ভারতে হিন্দুত্ববাদের উত্থান : আমাদের করণীয়

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
ডা. মনোজ দাশ: ১. ভূমিকা: ভারতের বৃহৎ পুঁজি ও কর্পোরেট হাউজের পৃষ্ঠপোষকতায় হিন্দুত্ববাদের উপর ভিত্তি করে বিজেপি পুনরায় নয়াদিল্লীর ক্ষমতায় এসেছে। হিন্দুত্ববাদ এখন ভারতের রাজনীতিতে শুধু প্রভাবশালী শক্তিই নয়, এক নির্ধারক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। শুধু ভারতের জন্যই নয়, এটা বাংলাদেশসহ সারা দুনিয়ার জন্য বিপজ্জনক। হিন্দুত্ববাদের এ উত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটা হঠাৎ করে বা রাতারাতি হয়নি। এটা ভারতের বুর্জোয়া রাজনীতির ধারাবাহিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো কিছু নয়। নিজস্ব স্বার্থে হিন্দুত্ববাদের রাজনীতির প্রতি কর্পোরেট পুঁজির সমর্থনের ফলে হিন্দুত্ববাদের উত্থানে এক উল্লম্ফন ঘটেছে। এজন্য হিন্দুত্ববাদের বিকাশের বর্তমান পর্যায় ও তার প্রভাব বুঝতে হলে ভারতে পুঁজিবাদের বর্তমান অবস্থান ও বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদী লগ্নী পুঁজির সাথে হিন্দুত্ববাদের ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের বাস্তবতাকে মিলিয়ে নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে। ২. হিন্দুত্বের পটভূমি: হিন্দু পরিচয় বা হিন্দুত্বের সামাজিক-ঐতিহাসিক একটি ব্যাকগ্রাউন্ড আছে। ভারতীয় সমাজ যখন পশুপালক সমাজ থেকে ক্রমবিবর্তনের মধ্য দিয়ে কৃষিসমাজের দিকে অগ্রসর হয়, তখন তা এক স্থিতিশীল সমাজের ভিত্তি রচনা করে। সমাজের বিকাশের তাগিদ থেকে তখন শ্রম বিভাজনের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। শুরুতে বর্ণাশ্রম প্রথার মাধ্যমে শ্রম বিভাজনের এ চাহিদা পূরণ করা হয়। বেদান্ত দর্শন এ বর্ণাশ্রম প্রথাকে ধর্মীয় ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে তাকে স্থায়ী রূপ দেয়। এভাবে প্রাচীনকাল থেকে বর্ণপ্রথাই হয়ে যায় তখনকার হিন্দু সমাজের মৌলিক শ্রম বিভাগ। এ রকম একটা বর্ণভিত্তিক শ্রেণিবিভক্ত সমাজে উচ্চবর্ণের লোকজন নিম্ন বর্ণের সাথে কোনো দিনই নিজেদের এক করে একক হিন্দু পরিচয়ে পরিচিত করাতে রাজি হয়নি। কিন্তু ইতিহাসের পরিক্রমায় ভারতে অন্যান্য ধর্মের উদ্ভব ও ইসলাম ধর্মের আগমন ঘটে। বর্ণপ্রথার নির্মমতা থেকে মুক্তির আশায় নিম্ন বর্ণের শ্রমজীবী মানুষ উল্লেখযোগ্য হারে বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-ইসলাম প্রভৃতি ধর্মে দীক্ষিত হতে শুরু করে। তখন উচ্চবর্ণের লোকজন তাদের দিকে আসতে থাকা বিপদকে উপলব্ধি করতে পারেন। ধর্মান্তরিত জনগোষ্ঠীকে পূর্বের মতো বর্ণাশ্রমের মাধ্যমে সামাজিক বৈষম্যের শৃঙ্খলে বেঁধে রেখে নিয়ন্ত্রণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না, সেটা তাদের জন্য এক বাস্তব সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়। বর্ণাশ্রমের যে আপাত স্থিতিশীল ব্যবস্থার ওপর তাদের সম্পত্তি এবং যাবতীয় সুখ-সমৃদ্ধি নির্ভরশীল ছিল সেটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। এ চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করবার জন্যই উচ্চবর্ণের লোকজন হিন্দুত্ববাদকে সামনে নিয়ে এলেন। সমগ্র ভারতবাসীকে অভিন্ন হিন্দু ধর্মপরিচয়ে আবদ্ধ রাখার জন্যই ব্যবহৃত হতে থাকল হিন্দুত্ববাদী চিন্তা। ৩. হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির ধারাবাহিকতা: প্রত্যক্ষভাবে