মুক্তবাজার অর্থনীতির নেতিবাচক দিক
মনির তালুকদার
মুক্তবাজার অর্থনীতির কতিপয় সুবিধা লক্ষ্য করা যায়। প্রথমত-মুক্তবাজার অর্থনীতি ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অবাধ প্রতিযোগিতা থাকার ফলে উৎপাদিত দ্রব্যাদি উৎকৃষ্ট মানের হয়। অবাধ প্রতিযোগিতার ফলে দ্রব্যমূল্যও হ্রাস পায়। দ্বিতীয়ত-এ ব্যবস্থায় উৎপাদিত দ্রব্যের ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা থাকায় উৎপাদকরা ক্রেতার পছন্দ ও চাহিদা অনুসারে পণ্য উৎপাদন করেন। তৃতীয়-বাজার ব্যবস্থায় উৎপাদন ক্ষেত্রে নিয়োজিত ব্যক্তিদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি পায়। দক্ষ পরিচালনার ফলে উৎপাদন ক্ষেত্রে অপচয়ের পরিমাণও অপেক্ষাকৃত কম। বাজার ব্যবস্থায় দুর্নীতি থাকে, তবে কর্মে অবহেলা, পক্ষপাতিত্ব এবং আমলাতন্ত্রের কুফল কম পরিলক্ষিত হয়। চতুর্থত-বাজারব্যবস্থা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সমর্থন করে। রাজনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতি ক্ষেত্রেও বাজার ব্যবস্থা স্বাধীনতা প্রদান করে থাকে। পঞ্চমত-বাজার ব্যবস্থায় সম্পদের ব্যক্তিগত মালিকানা থাকে বিধায় সম্পত্তির ওপর ব্যক্তির আইগত অধিকার বহাল থাকে। ফলে ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বিকাশের পথ সুগম হয়।
গ্রিক দার্শনিক এবিস্টটল বলেছেন, ব্যক্তির পূর্ণতার জন্য এবং তার ব্যক্তিত্বের যথাযথ বিকাশের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সম্পত্তির ভূমিকা অত্যধিক। ষষ্ঠত-বর্তমান বিশ্বে বাজার অর্থনীতির ব্যাপক প্রসারের ফলে বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ব্যাপক প্রসার ঘটে। মুক্তবাজার অর্থনীতি ও সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি দুটি বিপরীতধর্মী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। ব্যক্তির অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপর অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করে থাকে মুক্তবাজার অর্থনীতি। পক্ষান্তরে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি সমিষ্টিগত তথা সামাজিক স্বার্থের ওপর অধিক মাত্রায় গুরুত্ব আরোপ করে থাকে। সমাজতন্ত্র বিশ্বকে আয়ের অসম বণ্টনজনিত দারিদ্র্যসহ বাজার অর্থনীতির অনেক খারাপ দিক থেকে মুক্তির পথনির্দেশ করতে পারে।
সামাজিকভাবে একটি সরকারের গুরুদায়িত্ব হলো নিম্নরূপ-(১) অর্থনৈতিক দক্ষতা বৃদ্ধি ও দেশের আয়, উন্নতি, প্রবৃদ্ধি তরান্বিত করা (২) কর্মসংস্থান, আত্মকর্মস্থান ও নিয়োগ সুবিধা বৃদ্ধি করে দেশের বেকার সমস্যা দূরীকরণ, বাজার মূল্যের স্থিতিস্থাপকতা আনয়ন, সুষ্ঠু এবং পূর্ণ প্রতিযোগিতার পরিবেশে সৃষ্ঠি করে সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্পন্ন দ্রব্যাদি তৈরি এবং সরবরাহ, উৎপাদকের ন্যায্যমূল্য, ক্রেতা ও সাধারণ মানুষের উপযোগ এবং সুখভোগ বৃদ্ধি ইত্যাদি।
(৩) উদার ও উৎপাদনমুখী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবান্ধব রীতি-নীতির প্রণয়ন এবং রপ্তানি আয় বাড়িয়ে যতো বেশি সম্ভব বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন। সর্বশেষে আয় ও প্রবৃদ্ধি তরান্বিত, আয়ের সুষম বণ্টন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং একটি সুখী সমৃদ্ধ সমাজ গঠন করা ইত্যাদি।
