কোন পথে নেপালের রাজনীতি?

শেখ মোহাম্মদ ফরহাদ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

[নেপালে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর তৃতীয় সাধারণ নির্বাচনের ৩ মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। দেশটির শীর্ষ রাজনীতিবিদ, পেশাজীবী, সাংবাদিক, যুব নেতৃবৃন্দসহ সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলে নেপাল ঘুরে এসে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে একতার জন্য এই মন্তব্য প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন শেখ মোহাম্মদ ফরহাদ।] এক রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে গত ২০০৮ সালে রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিলোপের পর নেপাল একটি ফেডারেল বা যুক্তরাষ্ট্রীয় গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। এরপর ২০১৫ সালে নতুন সংবিধান প্রণয়নের মাধ্যমে বর্তমান দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা, অর্থাৎ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস বা নিম্নকক্ষ এবং ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি বা উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠিত হয়। সেপ্টেম্বর ২০২৫ এ জেন-জি গণঅভ্যুত্থানের পর ৫ মার্চ অনুষ্ঠিত ২৭৫ আসনের নিম্নকক্ষের ১৬৫ আসনে সরাসরি এবং ১১০ আসনে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাত বা পি.আর. পদ্ধতির নির্বাচনে মাত্র ৪ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি-আরএসপি ১৮২ আসনে জয়লাভ করে চমক সৃষ্টি করে। এই নির্বাচনে নেপালের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর ভরাডুবি হয়। নেপালি কংগ্রেস মাত্র ৩৮টি, নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি-ইউএমএল ২৫টি এবং নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি-মাওইস্ট সেন্টার ৭টি আসনে জয়লাভ করে। অন্যান্য ছোট ও আঞ্চলিক দল বাদবাকি ২৩টি আসনে জয় পায়। উল্লেখ্য, বিগত দুটি জাতীয় নির্বাচনে নেপালি কংগ্রেস, সিপিএন-ইউএমএল ও সিপিএন-মাওইস্ট সেন্টার এককভাবে অথবা দুই দল মিলে সরকার পরিচালনা করেছে। কেমন চলছে নতুন সরকার আকাশচুম্বি জনআকাঙ্ক্ষা, দুর্নীতিমুক্ত ও উন্নত নেপাল গড়ার প্রত্যয়ে গণঅভ্যুত্থানকারী জেন-জি ও তরুণ পেশাজীবীদের নেতৃত্বে বিপুল জয়ের পর আরএসপি কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র ও জনপ্রিয় র‌্যাপার ৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহকে (বালেন শাহ) প্রধানমন্ত্রী করে সরকার গঠন করে। দায়িত্ব নেওয়ার ১৩ দিনের মাথায় প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ ১০০ দফার একটি অ্যাকশন প্ল্যান ঘোষণা করেন। পূর্ববর্তী সরকারগুলো থেকে এই পরিকল্পনার ব্যতিক্রমী ও বিশেষ মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা কমিয়ে ১৭ তে নামানো, সরকারি অফিসগুলোতে ডিজিটাল ফাইল ট্র্যাকার চালু, যেন যে কোনো নাগরিক একটি নির্দিষ্ট অ্যাপে ঢুকে ঘরে বসেই তার ফাইলটির আপডেট জানতে পারেন, ট্রাফিক ব্যবস্থায় ভিআইপি কালচার বাতিল, ট্রাফিক পুলিশকে প্রধানমন্ত্রীসহ সকল মন্ত্রী-এমপি ও সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি থামিয়ে তল্লাশির ক্ষমতা প্রদান, সকল উন্নয়ন কাজে উন্মুক্ত টেন্ডার পদ্ধতি চালু, দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত নাগরিকদের জন্য সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে অথবা স্বল্পমূল্যে সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা চালু, কর্মজীবী নারী ও ছাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য কাঠমান্ডু শহরে বিনাভাড়ায় ‘ব্লু বাস’ সার্ভিস চালু, শিক্ষাক্ষেত্রে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত মূল্যায়ন পরীক্ষা বাতিল, শিক্ষাঙ্গনে সকল প্রকার রাজনীতি নিষিদ্ধ, সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রোভিসি পরিবর্তন, গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক রদবদল, শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার বাতিল ইত্যাদি। তবে, কিছু কিছু সরকারি পদক্ষেপ ইতোমধ্যে বস্তিবাসী, শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে। কাঠমান্ডু উপত্যকার নদীগুলোর দুই তীরে বসবাসরত প্রায় ১৫ হাজার বস্তিবাসীকে গত এপ্রিলে উচ্ছেদ করা হলেও আজ পর্যন্ত বিকল্প কোনো বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়নি। শহরের বিভিন্ন পতিত সরকারি জমিতে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বসবাসরত শ্রমজীবী মানুষদের স্থাপনা বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যা ইতোমধ্যে মানবিক সংকট সৃষ্টি করেছে। শহরের সৌন্দর্যবর্ধন করতে গিয়ে কাঠমান্ডুর মেয়র থাকাকালে বালেন্দ্র শাহের বিরুদ্ধে হকার উচ্ছেদ ও বলপ্রয়োগের সমালোচনা ছিল। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই দুর্নীতির অভিযোগে বিগত সরকারের দুই প্রধানমন্ত্রী কে.পি. শর্মা ওলি এবং শের বাহাদুর দেউবাকে গ্রেপ্তার করা হলেও এখন পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগে চার্জ গঠন করা যায়নি। দুজনেই আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হয়েছেন। শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার রহিতের সরকারি আদেশ ইতোমধ্যে সুপ্রিম কোর্ট অবৈধ বলে ঘোষণা করেছে। শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতি করার নাগরিক অধিকার নিষিদ্ধের পদক্ষেপও আইনি ভিত্তি পাবে বলে মনে হয় না। তিন মাসের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন করতে গিয়ে কাঠমান্ডু পোস্টের একজন সাংবাদিক এই প্রতিবেদককে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ক্ষমতা ক্রমাগত কেন্দ্রীভূত করা হচ্ছে এবং সংসদকে পাশ কাটিয়ে অধ্যাদেশ ব্যবহারের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য প্রতিবন্ধক হয়ে উঠতে পারে। আরএসপিতে রাজনৈতিক বির্তক ও গোষ্ঠীগত টানাপোড়েন ২০২২ সালের ২৬ জুন একজন গণমাধ্যমকর্মী রবি লামিচাঁন প্রচলিত ধারার রাজনীতির বাইরে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক মধ্যপন্থি রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি বা আরএসপি প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালে নেপালে জেন-জি গণঅভ্যুত্থানের পর তরুণরা আরএসপি’র দিকে ঝুঁকে যান। এবছর ৫ মার্চের নির্বাচনে মূলত: এদের চাপেই বালেন্দ্র শাহকে নেতৃত্বে আনা হয়। জেন-জিদের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আস্থা না থাকায় আরএসপিকে তারা রাজনীতির বিকল্প প্ল্যাটফর্ম হিসেবে মেনে নেয়, যদিও দলটির আদর্শ নিয়ে তাদের কোনো সুস্পষ্ট ধারণা নেই। সরকার গঠনের পর দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের নিয়ম অনুযায়ী রাজনৈতিক বিতর্কের সূচনার পাশাপাশি নেতৃত্ব বণ্টন প্রশ্নে গোষ্ঠীগত টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। শুরুতে ‘নতুন রাজনীতি’ ও ‘অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের’ কথা বলা হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কেন্দ্রীভূত করার অভিযোগে ইতোমধ্যে দলটি থেকে কয়েকজন শীর্ষ তরুণ নেতা পদত্যাগ করেছেন। দলটির আসন্ন জাতীয় সম্মেলনকে সামনে রেখে পুরানো নেতৃত্বের সাথে নতুন যোগ দেয়া জেনজিদের অপরাপর নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব প্রকাশিত হতে শুরু করেছে। ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ভারত ও চীনের মতো বৃহৎ প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রেখে ‘উন্নয়ন কূটনীতি’র মাধ্যমে উভয়ের কাছ থেকেই সুবিধা আদায় অতীতের মতই বর্তমান সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ভারতের উত্তরাখণ্ড, চীনের তিব্বত ও নেপাল সীমান্তের কৌশলগত গিরিপথ নিয়ে সম্প্রতি ভারত ও নেপালের মধ্যে নতুন করে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। ১৮১৬ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং নেপালের মধ্যে চুক্তি অনুসারে কালী নদীকে ভারত ও নেপালের মধ্যকার পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমানা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। নেপালেল দাবি, কালী নদীর উৎসস্থল লিম্পিয়াধুরা, কালাপানি ও লিপুলেখ তাদের ভূখন্ডের অংশ এবং এই গিরিপথ দিয়ে হিন্দুদের অন্যতম প্রধান তীর্থস্থান মানস সরোবরে যেতে এখন থেকে তাদের অনুমতি লাগবে। ভারতীয় অনুপ্রবেশ রুখতে বিহারের জোগবনী-রানী সীমান্তে রিকশাওয়ালাদের প্রবেশের সময় এখন থেকে যে কোনো ভারতীয় বৈধ পরিচয়পত্র প্রদর্শন করতে বলা হয়েছে। এই প্রবেশ অতীতে অবৈধ ছিল। এই রকম নতুন নতুন পদক্ষেপে ভারতের সাথে নেপালের বৈরী সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। অপরদিকে প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ অতি সম্প্রতি দেশটির সংসদের বক্তৃতায় বলেছেন, শুধু ভারত নয়, নেপালও ভারতের ভূমি দখল করেছে। এহেন অপরিপক্ব বক্তৃতায় দেশব্যাপী তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অপরদিকে চীনের সাথে দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার বিগত নেপালি কংগ্রেস-কমিউনিস্ট সরকারের সুসর্ম্পক ও ভারসাম্যের নীতি অনুসরণ করছে। চীন সরকার তার বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরআই নীতির অধীনে নেপালের অবকাঠামো উন্নয়ন, জলবিদ্যুৎ, পর্যটনসহ মেগা প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগ ও সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে। রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্তে মূলধারার দলগুলো এবছর সাধারণ নির্বাচনে নতুন রাজনৈতিক দল আরএসপি বড় বিজয় পাওয়ায় বিগত সরকারের প্রধান শরিক নেপালি কংগ্রেস ক্ষমতার বলয় থেকে ছিটকে পড়ে। তরুণ ভোটাররা এই দলকে পুরনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ, আর দুর্নীতি ও ক্ষমতালিপ্সু দল হিসেবে বর্জন করে। এরপরও মধেশ, বাগমতি, গন্ডকি ও পশ্চিম প্রদেশে দলটি ভালো ফল করে ৩৪টি আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা পেয়েছে। নির্বাচন পরবর্তী দলীয় মূল্যায়নে নেপালি কংগ্রেস ‘গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য ও জোটভিত্তিক ক্ষমতার ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে টিকে থাকা’কে আশু রাজনৈতিক করণীয় হিসেবে নির্ধারণ করেছে। তারা নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বকে সামনে নিয়ে আসার কথা বললেও নিজেদের ‘স্থিতিশীল ও রাষ্ট্র পরিচালনায় অভিজ্ঞ’ বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করছে। কমিউনিস্ট দলগুলোর বিপর্যয় নেপালের কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর ভাঙা-গড়ার ধরনের সাথে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর বহুলাংশে মিল আছে। বর্তমান কমিউনিস্ট ও বামপন্থি দলগুলোর মধ্যে জাতীয় ভিত্তিক সবচেয়ে শক্তিশালী ও সুসংগঠিত দল হচ্ছে নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি-ইউনিফায়েড মার্ক্সইস্ট-লেনিনিস্ট বা সিপিএন-ইউএমএল। নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর এই প্রতিবেদক দলটির সাধারণ সম্পাদক ও কিছু নেতৃস্থানীয় যুব ও পেশাজীবী নেতাদের সাথে আলাদা বৈঠকে পার্টির চলমান সংকট নিয়ে বিস্তৃত আলাপ করেছে। বৈঠকে অংশ নেয়া শীর্ষস্থানীয় যুব নেতৃবৃন্দ নাম প্রকাশ না করার শর্তে নির্বাচনে পার্টির ভরাডুবির জন্য সভাপতি কে. পি. শর্মা ওলি কেন্দ্রিক ‘এলিট কমিউনিস্টদের’ দায়ী করেন। এই নেতৃত্ব তাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত সমৃদ্ধ হলেও, জনগণ এমনকি তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সাথে কোনো যোগাযোগ রাখেননি। পার্টির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ত্যাগী ও সমালোচক মাঠের নেতাকর্মীদের সবসময় উপেক্ষা করা হয়েছে। যুব ছাড়াও পেশাজীবী নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন, সাধারণ নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে শীর্ষ নেতার প্রতি অনুগতদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ত্যাগী ও জনসম্পৃক্ত প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়া হয় নাই। ফলে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানোর পরও নির্বাচনে ভালো ফল করার যতটুকু সুযোগ ছিল, সঠিক প্রার্থী নির্ধারণের অভাবে তা হয়ে ওঠেনি। ফলাফল বিপর্যয়ের পর ওলি কেন্দ্রিক নেতৃত্ব কোণঠাসা হয়ে পার্টির সর্বস্তরে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। যুব নেতৃবৃন্দ এটা নিশ্চিত করেছেন যে, তাদের লক্ষ্য নেতৃত্ব পরিবর্তন করে জনসম্পৃক্ত ও গতিশীল পার্টি তৈরি করা। পার্টি বিভক্তির কোনো উদ্দেশ্য তাদের নেই। দ্বিপাক্ষিক আলাপকালে পার্টির সাধারণ সম্পাদক রাজন ভট্টারয় এসব সমালোচনা গ্রহণ করে জানান যে, সরকার পরিচালনার সময় বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগে ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু হয়েছে এবং কেউ দোষী প্রমাণিত হলে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নেতৃত্বের সমালোচনার কারণে যেসব পার্টি সদস্য বিশেষত যুব ও ছাত্র গণসংগঠনে কর্মরতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তারও পুনর্মূল্যায়ন করা হবে বলেও জানান তিনি। ২০০৮ সালে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ থেকে শুরু করে সকল গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, বিশেষত ভারত-নেপাল সীমান্ত ইস্যু যেমন কালাপানি বির্তকে কঠোর অবস্থান নিয়ে ইউএমএল ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। তবে বিগত দুটি সাধারণ নির্বাচনে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পালনকালে কোনো কোনো নেতার বিরুদ্ধে আমলাতন্ত্রের যোগসাজেশে দুর্নীতির অভিযোগ উঠে। ক্ষমতার মোহগ্রস্ততায় জনবিচ্ছিন্নতা ও শ্রেণিসংগ্রাম বিমুখতার ফলে জেন-জি ঝড়ে পার্টি টিকে থাকতে পারেনি। শুধু ইউএমএল নয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমল দহল ওরফে প্রচণ্ড যিনি নেপালের রাজনীতিতে ‘কিং মেকার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, তার দল নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি-মাওইস্ট সেন্টারও বিগত নির্বাচনে ব্যাপক জনপ্রিয়তা হারিয়েছে। নেপাল রাজতন্ত্র ও সামন্তবাদী ব্যবস্থা উচ্ছেদ ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে দলটি ১৯৯৬ সালে চীনের মাও-সে-তুং এর অনুসরণে জনযুদ্ধের ডাক দেয় এবং গ্রামীণ অঞ্চলে সমান্তরাল সরকার গঠন করে। প্রায় এক দশক গৃহযুদ্ধের পর ২০০৬ সালে তৎকালীন রাজতান্ত্রিক সরকারের সাথে ‘কম্প্রিহেনসিভ পিস একর্ড’ বা ব্যাপক শান্তিচুক্তি করে মূলধারার রাজনীতিতে প্রবেশ করে। নানা বিভক্তি ও খন্ডাংশগুলোর ঐক্যের পর বর্তমানে দলটি শ্রেণি সংগ্রামের পাশাপাশি সংসদীয় ধারার রাজনীতিতে মনোনিবেশ করেছে। ইউএমএল ও নেপালি কংগ্রেসের মতোই দলটির শীর্ষ নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে এবং তরুণ নেতৃত্ব সামনে আসার চেষ্টা করছে। কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের ঐক্য সাধারণ নির্বাচনে ব্যাপক বিপর্যয় ও দলগুলোর নেতৃত্ব পরির্বতনের চাপে দেশটির কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের ঐক্যের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সংসদে কৌশলগত সহযোগিতা নিয়ে ইতোমধ্যে মাওইস্ট সেন্টার, সিপিএন, সিসিএন-ইউনিফাইড সোসালিস্ট ও নেপাল ওয়ার্কার্স অ্যান্ড রিপ্রেজেন্টস পার্টির সাথে ইউএমএল-এর আলোচনা চলছে। সংসদের বাইরে থাকা জনতা সমাজবাদী পার্টি- জেএসপিকে নিয়ে নতুন রাজনৈতিক শক্তির মোকাবিলায় একটি বৃহত্তর বাম ঐক্যের আলোচনাও চলমান। নিকট ভবিষ্যতে সকল কমিউনিস্ট ও বামদের এক জোটে আন্দোলনে না আনা গেলেও জাতীয় ইস্যুতে যৌথ বা যুগপৎ কর্মসূচি পালন নিয়েও দলগুলোর চিন্তা আছে। উপসংহার বিগত সরকারগুলোর বিরুদ্ধে রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহির অভাবের অভিযোগ, আর দুর্নীতিমুক্ত ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ সংস্কারপন্থি নেতা হিসেবে সরকার পরিচালনার দায়িত্বে এসেছেন। তবে কঠোর কেন্দ্রীভূত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সেগুলো দ্রুততার সাথে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন, গণতান্ত্রিক নীতি অনুসরণ না করা বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ ও রাজনৈতিক সহনশীলতা প্রশ্নে নেপালের সচেতন জনপরিসরে ইতোমধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নিজ দল আরএসপিতে পুরাতন ও নবাগতদের দ্বন্দ্ব, সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সংস্কার, দুর্নীতি প্রতিরোধ, বেকারত্ব কমানো, নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান তৈরির মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন বালেন্দ্র শাহের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ। অপরদিকে সরকার বলপ্রয়োগের যে নীতি গ্রহণ করেছে, তার বিরুদ্ধে কমিউনিস্টরা এখনো রাজপথে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বরং বর্তমান সরকারকে আরো কিছুটা অসহিষ্ণু হয়ে ওঠার সুযোগ দেয়ার পাশাপাশি বিপর্যস্থ দল গুছিয়ে গতিশীল নেতৃত্বের অধীনে আন্দোলন করার কথা ভাবছে। তিন মাসের সরকার পরিচালনার পর্যবেক্ষপে এটি অনুমেয় যে বালেন্দ্র শাহ সরকার বর্তমান ধারায় রাষ্ট্র পরিচালনা অব্যাহত রাখলে বছর দুয়েকের মধ্যে অজনপ্রিয় হতে শুরু করবে। আর কমিউনিস্ট পার্টিগুলো বিচ্যুত ও অভিযুক্ত নেতৃবৃন্দকে বাদ দিয়ে যদি পরীক্ষিত ত্যাগী ও তরুণ নেতৃত্বকে সামনে আনতে পারে, নিজেদের ভুল-ত্রুটির কথা জনগণের কাছে খোলাখুলি স্বীকার করে শ্রেণিসংগ্রামের ধারায় পার্টিকে বিকশিত করতে পারে, তবে আগামী সাধারণ নির্বাচনে সরকার পরিচালনায় দায়িত্বে ফিরে আসা অলীক কল্পনা বলে মনে হয় না। লেখক : সাবেক ছাত্রনেতা

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..