হিন্দু-মুসলিম ধর্মীয় পরিচিতি সত্তা ব্যবহারের রাজনীতি শুরু হয় ব্রিটিশ আমলে। যখন ধর্মনির্বিশেষে ভারতীয় জনগণকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সমবেত করার সম্ভাবনা দেখা দেয়, সে সময়েই ব্রিটিশের কাছে সম্প্রদায়গত বিভেদের রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। উপমহাদেশের যেসব জনগোষ্ঠীর বাস তাদের স্বাতন্ত্র ও জাতিসত্তার স্বীকৃতি না দিয়ে ধর্মীয় পরিচিতি সত্তাকে সামনে আনা হয় এবং এভাবে উপমহাদেশে জাতিভিত্তিক রাষ্ট্র সৃষ্টি হতে না দিয়ে ধর্ম পরিচয়ে রাষ্ট্র নির্মাণে সহায়তা করে ব্রিটিশরা স্থানীয় বুর্জোয়াদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের যেহেতু কোনো সর্ব-ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র ছিল না, বরং উভয়ই ছিল স্ব-স্ব ধর্মাবলম্বী উচ্চ বর্ণের বৃহৎ পুঁজির মালিক ও ভূমিকেন্দ্রিক কায়েমী স্বার্থের প্রতিনিধি, এজন্য তাদের পক্ষেও ব্রিটিশ সরকারের এই ষড়যন্ত্রকে মোকাবিলা করা সম্ভব হয়নি, দরকারও হয়নি, অনেক ক্ষেত্রে তাদের স্বার্থের ঐক্যই বরং প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কংগ্রেস নিম্ন বর্ণের হিন্দুদেরকে হিন্দু সমাজের কাঠামোর মধ্যে ধরে রাখার জন্য সর্বতোভাবে চেষ্টা করেছে, কিন্তু নিম্ন বর্ণের হিন্দুদের জন্য কিছুই করেনি। হিন্দুত্বের নামে বিজেপি আজ নিম্ন বর্ণের মানুষদের হিন্দুত্বের কাঠামোর মধ্যে ধরে রেখে মুসলমানদের প্রতি যে আক্রমণাত্মক ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক অবস্থান গ্রহণ করেছে, এ কাজ তাদের পূর্ববর্তী শাসক দল কংগ্রেসও করেছিল। তফাৎ শুধু এ কাজ কংগ্রেস করেছে চুপিসারে, বিজেপি তা এখন করছে প্রকাশ্যে এবং বিজেপির ফ্যাসিবাদী পরিচালক-অঙ্গ ও সহায়ক সংগঠনগুলি– রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ, শিবসেনা, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল এটা করছে প্রকাশ্য সন্ত্রাসের মধ্য দিয়ে। নিম্ন বর্ণের হিন্দু ও দলিতদের নিজেদের ভোট ব্যাংকে আটকে রাখার জন্য যত রকম ভণ্ডামী ও ধাপ্পাবাজি করা দরকার বিজেপি তা সাফল্যের সাথে করছে। বিজেপি সমগ্র হিন্দুদের স্বার্থ রক্ষাকারী কোনো রাজনৈতিক দল নয়। কারণ বিজেপি বর্ণাশ্রমকে অস্বীকার করে বৃহৎত্তর হিন্দু পরিচয়ে সব হিন্দুদের স্বার্থ রক্ষা করতে রাজি নয়। বরং সমাজে নির্মম বর্ণাশ্রয়ী শোষণ, নির্যাতন অব্যাহত রেখে বৃহত্তর হিন্দু পরিচয়ের আড়ালে বিজেপি তাদের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি কার্যকর করছে। তাই হিন্দুত্বের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ভারতের বুর্জোয়া দলগুলোর রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বুর্জোয়া রাজনীতির ধারবাহিকতা থেকে এটা বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। ভারতীয় বুর্জোয়া দলগুলি সমগ্র হিন্দুদের জন্য কোনো হিন্দু ধর্মীয় স্বার্থ সংরক্ষক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেনি। তাদের প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র বর্ণ-হিন্দু ও বৃহৎ পুঁজির মালিকদের পাহারাদার। ৪. হিন্দুত্ববাদের সাথে বৃহৎ পুঁজির ঐক্য: পুঁজির শোষণ বৃদ্ধি ও নির্বিঘ্ন রাখার জন্য বর্ণ-হিন্দু এবং ভারতের বৃহৎ পুঁজি ও আন্তর্জাতিক লগ্নী পুঁজির দরকার অখণ্ড ভারত। আর ঐক্যবদ্ধ ভারতে পুঁজির শোষণ স্ফীতকরণ, অবাধ ও নির্বিঘ্ন রাখার জন্য ভারতের বৃহৎ পুঁজি এবং সাম্রাজ্যবাদী বিদেশি শক্তির দরকার এমন এক রাজনৈতিক শক্তি ও নেতা, যে দক্ষতার সাথে তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য ম্যানেজারের ভূমিকা পালন করতে পারে। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে ভরপুর বিশাল ভারতীয় রাষ্ট্রে এই ঐক্যবদ্ধতার সূত্রের সন্ধান তারা পেয়েছে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা এবং তার বিশেষ রূপ হিন্দুত্ববাদের মধ্যে। হিন্দুত্ববাদের যোগ্য নেতা হিসেবে তারা বেছে নিয়েছে মোদীকে। ভারতের বৃহৎ পুঁজি ও আন্তর্জাতিক লগ্নী পুঁজি একত্রে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে একদিকে ভারতের বিচ্ছিন্নতার উপাদান: তার সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক বৈচিত্র্য, জাতপাতের বিভেদ এবং জনগণের চেতনায় স্বশাসনের আকাঙ্খাকে আড়াল করার চেষ্টা করছে, একই সাথে তারা পুঁজির শোষণ-নিপীড়নকেও জনগণের দৃষ্টিসীমার বাইরে রাখার কৌশল গ্রহণ করেছে। তাই বর্ণ প্রথা টিকিয়ে রেখে, হিন্দুত্বের পরিচয়ের মধ্যে তাকে আড়াল করে, মুসলমানদের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্থানের জন্য ভারতের বৃহৎ পুঁজির বিরাট স্বার্থ ও অবদান রয়েছে। ৫. হিন্দুত্ববাদ-পুঁজিবাদ-জাতপাত ও আন্তঃধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলনের যোগসূত্রতা: হিন্দুত্ববাদ ও শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষ এবং তাদের মধ্যে বিশেষভাবে দলিতরা বর্ণ-হিন্দু ও বৃহৎ পুঁজির নির্মম শোষণ নিপীড়ন-বৈষম্যের শিকার। দলিতরা দ্বিমুখী চাপের মধ্যে আছে। তার একটা হলো ব্রাহ্মণ্যবাদী সামাজিক কাঠামোর দিক থেকে। আর অন্যটি হলো ‘বিশ্বায়নের’ নামে পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ যে আক্রমণ চালাচ্ছে সেদিক থেকে। সাম্রাজ্যবাদ ভারতের দলিতদের মধ্যে সস্তা শ্রমের এক উৎস পেয়েছে। তাকে ব্যবহার করে সম্পদ লুট করে নেওয়ার সুযোগ তারা পুরোমাত্রায় ব্যবহার করছে। দলিত জনসাধারণ দুদিক থেকেই শোষণ-নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। আবার হিন্দুধর্মের কাঠামোর মধ্যে এই দলিতদের ধরে রেখে হিন্দুত্ববাদের উত্থান ঘটিয়ে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিক বিস্তার ঘটাচ্ছে বর্ণ-হিন্দু ও বৃহৎ পুঁজিপতি শ্রেণি। নিম্নবর্ণের দলিতদের ওপর বর্ণ-হিন্দু ও পুঁজি মালিকদের শোষণ-নির্যাতন এবং মুসলমান খ্রিস্টানসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর তাদের নির্যাতনের মধ্যে ঐতিহাসিক যোগসূত্র আছে। বর্ণপ্রথার কারণে নিজেদের ধর্মের নিম্নবর্ণের বিরুদ্ধে উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের যে ঘৃণা আছে, শোষণ-নির্যাতন আছে তার সাথে মুসলমান-খ্রিস্টানদের প্রতি তাদের ঘৃণা-শোষণ-নির্যাতন ও বিরুদ্ধতা একই সূত্রে গ্রোথিত। প্রকৃত বিচারে নিম্নবর্ণের হিন্দু জনগোষ্ঠীর সাথে নয়, মুসলমান-খ্রিস্টানদের দ্বন্দ্ব-বিরোধ আছে উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের সাথে। নিম্নবর্ণের হিন্দুদের সাথে যাতে মুসলমান-খ্রিস্টানদের গণতান্ত্রিক কোনো অধিকারের ঐক্য গড়ে না ওঠে, সেজন্য বিজেপি দলিতদেরকে শুধু মুসলমানদের থেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টাই করে না, তাদের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টির চেষ্টাও করে। দলিতরাই বিজেপির শক্তির উৎস। দলিতরা যতদিন পর্যন্ত বিজেপির পক্ষে থাকবে ততদিন বিজেপির শক্তি খর্ব