মুক্তবাজার অর্থনীতি বিভিন্ন কারণে সাময়িকভাবে হলেও ব্যর্থতার সমুখীন হয় বা হতে পারে। ব্যর্থতার উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হলো-মুক্তবাজার অর্থনীতিতে নিয়ন্ত্রণের অভাব ঘটে। নেতিবাচকভাবে স্বার্থপর ব্যবসায়ীরা সীমাহীন মুনাফা লাভের চেষ্টা করে। আবার পূর্ণ প্রতিযোগিতার অভাবে সমগ্র সমাজে একচেটিয়া অথবা অস্থির বাজার পরিস্থিতি বিরাজ করে। উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারমূল্য সাধারণত বেশি হয়। ক্রেতাসাধারণ অতৃপ্তিতে ভোগে।
দেশের সামাগ্রিক চাহিদা ও উৎপাদন হ্রাস পায়। দেশজ মোট উৎপাদন কমে সামগ্রিকভাবে সমগ্র দেশ একটি মন্দা পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারে। আবার উৎপাদকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়। বাজার অর্থনীতিতে নিয়ন্ত্রণের অভাবে ব্যবসায়ীরা স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত হয়।
মুক্তবাজার অর্থনীতিতে নিয়ন্ত্রণের অভাব বা নেতিবাচক উপজাত দ্রব্যাদির তৈরির জন্য সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেমন-বায়ু ও পানি দূষিতকরণ ইত্যাদি। নিয়ন্ত্রণের অভাবে বাজারমূল্যের স্থিতিস্থাপকতা আসে না। তাতে করে বেকার সমস্যা বৃদ্ধি পেয়ে আয় এবং সম্পদের অসম বণ্টন দারিদ্র্য বৃদ্ধি পায়। নিয়ন্ত্রণের অভাবে উৎপাদনমুখী নয়, এমন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নীতি সমাজে বিরূপ প্রভাব ফেলে। যেমন- বাড়তি ঞধৎরভভ এর কারণে আমদানিকৃত নিত্যপ্রয়োজনীয় বিদেশি দ্রব্যসামগ্রীর মূল্য বেড়ে যায়। সীমিতকরণ কোটা পদ্ধতির কারণে ভোক্তাদের আমদানিকৃত নিত্যপ্রয়োজনীয় বিদেশি সামগ্রী বেশি মূল্যে কিনতে হয়।
মুক্তবাজার অর্থনীতি উদার এবং উৎপাদনমুখী–এ বিষয়ে কারো কোনো সন্দেহ নেই। তবে যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণের অভাবে অপূর্ণ প্রতিযোগিতার কুফল, নেতিবাচক বা সামাজিকভাবে ক্ষতিকারক উপজাত দ্রব্যাদি তৈরি, সুষ্ঠু আন্তর্জাতিক এবং অর্থনৈতিক রীতি-নীতির অভাব, বাজারমূল্যের অস্থিতিস্থাপকতা, বেকার সমস্যা বৃদ্ধি ও আয়ের অসম বণ্টন ইত্যাদি অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। কোনো সন্দেহ নেই, সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে অসম বণ্টন এবং দারিদ্র্যের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে খুবই কম।
মুক্তবাজার অর্থনীতিতে নিয়ন্ত্রণ সাপেক্ষে সরকারকে বলিষ্ঠ ভূমিকা নিতে হয়। বিভিন্ন ধরনের সুষম বণ্টন প্রক্রিয়া সরকার নেয়। যেমন আয়করের আওতা এবং হার বৃদ্ধি করে সচ্ছল পরিবারের আয় থেকে অংশবিশেষ অসচ্চল পরবারে বিতরণ ইত্যাদি। তাছাড়া বাজেট ঘাটতি বাড়িয়ে অর্থ ও অসচ্ছল ব্যক্তিদের নিয়োগ সাপেক্ষে আয়ের বণ্টন ব্যবস্থা সরকার নিতে পারে। অর্ধস্বচ্ছল পরিবারের জন্যে Food Stamp, Medi-Care and Lwo cost Housing ইত্যাদি-সাপেক্ষে ভর্তুকি দিয়ে সুবিধাবঞ্চিতদের সাহায্য করা যেতে পারে। Transfer Payment (TP) আয়ের অসম বণ্টন দূরীকরণ সাপেক্ষে বিশেষভাবে সহায়ক। Transfer Payment এর মাধ্যমে আয়ের অসম বণ্টন কিছুটা হলেও হ্রাস করা সম্ভব। বেকার সমস্যা ও দারিদ্র্য প্রবণতা হ্রাসকল্পে বেকার যুবকদের বেকার বীমা প্রদান করে আর্থিক সুবিধা দেয়া যায়। Markets are a great way to organise economic activities, but they need an adult supervision, said David wassel মুক্তবাজার অর্থনীতিতে আয় ও সুখভোগের অসম বণ্টন ও দারিদ্র্য প্রবণতার কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। বাজার অর্থনীতিতে আয়ের অসম বণ্টন একটা সমস্যা, যা অবশ্যই দূর করতে হবে। ওই অসম বণ্টন ও দারিদ্র্য প্রবণতা দূরীকরণে সরকারকেই প্রধান ভূমিকা নিতে হবে। তবে উন্মুক্ত বাজার, উন্মুক্ত অর্থনীতি বা বাজার অর্থনীতির সঠিক নিয়ন্ত্রণের ভেতরে ভারসাম্যতা সঠিকভাবে বজায় রাখতে হবে। Briefly, we must find the correct balance between free markets and regulation by a careful analysis of the cost and benefits of each approach of free markets and regulations সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী সৃষ্টি, সরকারি খাদ্য সাহায্য প্রদান, কাজের বিনিময়ে খাদ্য, দুর্যোগজনিত কারণে দারিদ্র্যপীড়িতদের অন্ন, বস্ত্র বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ইত্যাদি বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সাশ্রয়ী ও স্বল্প সুদে লোন দিয়ে সুবিধাবঞ্চিতদের গ্রামীণ ব্যাংক মডেলের মতো বাজার কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে।
অসম বণ্টন দূরীকরণ সরকারের আয়কর নীতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেকার সমস্যা দূরীকরণ Transfer Payment (TP) এবং বিভিন্ন ধরনের Public goods এবং সামাজিক মূলধন গঠন ইত্যাদি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি করতে হবে। আয়করে আওতা ও আয়কর রেট একটি সহনশীল পর্যায়ে বৃদ্ধি এবং সুষ্ঠু বণ্টনসাপেক্ষে সরকারের হাত শক্ত করতে হবে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে Progressive Tex নীতি অনুসরণ করতে হবে। একটি ব্যক্তি যতো বেশি আয়, ততো বেশি Tex rate বাজার মূল্যের স্থিতিস্থাúকতা আনয়ন, বেকার সমস্যা দূরীকরণ, দারিদ্যবিমোচন সাপেক্ষে দেশের সামাজিক অর্থনৈতিক নীতি নিধারণ, যেমন- মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক কর্মকাণ্ডের সুষ্ঠু পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ সাপেক্ষে অতি সাবধানতার সঙ্গে ফলপ্রসূ নীতি নিধারণ করতে হবে। নেতিবাচক Textrnalty সামাজিকভাবে অপ্রত্যাশিত-যা প্রতিরোধে অবশ্যই বড় ধরনের ঞবী আরোপ করতে হবে। সামাজিক মূলধন গঠনে কিছু কিছু বিনিয়োগ ও কার্যক্রমকে Puplic goods বলে-যা বাড়তি খরচ ছাড়াই সমাজে সবাই ব্যবস্থা করতে পারে এবং উপকৃত হয়। যেমন-মহাসড়ক নেটওর্য়াক ও Notional Weather Servicers ইত্যাদি। কোনো বেসরকারি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এ জাতীয় মূলধন গঠন ও বিনিয়োগে উৎসাহী হয় না। সরকারকে ভর্তুকি দিয়ে হলেও ওই জাতীয় কার্যক্রমে সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করতে হবে।
লেখক : রাজনীতিক ও কলামিস্ট
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন