মহান মে দিবস

পুঁজির দাসত্ব থেকে মুক্তির অঙ্গীকার

ডা. মনোজ দাশ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
মে দিবস হলো শ্রমিক শ্রেণির আন্তর্জাতিক সংহতি এবং পুঁজিবাদী শোষণ ও মজুরি দাসত্ব থেকে মুক্তি ঘোষণার দিন। মে দিবস হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণির ঐক্যবদ্ধ শক্তিমত্তার অঙ্গীকার। এটা হলো শ্রমজীবী মানুষের প্রথম এবং একমাত্র আন্তর্জাতিক শ্রম দিবস, বৃহত্তর সাফল্য ও বিপ্লবের লক্ষ্যে উৎসর্গকৃত দিন। লেনিনের কাছে মে দিবস ছিল–‘মানুষের রাজনৈতিক মুক্তির জন্য অপরাজেয় সংগ্রাম এবং শ্রমিক শ্রেণির শ্রেণিচেতনার অগ্রগতি ও সমাজতন্ত্রের জন্য সরাসরি সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু।’ মে দিবসের এসব তাৎপর্য এবং গুরুত্ব পুঁজিবাদকে এখনো তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। এখনো মে দিবস পুঁজিবাদের বুকে জাগায় ভয়, আর শ্রমিক শ্রেণির বুকে জাগায় শোষণমুক্তির ঐতিহাসিক আশাবাদ। কাজের ঘণ্টা কমাবার আন্দোলনের সাথে মে দিবসের জন্মকাহিনী জড়িয়ে আছে। শ্রমিক শ্রেণির কাছে এর রাজনৈতিক তাৎপর্যও খুব গভীর। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে আমেরিকার শ্রমিকরা কাজের ঘণ্টা কমানোর জন্য আন্দোলন শুরু করেন। কাজের ঘণ্টা কমানোর এই আন্দোলন শুধু আমেরিকায় হয়েছিল তা নয়, উদীয়মান পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যেখানেই শ্রমিকরা প্রচণ্ডভাবে শোষিত হয়েছেন সেখানেই আন্দোলন গড়ে উঠেছে। পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার অসঙ্গতির স্বতঃস্ফূর্ত পরিণতি হিসেবেই এই আন্দোলনের জন্ম। আন্দোলনের একটি পর্যায়ে পুঁজিবাদী দাসত্বের বিপক্ষে এবং শ্রমিক শ্রেণির স্বতন্ত্র রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বপক্ষে আওয়াজ ওঠে। ১৮৬৬ সালের ২০ আগস্ট ৬০টি ট্রেড ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা বাল্টিমোরে যে ‘ন্যাশনাল লেভার ইউনিয়ন’ প্রতিষ্ঠা করেন তার ঘোষণায় বলা হয়–‘দেশের শ্রমিক শ্রেণিকে পুঁজিবাদের দাসত্ব থেকে মুক্ত করবার জন্য এই মুহূর্তে প্রথম ও প্রধান প্রয়োজন হলো- এমন আইন পাস করা যার ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সমস্ত রাজ্যেই সাধারণ কাজের দিন হবে ৮ ঘণ্টা।’ এ সংগঠনের পরিচালনায় যে রাজনৈতিক তৎপরতা সৃষ্টি হয়, তার চাপে অনেকগুলো রাজ্য সরকারি কর্মক্ষেত্রে ৮ ঘণ্টা কাজের দাবি মেনে নেয়। আইন সভা এই মর্মে একটা আইনও পাস করে। ১৮৬৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মার্কস-এঙ্গেলসের পরিচালনায় প্রথম আন্তর্জাতিক তার জেনেভা কংগ্রেসে ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিকে সমর্থন দেয়। ১৮৬৭ সালে প্রকাশিত ‘ক্যাপিটাল’ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে ‘কাজের দিন’ নামক অধ্যায়ে মার্কস ৮ ঘণ্টা কাজের দিন আন্দোলনের গুরুত্বের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। পুঁজিবাদী শাসক শ্রেণির শত আক্রমণ মোকাবিলা করে অজস্র ধর্মঘট ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শ্রেণিগত অবস্থান সম্পর্কে অধিকতর সচেতন, সংগ্রামী চেতনাসম্পন্ন এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এক শ্রমিক শ্রেণির অভ্যুদয় ঘটে আমেরিকায়। ১৮৮৫ সালে ফেডারেশনগুলোর সম্মেলন থেকে পরবর্তী বছরের ১ মে ধর্মঘট করে ৮ ঘণ্টা কাজের দাবি আদায়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৮৮৬ সালে ধর্মঘটের দিন যতই ঘনিয়ে আসে শহর শহরে ‘আট ঘণ্টা শ্রম সমিতি’ গড়ে উঠতে থাকে। সমগ্র শ্রমিক আন্দোলনে একটা জাগরণ পড়ে যায়। অসংগঠিত শ্রমিকদের গায়ে এসে লাগে তার ছোঁয়া। আমেরিকার শ্রমিক শ্রেণির ইতিহাসে নতুন আলোর আভাস দেখা দেয়। শিকাগো শহর বামপন্থি শ্রমিক আন্দোলনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠায় ধর্মঘটেরও কেন্দ্র হয়ে উঠে। সংগ্রামী শ্রমিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় শিকাগোর ধর্মঘট বিরাট আকার ধারণ করে। ১ মে শিকাগোতে শ্রমিকদের এক বিশাল সমাবেশ হয়। শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে বেরিয়ে আসে। শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে এর আগে শ্রেণি-সংহতির এতো বলিষ্ঠ প্রকাশ আর দেখা যায়নি। ১৮৮৬ সালের ১ মের ধর্মঘটে ৮ ঘণ্টা আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে। আমেরিকার শ্রমিক শ্রেণির এই আন্দোলন রচনা করে এক গৌরবময় অধ্যায়। পুঁজিপতি শ্রেণি এই আন্দোলনকে ধ্বংস করে দিতে মরিয়া প্রচেষ্টা চালায়। ৩ মে তারিখে ম্যাক-কর্মী করিপার কারখানার ধর্মঘটী শ্রমিকদের এক সভায় পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়ে ৬ জন শ্রমিককে হত্যা করে। এই হত্যার প্রতিবাদে ৪ মে হে মার্কেট স্কয়ারে এক বিশাল সভা অনুষ্ঠিত হয়। সমবেত শ্রমিকদের ওপর পুলিশ আবার আক্রমণ করে, এর মধ্যে একটি বোমা এসে পড়ে এবং তার আঘাতে একজন সার্জেন্ট নিহত হয়। শুরু হয়ে যায় লড়াই, লড়াইয়ে মৃত্যু হয় ৭ জন পুলিশের, আর ৪ জন সংগ্রামী শ্রমিকের। হে মার্কেট রক্তের প্লাবনে ভেসে যায়। পার্সনস, স্পাইজ, ফিসার এবং এঙ্গেলকে ফাঁসির মঞ্চে হত্যা করা হয়। অজস্র সংগ্রামী শ্রমিক নেতাকে কারাগারে পাঠানো হয়। ১৮৮৮ সালের ডিসেম্বরে আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার ১৮৯০ সালের ১ মে তারিখে ৮ ঘণ্টা কাজের সময়সহ বিভিন্ন দাবিতে সমগ্র আমেরিকায় বিক্ষোভ প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আর ১৮৮৯ সালে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকও ১৮৯০ সালের ১ মে তারিখ পৃথিবীর সমস্ত দেশের সমস্ত শহরে মেহনতি মানুষের কাছে একই সাথে আন্তর্জাতিক বিক্ষোভ প্রদর্শনের আহ্বান জানায়। ১৮৯০ সালে নিউইয়র্কের ইউনিয়ন স্কয়ারে মে দিবসের সমাবেশে ঘোষণা করা হয়–‘আট ঘণ্টা কাজের দাবি পূরণের সংগ্রাম আমরা চালিয়ে যাবো। কিন্তু কখনোই ভুলবো না, আমাদের শেষ লক্ষ্য হলো পুঁজিবাদী মজুরি ব্যবস্থার উচ্ছেদ সাধন’। ১৮৯০ সালে ইউরোপের অনেক দেশে বড় করে মে দিবস উদযাপন করা হয়। এ বছরের ১ মে কমিউনিস্ট ইস্তেহারের চতুর্থ জার্মান সংস্করণের ভূমিকা লিখতে গিয়ে এঙ্গেলস উল্লেখ করেন–‘এই লাইগুলো যখন আমি লিখছি, ঠিক তখনই ইউরোপ ও আমেরিকার শ্রমিক শ্রেণি তাদের শক্তি সামর্থের হিসেব-নিকেশ করছেন। ইতিহাসে এই প্রথম শ্রমিক শ্রেণি একটি সেনাবাহিনী হিসেবে, একই পতাকাতলে একটি মাত্র লক্ষ্য পূরণের জন্য সংগ্রাম করছেন। ...সমস্ত দেশের পুঁজিপতি আর জমিদাররা বুঝতে পারবে সারা দুনিয়ার শ্রমিকরা আজ সত্যি সত্যি ঐক্যবদ্ধ।’ ১৮৯৩ সালে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের জুরিখে অনুষ্ঠিত কংগ্রসেও মে দিবসের তাৎপর্য ও গুরুত্ব উল্লেখ করে বলা হয়–‘আট ঘণ্টার কাজের দাবিতে ১ মে তারিখে দেশে দেশে যে শ্রমিক সমাবেশ হচ্ছে, তা শ্রমিক শ্রেণির সুদৃঢ় সংকল্পের অঙ্গীকার। এই সংকল্প হলো, সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে শ্রেণি বৈষম্যের বিলোপ সাধন করা। এবং এভাবে শ্রেণি বৈষম্যের বিলোপের মাধ্যমে সমস্ত জাতির শান্তির পথে আন্তর্জাতিক শান্তির একমাত্র সড়কে পদার্পণ করা।’ মে দিবসের অফুরন্ত শক্তি ও চেতনা সারা দুনিয়ার মেহনতি মানুষের কল্পনা ও বৈপ্লবিক চেতনাকে এমনভাবে অধিকার করে বসে, যার ফলে প্রতি বছরেই আগের বছরের তুলনায় মেহনতি মানুষ আরো বিপুল সংখ্যায় শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করে। প্রতিবারই মে দিবসের সংগ্রামী ঐতিহ্য নব নব তাৎপর্য ও গুরুত্ব নিয়ে হাজির হয়। কিন্তু বুর্জোয়া ও সংস্কারবাদী শ্রমিক আন্দোলন মে দিবসের সংগ্রামী ধারার পরিবর্তে তাকে শুধু বিশ্রাম ও আমোদ-প্রমোদের দিনে পরিণত করার মাধ্যমে মে দিবসের সমাবেশকে প্রাণহীন করে দিতে চেষ্টা করে। সংস্কারবাদী আন্দোলনের চোখে মে দিবস হলো নিছক একটা ছুটির দিন। আর শ্রমিক আন্দোলনের বিপ্লবী ধারার কাছে মে দিবস হচ্ছে শ্রেণি বৈষম্য বিলোপের জন্য শ্রমিক শ্রেণির শপথের দিন, মে দিবস তার কাছে শোষণ ও মজুরি দাসত্বের পুঁজিবাদী ব্যবস্থা উচ্ছেদের জন্য সুদৃঢ় সংকল্পে ঐক্যবদ্ধ অঙ্গীকার। বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণির কাছে প্রতিবারের মতো মে দিবস এবারও তার সংগ্রামী তাৎপর্য ও গুরুত্ব নিয়ে হাজির হয়েছে। এদেশের শ্রমিক শ্রেণি আজ নিদারুন শোষণ-বঞ্চনার শিকার। কৃষি, শিল্প ও সেবা ক্ষেত্রে শ্রমজীবী মানুষের শ্রম-ঘামে জাতীয় উৎপাদন বেড়ে চলেছে। শ্রমিকের মাথাপিছু উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পেলেও সে অনুপাতে তাদের মজুরি বাড়েনি। শ্রমিকের উপর আপেক্ষিক শোষণের হার ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। বস্তুত এক অর্থে শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি বরং হ্রাস পেয়েছে। তাদের জন্য জাতীয় ন্যূনতম মজুরিও নির্ধারণ করা হয়নি। এদেশের শ্রমিকরা শুধু ন্যায্য মজুরি থেকেই বঞ্চিত থাকছে না, অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারও তাদের নেই। নিম্ন মজুরি, বেকারত্ব, অভাব, ছাটাই, নির্যাতন, জেল- জুলুম তাদের নিত্য সঙ্গী। যতক্ষণ এই পুঁজিবাদী শোষণ ব্যবস্থা বহাল আছে ততক্ষণ কাজের নিশ্চয়তা, ন্যায্য মজুরি, অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার ও গণতান্ত্রিক শ্রম আইনের জন্য বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণিকে লড়তে হবে। তবে শুধু এই সংগ্রামেই শ্রমজীবী মানুষের মুক্তি আসবে না, এর পাশাপাশি পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা উচ্ছেদ করে শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আপোষহীন বিপ্লবী ধারার শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। পুঁজিবাদী সমাজ উচ্ছেদ করে শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য শ্রমিক শ্রেণিকে তার নিজস্ব রাজনৈতিক দল কমিউনিস্ট পার্টিতে সংগঠিত হতে হবে। শোষণ উচ্ছেদ কেবলমাত্র শ্রমিক শ্রেণিকে মজুির দাসত্ব থেকে মুক্ত করবে না, সমাজের অন্যান্য নিপীড়িত শ্রমজীবী মানুষকেও শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্ত করবে। তাই শ্রমিক শ্রেণিকে তার লক্ষ্য পৌঁছাতে হলে মেহনতি কৃষক ও অন্যান্য শ্রমজীবী জনগণের সাথে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। একমাত্র এভাবেই আন্তর্জাতিক সংহতি ও সহযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে সমগ্র মানব জাতির শান্তি ও সুখী ভবিষ্যতের জন্য অন্যান্য দেশের শ্রমিক শ্রেণির মতো বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণিও পুঁজির দাসত্ব থেকে আমাদের মুক্ত করে মহান মে দিবসের চেতনাকে সার্থক করে তুলবে। লেখক : সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..