হকারদের এই বিজয় কি আদৌ বিজয়?

জহর লাল রায়

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

ঢাকার ফুটপাত, বাজার, বাসস্ট্যান্ড কিংবা রেলস্টেশন; জনবহুল যেকোনো স্থানেই চোখ মেললে যে দৃশ্যটি সবচেয়ে চেনা, তা হলো শ্রমজীবী হকারদের ব্যস্ততা। কেউ পণ্য সাজাচ্ছেন, কেউ হাঁকডাক দিয়ে ফলমূল বা খাবার বিক্রি করছেন, কেউবা পসরা সাজিয়েছেন নিত্যপ্রয়োজনীয় ছোটখাটো জিনিসের। গুলিস্তান, বায়তুল মোকাররম, পল্টন, সদরঘাট থেকে শুরু করে যাত্রাবাড়ী, নিউমার্কেট, মিরপুর এমনকি সংসদ ভবনের সামনে পর্যন্ত হকাররা আছে। এই স্বীকৃতিবিহীন পেশায় কত মানুষ কাজ করে খাচ্ছে, কিংবা শহরের কত সংখ্যক মানুষ এই কেনাবেচা থেকে সরাসরি উপকৃত হচ্ছে সেই হিসাব সরকার বা কর্তৃপক্ষের কাছে পাওয়া যাবে না। কারণ, সরকারি ভাষায় হকাররা ‘অবৈধ’। ঢাকার প্রতিটি বাণিজ্যিক এলাকায় রয়েছে হকারদের এই দীর্ঘদিনের উপস্থিতি। ঢাকা শহরে এটা এক অতিসাধারণ বাস্তবতা। হাজার হাজার মেহনতি পরিবারের জীবন-জীবিকা নির্ভর করে হকারি পেশার ওপর ভর করে। দেশের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে বিরাট অবদান রাখার পরও, বুর্জোয়া নগর ব্যবস্থায় হকাররা বরাবরই অবহেলা, অনিশ্চয়তা আর নির্মম রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক জুলুম-নির্যাতনের শিকার। যুগের পর যুগ ধরে একদিকে যেমন চলছে তাদের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম, অন্যদিকে তেমনই তাদের সইতে হয় উচ্ছেদ অভিযান, লুম্পেন পেটি-বুর্জোয়াদের লাগামহীন চাঁদাবাজি, প্রশাসনিক নিপীড়ন আর মধ্যম শ্রেণির সামাজিক অবজ্ঞা। শহরের সচল অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া সত্ত্বেও এই পুঁজিবাদী রাষ্ট্র আজ অবধি তাদের শ্রমের আইনি স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে, ওপরতলার যেকোনো একটা স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তে মুহূর্তের মধ্যে ধূলিসাৎ হয়ে যায় লাখো শ্রমজীবী মানুষের রুটি-রুজি। জীবিকা টিকিয়ে রাখতে হকারদের পুলিশ, প্রশাসন, বুলডোজারের সামনে রুখে দাঁড়ানোটা প্রায় প্রতিদিনের ঘটনা। দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের মাধ্যমেই টিকে আছে হকার ভাই বোনদের বেচে থাকার স্বপ্ন। প্রত্যেক নতুন সরকার, নতুন মেয়র, নতুন ডিএমপি কমিশনার, এমনকি পুলিশের নতুন ডিসি ও ওসি আসার সাথে সাথেই সবার আগে তাদের চোখ পরে হকারদের দিকে। কারণ, বাহাদুরি দেখানোর সবচেয়ে সহজ ও নিরাপদ জায়গা হলো গরিব ও শ্রমজীবী মানুষ। হাসিনা সরকার যেমন বারবার হকারদের উচ্ছেদ, হামলা-ভাঙচুর করে গেছে বিএনপি সরকারের শুরুতেও তেমনই ঢাকা শহরে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হকার উচ্ছেদের নামে ব্যাপক ধরপাকড়, মামলা বাণিজ্য, মালামাল ধ্বংস ইত্যাদি শুরু হয়। মূলত ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেখানো পথে নতুন সরকার অনির্বাচিত দলীয় নেতাদের মেয়রের পদে বসিয়ে দিয়েছে। পুলিশ প্রশাসনে নতুন লোকজন পদায়ন করা হয়েছে। সবাই মিলে ঝাপিয়ে পড়েছে দুর্বল হকার, রিকশাওয়ালাসহ বিভিন্ন শ্রমজীবী মানুষের বিরুদ্ধে। এই হকার উচ্ছেদের পাশাপাশি তলেতলে আবার মূলত চলেছে নতুন চাঁদাবাজদের কাছে ফুটপাতের হাতবদল ও ভাগবাটোয়ারা। ঈদের আগে ঘটে যাওয়া হকার উচ্ছেদ এবং তার বিরুদ্ধে হকার্স ইউনিয়নের নেতৃত্বে বিরাট আন্দোলন মূলত দীর্ঘদিনের একটি শ্রেণি প্রশ্নকেই আবার সামনে এনেছে, তা হলো এই শহরটা আসলে কার? তথাকথিত ‘উন্নয়ন’ আর ‘সৌন্দর্যবর্ধন’-এর নামে সাজানো-গোছানো যে নগরীর ছবি আমাদের দেখানো হয়, তা কি কেবল কর্পোরেট পুঁজিপতি আর অভিজাত শাসক শ্রেণির বিলাসী জীবনের জন্য? এই শহরে রক্ত পানি করা শ্রমজীবী মানুষের কি সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই? এই অভিযানের নামে যা ঘটেছে, তা এককথায় পুঁজিবাদী নির্মমতা। বহু হকারের মালামাল জব্দ করা হলো, ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো দোকানপাট, নষ্ট করা হলো হাজার হাজার পরিবারের বেঁচে থাকার সামান্যতম অবলম্বন এমনকি চড়া সুদে সংগ্রহ করা স্বল্প পুঁজিতে কেনা পণ্যসামগ্রী। বছরের পর বছর ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা একজন শ্রমজীবী মানুষের শেষ সম্বল কয়েক মিনিটের মধ্যেই গুড়িয়ে দেয়া হল, দুই সপ্তাহে গ্রেফতার করা হয়েছিলো কয়েকশ হকারকে। কোনো আগাম কার্যকর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করেই ক্ষমতার জোর আর স্বেচ্ছাচারিতায় হাজারো পরিবারকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে চরম অনাহার ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। নতুন সরকারের শুরুতেই এই উচ্ছেদ অভিযানের পেছনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মনস্তত্ত্বটা বুর্জোয়া শাসক শ্রেণির চিরাচরিত চরিত্রের কথাই মনে করিয়ে দেয়। প্রায় ১৯ বছর ক্ষমতার বাইরে থেকে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নগর প্রশাসনের শীর্ষ পদগুলোতে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির বদলে আমলাতান্ত্রিক দলীয় নিয়োগ দিয়েছে। ফলে নগর ব্যবস্থাপনায় সাধারণ মানুষের প্রত্যক্ষ অংশীদারত্ব ও জবাবদিহির জায়গাটি সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত থেকে গেছে। এমন এক গণবিচ্ছিন্ন অবস্থায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের নতুন আমলারা নিজেদের প্রশাসনিক সক্ষমতা ও ক্ষমতার দাপট সগৌরবে প্রদর্শন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দুঃখজনক ও ক্ষোভের বিষয় হলো, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, ডেঙ্গু, হাম, বিদ্যুৎ, জলাবদ্ধতাসহ নগর জীবনের ও বহুমাত্রিক সংকটগুলোর কোনো কাঠামোগত সমাধান না খুঁজে, তারা বরাবরের মতোই সবচেয়ে সহজ লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিলেন ফুটপাতের হকারদের। শহরের বড় বড় রুই-কাতলা, কালোবাজারি কিংবা প্রভাবশালী ভূমিদস্যুদের অবৈধ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেখানে এই প্রশাসনের জন্য কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ, সেখানে ফুটপাতে জীবন বাজি রেখে লড়া দরিদ্র মানুষের ওপর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দাপট দেখানো তুলনামূলক অনেক সহজ। ফলে এই উচ্ছেদ অভিযান জনস্বার্থ রক্ষার চেয়ে অনেক ক্ষেত্রেই স্রেফ রাষ্ট্রীয় লাঠিয়াল বাহিনীর পেশিশক্তি ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রদর্শনের মহড়া মাত্র। তবে ইতিহাস সাক্ষী, সর্বহারা ও মেহনতি মানুষকে সহজে দমন করা যায় না। পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেলে তাঁরা সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের লাল পতাকাতলে সংগঠিত হকাররা ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তে তীব্র প্রতিরোধ ও প্রতিবাদ গড়ে তুলেছে। সংগঠনের সভাপতি আব্দুল হাশেম কবির এবং সাধারণ সম্পাদক হযরত আলীসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ আন্দোলনের সামনের সারিতে থেকে হকারদের অবরুদ্ধ ক্ষোভকে রাজপথের উত্তপ্ত লড়াইয়ে রূপ দিয়েছেন। এই লড়াইয়ের আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং শাসক শ্রেণির ওপর সেটা এক অভাবনীয় চাপ সৃষ্টি করেছে। টানা আন্দোলনের মুখে পুলিশ প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবশেষে সুর নরম করতে বাধ্য হয়। হকারদের যৌক্তিক প্রতিরোধের মুখে তারা এক প্রকার পিছু হটে এবং জীবিকার অধিকারের প্রশ্নে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল থেকেও বক্তব্য আসতে শুরু করে। নতুন প্রধানমন্ত্রীও এক পর্যায়ে উচ্ছেদ না করে হকারদের নিবন্ধন ও পুনর্বাসনের আহ্বান জানান। এটিকে নিঃসন্দেহে এবারের হকার আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক মোড় বলা চলে। কারণ, এই সংগঠিত প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের একতরফা স্বৈরাচারী ও পুঁজিপতি-বান্ধব সিদ্ধান্তকে সাময়িকভাবে রুখে দেওয়া গেছে। বুর্জোয়া রাষ্ট্রকে মেহনতি মানুষের প্রতিরোধের শক্তি প্রদর্শন করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একে কি আমরা আদৌ ‘বিজয়’ বলবো? শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস বলে, না। এই আপাত সফলতার পরও হকারদের স্থায়ী পুনর্বাসন, আইনি স্বীকৃতি, চাঁদাবাজিমুক্ত কাজের পরিবেশ এবং জীবিকা সুরক্ষার মূল প্রশ্নগুলো এখনো অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। আন্দোলনের চাপে পড়ে প্রশাসন হয়তো আলোচনায় বসেছে, সামনে আনা হয়েছে ‘হকার নীতিমালা ২০২৬’-এর কথাবার্তা। কিন্তু এই নীতিমালায় পুনর্বাসনের যে গালভরা বুলি আছে, তার সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত রূপরেখা এখনো কুয়াশাচ্ছন্ন। হকারদের নিবন্ধন কার্ড বা আইডি দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু আমাদের চেনা আমলাতান্ত্রিক ও দলীয়করণের ব্যবস্থায় এই প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ হবে, নাকি প্রকৃত হকারদের বাদ দিয়ে অন্য কোনো লুটেরা গোষ্ঠী এর সুবিধা লুটবে, সেই সংশয় উড়িয়ে দেওয়া যায় না। পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় ফাঁকি রয়েছে। হকারদের জন্য যে বিকল্প বা দূরবর্তী স্থান নির্ধারণ করা হবে, সেখানে আদৌ সাধারণ ক্রেতার সমাগম হবে তো? ব্যবসা করার মতো ন্যূনতম অর্থনৈতিক পরিবেশ যদি না থাকে, তবে সেই পুনর্বাসন কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে। একজন হকারের জন্য শুধুমাত্র কয়েক ফুট ফাঁকা জায়গা পাওয়াই যথেষ্ট নয়; সেই জায়গায় পণ্য বিক্রি করে দিনশেষে পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দিতে পারার নিশ্চয়তাটুকুও জরুরি। একই সাথে বড় ভয় যেটা তৈরি হয়েছে সেটা হলো, নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে ঘিরে দানা বাঁধতে যাওয়া সম্ভাব্য প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি। আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা বলে, এ ধরনের সরকারি উদ্যোগ নেওয়া মাত্রই বিভিন্ন সংগঠনের নামে ও বেনামে একদল মধ্যস্বত্বভোগী গোষ্ঠী এবং সরকার দলীয় দালালচক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে প্রকৃত হকাররা বরাবরের মতোই বঞ্চিত থেকে যান, আর পর্দার আড়ালের প্রভাবশালী ও অসাধু গোষ্ঠী সেই প্রকল্পের ফায়দা তোলে। যদি এই নীতিমাালার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক না হয়, তবে এটি হকারদের কল্যাণের চেয়ে দুর্নীতির নতুন এক প্রাতিষ্ঠানিক চারণভূমি তৈরি করবে মাত্র। আসলে হকার সংকটকে একপাক্ষিকভাবে ‘ফুটপাত দখল’ কিংবা ‘নগরের সৌন্দর্য নষ্টের’ চশমা দিয়ে দেখলে বাস্তবতার একটি বিশাল অংশ আড়ালে থেকে যাবে। এটি মূলত কর্মসংস্থান, নগর অর্থনীতি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিতে হকারদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান অনস্বীকার্য। রাষ্ট্র যখন দেশের বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়, তখন বেঁচে থাকার তাগিদে মানুষ স্ব-উদ্যোগে এই হকারি পেশায় যুক্ত হয়। আমাদের মানসিকতাকে একটু ঝালিয়ে নেওয়া দরকার, শহরটা নিশ্চয়ই শুধু বড়লোক আর বড় বড় ব্যবসায়ীদের নয়। এই হকাররাই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য পৌঁছে দিয়ে বাজারের ভারসাম্য ধরে রাখছেন। হকারদের বাদ দিয়ে ঢাকার মতো একটি জনবহুল শহরে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও অর্থনীতি কল্পনা করা অসম্ভব। কোনো শহর বা গ্রাম কেবল শোষক ও ধনীদের একক আবাসস্থল হতে পারে না, এই শহর শ্রমিক, হকার, রিকশাচালক ও প্রান্তিক মানুষেরও। যারা প্রতিদিন নিজেদের রক্ত পানি করা শ্রম দিয়ে এই শহরকে সচল রাখছেন, তাদের বাদ দিয়ে কোনো নগর পরিকল্পনাই টেকসই কিংবা মানবিক হতে পারে না। যে উন্নয়ন মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে নেয়, সেই উন্নয়ন কখনো জনমুখী, জনকল্যাণকর নয়। এই সংকটের স্থায়ী ও মর্যাদাপূর্ণ সমাধানের জন্য কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। পুনর্বাসন ছাড়া কোনো উচ্ছেদ নয় এই নীতি গ্রহণ। কোনো বিশেষ প্রয়োজনে হকারদের সরাতে হলে, আগে তাদের জন্য সমমানের বিকল্প কর্মসংস্থান সুনিশ্চিত করতে হবে। যেখানে অবশ্যই ব্যবসা করার মত পরিবেশ, ক্রেতা সমাগম থাকতে হবে। এছাড়াও পরিকল্পিত হকার অঞ্চল। বিশেষ করে রাত্রিকালীন বাজার। হকাররা কোথায় বসবেন, কোন সময়ে ব্যবসা করবেন এবং পথচারীদের চলাচলের জায়গা কীভাবে নির্বিঘ্ন রাখা হবে, তা হকার প্রতিনিধিদের সাথে নিয়ে যৌথভাবে ম্যাপ তৈরি করে নির্ধারণ করতে হবে। আইনি স্বীকৃতি অবশ্যই সবচেয়ে জরুরি বিষয়। বিশেষ করে আমাদের মত দেশে জীবিকা সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করা যে কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের প্রথম কর্তব্য। হকারদের ‘অবৈধ’ বা ‘অপরাধী’ হিসেবে গণ্য না করে, দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা ‘ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী’ হিসেবে তাদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। চাঁদবাজির সিন্ডিকেট ধ্বংস করার দায়িত্ব কে নেবে? ফুটপাতকেন্দ্রিক অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অভিশাপ হলো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাঁদাবাজি। হকারদের আয়ের একটা বড় অংশ চলে যায় এই সিন্ডিকেটের পকেটে। এই অদৃশ্য থাবা শক্ত হাতে না ভাঙলে কোনো নীতিমালাই আলো দেখবে না। হকারদের ভাগ্য নির্ধারণের যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার টেবিলে তাদের নিজেদের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। দালালমুক্ত প্রকৃত হকার প্রতিনিদিদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। হকারদের অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। ‘উন্নয়ন’ মানে কেবলই চকচকে চওড়া রাস্তা, ফ্লাইওভার কিংবা বহুতল কাঁচের ভবন নয়। সত্যিকারের উন্নয়নের স্পন্দন লুকিয়ে থাকে মানুষের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তার ভেতর। তাই হকারদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফলে ‘হকার নিতিমালা ২০২৬’ সহ যতটুকু অর্জন সম্ভব হয়েছে, তাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। এটি প্রমাণ করেছে যে সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেলে তারা লড়াই করে দাবি আদায় করতে পারে। তবে একে কোনোভাবেই ‘চূড়ান্ত বিজয়’ ভাবার অবকাশ নেই। আমাদের যেতে হবে আরো বহু দূর! লেখক : ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠক, সাবেক ছাত্রনেতা

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..