সমাজে সবার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে প্রথম প্রয়োজন-সবার জন্য শিক্ষা
এ. এন. রাশেদা
শিক্ষাই হলো উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। আর শিক্ষক তার পরিচালনাকারী। এ কথা সবাই জানেন। কিন্তু মানেন কতজন? না, একেবারেই মানেন না। যদি মানতেন তাহলে কি রাষ্ট্রীয় পুলিশ বাহিনী দ্বারা প্রকাশ্য দিবালোকে শিক্ষকের গায়ের শার্ট ছিঁড়ে ফেলা যেতো? শিক্ষককে প্রহার করা যেতো?
পৃথিবীর কোথাও বোধহয় এমন নজির পাওয়া যাবে না। দুর্ভাগা এ দেশ। তবে এমন নিকৃষ্ট উদাহরণ আগেও সৃষ্টি হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের এক স্কুলের প্রধান শিক্ষককে স্থানীয় এমপি কান ধরে ওঠবস করিয়েছিলেন। নড়াইলের এক স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষককে ছাত্ররা গলায় জুতার মালা পরিয়ে ঘুরিয়েছে। ক্লাসের পাঠ্যবই তিনি পড়াচ্ছিলেন পৃথিবীর উৎপত্তি নিয়ে। চমৎকার এ দেশ! তাইনা? আবার ২০২৪-এর আগস্টের পর দেখা গেল প্রায়–প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকদের জোর করে শিক্ষার্থীরা চেয়ার থেকে নামিয়ে দিচ্ছে। দড়ি দিয়ে গাছের সাথে শিক্ষককে বেঁধে রাখছে। সচিবালয়ে গিয়ে ঘেরাও করে উচ্চ মাধ্যমিকের অটোপাসের দাবি আদায় করে নিচ্ছে। এমন হাজারো উদাহরণ দেওয়া যায়– যার সঙ্গে শিক্ষার কোনো সম্পর্ক নেই।
তবে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে-দেশ স্বাধীন হলো– ১৯৭২-এর সংবিধানের মূলনীতির ১০ ধারায় বলা হলো– “মানুষের ওপর মানুষের শোষণ হইতে মুক্ত ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজ লাভ নিশ্চিত করিবার উদ্দেশ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হইবে।”
আর ১৭ নম্বর ধারায় বলা হলো– রাষ্ট্র : (ক) একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষালাভের জন্য। (খ) সমাজের প্রয়োজনের সহিত শিক্ষাকে সঙ্গতিপূর্ণ করিবার জন্য এবং সেই প্রয়োজনসিদ্ধ করিবার উদ্দেশ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছাপ্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টির জন্য। (গ) আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করিবার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।”- এই প্রতিশ্রুতি শুধু মূলনীতিতে উল্লিখিত হয়েছে, কিন্তু সংবিধানের তৃতীয় ভাগে মৌলিক অধিকার হিসেবে তা স্বীকৃত হয় নাই। তাই আজও স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও ঐ একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য... শিক্ষাদানের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। বরং উল্টোধারায় সব চলছে।
আর সবার জন্য শিক্ষাদানই সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার পূর্বশর্ত। ‘শিক্ষাদান’ কিন্তু শিক্ষা বিক্রি নয়। অর্থাৎ নিঃখরচায় সবার জন্য শিক্ষার গ্যারান্টি রাষ্ট্র সকল নাগরিকের জন্য নিশ্চিত করে। স্বাধীনতার পর আনাচে-কানাচে বিভিন্ন স্কুল এবং নৈশকালীন স্কুলও গড়ে উঠেছিল সাধারণ এবং সমাজতান্ত্রিক চেতনার মানুষদের দ্বারা। ১৯৭৫-এ পটপরিবর্তনের পর অবশ্য অন্য এক ধারা দেখা গিয়েছিল। টেলিভিশনে এক কথাসাহিত্যিক ক্লাস নিতেন সহজবোধ্য করে- ‘লতার মত ‘ল’, ‘পাতার মত ‘প’- এই ধরনের সহজ পদ্ধতিতে। উদ্দেশ্য সবাইকে শিক্ষিত করার। আবার স্কুলের শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল, তারা যেন অন্তত একজন করে শিক্ষিত করে এবং সেই নবীন শিক্ষার্থীকে পরীক্ষা দিতে হবে স্কুলে গিয়ে। শহরাঞ্চলে তা অসাধুতায় পরিণত হয়েছিল। সে প্রকল্প আর চলেনি। এরপর ২/১টি জেলার শতভাগ স্বাক্ষর- শিরোনামে খবরও প্রচারিত হয়েছিল।
আসল কথা হলো- তা কার্যকরী হয়নি। শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতির কোনো পরিকল্পনা কোনো সরকারই নেয়নি। বরং ঘুষ-দুর্নীতির মধ্য দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থাকে চরম দুর্যোগের মধ্যে ফেলে দিয়েছে দীর্ঘ ৫৪ বছরে।
শিক্ষার সাথে সম্পর্কিত প্রতিটি অফিসের ঘুষ দুর্নীতির দু-একটি উদাহরণ দেয়া যায়। যেমন- ২৪/৬/’২৩ দৈনিক সমকালে প্রকাশিত হয়েছে ‘বিশ্ববিদ্যালয় অনিয়ম দুর্নীতির বাসা’; দৈনিক ইত্তেফাক (১৫/৭/’২৩) ‘আজ থেকে সব বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে তালা ঝোনানোর ঘোষণা: জাতীয়করণ করার দাবি’; দৈনিক সমকাল (২৯/৮/’২৩) ‘শিক্ষা ক্যাডারে বঞ্চনাই নিয়তি’; দৈনিক কালবেলা (২/৯/’২৩)– ‘২০০ শিক্ষার্থী চিহ্নিত-কেনা প্রশ্নে ভর্তি সব নামি মেডিকেলে’; দৈনিক সমকাল (৪/১০/’২৩)– ‘১৭ নেতার দখলে সাত হলের ১০৮০ কক্ষ’; দৈনিক কালবেলা (২১/১০/’২৩)–‘মাউশিতে পদোন্নতির চাবিকাঠি সিন্ডিকেটের হাতে’; আমাদের সময় (২৬/১০/’২৩)– ‘প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচিতে ১০ পদের দুর্নীতি’; দৈনিক কালবেলা (১/১২/’২৩)–‘শতভাগ ফেল, তবুও চলছে কলেজগুলো’; দৈনিক ভোরের কাগজ (৩১/১২/’২০)–‘কোটি টাকা দিয়েও পাস করতে পারেনি পাঁচশত পরীক্ষার্থী’– এমন লোমহর্ষক খবর হাজার ছাড়াবে।
আর সাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেনের চাঞ্চল্যকর খবরটি ছিল- ‘পাঁচ বছরে প্রাথমিক শিক্ষার তেমন উন্নতি না হলেও তিনি কাজকর্মে ও কথাবার্তায় ছিলেন বিতর্কিত– রংপুরের রৌমারীর জান্দিরকান্দায় রয়েছে ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি অটো রাইস মেশিন, রৌমারী বাজারে ১২ শতাংশ জমিতে ছয়তলা ভবন, পট্টিমারি বাজারে ২০ কাঠা জমিতে মার্কেট নির্মাণ চলছে।’ খুবই কষ্টকর খবর হলো যে ‘জাতীয় শিক্ষানীতি অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করার লক্ষ্যে ৬০০ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি চালু করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। অথচ এই মন্ত্রীর কারণে সেসব বন্ধের পথে- এই ছিল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর দুর্নীতির নিরিখে দূরদর্শিতা! প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা দেওয়া হলেও তারা বেতন পান ১১তম গ্রেডে। যা হওয়ার কথা ছিল ২০২৩ সালে তৎকালীন সরকারের আদেশে, আজও তা হয়নি। এটি হলো প্রধান শিক্ষকদের বেলায়। বর্তমানে ২০২৫ সালের ২৫ মে থেকে চলছে প্রাথমিক পর্যায়ের সহকারী শিক্ষকদের আন্দোলন। তারা কি খুব বেশি চেয়েছেন? আর চাইতেই বা হবে কেন?
তাদের দাবিসমূহ : ১। কনসালটেশন কমিটির সুপারিশের যৌক্তিক সংস্কার করে সহকারী শিক্ষক পদটিকে এন্ট্রি পদ ধরে ১১তম গ্রেডে বেতন নির্ধারণ করতে হবে, ২। ১০ বছর ও ১৬ বছর পূর্তিতে গ্রেড প্রাপ্তির জটিলতা নিরসন করতে হবে, ৩। প্রধান শিক্ষক পদে শতভাগ পদোন্নতিসহ দ্রুত পদোন্নতি প্রদান করতে হবে। [উল্লেখ্য যে, পরীক্ষা কার্যক্রম এই কর্মসূচির আওতামুক্ত থাকবে।]
এই যদি হয় প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকদের সম্মান তা হলে জাতি কীভাবে শিক্ষিত হবে? শিক্ষকতা পেশা সম্পর্কে রাশিয়ান শিক্ষাবিদ বিংশ শতাব্দির প্রথম দিকে বলেছিলেন- ‘আমাদের এই পেশা মস্ত একটা সৃষ্টিশীল পেশা বুঝলে! আমাদের ভাবতে হয়, অনুভব করতে হয় গভীরভাবে, রীতিমতো দায়িত্ব নিয়ে। কেননা আমরা যা তৈরি করার চেষ্টা করি– তা খোদ মানুষ!’
অন্যত্র তিনি বলছেন, ‘এ বিষয়ে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত যে এদেশে শিক্ষাদানের উদ্দেশ্য বলতে কেবলমাত্র স্রষ্টা তৈরি করা, আমাদের নতুন রাষ্ট্রের নির্মাণে প্রবল কর্মশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে সমর্থ সামাজিক দিক থেকে এমন অঙ্গীকারবদ্ধ মানুষ গড়তে সমর্থ মানুষ গড়াই শুধু বোঝায় না। আমাদের শিক্ষা দেয়ার অর্থ এমন সব শিক্ষিত লোক তৈরি করা যাদের নাকি ব্যক্তিগত জীবনে সুখী হওয়ারও বাধ্যবাধকতা থাকবে।’
আর যারা সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা কায়েম করতে চান কিন্তু পিছিয়ে পড়া মানুষদের থেকে দূরে থেকে দিবাস্বপ্ন দেখেন তাদের উদ্দেশ্যে আমি রবীন্দ্রনাথের সামান্য কটি কথা উদ্ধৃত করে শেষ করতে চাই– ‘আমাদের শিক্ষিত লোকদের জ্ঞান যে নিষ্ফল হয়, অভিজ্ঞতা যে পল্লীবাসীর কাজে লাগে না, তার কারণ আমাদের অহমিকা, যা আমাদের মিলতে দেয় না, ভেদকে জাগিয়ে রাখে। তাই আমি বারংবার বলি, গ্রামবাসীদের অসম্মান করো না। যে শিক্ষার আমাদের প্রয়োজন তা শুধু শহরবাসীদের জন্য নয়, সমস্ত দেশের মধ্যে তার ধারাকে প্রবাহিত করতে হবে। সেটা যদি শুধু শহরের লোকদের জন্য নির্দিষ্ট থাকে তবে তা কখনো সার্থক হতে পারে না।
মনে রাখতে হবে শ্রেষ্ঠত্বের উৎকর্ষে সকল মানুষেরই জন্মগত অধিকার। গ্রামে গ্রামে আজ মানুষকে এই অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। আজ আমাদের সবচেয়ে বড় দরকার শিক্ষার সাম্য।’
লেখক : সম্পাদক, সাপ্তাহিক একতা ও শিক্ষাবার্তা
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন