যদেশের ভূখণ্ড নিয়ে বৃহত্তর বঙ্গের মানচিত্র প্রকাশ তো ফ্যাসিবাদের মূল বৈশিষ্ট্য জাতিদম্ভের নামান্তর। আমাদের দেশের বিশেষ পরিস্থিতিতে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ রূপে যা বিবেচিত তা অব্যাহত রেখে, মিডিয়ার নিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা দিয়ে, ঐতিহাসিকভাবে রাজনৈতিক ও আদর্শিক মতভেদে বিভক্ত দলগুলোকে সাংবিধানিক সংস্কারের নামে পরোক্ষভাবে জোর করে ঐক্যমতে নিয়ে আসার নামে কালক্ষেপণ করে মূল লক্ষ্য নির্বাচনী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কাজ প্রলম্বিত করার মাধ্যমে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করে এই সরকার নবতর এক স্বৈরশাসনের পথে, পূর্বের মত ফ্যাসিবাদী পদ্ধতির শাসনের ধারায় দেশকে সম্ভবত সচেতন বা অবচেতনভাবে নিয়ে যেতে চাইছেন।
এই ফ্যাসিবাদী পদ্ধতিতে দেশ শাসনের ধারা থেকে গণতন্ত্রহীনতা, সাম্প্রদায়িক বৈষম্য ও শাসকগোষ্ঠীর সাম্রাজ্যবাদী আনুগত্যের ধারা থেকে দেশকে মুক্ত করার এমনকি ন্যূনতম স্থায়ী বুর্জোয়া গণতন্ত্রের জবাবদিহিমূলক ধারায় দেশকে নিয়ে যাবার ঐতিহাসিক কর্তব্য সম্পাদনের দায়িত্ব বৃহত্তর বাম গণতান্ত্রিক জোট, দল ও মুক্তবুদ্ধিচর্চায় বিশ্বাসী ব্যক্তিদের আজ নিতে হবে। শ্রেণিসংগ্রাম জোরদার করার বহুল উচ্চারিত প্রতিজ্ঞা বাস্তবে প্রতিপালন করা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ পুনরুদ্ধার কখনো সম্ভব হবে না।
লেখক : সভাপতি, সিপিবি, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন