সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ন্যাপ-ছাত্র ইউনিয়ন-কমিউনিস্ট পার্টির বিশেষ গেরিলা বাহিনী

সৈয়দ আহমেদ অটল

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
ডিসেম্বর বিজয়ের মাস। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। এই যুদ্ধে সকল শ্রেণি-পেশা ছাত্র-জনতা অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিবাহিনী ছাড়াও ন্যাপ-ছাত্র ইউনিয়ন-কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) বিশেষ গেরিলা বাহিনী গঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। এই বাহিনীর রয়েছে রক্তাক্ত ইতিহাস। যারা এক সময় মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করেছেন, অসাম্প্রদায়িক- গণতান্ত্রিক সমাজ গড়তে দায়িত্ব পালন করেছেন, সেই সব প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার ছাত্র-জনতা এই বাহিনীতে যুক্ত হয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ভারতের আসামের তেজপুরে এই বাহিনীর সদস্যদের জন্য পৃথক ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়। ট্রেনিং শেষে গেরিলা বাহিনীর সদস্যরা ভারতের বিভিন্ন সীমান্ত পথ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। এই বাহিনীর প্রধান ছিলেন সিপিবির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে পল্টন ময়দানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে বাহিনী প্রধান ও সিপিবির সাধারণ সম্পাদক কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ যুদ্ধাস্ত্র সমর্পন করেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ন্যাপ-ছাত্র ইউনিয়ন-কমিউনিস্ট পার্টির সমন্বয়ে গঠিত এই বাহিনী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক স্বীকৃতি লাভ করে। ডিসেম্বরের শুরু থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের সাঁড়াশি আক্রমণে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দিশাহারা হয়ে পড়ে। এ ভাবে দিন যতই গড়াতে থাকে মুক্তিযোদ্ধাদের সাঁড়াশি আক্রমণ ততই বাড়তে থাকে। মুক্তির সংগ্রামে উত্তাল হয়ে ওঠে বাংলার মাটি। মুক্তিবাহিনীর গেরিলা আক্রমণ থেকে সম্মুখ যুদ্ধের গতি বাড়ে। জীবন বাজি রেখে সীমিত অস্ত্র নিয়ে অসীম সাহসে মুক্তিযোদ্ধারা সর্বত্র পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ফলে অপ্রতিরোধ্য বাঙালির বিজয়ের পথে পাকিস্তানি বাহিনীর সব পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াত-শিবিরের গড়া রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বাহিনী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে এ সময় নানাভাবে সহযোগিতা করে। তারপরও বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তুমুল লড়াইয়ে পাকিস্তানি সেনারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। ফলে অবরুদ্ধ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অনেক এলাকায় ‘মুক্তাঞ্চল’ গড়ে ওঠে। পদে পদে মুক্তিবাহিনীর হামলায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দিশাহারা হয়ে পড়ে। মুক্তিযোদ্ধারা বিজয়ের বেশে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। বাংলাদেশের প্রায় সকল রণক্ষেত্রে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকায় হানাদার বাহিনী সর্বত্র পিছু হটছিল। পাকিস্তানি বিমানবাহিনী ক্রমশ পঙ্গু হয়ে পড়ছিল। এদিকে ভারতীয় পূর্বাঞ্চল কমান্ডের লে. জে. জগজিৎ সিং অরোরার অধিনায়কত্বে ঘোষিত হয় বাংলাদেশ-ভারত যুক্ত কমান্ড। একাত্তরের মাঝামাঝি সময়ে ন্যাপ-ছাত্র ইউনিয়ন-কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) বিশেষ গেরিলা বাহিনী গঠনের মাধ্যমে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। বগুড়া থেকে প্রথম (কেন্দ্রীয়ভাবে দ্বিতীয় ব্যাচ) ২০ জনের একটি দল ট্রেনিংয়ের জন্য আগরতলা থেকে রেডক্রসের মালবাহী বিমানে তেজপুর যায়। এই ব্যাচে এই লেখকও ছিলেন। সে সময় আগরতলা বিমানবন্দরে অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ এই সব মুক্তিযোদ্ধাদের বিদায় জানাতে উপস্থিত ছিলেন। এই ব্যাচে বিভিন্ন জেলার ৩০০ জনের কমান্ডার ছিলেন মনজুরুল আহসান খান। ডেপুটি কমান্ডার ছিলেন রংপুরের শাহাদাৎ আলম ও চট্টগ্রামের মোহাম্মদ শাহ আলম (বর্তমানে সিপিবির সভাপতি)। এর আগে প্রথম ব্যাচ ট্রেনিং শেষে বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য সীমান্ত এলাকায় ফিরে যায়। প্রায় তিন মাস ট্রেনিং শেষে আমরাও পশ্চিম দিনাজপুরের বালুরঘাট সীমান্তে পৌঁছি। প্রথম ব্যাচের একদল মুক্তিযোদ্ধা ঢাকার দিকে অগ্রসরের সময় কুমিল্লার বেতিয়ারায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাথে মুখোমুখি যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এই যুদ্ধে নয়জন শহীদ হন। এটা নভেম্বরের প্রায় মাঝামাঝি সময়ের ঘটনা। এ সম্পর্কে সিপিবির সাবেক সভাপতি মনজুরুল আহসান খান তার ‘বলা-না বলা কথা’ গ্রন্থে লিখছেন– ‘পরের দিন খবর পেলাম, ভোরবেলা কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থানার বেতিয়ারা গ্রামে আমাদের নয়জন যোদ্ধা পাকবাহিনীর এক অ্যাম্বুসে শহিদ হয়েছেন!’ তিনি আরও লিখছেন– ‘একজন ব্রিগেডিয়ার জানালেন, এই অ্যাম্বুস যেভাবে হয়েছিল তাতে ৯৯% মারা পড়ার কথা। সে হিসাবে ৩৮ জনের মধ্যে নয়জন মারা গেছে। এ থেকে বোঝা যায়, মুক্তিযোদ্ধারা সাহস ও দক্ষতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। এ ব্যাপারে সাপ্তাহিক একতা’র দায়িত্বপ্রাপ্ত কমরেড মোসলেম উদ্দিন এই লেখককে জানান, ‘এই হৃদয় বিদারক ঘটনাটি ঘটেছিল ১১ নভেম্বর। আর এই নয়জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হলেন– নিজাম উদ্দিন আহমেদ, সিরাজুম মনির, মো. বশিরুল ইসলাম (বশির মাস্টার), জহিরুল হক ভূইয়া (দুধু মিয়া), আওলাদ হোসেন, শহিদুল্লা সাউদ, আব্দুল কাইয়ুম, মো. শফিউল্লাহ এবং আব্দুল কাদের।’ ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে পাকিস্তানের পক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ‘যুদ্ধবিরতি’ প্রস্তাব উত্থাপন করলে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাতে ভেটো দেয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব ভেস্তে যায়। তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক পোল্যান্ডও যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয়। ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত থাকা। সোভিয়েত ইউনিয়ন ছাড়াও সে সময়ের সোভিয়েত ব্লকের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো মার্কিন প্রস্তাবে বিরোধিতা করে। সোভিয়েত ইউনিয়নকে বাংলাদেশের পক্ষে আনতে সিপিবির তৎকালীন সভাপতি কমরেড মণি সিংহ বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। প্রবাসী বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের অন্যতম সদস্য ছিলেন মণি সিংহ। সোভিয়েতের সমর্থন পেতে মণি সিংয়ের সাথে ন্যাপের সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ বিশেষ দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ব্যাপারে সাধারণ সম্পাদক এস এ ডাঙ্গের নেতৃত্বে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআই)-র বিশেষ ভূমিকা ছিল। সেই সময় রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন কোসিগিন এবং পার্টির সাধারন সম্পাদক ছিলেন ব্রেজনেভ। ৬ ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। সর্বপ্রথম স্বীকৃতি দেয় ভুটান, আগের দিন। ৮ ডিসেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল মানেকশ বিভিন্ন ভাষায় হানাদার বাহিনীকে আত্মসমর্পণ বাণী বিমানের মাধ্যমে লিফলেট ছড়ায়। এতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীকে আত্মসমর্পণ করতে এবং সঙ্গে সঙ্গে এ আশ্বাস দেন যে, আত্মসমর্পণ করলে তাদের প্রতি জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী আচরণ করা হবে। কিন্তু পাক সামরিক শাসকরা কিছুতেই আত্মসমর্পণের দিকে না গিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে বাংলাদেশে অবস্থানরত সেনাসদস্যদের নির্দেশ দেয়। ফলে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধের তীব্রতা বাড়তে থাকে। প্রতিটি ক্ষেত্রে হানাদার বাহিনীকে একের পর এক পরাজিত করতে থাকে মুক্তিবাহিনী। ৮ ডিসেম্বর কুষ্টিয়ার মিরপুর থানায় কমান্ডার আফতাব উদ্দিন খান ১৭০ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা গান স্যালুটের মাধ্যমে উত্তোলন করেন। (চলবে)

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..