
ইতিহাসে কখনও কখনও এমন কতগুলো ঘটনা ঘটে, যেগুলো ইতিহাস নির্মাণে উল্লেখযোগ্য ছাপ রেখে যায়। এসব ঘটনা, কখনোই ভুলে যাওয়া উচিত নয়। এসব ঘটনা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করা হবে অন্যায় এবং বৃথা। তবুও দুরভিসন্ধিমূলক ইঞ্জিনিয়ারিং করে কৃত্রিমভাবে সেই ঘটনার বিকৃত উপস্থাপন অথবা তা ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা অনেকে করে থাকেন। যারা ইতিহাসের অমূল্য সঞ্চয় থেকে ইতিহাসের কোনো ঘটনাকে অসৎ উদ্দেশ্যে ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন, তাদেরকে ইতিহাসও একসময়– ‘ভুলে যেতে ভুল করে না’।
আজ থেকে ৭৬ বছর আগে ১৯৫০-এর ২৪ এপ্রিল রাজশাহী জেলের ‘খাপড়া ওয়ার্ডে’ পুলিশের গুলিতে যে নৃসংশ হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছিল তা ছিল তেমনি একটি ঘটনা। এই ঘটনার কথাটি যেভাবে মানুষের মনে জাগ্রত ও মহিমান্বিত করে রাখা উচিত ছিল, রাষ্ট্র ও সমাজ তা রাখেনি। যদিও খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ড ছিল জাতির ইতিহাসে বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের একটি অবিস্মরণীয় গৌরবজ্জ্বল ঘটনা।
পাকিস্তানের শাসনকালের অন্যায়, অবিচার ও নির্মম-নিষ্ঠুর বর্বরতার বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের এ গৌরবগাঁথাকে অবলম্বন করে এদেশে ধাপে ধাপে গণসংগ্রামের ধারা গড়ে উঠেছিল। এই পথ ধরেই স্থাপন করা সম্ভব হয়েছিল মহান মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের পরবর্তী সোপানগুলো। পাকিস্তানের উপনিবেশিক শাসনের অবসানের লক্ষ্যে পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধকে যারা ‘ভাইয়ে ভাইয়ে ভুল বোঝাবুঝি’ বলে হালকা করে দেখে দেশকে একাত্তরের আগে ধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন (আসলে দুঃস্বপ্ন) দেখানোর চেষ্টায় লিপ্ত, এবং যারা এদেশে কমিউনিস্ট ও বামপন্থি শক্তির ভূমিকাকে বিকৃত ও তুচ্ছ বলে প্রতীয়মান করতে সরব প্রয়াসে নিয়োজিত, তারাই আজ ইতিহাসের এসব সত্যকে আড়াল করতে সচেষ্ট।
শুরু থেকেই খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা হয়েছিল। বুর্জোয়া ইতিহাসবিদরা ‘ইতিহাস বিকৃতির’ কাজটা খুব ভালোই করে থাকেন। কখনো তা তারা করেন তথ্য বিকৃতির মাধ্যমে, আবার কখনো বা তারা তা করেন ঘটনার ‘অনুল্লেখের’ বা ‘পাত্তা না দেয়ার’ মাধ্যমে সে তথ্যকে ভুলিয়ে দেয়ার প্রয়াসের দ্বারা। খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ডের ঘটনার ক্ষেত্রেও তেমনটিই করা হয়েছে। এ ঘটনাটিকে ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলেছে বিগত সাড়ে সাত দশক ধরে।
তবে মুক্তিযুদ্ধের পর রাজশাহী জেলে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। কমিউনিস্ট ও বামপন্থিরা সেখানে পুষ্পমাল্য অর্পণ করে থাকেন। তারা খাপড়া ওর্য়াড নিয়ে আলোচনা সভা ও লেখালেখি করেন, কিন্তু ইতিহাস আরো কিছু দাবি করে। খাপড়া ওয়ার্ড দিবসটি এমন একটি ঐতিহাসিক দিবস যা রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হওয়া উচিত। অথচ তা এখনও করা হয় না। এই ‘অপরাধের’ জন্য ইতিহাস আমাদের কখনোই ক্ষমা করবে না।
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর, এদেশে আরেকটি যে জেল হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল; অনেকে সে দিনটিকে ‘জেল হত্যাকাণ্ড দিবস’ হিসেবে পালন করে থাকেন। অথচ এদেশে প্রথম জেল হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছিল তারও সিকি শতাব্দি আগে রাজশাহী জেলের ‘খাপড়া ওয়ার্ডে’।
কী ছিল খাপড়া ওয়ার্ডের ঘটনা? সে তথ্য জানতে হলে আমাদের একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৫০ সালে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের তখন সবে যাত্রা শুরু। ভাষা আন্দোলন শুরু হলেও পাকিস্তান নিয়ে বাঙালি মুসলমানদের মোহটা তখনও সেভাবে কাটেনি। অনেকেই মনে করতেন, মাত্র পাকিস্তান আদায় হয়েছে। এসময় অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক আন্দোলন করে শিশুরাষ্ট্র পাকিস্তানের সরকারকে বিব্রত করা উচিত হবে না। কিন্তু কমিউনিস্টরা ছিল পাকিস্তানের ‘সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতি তত্ত্বের’ বিরোধী। তা ছাড়া, তারা সাধারণ মানুষের রুটি-রুজির সমস্যা সমাধান ও বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করতে গণ সংগ্রামের বিশ্বস্ত অগ্রনায়ক। তাই রুটি-রুজি অধিকারের দাবিতে আন্দোলনের সম্ভাবনাকে বিনষ্ট করার জন্য পাকিস্তানের ক্ষমতাসীনরা আগেভাগেই আঘাত হানার পথ নিয়েছিল। এদিকে আবার কমিউনিস্টরাই তখন ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়, লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়’ স্লোগান তুলে বিপ্লবী পন্থায় লড়াই চালাতে শুরু করেছিল। এসব কারণে কমিউনিস্টরা শুরু থেকেই ছিল পাকিস্তানের নব্য-শাসকগোষ্ঠীর চক্ষুশূল।
এভাবে পাকিস্তানের যাত্রার শুরু থেকেই সর্বত্র চলছিল মুসলিম লীগ সরকারের দমন-পীড়নের রাজত্ব। মুসলিম লীগের সেই দুর্দান্ত ও একচ্ছত্র শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম লড়াই সূচনা করেছিল কমিউনিস্টরা। অনেকদিন পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টিই ছিল একমাত্র কার্যকর বিরোধী দল। ‘কমিউনিস্টরা হচ্ছে দেশের শত্রু ও তাদের পঞ্চমবাহিনী’- পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর এই অপপ্রচারকে অনেকে সত্য মনে করতো। তখনও আওয়ামী লীগ গঠিত হয়নি।
উত্তরবঙ্গে চলছিল ‘তেভাগা আন্দোলন’। ময়মনসিংহের গারো পাহাড়ের পাদদেশ জুড়ে গড়ে উঠেছিল ‘টংক আন্দোলন’। সিলেটে চলছিল ‘নানকার বিদ্রোহ’। শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন চলছিল দেশজুড়ে। এসব আন্দোলন-সংগ্রামকে স্তব্ধ করার জন্য চলছিল প্রচণ্ড দমন-পীড়নের স্টিম রোলার। কমিউনিস্ট ও কৃষক-শ্রমিক আন্দোলনের কর্মী ও প্রগতিশীল লেখক-সাহিত্যিক-শিল্পী-বুদ্ধিজীবীদের হাজারে-হাজারে গ্রেফতার করে ভরে তোলা হয়েছিল কারাগারগুলো। তাদের অনেকে আটক ছিলেন রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ডে।
বন্দি অবস্থাতে থাকা কমিউনিস্টরা তাদের নিজেদের জন্য রাজবন্দির মর্যাদা ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার নিশ্চয়তা এবং একই সঙ্গে সাজাপ্রাপ্ত ও হাজতিদের প্রতি অমানবিক আচরণ বন্ধ করা, ঘানি টানার কাজ বন্ধ করা ইত্যাদি দাবিতে দেশের সব জেলখানায় আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। বেশ কিছুদিন ধরে এসব নিয়ে দেনদরবার, দাবিনামা পেশ ইত্যাদি চলেছিল। তারা এই ইস্যুতে একাধিকবার টানা দীর্ঘ অনশন কর্মসূচি পালন করেন। ঢাকা জেলে অনশনরত শিবেন রায়কে ‘ফোর্স ফিডিং’ করাতে গেলে তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তথাপি জেল কর্তৃপক্ষ দাবি মেনে নিতে রাজি হয়নি।
