বিশ্ব শান্তি পরিষদ ও ফ্রেডেরিক জুলিও ক্যুরি
এম এ আজিজ মিয়া :
মানবসভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে যুদ্ধ বা সংঘর্ষের পাশাপাশি চলে এসেছে শান্তির প্রয়াস। কেননা যুদ্ধে উন্মত্ত হয় কতিপয় ক্ষমতাধর শাসক। আর তার বলি হয় শান্তিপ্রিয় অগণিত মানুষ। তাই অশান্তির আগুন নেভাতে এবং ধ্বংসযজ্ঞ ঠেকাতে এগিয়ে আসেন শান্তিপ্রিয় মানুষেরা যেমন কবি, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, দার্শনিক ও আপামর মেহনতি মানুষ। কেননা যুদ্ধে তাঁদের কোনো স্বার্থ থাকে না। এমনই উদ্যোগ দেখা গেছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ও পরে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর কতিপয় ফরাসি, জার্মান, অস্ট্রিয়, হাঙ্গেরিয় ও ইংরেজ নাগরিক বারব্যুস, রোলাঁ, হার্জিগ, নিকোলাই-এর নেতৃত্বে একটি যুদ্ধবিরোধী সংঘ ‘ইন্টারন্যাাশনাল গ্রুপ কারাইট’ গঠিত হয়। তাঁরা ১৫ দফা সম্বলিত একটি ইশতেহার প্রকাশ করেন। সেখানে জর্জ বার্নার্ড শ, এইচ জি ওয়েলস প্রমুখ স্বাক্ষর করেছিলেন। যুদ্ধের বিরোধিতার কারণে জার্মানিতে আলবার্ট আইনস্টাইনকে (১৮৩৯-১৯৫৫) নানাভাবে হেনস্তা হতে হয়েছিল। বিশ্বের দশকে ইউরোপে ফ্যাসিস্ট শক্তির উত্থানপর্বে ১৯২৭ সালে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধবিরোধী লীগ গঠিত হয়েছিল। ত্রিশের দশকের মধ্যভাগে ফ্যাসিস্ট হিটলার-মুসোলিনী-ফ্রাঙ্কোর যুদ্ধোন্মত্ততার প্রেক্ষিতে প্যারিস, মাদ্রিদ ও ব্রাসেলস-এ বিশ্বশান্তি ও সভ্যতা রক্ষায় বেশ কয়েকটি বিশ্ব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৩৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলেও পৃথিবীর দেশে দেশে শান্তির সংগ্রাম অব্যাহত থাকে। জার্মান পদানত ফরাসি দেশে শত নিপীড়ন-নির্যাতন এমনকি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিশ্বশান্তি আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব নোবেলজয়ী বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ফ্রেডেরিক জুলিও ক্যুরি (১৯০০-১৯৫৮) যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ‘বিশ্বশান্তি পরিষদ’ গঠন করেছেন, যা বিশ্ব শান্তি আন্দোলনের ইতিহাসের চিরদিন উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। তাঁর জন্ম ১৯০০ সালের ১৯ মার্চ প্যারিসে এবং মারা যান ১৯৫৮ সালের ১৪ আগস্ট।
জুলিও-র বাবা ছিলেন হেনরি জুলিও। তিনি দুনিয়া কাঁপানো প্যারিকমিউনে অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৩০ সালের মার্চ মাসে জুলিও ক্যুরি ‘তেজস্ক্রিয় মৌলিকপদার্থের রাসায়নিক ধর্ম ও বহুধা প্রয়োগ সম্পর্কে অনুসন্ধান’ বিষয়ের ওপর ডক্টরেট থিসিস জমা দেন। এবং সে বছরই ডিগ্রি লাভ করেন। এবার তিনি পুরো সময়টাই গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন। কেননা ইতোমধ্যে তিনি ফ্রান্সের জাতীয় বৈজ্ঞানিক সংস্থা সিএনআরএস-র আর্থিক অনুদান লাভ করেছেন। ফলে গবেষণায পুরোপুরি মনোনিবেশ করায় তাঁর আর কোনো পিছুটান ছিল না। ১৮৯৬ সালে হেনরি বেকোরেল ইউরেনিয়াম ধাতুর স্বাভাবিক তেজষ্ক্রিয়তা আবিষ্কার করেন। ১৮৯৭ সালে জে জে টমসন ইলেকট্রন আাবিষ্কার করেন এবং সে বছরই মারি ক্যুরি এবং পিয়ের ক্যুরি আবিষ্কার করেন রেডিয়া। ১৯০৩ সালে হেনরি বেকেরেল, মারি ক্যুরি ও পিয়ের ক্যুরি যৌথভাবে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৩২ সালে জেমস চ্যাডউইক নিউট্রন এবং কার্ল এন্ডারসন যে পজিট্রন আবিষ্কার করেনৈ, তার প্রাথমিক কাজ করেছিলেন জুলিও ক্যুরি এবং আইরিন ক্যুরি। কিছুদিনের মধ্যে তাঁরা যৌথভাবে কৃত্রিম তেষ্ক্রিয়তা আবিষ্কার করেন এবং এজন্য ১৯৩৫ সালে রসায়নশাস্ত্রে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন।
জুলিও ক্যুরি এবং আইরিন ক্যুরির গবেষণা কাজ অব্যাহত গতিতে চলতেই থাকে। ১৯৩৬ সালের নির্বাচনে পপুলার ফ্রন্ট চেম্বর অব ডেপুটিজে বিপুলভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেন। এই বিজয়কে জুলিও ক্যুরি, পল লাঁজভা ও তাঁদের সমর্থকেরা বিপুলভাবে অভিনন্দিত করেন। জনপ্রিয় সরকার গঠিত হলে আইরিন ক্যুরি তার বৈজ্ঞানিক গবেষণা বিভাগে আন্ডার সেক্রেটারির পদ গ্রহণ করেন। ১৯৩৭ সালে জুলিও ক্যুরি সরবনে অধ্যাপক নিযুক্ত হন। ১৯৩৮ সালে ক্যুরি গবেষণাগারে ক্যুরি দম্পতি ইউরেনিয়াম পরমাণুকে নিউট্রন দ্বারা আঘাত করে ল্যান্থানাম পরমাণুর কাছাকাছি একটি মৌলিক পদার্থের পরমাণ পাচ্ছিলেন। অটো হান ও স্ট্র্যাসম্যানের আরো সূক্ষ্ম পদ্ধতির মাধ্যমে প্রমাণিত হল যে, ইউরেনিয়াম পরমাণুটি নিউট্রনের আঘাতে ভেঙে গিয়ে যে দুটি সমান ভারী টুকরোয় পরিণত হয়, যার একটি বেরিয়াম এবং অপরটি ক্রিপটন। পরমাণু বিভাজন সংক্রান্ত আবিষ্কারগুলোর নিরাপত্তা রক্ষার জন্য জুলিও ক্যুরি ও তাঁর সহকর্মীরা এ বিষয়ের পাঁচটি পেটেন্ট তৈরি করে ফ্রান্সের বৈজ্ঞানিক গবেষণার জাতয় কেন্দ্রের হাতে তুলে দেন। ফ্যাসিবাদের উত্থান ও বিশ্বযুদ্ধের সময় পারমাণবিক শৃঙ্খলা প্রক্রিয়ার অপ্রয়োগের আশংকায় জুলিও ক্যুরি ও আইরিন ক্যুরি ১৯৩৯ সল থেকে গবেষণাপত্র প্রকাশ করা বন্ধ রাখেন। তঅচাড়া নিউকিয়ার রিঅ্যাক্টর তৈরির সূত্রটিও একটি বন্ধ খামের মধ্যে পুরে ফ্রান্সের বিজ্ঞান একাডেমির ভল্টে জমা রাখেন। ১৯৩৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে জুলিও ক্যুরি জীবনের চরম ঝুঁঁকি নিয়ে ফ্রান্সের প্রতিরোধ যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। ১৯৪৪ সালের ৬ জুন মিত্রশক্তি ফ্রান্সে প্রবেশ করে এবং জেনারেল দ্য গল অস্থায়ী সরকারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ফ্রান্স