প্রাথমিক শিক্ষায় বৈষম্যমূলক অবস্থা এবং উত্তরণ ভাবনা

শাহিনুর আল আমীন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
শিক্ষা কী : শিক্ষা প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার। প্রতিটি সমাজের অগ্রগতির ভিত্তি। শিক্ষা সম্পর্কে Joseph T shipley (১৮৯৩-১৯৮৮) তাঁর– Dictionary of the word origins-এ লিখেছেন- Education শব্দটি এসেছে ল্যাটিন ঊফবী এবং Ducer-due শব্দ দুটি হতে। যার অর্থ বের করা; পথপ্রদর্শন করা। ব্যাপক অর্থে তথ্য সংগ্রহ করে দেওয়া এবং সুপ্ত প্রতিভা বের করা। এই বুৎপত্তিগত অর্থ অনুযায়ী বলা যায় শিক্ষার্থীর মধ্যকার ঘুমন্ত প্রতিভা বা সম্ভাবনার পথ নির্দেশকই হল শিক্ষা। দার্শনিক বারট্রান্ড রাসেল (১৮৭২-১৯৭০) বলেছেন, Education should not aim at a passive awareness of dead facts, but an activity directed towards the world our efforts are to creat. কবিগুরুর ভাষায় : “যে কোনো যথার্থ জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক লক্ষ্য হওয়া উচিৎ সৃজনশীলতা, স্বাধীনতা আনন্দ এবং দেশের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সম্পর্কে সচেতনতাকে উৎসাহিত করা।” ২০১০ সালের শিক্ষানীতিতে এর কিছুটা ছোঁয়া পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু আমাদের সামনে শিক্ষাটা এমন এক রূপে দাঁড়িয়েছে যে, আমরা শিক্ষা বলতে বুঝি একটা হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে কাগজের একটা সনদ অর্জন। যার মাধ্যমে নিজেকে কোনো প্রতিষ্ঠানে অর্থ যোগে নিয়োগ করা যায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাটা সসীম, নির্দিষ্ট, পরিমাপযোগ্য। কারিকুলামে এমন কিছু বিষয় সংযোজন করা দরকার যেন এই সসীমের মধ্যে অসীমের সন্ধান মেলে। আমাদের শিক্ষার্থীরা যেন স্বশিক্ষার আলোর সন্ধানে ছুটে যায়। এই নির্দিষ্টতা যেন জ্ঞান সমুদ্রে প্রবেশের পথনির্দেশক হয়। অন্তত এই জ্ঞান অর্জনের ফলে কোনো শিক্ষার্থীর আচরণে মৌলিক সমাজ স্বীকৃত পরিবর্তনই হয়। প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য : “শিশুর শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, নৈতিক, মানবিক, নান্দনিক, আধ্যাত্মিক ও আবেগিক বিকাশ সাধন এবং তাদের দেশাত্মবোধে, বিজ্ঞানমনস্কতা, সৃজনশীলতা ও উন্নত জীবনের স্বপ্ন দর্শনে উদ্বুদ্ধ করা। একটা শিশু ভবিষ্যতে কতটুকু ন্যায়, নীতিবান, আদর্শবান, চরিত্রবান হবে বা দেশ, জাতি, সমাজের প্রতি কতটুকু দ্বায়িত্বশীল হবে এটি অনেকাংশেই নির্ভর করে তার প্রাথমিক জীবনের শিক্ষার ওপর। প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব তাই অপরিসীম। জাতির মেরুদণ্ড যে কারখানায় তৈরি হয়, তার নাম হল প্রাথমিক বিদ্যালয়। শিক্ষার কয়েকটি স্তর রয়েছে : (১) প্রাথমিক শিক্ষা (২) মাধ্যমিক শিক্ষা (৩) উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা (৪) উচ্চ শিক্ষা। আমাদের দেশে প্রাক-প্রাথমিক থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা স্তর। ২০১০ সালের শিক্ষানীতিতে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা স্তর করা হয়েছে। যার ফলে প্রতি বছর কিছু কিছু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পর্যায়ক্রমে ৮ম শ্রেণি চালু হচ্ছে। কিন্তু বিভিন্ন জটিলতায় বাস্তবায়নের অগ্রগতির পদক্ষেপ বড়ই ধীর। ২০১০ সাল থেকে এপর্যন্ত ৭২৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি চালু করা হয়েছে। (১) প্রাথমিক শিক্ষার বর্তমান অবস্থা ও করণীয় : পরিসংখ্যান (প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন ২০১৮-২০১৯) অনুযায়ী দেশে বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা– ৬৫৬২০টি, নন রেজি: বেসরকারি প্রাথমিকা বিদ্যালয় ৪৭৫৪টি, কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ১৪২টি, রস্ক স্কুল-৩১৯৯টি, শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট প্রাথমিক বিদ্যালয়-২০৩টিসহ মোট ৭৩৯১৮টি বিদ্যালয় আছে, যেগুলো সরকার দ্বারা পরিচালিত। এছাড়া অন্যান্য সংস্থা পরিচালিত বিদ্যালয় রয়েছে ৫৫৩৪০টি। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা- ১,৪১,০০৪৪৫ জন। শিক্ষক সংখ্যা প্রধান এবং সহকারী শিক্ষকসহ মোট ৩,৫৬,৩৬৬ জন। এর মধ্যে প্রায় ৩,০০,০০০ জন সহকারী শিক্ষক। প্রধান শিক্ষকগণ প্রশাসনিক কাজে এতই ব্যস্ত থাকেন যে, শ্রেণিতে পাঠদানে অংশগ্রহণের সুযোগ তাদের সীমিত। বর্তমানে শিক্ষক শিক্ষার্থী অনুপাত প্রায় ১:৫৫। একজন শিক্ষক দ্বারা এত বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থীকে পাঠদান সম্ভব নয়। ফলে ব্যাহত হয় মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা। ২০১০ সালের শিক্ষানীতি অনুযায়ী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত ধরা হয়েছে ১:৩০। দুঃখের কথা হল, আমাদের দেশে কোনো শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন দেখা যায় না। (২) বিদ্যালয়ের সময় সূচি : সিটি কর্পোরেশনের বিদ্যালয়ের সময়সূচি– ৮:০০টা হতে ৩:১৫টা পর্যন্ত, দেশের অন্যান্য স্থানে এক শিফটের বিদ্যালয়ের সময়সূচি– ৯:০০টা থেকে ৪:১৫টা পর্যন্ত, দুই শিটের বিদ্যালয়ের সময়সূচি– ৯:০০ থেকে ৪:৩০টা পর্যন্ত। আবার এমনও কিছু বিদ্যালয় রয়েছে যা পরিচালিত হয় ৭:০০টা হতে ১২টা পর্যন্ত। আবার উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন প্রাথমিক শিক্ষা চলে ৭:৩০টা হতে ১০:৩০টা পর্যন্ত। সকল বিদ্যালয়ে একই সময়সূচি থাকা বাঞ্ছনীয়। কিছু কিছু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিডডে মিল চালু আছে। সকল বিদ্যালয়ে মিডডে মিল চালু করতে হবে। পর্যাপ্ত বিনোদন উপকরণ ও খেলাধুলার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। (৩) ভর্তির হার ও ঝরে পড়া রোধ : প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তির নিট হার ২০০৫ সালে ছিল ৮৫%। ২০১৯ সালে সেটা ৯৭.৩৪%-এ উন্নীত হয়েছে। অনেক ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষাচক্র শেষ হবার আগেই বিদ্যালয় ত্যাগ করে অর্থাৎ ঝরে পড়ে। ২০১৯ সালের হিসাব অনুযায়ী ঝরে পড়ার হার ১৭.৯০%। সরকার ঝরে পড়া রোধে স্কুল ফিডিং, উপবৃত্তি প্রদান, বিদ্যালয়ের পরিবেশ উন্নয়ন, পাহাড়ি এলাকায় ২৯ হোস্টেল নির্মাণসহ বিভিন্ন সচেতনতামূলক কাজকর্ম চালু করেছে। যার ফলে ঝরে পড়ার হার অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু কোভিড- ১৯ নামক মহামারির ফলে বিশ্বব্যাপি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাব্যবস্থা এবং আমাদের দেশে ব্যাপক হারে বেড়েছে শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহ। ফলে ঝরে পড়ার হার উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো এই মহামারির মধ্যেও মাদ্রাসা বন্ধ হয়নি। তাই প্রায় ১৩ ভাগ সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার্থী মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছে। সরকারকে এবিষয়ে এখনি ভাবতে হবে। এর প্রভাব এত ভয়াবহ হবে যে কোভিড-১৯ কেও হার মানাবে। (৪) প্রাথমিক শিক্ষক হবার যোগ্যতা : ১৯৯০ সালের পর থেকে পুরুষের ক্ষেত্রে স্নাতক বাধ্যতামূলক এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে এস এস সি পাস। ২০১৩ সালের নিয়োগবিধি অনুসারে পুরুষের ক্ষেত্রে– স্নাতক ডিগ্রি, মহিলাদের ক্ষেত্রে– এইচএসসি। কিন্তু ’৯০ এর পরে এসএসসি পাস প্রার্থীদের সরকারি শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধি এবং সম্মানী বৃদ্ধিতে দাতাদের প্রেসার এড়ানোর জন্য নিয়োগবিধিতে এস এস সি বা এইচ এস সি পাশ রাখা হয়েছিল। মনে রাখতে হবে, মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষক না থাকলে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা সম্ভবপর নয়। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরে এসে ২০১৯ সালের নিয়োগবিধিতে মহিলা ও পুরুষ উভয়ের যোগ্যতা স্নাতক করা হয়েছে। চাকুরিতে প্রবেশের পরে ১ বছর ৬ মাস মেয়াদের একটা ডিপ্লোমা ইন এডুকেশন কোর্স চালু করা হয়েছিল। কিন্তু এবছর থেকে মেয়াদ কমিয়ে ১০মাস করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অথচ আমরা বলে আসছি, এই কোর্সটি হবে ৪ বছর মেয়াদী একটি অনার্স কোর্স। এবং পেশায় প্রবেশের পূর্বেই কোর্সটি সমাপ্ত করতে হবে। তাহলে তিনি অন্তরে শিক্ষকতা পেশাকে লালন করবেন। আগে থেকেই তাকে শিক্ষক হয়ে পেশায় প্রবেশ করতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষা হল জাতির ভিত্তি। আর এই ভিত্তি নির্মাণ করেন প্রাথমিক শিক্ষকগণ। প্রাথমিক শিক্ষকদের হতে হবে শিশুমনোবিজ্ঞানী। দেশের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী মেধাবীদের এই পেশায় প্রতি আকৃষ্ট করতে হবে। শিক্ষকদের সম্মানী ও মর্যাদা বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে করে দেশের অবিভাবকদের স্বপ্ন তৈরি হয় যেন তাদের সন্তানকে বড় করে শিক্ষকতা পেশায় দিবেন। (৫) কোটা পদ্ধতি : ২০১৯ সালের নিয়োগবিধি অনুযায়ী সরাসরি নিয়োগ যোগ্য পদের মহিলা কোটা- ৬০%, পোষ্য কোটা- ২০%। বিশেষ করে শিক্ষাক্ষেত্রে কোটা পদ্ধতি বাতিল করা দরকার। কোটা পদ্ধতির কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। তাই সকল কোটা তুলে দিয়ে যোগ্যতার ওপর গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। তাহলে মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ পাবে এবং প্রাথমিক শিক্ষা হবে মানসম্মত। (৬) পদোন্নতি : একজন প্রাথমিক শিক্ষক যে পদে যোগদান করেন ঐ পদ থেকেই সাধারণত তাকে অবসর নিতে হয়। কারণ তার ভাগ্যে কোনো পদোন্নতির সুযোগ আসে না। মাত্র ১৫ ভাগ সহকারী শিক্ষক চাকুরী জীবনে একবার পদোন্নতি পান। সেটাও আবার স্ব-বেতনে। এই কারণে মেধাবীরা এই পেশায় আসতে চান না এবং এলেও থাকতে চান না। এটা এখন মেধাবীদের একটা ট্রানজিট পেশায় পরিণত হয়েছে। সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক পদে শতভাগ এবং যোগ্যতা অনুযায়ী পরিচালক পর্যন্ত প্রমোশন পদ্ধতি চালু না করলে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন সম্ভবপর নয়। কারণ মানসম্মত শিক্ষক এই পেশায় থাকছে না। আর যারা আছেন তাদের পরিবারপরিজনের ভরণ-পোষণ যোগাতে অন্য কোনো কাজে মনোনিবেশ করতে হয়। ফলে বিঘ্নিত হয় মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা। ২০০৯ সাল থেকে প্রমোশন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়ে বন্ধ ছিল। এরপর প্রায় দীর্ঘ ১০ বছর পর কিছু সহকারী শিক্ষককে প্রধান শিক্ষক পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সেখানেও রয়েছে বেশ জটিলতা। দ্রুত সকল জটিলতার নিরসন করে পদোন্নতি চালু করা প্রযোজন। (৭) গ্রেডেশন : গ্রেডেশন নিয়ে কবিগুরুর জুতা আবিষ্কারের দশা সৃষ্টি হয়েছে। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ বলছেন, উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের তারিখ থেকে চাকরিকাল গণনা করতে হবে, কেউ কেউ বলছেন যোগদানের তারিখ হতে, আবার কেউ বলছেন অন্য উপজেলা হতে বদলি হয়ে আসা শিক্ষকগণ বহিরাগত, তারা বদলিকৃত উপজেলায় যোগদানের তারিখ থেকে সিনিয়ারিটি পাবে। অনেকের মতামত, জাতীয় পর্যায়ে একটি মাত্র গ্রেডেশন হবে। উপজেলা পর্যায়ে বা জেলা পর্যায়ে গ্রেডেশন করতে হবে এভাবনাও রয়েছে অনেকের মধ্যে। যার স্বার্থ যেখানে নিহিত, তিনি সেই মতামত দেন। স্বার্থের বাইরে এসে নিরোপেক্ষভাবে ভাবতে হবে। শিক্ষকতায় (চাকরিতে) অভিজ্ঞতা কী আগে সেটা জানতে হবে। আমার মনে হয় যে, যে ব্যক্তি যেদিন থেকে তার পেশায় যোগদান করবেন ঐদিন থেকেই তার চাকরিকাল বা অভিজ্ঞতা গণনা করা উচিৎ হবে। ধরুন, কোনো শিক্ষক তার বাবার বাড়ির ঠিকানায় চাকরিতে যোগদান করলেন। ৬ বছর চাকরি করার পর তার বিবাহ হল। সে তার স্বামীর স্থায়ী ঠিকানায় বা কর্মস্থলে (ভিন্ন উপজেলায়) বদলি হয়ে গেলেন। এখন যদি আইন করা হয়, তার বদলিকৃত উপজেলায় যোগদানের তারিখ থেকে সিনিয়ারিটি গণনা করা হবে, তাহলে ঐ শিক্ষকের ৬ বছর চাকুরী করার অভিজ্ঞতা থাকছে না। তার মানে সরকার আইন করে চাকুরীর অভিজ্ঞতা স্মৃতিতে রাখতে দিবে না। এটা কোনো আইন হতে পারে না। এটা সংবিধান বিরোধী এবং অমানবিক। বদলি নীতিমালায় বা কোনো নিয়োগবিধিতে উল্লেখ করা হয়নি যে, “অন্য উপজেলা হতে বদলি হয়ে আসা শিক্ষকগণ বহিরাগত, তারা বদলিকৃত উপজেলায় যোগদানের তারিখ থেকে সিনিয়ারিটি পাইবেন।” যা ইচ্ছা তাই করা যায় না। এবার বলতে পারেন, যে উপজেলায় বদলি হয়ে আসলেন সেই উপজেলার শিক্ষকগণ পদোন্নতি হতে বঞ্চিত হচ্ছেন। যদি উপজেলা পর্যায় গ্রেডেশন হয়, তাহলে বঞ্চিত হতে পারেন। দেশের কোনো কোনো উপজেলায় পদোন্নতি পেয়েছেন ২০০৬/৭ সালের নিয়োগ প্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকগণ। পক্ষান্তরে কোনো কোনো উপজেলায় ১৯৮৭ সালে নিয়োগ প্রাপ্ত শিক্ষকগণ পদোন্নতি পাননি। এটাও নিয়ম হতে পারে না। তাই জাতীয় পর্যায়ে যোগদানের তারিখ থেকে গ্রেডেশন করাই বাঞ্ছনীয়। প্রধান শিক্ষক পদটি একটি দ্বিতীয় শ্রেণির পদ, তাই ভিন্ন উপজেলায় পদোন্নতিতে পোস্টিং হতেই পারে। যদি ভিন্ন উপজেলায় চাকুরি করতে না চান, তাহলে পরবর্তিতে ৭এর খ ধারা অনুসারে নিজ উপজেলায় পদ শূন্য সাপেক্ষে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বদলি হয়ে আসতে পারবেন, সে ব্যবস্থা থাকা দরকার। (৮) শিক্ষা বাজেট : জাতি সংঘের সদস্যভুক্ত সকল দেশে জিডিপি-এর ৭% শিক্ষাখাতে বরাদ্দের ব্যাপারে ইউনেস্কোর সুপারিশ ছিল। কিন্তু ২০০৬ সালে সেনেগালের রাজধানী ডাকার- এ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর শিক্ষামন্ত্রীদের এক সম্মেলনে তাদের আর্থিক অসামর্থ বিবেচনা করে শিক্ষাখাতে জিডিপি-এর ৬% (ছয় শতাংশ) ব্যয় করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়েছিল। এরপর ২০১৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার ইনচিওয়ান-এ সেটা কমিয়ে জিডিপি-এর ৪%-৬% (চার শতাংশ থেকে ছয় শতাংশ) বা জাতীয় বাজেটের ১৫%-২০% ধার্য করা হয়। তিনটি ঘোষণায়ই বাংলাদেশের স্বাক্ষর রয়েছে। কিন্তু আজ অবধি বাংলাদেশ তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেনি। বাংলাদেশে ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ জিডিপি’র ১.৮৩ শতাংশ (৮১ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকা) যা বড়ই অপ্রতুল। এর মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষাখাতে ৩১ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক মান অনুসারে প্রাথমিক শিক্ষায়, শিক্ষাখাতে বরাদ্দের ন্যূনতম ৪৫% বরাদ্দ থাকতে হবে। এ থেকে সাধারণভাবেই বোঝা যায় যে, আমাদের দেশের প্রাথমিক শিক্ষা পরিকল্পনায় এবং অর্থ বরাদ্দে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। আবার বরাবরের মতো এবছরেও শিক্ষা বাজেটে আকার বৃদ্ধি দেখাতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিভাগের বাজেট এক করে শিক্ষাখাতে বাজেট বেশি দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। বাংলাদেশের সমমানের বা দুর্বল কয়েকটি দেশের শিক্ষাখাতে বরাদ্দ জিডিপি-এর হার নি¤েœ উল্লেখ করা হল। ভুটান ৪.৮%, নেপাল ৪.৬%, ভারত ৩.৭%, মালদ্বীপ ১১.২০%, সেনেগাল ৫.৮%, তানজেনিয়া ৬.৮% শিক্ষাখাতে বরাদ্দ। যে সমস্ত দেশে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বেশী তাদের শিক্ষক-কর্মচারীর সমস্যা লাঘব করার পাশাপাশি তারা আর্থ- সামাজিক অগ্রগতিও অর্জন করে চলেছে। আবার অবাক করা বিষয় হলো আমাদের শিক্ষায় বরাদ্দকৃত বাজেট থেকে সেনা বাহিনীর শিক্ষা/প্রশিক্ষণে ব্যয় হয়। এ সমস্ত সংকট কাটিয়ে উঠতে না পারলে দেশকে এগিয়ে নেওয়া অসম্ভব হবে (৯) ছুটি : সকল জাতীয় দিবসে ছুটির তালিকায় ছুটি লেখা। অথচ আমাদের ঐ দিবসগুলোতে বিদ্যালয়ে অবস্থান করতে হয়। যেহেতু আমরা ঐ দিবসগুলোতে ছুটি ভোগ করিনা বা ভোগ করা সম্ভবপর নয়, তাই দিনগুলো কার্য দিবস হিসেবে ঘোষণা করা প্রয়োজন। শিক্ষা ডিপার্টমেন্টকে ভ্যাকেশনাল ডিপার্টমেন্ট বলা হয়। কারণ এই ডিপার্টমেন্টে ছুটি অনেক বেশি ধারণা করা হয়। বাস্তবে অন্যান্য ডিপার্টমেন্ট থেকে ছুটি বেশি নয় বরং কম। অন্যান্য সকল ডিপার্টমেন্টে বছরে ১৪৪ দিন ছুটি আর শিক্ষা ডিপার্টমেন্টে বছরে ১২৭ দিন ছুটি। আবার প্রতি তিন বছর পর পর সকল ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শ্রান্তি বিনোদন ভাতাসহ ১৫ দিন ছুটি দেওয়া হয় যেটা আমাদের দেওয়া হয় না। অন্যান্য ডিপার্টমেন্টে অবসর প্রস্তুতি ছুটিতে গেলে এক বছর পূর্ণ বেতন দেওয়া হয়। পক্ষান্তরে আমাদের অর্ধগড় বেতনে অবসর প্রস্তুতি ছুটি দেওয়া হয়। যেহেতু আমরা সরকারি কর্মচারী, তাই পূর্ণ বেতনে অবসর প্রস্তুতিকালীন ছুটি প্রদান করা এবং প্রতি তিন বছর পর পর স্বয়ংক্রীয়ভাবে শান্তি বিনোদন ভাতা দরকার। এসময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হল, উচ্চ বিদ্যালয়ের ছুটির সাথে প্রাথমিকের ছুটির কোনো মিল নেই। এতে করে যে অভিভাবকের সন্তান প্রাথমিক এবং উচ্চ বিদ্যালয়ে অর্থাৎ উভয় প্রতিষ্ঠানে পড়ে, তাদের জন্য সমস্যার কারণ হয়ে পড়ে। আমাদের আন্তঃমন্ত্রণালয়ের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। (১০) বেতন-ভাতা/বৈষম্য : একজন শিক্ষক তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী, একথা ভাবতেও লজ্জা পাই। যাদের বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর তারা যদি তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারি হন, তাহলে ঐ জাতিই তৃতীয় শ্রেণির জাতি হবে। আমি কোনো চাকরিজীবীকে ছোট বা বড় করছি না। শুধুমাত্র বৈষম্য দেখানোর জন্য উদাহরণ হিসাবে উপস্থাপন করছি। আমাদের দেশের একজন নার্স-২য় শ্রেণির (এইচ এস সি পাস করে একটা প্রশিক্ষণ), কানুনগো-২য় শ্রেণির (স্নাতক পাস), সহকারী তহশীলদার ২য় শ্রেণির (স্নাতক পাস), স্বাস্থ্য মাঠ কর্মী-২য় শ্রেণির (এইচ, এস সি পাস)। অথচ একজন প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক হতে হলে স্নাতক ২য় বিভাগসহ এক বছর ছয় মাসের ডিপিএড প্রশিক্ষণ করতে হয়। এ কেমন অদ্ভুত বৈষম্য। সরকারের অন্যান্য ডিপার্টমেন্টের স্নাতক ২য় শ্রেণির যোগ্যতা সম্পন্ন কর্মকর্তা কর্মচারিদের যে সুযোগসুবিধা দেওয়া হয়, সেটাও যদি এই অবহেলিত শিক্ষকগণ পেতেন তাহলে কিছু দায়ভার সরকারের কমে যেত। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ০১-০৭-১৯৭৩ সালে প্রায় ৩৭,০০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সরকারিকরণ করেছিলেন। এবং তিনি যোগ্যতা ভিত্তিক বেতন কাঠামো নির্ধারণ করেছিলেন। ঐ সময় সহকারী এবং প্রধান শিক্ষকদের মধ্যে বেতনের কোনো তফাৎ ছিল না। তখন ছিল যোগ্যতা ভিত্তিক বেতন স্কেল। ‘০১-০৬-১৯৮৫ তারিখ থেকে শুরু করে ২৭-৮-২০০৬ তারিখ পর্যন্ত বেতন স্কেলের পার্থক্য ছিল এক ধাপ। ২৮-৮-২০০৬ তারিখ উন্নীত স্কেল দেওয়ায় পার্থক্য দাঁড়ায় ২ ধাপ। ৯ মার্চ ২০১৪ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় পার্থক্য হল তিন ধাপ। এর পর দীর্ঘ ৭ বছর আন্দোলনের ফলে গত ০৯/০২/২০২০ তারিখ থেকে সহকারী শিক্ষকদের একটি ধাপ উন্নীত করা হয়েছে। অচিরেই এই বৈষম্য দূর করা প্রয়োজন। প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে আর্থিক সমতা স্থাপন করে কর্মক্ষেত্রে সুন্দর পরিবেশও শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষকদের আন্তরিকতার সাথে কাজ করার সুযোগ তৈরি করুন। শিক্ষকদের সামাজিক; অর্থনৈতিক মান উন্নয়ন ছাড়া শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভবপর নয়। প্রাথমিক শিক্ষা ও শিক্ষকদের কল্যাণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান ছিল অপরিসীম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার বিগত ৯ জানুয়ারি, ২০১৩ খ্রি. ২৬ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারিকরণ ও ৯ মার্চ, ২০১৪ উন্নীত বেতন কাঠামো ঘোষণা করে তারই প্রমাণ রেখেছেন। আশা করি এবার সুযোগ বঞ্চিত শিক্ষকদের দিকে সুদৃষ্টি দিবেন, যার ফলস্বরূপ শিক্ষা ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়বে। (১১) ভিন্ন ধারার শিক্ষাব্যবস্থা : আমাদের দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে তিন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে। (ক) সরকারি বিদ্যালয় (খ) কিন্ডার গার্টেন (বাংলা/ইংরেজি) (গ) মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা। এই তিন বিদ্যা গ্রহণকারীদের আচার-আচরণ, চিন্তা-চেতনা ভিন্নতর হবে এটাই স্বাভাবিক। ইংরেজি মাধ্যমের কিন্ডার গার্টেনের শিক্ষার্থীরাতো অন্তরে বাংলা সংস্কৃতি ধারণ করে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশের সকল মাদ্রাসা কি মূলধারায় আসতে পেরেছে? অধিকাংশ ক্ষেত্রে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং যুগ উপযোগী শিক্ষা থেকে মাদ্রাসার ছাত্ররা বঞ্চিত। দেশে ইবতেদায়ী মাদ্রাসার সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার। যেখানে প্রায় ২৩ লক্ষ শিক্ষার্থী লেখাপড়া করে। তারা রাষ্ট্রের কি ধরনের উন্নয়ন মূলক কাজে অংশ নেয় আমরা জানি। তাদের অচিরেই মূল ধারার সাথে এক করে কর্মমুখী শিক্ষায় সম্পৃক্ত করা জরুরি। (১২) বেতন স্কেলে বৈষম্য : পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই বেতন কাঠামো নির্ধারিত হয় ১:৬ আনুপাতিক হারে। অর্থাৎ সবনিম্ন ধাপ ১ টাকা হলে সর্বোচ্চ হবে ৬ টাকা। কিন্তু আমাদের দেশে ৮ম জাতীয় পে-কমিশন সর্বনিম্ন ৮,২৫০/- (আট হাজার দুইশত পঞ্চাশ) টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭৮,০০০/- (আটাত্তর হাজার) টাকা। যার অনুপাত দাঁড়ায় প্রায় ১:১০। বলা হচ্ছে সকল ক্ষেত্রে ২ (দুই) গুণ বেড়েছে। সর্বনিম্ন ধাপ ৪১০০/- (চার হাজার একশত) টাকা সেখান থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৮,২৫০/- (আট হাজার দুইশত পঞ্চাশ) টাকা। বৃদ্ধি পেয়েছে (৮২৫০-৪১০০) ৪১৫০/- টাকা। সর্বোচ্চ ধাপ ৪৫,০০০/- টাকা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৭৮,০০০/- টাকা। বৃদ্ধি পেয়েছে (৭৮,০০০- ৪৫,০০০) ৩৩,০০০/- টাকা। বিষয়টি বড়ই কষ্টের। ধনীক শ্রেণি বাজার করেন ভিন গ্রহ থেকে যেখানে পণ্য দ্রব্যের দাম বেশী। আর দরিদ্র শ্রেণির খাবার প্রয়োজন হয় না; ক্ষুধা নেই। ভাবনার সময় এসেছে। মানসম্মত শিক্ষা প্রদান ও আলোকিত মানুষ গড়ার লক্ষ্যে পেশাগত দক্ষতা সম্পন্ন বিপুল সংখ্যক শিক্ষক প্রয়োজন। কিন্তু শিক্ষকতা পেশাটি এখনও আমাদের দেশে তেমন জনপ্রিয় না হওয়ায় অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষাজীবন শেষ করে এই পেশায় আসতে অনীহা প্রকাশ করে। শিক্ষকতার পেশাকে আকর্ষণীয় করে যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের এই পেশায় নিয়ে আসা, পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ ও তাদের পেশাগত মান উন্নয়নে শুরুতেই যথাযথ প্রশিক্ষণ নিশ্চত করণ ও তা অব্যহত রাখা, বিদ্যালয়ে শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ তৈরি এবং সঠিকভাবে Monitoring ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য আমাদের সরকার ও সংশ্লিষ্ট সকলের উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। জাতীয় শিক্ষানীতি–২০১০ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে এসব প্রত্যাশা বাস্তবায়িত হলে শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা বাড়বে এবং শিক্ষার মানের উন্নয়ন ঘটবে। লেখক পরিচিতি : সহকারী শিক্ষক, চুনকুটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..