রাজশাহী জেলের ‘খাপড়া ওয়ার্ডে’ থাকা রাজবন্দিরাও সে আন্দোলন চালাচ্ছিল। আন্দোলন দমনের জন্য জেল কর্তৃপক্ষ কয়েকজন নেতাকে সেখান থেকে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয়ায় উত্তেজনা চরমে উঠেছিল। ১৯৫০ সালের ২৩ এপ্রিল রাতে খাপড়া ওয়ার্ডের বন্দিরা সারা রাত ধরে উদ্ভূত পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। সেই আলোচনা ২৪ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত চলেছিল। ফলে অনেকেই ছিলেন ক্লান্ত।
সকালের চা-নাশতা খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকেও চলছিল আলোচনা। এমন সময় খাপড়া ওয়ার্ডে এসে হাজির হন জেল সুপার মিস্টার বিল, সাথে দু’জন ডেপুটি জেলার, ডাক্তার, সুবেদার আকবর খাঁ, কয়েকজন মেটসহ প্রায় ত্রিশ-পঁয়ত্রিশজন সিপাহি। সিপাহিদের হাতে লাঠি।
ওয়ার্ডের পূর্ব দিকের এক বন্দির সঙ্গে জেলার বিল সাহেবের কিছু কথোপকথনের পরেপরেই তিনি হঠাৎ করে ওয়ার্ডের মূল গেটটি বন্ধ করে দিতে নির্দেশ দেন। ঘটনার আকস্মিকতায় দু’জন জেল কর্মকর্তাও ভেতরে আটকা পড়ে যান। এরপর বন্দিদের ওপর শুরু হয়ে যায় নির্বিচার পুলিশি হামলা। বন্দিরা প্রমাদ গুণলেন। তারা হামলা প্রতিহত করার চেষ্টা চালালেন। দরজা-জানালা আটকিয়ে দিলেন। ফলে জেল কর্তৃপক্ষের কেউ ভেতরে ঢুকতে পারলেন না। কিন্তু বাইরে থেকে জানালার ফাঁক দিয়ে সিপাহিরা অনবরত লাঠি ছুড়ে মারতে থাকলেন। বন্দিরা ভেতর থেকে হাতের কাছে যা ছিল তা দিয়ে সেসব আটকে দেয়ার চেষ্টা করলেন। কাঁসার থালা, ঘটি, বাটি, শিশি, দোয়াত ছুড়তে থাকলেন। কিন্তু এক পর্যায়ে প্রতিরোধের সব চেষ্টাই ব্যর্থ হল। অনেকে আহত হয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। এসবের মাঝে আকস্মিকভাবে শুরু হয়ে গেল গুলিবর্ষণ। শত শত রাউন্ড গুলি। খৈ ফোটার মতো। ক্ষণিকের মধ্যে শহীদের রক্তের স্রোতে লাল হয়ে গেল ‘খাপড়া ওয়ার্ড’।
সেদিন গুলিতে আহত বন্দি কমরেড আবদুস শহীদ ‘খাপড়া ওয়ার্ডের’ সেই রক্তলাল দিনটির স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিখেছেন, “চকিত দৃষ্টিতে দেখলাম, খাপড়ার প্রায় পঞ্চাশটি জানালায় বন্দুকের নল লাগিয়ে সিপাহিরা দাঁড়িয়ে আছে। আমি তৎক্ষণাৎ উপুড় হয়ে বালিশের নিচে মাথা গোঁজার সঙ্গে সঙ্গে রাইফেলের গর্জনে খাপড়ার ভিত যেন ফেটে চৌচির হতে চাইল। গেটের দিকে একটু চোখ পড়তেই দেখলাম ফিনকি দিয়ে রক্ত একেবারে ছাদ পর্যন্ত উঠছে। আমার মাথা একটি সাপোর্টিং ওয়ালের আড়ালে বালিশের নিচে গোঁজা ছিল, পা কনুই বাইরে ছিল। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম হাঁটু দু’ফাঁক করে স্পিøন্টার ঢুকে গেল। বালিশের নিচ থেকে দেখলাম পাশেই কমরেড হানিফের বাহুর উপরিভাগ ছিঁড়ে গেছে এবং সেখান থেকে অঝোরে রক্ত ঝরছে। একটু পরেই কমরেড হানিফকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে দেখি। যেন দেখলাম আমার অদূরেই কুষ্টিয়ার কমরেড নন্দ সান্যাল রক্তাক্ত শরীরে মেঝের ওপর লুটিয়ে পড়েছে। আমার হুঁশ হারানোর আগে যতটুকু মনে আছে দেখলাম খাপড়া ওয়ার্ডে রক্তের স্রোত বইছে। আমার শরীর বুক পর্যন্ত রক্তে ডুবন্ত। ...গুলিবিদ্ধ বন্দিদের বীভৎস আর্তনাদের কথা আমার মনে আছে।
“যখন হুঁশ হল তখন বেলা দশটা। ...সে দৃশ্য ভয়ংকর। রক্তের গন্ধে মাছি এসে জুটেছে। মাছিগুলো আহতদের ঘিরে ধরেছে। ...যদি কোনো কাল্পনিক নরকের ভয়াবহ চিত্র কেউ কোনোদিন কল্পনা করে থাকে তার সেই কল্পনার সঙ্গে এ দৃশ্যের সাদৃশ্য থাকবে নিশ্চয়ই; মানুষ কর্তৃক রক্তের হোলি খেলার পর মাছি এবং বালুকণার আক্রমণ শুধু এই কথাটাই স্মরণ করিয়ে দেয়, পুঁজিবাদী সমাজে দেশপ্রেম এক বীভৎস অভিশাপ।” ...এই ছিল সংক্ষেপে সেদিনের সেই বীভৎস হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা।