ফ্যাসিস্ট হিটলারের কবল থেকে মুক্ত হলে ফ্রান্সকে নতুন করে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেয়া হয়। ১৯৪৪ সালের আগস্ট মাস থেকে জুলিও ক্যুরি সিএনআরএস-র অধিকর্তা নিযুক্ত হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর টালমাটাল বিশ্ব রাজনীতির দিনগুলোতেও জুলিও ক্যুরি বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও বিশ্বশান্তি আন্দোলনের আজীবন পাশাপাশি চালিয়ে গেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে জার্মান অধিকৃত ফ্রান্সের প্রতিরোধ আন্দোলনে জুলিও ক্যুরি অংশ নেন। প্রতিরোধ সংগ্রামের অংশ হিসেবে গোপনে ‘লা ইউনিভার্সাইট লিবার’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন তিন জনের একটি গ্রুপ। তার অন্যতম ছিলেন লাঁজভার জামাতা পদার্থবিজ্ঞানী জাকিস সলোমন। তাঁরা সকলেই ছিলেন নিষ্ঠাবান কমিউনিস্ট। তাঁদের সঙ্গে জুলিও ক্যুরি ইতোমধ্যে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। ১৯৩৩ সালের মে মাসে কমিউনিস্ট পার্টি ফাসিস্টদের প্রতিরোধের জন্য ‘জাতীয় ফ্রন্ট কমিটি’ গঠন করেন। তাঁদের মধ্যে একমাত্র জুলিও ক্যুরিই ছিলেন অ-কমিউনিস্ট সদস। ১৯৪৩ সালের ২৯ জুন জুলিও ক্যুরিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে জার্মানদের হাতে তুলে দেয়। তবে জার্মান পদার্থবিদ গেন্টনারের সহায়তায় তিনি মুক্তি পান। কিন্তু একসময় ফরাসী পুলিশের সহায়তায় বিজ্ঞানী সলোমন ও বেশ কিছু বুদ্ধিজীবী গ্রেপ্তার হন। ১৯৪৩ সালের ২৩ মে তাঁদের বিনা বিচারে হত্যা করা হয়। এ সংবাদ যেদিন জুলিও ক্যুরি পেলেন সেদিনই তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করার সিদ্ধান্ত নেন।
জুলিও ক্যুরি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করার পর জার্মান অধিকৃত এলাকায় জাতীয় ফ্রন্ট কমিরি বিভিন্ন গোষ্ঠীকে তিনি একটি মাত্র নিয়ন্ত্রক কমিটির অধীনে আনেন। তিনি এই কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। তাছাড়া তাঁর অন্যান্য দায়িত্বের মধ্যে ছিল বোমা জাতীয় বিস্ফোরক পদার্থ ও বেশ কয়েকটি বেআইনি বেতার যন্ত্র তৈরি করা। ১৯৪৩ সালে যখন আর স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব হচ্ছিল না, তখন তিনি আত্মগোপন করেন এবং স্ত্রী ও কন্যাদ্বয়কে সুইজারল্যান্ড পাঠিয়ে দেন। ১৯৪৪ সালের প্রথম দিকে বিজ্ঞানী লাঁজভাকে টুঁয়ে থেকে সুইজারল্যান্ড পালিয়ে যাবার পুরো ব্যবস্থাটাই করেছিলেন জুলিও ক্যুরি। ১৯৪৪ সালের ৬ জুন মিত্রবাহিনী ফ্রান্সে প্রবেশ করে। প্রতিরোধ সংগ্রামীরা সেনাপতি জ্যাকস লোভিয়ারের নেতৃত্বে ২৫ আগস্ট প্যারিসে পৌঁছান। বামপন্থিদের সহায়তার দ্য গল অস্থায়ী সরকারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ফ্রান্স জার্মিানির কবল থেকে মুক্ত হলে বিধ্বস্ত বিজ্ঞানের পরিকাঠামো গড়ে তোলার প্রয়াস গ্রহণ করে জুলিও ক্যুরি। ১৯৪৪ সালে জুলিও ক্যুরিকে সিএনআরএস-র অধিকর্তা নিযুক্ত করা হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত ফ্রান্সের শিল্পোন্নয়নের জন্র পারমাণবিক শীক্তকে কাজে লাগানোর প্রয়াস নেয়া হয়। তবে এ ব্যাপারে ব্রিটেন বা আমেরিকার ওপর বেশি নির্ভরশীল হওয়া যাবে না। ‘ভারী জল’ আনা হলো নরওয়ে থেকে। তাছাড়া ব্রিটেনে সংরক্ষিত ‘ভারী জল’ নিয়ে ফিরে আসার সময় বাধা সৃষ্টি করে ব্রিটেন। সন্দেহ করে ব্রিটিশ সরকার; এ ব্যাপারে যদি কোনো চুক্তি হয় কমিউনিস্ট রাশিয়ার সঙ্গে! কেননা জুলিও ক্যুরি যে ছিলেন কমিউনিস্ট। অবশ্য প্রেসিডেন্ট দ্য গলের মধ্যস্থতায় তার একটা সম্মানজনক সুরাহা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ফ্রান্সেই নির্মিত হয়েছিল। জুলিও ক্যুরি পারমাণবিক শক্তিকে ধ্বংসের কাজে নয়, মানবকল্যাণের কাজে লাগানোর পক্ষে ছিলেন। পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের পাশাপাশি বিশ্বশান্তি আন্দোলন শুরু করেন জুলিও ক্যুরি। ১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত হয় ‘ব্রিটিশ অ্যাসেসিয়েশন অব সায়েন্টিফিক ওয়ার্কস’ নামে একটি সম্মেলন। তার মূল আলোচ্য বিষয় ছিল ‘বিজ্ঞান ও মানুষের কল্যাণ’। পৃথিবীর নয়টি দেশ থেকে বিজ্ঞানীরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সকলেই বিজ্ঞানীয়দের একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন গড়ার প্রয়োজন অনুভব করেন। ১৯৪৬ সালের ২০ ও ২১ জুলাই বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে প্যারিসে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে ‘ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব সায়েন্টিফিক ওয়ার্কস’ গঠিত হয়। সংগঠনের সংবিধান ও অন্যান্য নথিপত্র রচনা করেন জুলিও ক্যুরি ও ইংরেজ বিজ্ঞানী জেডি বার্নাল। সম্মেলনে ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্যারিসে সমবেত হন ফ্রান্স প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রায় ত্রিশ জন সৈনিক। তাঁরা সবাই উপলব্ধি করেছিলেন যে দুই পরাশক্তি রুশ-মার্কিন ঠান্ডা যুদ্ধের মহড়া বন্ধ করার দরকার। আর এজন্য বিশ্বব্যাপী শান্তি আন্দোলন জোরদার করা আবশ্যক। সেখানে শান্তির জন্য একটি বিশ্ব কমিটি গঠিত হয় ফ্রেডেরিক জুলিও ক্যুরির নেতৃত্বে। ১২ সদস্যের কার্যকরী ব্যুরোর অধিকাংশই ছিলেন কমিউনিস্ট প্রথম দিনের উদ্যোক্তারা ছিলেন ডব্লু ই বি ডু বইস, পল রবসন, হাওয়ার্ড ফাস্ট, পাবলো পিকাসো, লুইস অ্যারাগো, জর্জ অ্যামাডো, পাবলো নেরুদা, গাইয়র্গি লুকাস, রেন্টো গুটোসো, জিন-পল সাক্ষের্ত্র, দিয়াগো রিভেরা, মুহাম্মদ আল-আশমর ও জুলিও ক্যুরি। পাবলো পিকাসোর অঙ্কিত পায়রাকে সংগঠনের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিলো। তারই প্রস্তুতিপর্বে ১৯৪৯ সালের ২০ এপ্রিল প্যারিসে শান্তিকামী মানুষের এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। প্যারিসের রাফেলো স্টেডিয়ামের এক জনসভায় তিনি শান্তির স্বপক্ষে সংগ্রাম জোরদার করা এবং কার্যকরীভাবে শান্তিকে রক্ষা করার জন্য সাহসের সাথে মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। জুলিও ক্যুরির নেতৃত্বে ফ্রান্সে শান্তি আন্দোলন শুরু হলে দেশি-বিদেশি কমিউনিস্ট বিরোধী চক্র জুলিও ক্যুরির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ফ্রান্সের প্রথম পারমাণবিক পাইলকে আমেরিকার টাইম ম্যাগাজিন আখ্যায়িত করে ‘এক কমিউন্টি পাইল’ হিসেবে। ফরাসি সরকাও তাঁকে রেখেছিল কঠোর নজরদারির মধ্যে। বিভিন্ন বিভাগ থেকে কমিউনিস্টদের সরিয়ে দেয়া হয়। ফ্রান্সের কমিউনিস্ট পার্টি ইন্দো-চীনের যুদ্ধ, জার্মানির সামরিক শক্তি বৃদ্ধি ও ন্যাটো প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে সরকারের সমালোচনা করেছিলেন।
১৯৫০ সালের নভেম্বর মাসে পোল্যান্ডের ওয়ারশ-তে শান্তিকামীদের যে দ্বিতীয় বিশ্ব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, সেখানেই ‘বিশ্ব শান্তি পরিষদ’ নামে একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন গড়ে ওঠে এবং তার সংবিধান রচনা করা হয়। প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ফ্রেডেরিক জুলিও ক্যুরি। বিশ্ব শান্তি পরিষদের বিশ্ব শান্তি আন্দোলন চালিয়ে যাবার জন্য ১৯৫১ সালে তাঁকে স্ট্যালিন শান্তি পদকে ভূষিত করা হয়। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই ফ্রান্স সরকার ফ্রান্সের পারমাণবিক শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যানের পদ থেকে তাঁকে অপসারিত করে। তবে ইতোমধ্যে বিশ্ব শািন্ত আন্দোলন দেশে দেশে জোরদার হয় এবং বিভিন্ন দেশে বিশ্ব শান্তি পরিষদের শাখা গঠিত হয়। ১৯৫১ সালে চীনে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ব শান্তি সম্মেলন। সেখানে প্রখ্যাত সাহিত্যিক মনোজ বসু ও অন্যান্য ভারতীয় প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে অংশ নিয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান (পরে বঙ্গবন্ধু ও জাতির পিতা) এবং আরো বেশ কয়েকজন প্রতিনিধি। পঞ্চাশের দশকে ভিয়েনা, বার্লিন, হেলসিংকি ও স্টকহোম-এ অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশ্ব শান্তি সম্মেলন। পারমাণবিক সমরাস্ত্র প্রতিযোগিতার পাশাপাশি বিজ্ঞানীরা শান্তির আন্দোলনে এগিয়ে আসেন। আলবার্ট আইনস্টাইন তো ‘এক বিশ্বরাষ্ট্র সরকার’ গঠনেরই প্রস্তাব করেন। ১৯৫৩ সালের ডিসেম্বর মাসে জাতিসংঘ ‘শান্তির জন্য পরমাণু’ শীর্ষক প্রস্তাব প্রথম উত্থাপন করেছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইজেন হাওয়ার। ১৯৫৫ সালের এপ্রিল মাসে যে ‘রাসেল-আইনস্টাইন ইশতেহার’ প্রকাশিত হয় তারও ভূমিকা নিয়েছিলেন জুলিও ক্যুরি। ১৯৫৫ সালের ডিসেম্বর মাসে জেনেভাতে অনুষ্ঠিত হয় ‘শান্তির জন্য পরমাণু’ সম্মেলন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা সে সম্মেলনে যোগদান করেছিলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন বিশিষ্ট ভারতীয় পরমাণু বিজ্ঞানী হোমিও জাহাঙ্গীর ভাবা। কিন্তু দুঃখের বিষয় ফরাসি সরকার জুলিও ক্যুরি ও আইরিন ক্যুরিকে সে সভায় যেতে অনুমতি দেয়নি। অতিরিক্ত খাটাখাটনি ও মানসিক চাপের ফলে সে সময় তাঁর স্বাস্থ্য ভাঙতে থাকে। প্রথম দিকে বিশ্ব শান্তি পরিষদের কার্যালয় স্থাপিত হয় প্যারিসে (১৯৪৯), প্রাগ (১৯৫২), ভিয়েনা (১৯৫৪), হেলসিংকি (১৯৬৮) এবং সর্বশেষে এথেন্সে (২০০০)। তবে বিগত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয়ের কারণে বিশ্ব শান্তি আন্দোলনে অনেকটা ভাটা পড়েছে এবং বিভিন্ন দেশে তা অনেকটা ভিন্ন নাম ধারণ করেছে। সীমিত পরিসরে হলেও বাংলাদেশ শান্তি পরিষদ কাজ করে চলেছে। ২০১৪ সালে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জুলিও ক্যুরি বঙ্গবন্ধু শান্তি সংসদ এবং প্রতিষ্ঠানটির পাক্ষিক পত্রিকা ‘আমাদের জুলিও ক্যুরি, বঙ্গবন্ধু’ প্রকাশিত হয়ে চলেছে।
১৯৫৩ সালের মে মাসে জুলিও ক্যুরি একবার অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, পরে আর একবার ১৯৫৫ সালে। ১৯৫৭ সালের ১৭ মার্চ লিউকোমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান তাঁর জীবন ও কর্মসঙ্গিনী আইরিন ক্যুরি। এ মৃত্যু ছিল তাঁর কাছে মর্মান্তিক ও অসহনীয়। এরপর সরবনে পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞান চেয়ারে স্থলাভিষিক্ত হন। তার একবছর পর ১৯৫৮ সালের জুলাই মাসে তাঁর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়। সে বছর ১৪ আগস্ট বিশ্ব শান্তির অক্লান্ত সৈনিক জুলিও ক্যুরি মারা যান। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৯ বছর। তিনি রেখে যান এক কন্যা পারমাণবিক বিজ্ঞানী হেলেন ল্যানজেবিন জুলিও, এক পুত্র জৈব রসায়নবিদ পিঁয়রে জুলিও এবং বিশ্বের অগণিত শান্তিকামী মানুষ। জুলিও ক্যুরি তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের কৃতিত্ব হিসেবে বহু সম্মাননা ও পদক লাভ করেছেন। তাঁর নামে চাঁদে একটি আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের নামকরণ করা হয়েছে। ১৯৪৬ সালে রয়্যাল সোসাইটির বিদেশি সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫১ সালে তিনি স্ট্যালিন শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। তাছাড়া বুলগেরিয়ার সোফিয়ায় একটি রাস্তা এবং নিকটস্থ মেট্রো স্টেশনের নামকরণ করা হয়েছে তাঁর নামে। তাছাড়া কানাডার উত্তর মন্ট্রিল, বুখারেস্ট, রুমানিয়া, ওয়ারশ, পোল্যান্ড, শ্লোভাকিয়ায় তাঁর নামাঙ্কিত স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে। তিনি ফ্রান্স বিজ্ঞান একাডেমি এবং মেডিসিন একাডেমির সদস্য ছিলেন। রুমানিয়া তাঁর স্মরণে ডাক টিকিট প্রকাশ করেছে। তাছাড়া তাঁরই নামাঙ্কিত একটি বিদ্যালয় ‘জুলিও ক্যুরি হাই স্কুল’ (মাদারীপুর), ‘জুলিও ক্যুরি বঙ্গবন্ধু শান্তি সংসদ’ (২০১৪) ঢাকাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং নিয়মিত ‘আমাদের জুলিও ক্যুরি বঙ্গবন্ধু’ পাক্ষিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়ে চলেছে। ১৯৪৮ সালে নির্মিত একটি আধা প্রামাণ্য চিত্রে তাঁকে দেখা গেছে কীভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ফ্রান্সের প্রতিরোধ আন্দোলনে তিনি বিজ্ঞানী সহকর্মী হানস হালবন এবং লেভ কোভারস্কিকে নিয়ে সরওয়ের ভারমক ভারী জল প্লান্টে কাজ করেছেন। ফ্রান্স দ্য কলেজে পারমাণবিক ফিশন ও চেইন রি্যাকশন নিয়ে ভাষণ দান করতেও তাঁকে দেখা গেছে। মৃত্যুর পর প্যারিসে সর্বস্তরের মানুষের কাছ থেকে তিনি যে শ্রদ্ধা, সম্মান ও ভালোবাসা পেয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর বিশ্ব শান্তির পরিষদ প্রবর্তিত বিশ্ব শান্তি পদকের নামকরণ করা হয় ‘জুলিও ক্যুরি শান্তি পদক’। বিশ্বের যে সকল বরেণ্য মনীষীরা এ পদক লাভ করেন তাঁদের মধ্যে ম্যানেলিস গ্রিজোস (গ্রিস, ১৯৫৯), বিল মরৌও (অস্ট্রেলিয়া, ১৯৬৪), নেলসন ম্যান্ডেলা (দক্ষিণ আফ্রিকা, ১৯৬৪), ভ্যালেন্তিনা তেরেস্কোভা (সোভিয়েত ইউনিয়ন, ১৯৬৬), পাবলো নেরুদা (চিলি, ১৯৬৮), ডেনিস নোয়েল প্রিট (১৯৬৯), পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু (ভারত, ১৯৭০), মার্টিন লুথার কিং (১৯৭১), ফিদেল কাস্ত্রো (কিউবা, ১৯৭২), জামাল আবদেল নাসের (মিশর, ১৯৭২), সালভেদর আলেন্দে (১৯৭২), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (বাংলাদেশ, ১৯৭৩), ইয়াসির আরাফাত (প্যালেস্টাইন, ১৯৭৫), লিউনিদ ব্রেজনেভ (সোভিয়েত ইউনিয়ন, ১৯৭৫), নিকোলাই চসেস্কু (রোমানিয়া, ১৯৭৭), হ্যাং সাবরিন (কম্পুচিয়া, ১৯৮৩), ইউসুফ মাইতামা স্যুডেলে (নাইজেরিয়া, ১৯৮৩), জুলিয়াস নায়ার (তানজানিয়া, ১৯৮৮), ড্যানিয়েল অর্তেগা (নিকারাগুয়া, ১৮৮৯) প্রমুখ অন্যতম।
ফ্রেডেরিক জুলিও ক্যুরি আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তিনি আছেন আমাদের কর্মপ্রয়াস ও চেতনায়। তাঁর স্মৃতি বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের মন থেকে কোনোদিন মুছে যাবার নয়।
লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন