কমরেড হায়দার আকবর খান রনোর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে অনুষ্ঠিত স্মরণসভায় আলোচনা করেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমএকতা প্রতিবেদক :
“সারা বিশ্বে উগ্র ডানপন্থি ও ফ্যাসিবাদী রাজনীতির আস্ফালন চলছে। এই অবস্থায় আশার আলোর মতো বামপন্থাই মানুষের সামনে বিকল্প হিসেবে আজ ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। এমন এক যুগসন্ধিকালে কমরেড রনো বেঁেচ থাকলে সমাজ অত্যন্ত উপকৃত হতো।”
বিশিষ্ট মার্কসবাদী তাত্ত্বিক, দেশের শীর্ষ বামপন্থি রাজনীতিক, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক উপদেষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা কমরেড হায়দার আকবর খান রনোর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে অনুষ্ঠিত স্মরণসভায় বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, কমরেড রনো ছিলেন একজন তীক্ষ্ণ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন বাস্তববাদী মানুষ। সে কারণেই তিনি আমৃত্যু ছিলেন একজন আশাবাদী রাজনীতিবিদ। তিনি রাজনৈতিকভাবে বামপন্থার অপরিহার্যতা নিয়ে কখনো দ্বিধাদ্বন্দে ভোগেননি।
সিপিবির সাবেক সভাপতি সেলিম আরো বলেন, “একই আদর্শে আমরা লড়াই শুরু করেছিলাম। পাকিস্তান আমলে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে হায়দার আকবর খান রনো বিরাট সাহসিকতার সাথে লড়াই করেছেন। উত্তাল ষাটের দশক থেকে শুরু করে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি একজন লড়াকু নেতা হিসেবে ছিলেন। তিনি আগামীতেও বামপন্থিদের লড়াইয়ে প্রেরণা হয়ে থাকবেন।”
১২ মে মঙ্গলবার, বিকেল ৫টায়, পুরানা পল্টনের মুক্তি ভবনের মিলনায়তনে স্মরণসভায় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দনের সভাপতিত্বে আরও বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান, সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মিহির ঘোষ, প্রগতি লেখক সংঘের সহ-সভাপতি জাকির হোসেন প্রমুখ। স্মরণসভা সঞ্চালনা করেন সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার।
বর্ষীয়ান রাজনীতিবি খালেকুজ্জামান বলেন, আজীবন বিপ্লবী হিসেবে নিজেকে কর্মে নিয়োজিত রেখেছিলেন কমরেড হায়দার আকবর খান রনো। তিনি একজন সজ্জন আর বিনয়ী রাজনীতিবিদ ছিলেন। কবিতার প্রতি এবং রবীন্দ্রনাথের প্রতি তার ছিলো বিশাল অনুরাগ। তিনি তার বক্তব্যে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়কে খুব সহজভাবে বলতে পারতেন।
তিনি আরও বলেন, কমরেড রনো জনগণের কাছে মার্কসবাদকে পৌঁছে দিতে এবং লড়াই সংগ্রামের ইতিহাসকে লিপিবদ্ধ করতে তিনি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত গণমানুষের জন্য লিখে গেছেন। ইতিহাসের কাছে তার এই অবদান অমূল্য।
সিপিবি সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন বলেন, মার্কসবাদী তাত্ত্বিক, বামপন্থি রাজনীতিক এবং সংগ্রামী নেতা হিসেবে কমরেড রনো জনমানুষের কাছে সুপরিচিত ছিলেন। তার ‘উত্তাল ষাটের দশক’ বইটি সে সময়ের মুক্তি সংগ্রামের প্রামাণ্য দলিল। তার লেখার মধ্য দিয়ে ষাটের দশককে পাঠ করা যায়।
তিনি বলেন, ইতিহাসে গণমানুষের অবদান ধরে রাখতে হায়দার আকবর খান রনোর গ্রন্থগুলো অসামান্য ভূমিকা রেখে যাবে। তিনি আন্তর্জাতিক সাম্যবাদী রাজনৈতিক আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি নিজের নীতি-আদর্শে ছিলেন অবিচল। আগামী দিনের রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য কমরেড হায়দার আকবর রনো অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব।
২০২৪ সালের ১১ মে রাত ২টায়, ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন হায়দার আকবর রনো।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে কমরেড রনো ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তানি স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম, মহান মুক্তিযুদ্ধ, এদেশে অসাম্প্রদায়িকতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অবিচল ছিলেন। জেল-জুলুম নির্যাতন উপেক্ষা করে তিনি ছিলেন এক বর্ণাঢ্য লড়াকু জীবনের অধিকারী।
একজন মার্কসবাদী তাত্ত্বিক হিসাবে তিনি অসংখ্য গ্রন্থ, রচনা ও পুস্তিকা রেখে গেছেন। তার লেখনি নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষা ও সংগ্রামী প্রেরণার অফুরন্ত উৎস। কমরেড রনো জীবনের শুরুতে ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত হন। তিনি ৬০’র দশকে অবিভক্ত ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ছাত্র আন্দোলন শেষে শ্রমিকের লড়াইয়ে শামিল হন। ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান পূর্ববর্তী সময়ে টঙ্গী শিল্পাঞ্চলে কিংবদন্তি ঘেরাও আন্দোলন সংগঠিত করার মধ্য দিয়ে সংগ্রামী ধারার শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলেন কমরেড রনো। এই শ্রমিক আন্দোলন ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশের অভ্যন্তরে শিবপুরসহ ১৪টি সশস্ত্র ঘাঁটি এলাকা ও অসংখ্য মুক্তাঞ্চলকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান সংগঠকের ভূমিকা পালন করেছিলেন হায়দার আকবর খান রনো। মহান মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে শ্রমজীবী মেহনতি মানুষকে সংগঠিত করার মাধ্যমে শোষণমুক্তি ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আজীবন তিনি নিয়োজিত ছিলেন। মৃত্যুকালীন সময়ে তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে দীর্ঘ অসুস্থতা সত্ত্বেও পার্টির দায়িত্ব ও রাজনৈতিক কর্তব্য পালনে তিনি কখনো পিছু হটেননি।