সেদিন এ হত্যাকাণ্ডে যারা জীবন দিয়েছিলেন, তারা হলেন- দিনাজপুরের সর্বজন শ্রদ্ধেয় কৃষক নেতা কম্পরাম সিং, খুলনার দৌলতপুরের ছাত্রনেতা আনোয়ার হোসেন, ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামী সুধীন ধর, রেল শ্রমিক নেতা দেলোয়ার হোসেন, ময়মনসিংহের সুখেন ভট্টাচার্য, কুষ্টিয়ার হানিফ শেখ, আন্দামান ফেরত বিপ্লবী বিজন সেন। তাদের সবাই ছিলেন তৎকালীন নিষিদ্ধ ঘোষিত পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ও কর্মী।
সেদিনের গুলিবর্ষণে আহত হয়েছিলেন- আভরণ সিং, কালী সরকার, খবির শেখ, ডা. গণেশ সরকার, ভুজেন পালিত, ডা. সরকার, সত্যেন সরকার, গারিস উল্লাহ, সুধীর সান্যাল (নন্দ), লালু পাণ্ডে, শীতাংশু মৈত্র, হীরেন সেনগুপ্ত, আবদুল হক, প্রসাদ রায়, আমিনুল ইসলাম বাদশা, বাবর আলী, ফটিক রায়, শ্যামাপদ সেন, আশু ভরদ্বাজ, অনিমেষ ভট্টাচার্য, অনন্ত দেব, প্রিয়ব্রত দাস (মঞ্জু), আবদুশ শহীদ, সদানন্দ দাস, রশিদ উদ্দিন, মাধব দত্ত, নুরুন্নবী চৌধুরী, আবদুল মনসুর হাবিবুল্লাহ, বঙ্কিম চট্টোপাধ্যায়, নাসির উদ্দিন আহমেদ, পরিতোষ দাশগুপ্ত, মতিলাল বর্মণ, পরিমল দাশগুপ্ত প্রমুখ। তাদেরও অধিকাংশ ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ও কর্মী।
আজও ‘খাপড়া ওয়ার্ডের’ হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার হয়নি। এমনকি এ নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনো মামলাও হয়নি। ঘটনার সাত-আট দশক পর অপরাধীদের কাউকেই এখন জীবিত পাওয়া যাবে না। তথাপি, ইতিহাসের কাছে ঋণমুক্ত হওয়ার জন্য এবং প্রকৃত ঘটনার সর্বাংশ বিবরণ ইতিহাসে স্বচ্ছ করে রাখার জন্য এ বিচার হওয়া উচিত।
‘খাপড়া ওয়ার্ড’ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নতুন প্রজন্মের কাছেও তুলে ধরা প্রয়োজন। অন্যথায় কীভাবে তারা অনুধাবন করবে যে, কী ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের আসল চরিত্র, কী ছিল মুসলিম লীগের অত্যাচারের চেহারা, কারা তার বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহের নিশান উড্ডীন করেছিল, কী ছিল কমিউনিস্টদের বীরত্ব ও আত্মত্যাগের স্বরূপ।
বুর্জোয়া দলগুলোর কাছে এ ঐতিহাসিক ‘খাপড়া ওয়ার্ড’ দিবসের কোনো গুরুত্ব নেই। কারণ, যে বিষয়ে অবগত হওয়ার কোনো বাণিজ্যিক বাজারমূল্য নেই, চলতি হাওয়ার বুর্জোয়া ব্যবসায়িক ‘বাজার রাজনীতিতে’ তা মূল্যহীন তুচ্ছ ঘটনা মাত্র।
তাই, খাপড়া-ওয়ার্ডের জেল হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে ইতিহাসের পাতায় যথাযোগ্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠার কাজটি করতে হবে কমিউনিস্ট-বামপন্থি-প্রগতিশীলদেরকে। এ কাজের সাফল্য বহুলাংশে নির্ভর করছে দেশের বর্তমান লুটপাটের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার আমূল বাম-প্রগতিমুখীন রূপান্তর সাধনে সক্ষম হওয়ার ওপর। নির্ভর করছে বর্তমান বাণিজ্যিক-ভোগবাদী-ভক্তিবাদী ধারার রাজনীতি (অপ-রাজনীতি!) থেকে দেশকে মুক্ত করে একটি বাম গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল বিকল্প ধারার সরকারকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করতে পারার ওপর।