হবে না। তাই ভারতে শুধুমাত্র আন্তঃধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আন্দোলন থেকে বিশেষ কোনো লাভ হবে না। বিজেপির হিন্দুত্বের রাজনীতিকে পরাজিত করার জন্য দলিতদের থেকে বিজেপিকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো শ্রমিক-কৃষকের শ্রেণিসংগ্রামের পাশাপাশি বর্ণপ্রথা ভেঙ্গে দেওয়া ও অন্যান্য অধিকার অর্জনের জন্য দলিতদের মধ্যে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিকাশ ঘটানো। ৬. পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ পরিস্থিতি: ভারতের সামগ্রিক পরিস্থিতি থেকে পশ্চিমবঙ্গ আলাদা কিছু নয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানের স্থানীয় বিশেষ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণও রয়েছে। বামদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় তৃণমূল বিজেপিকে জায়গা করে দিয়েছে। বামফ্রন্টকে নিঃশেষ করার জন্য বামকর্মী-সমর্থকদের ওপর মমতা সীমাহীন নিপীড়ন চালিয়েছে। এটা মোকাবিলায় বামফ্রন্টের যে সীমাবদ্ধতা থাকুক না কেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানের জন্য মমতার লুণ্ঠন-নিপীড়ন-ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনই দায়ী। অত্যাচারিত জনগণ পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিকে রক্ষাকর্তা ভেবেছে। মানুষ মমতার ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। সমগ্র ভারতের মতো পশ্চিমবঙ্গেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সাম্প্রদায়িকতার অভিঘাতে সংখ্যালঘুদের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার ঘটেছে। সংখ্যালঘুদের ব্যবহার করতে যেয়ে মমতা সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশয় দিয়েছে, বৃহৎ জনগোষ্ঠী সেটাকে সংখ্যালঘুর তোষণ নীতি হিসেবে দেখেছে। সংখ্যালঘুরা ফ্যাসিবাদী মমতাকে যত শক্তিশালী করেছে, বিজেপি ঠিক সেই হারেই বেড়েছে। আমাদের বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন, রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম বহাল রাখা, পাঠ্য পুস্তকের রদবদল, কওমী মাদ্রাসাকে স্বীকৃতি দান ইত্যাদি ঘটনাও পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির পালে বাতাস দিয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয় মানে সব শেষ হয়ে যাওয়া নয়। কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও বামপন্থিদের বিজয়ের অনেক শর্ত বিদ্যমান আছে। বামপন্থিরা আবার ঘুরে দাঁড়াবে। ৭.বাংলাদেশে আমাদের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে হবে: ভারতে বিজেপির নেতৃত্বে হিন্দুত্ববাদের উত্থানের মধ্য দিয়ে ভারতীয় রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী তৎপরতা আরো বাড়বে। এর প্রতিক্রিয়া ও প্রভাব বাংলাদেশেও আমরা নানাভাবে অনুভব করবো। বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন বেড়েছে কয়েক গুণ। প্রথমত এই নির্যাতনের একটা শ্রেণি চরিত্র আছে। কারণ এ নির্যাতনের বেশিরভাগ হচ্ছে গরিব নিম্নবিত্ত ও ক্ষমতার সাথে সম্পর্কহীন হিন্দু জনগণের ওপর। দ্বিতীয়ত হিন্দুদের উপর আক্রমণের একটি সাম্প্রদায়িক চরিত্রও আছে। সেটি অস্বীকার করা বা লুকিয়ে রেখে কোনো লাভ হবে না। ক্ষমতাসীন ও তাদের সাথে সম্পর্কযুক্ত ব্যক্তিদের ধর্মীয় সংখ্যালঘু বিশেষত হিন্দুদের বসতবাড়ি, ধর্মস্থান এবং জীবন জীবিকার উপর আক্রমণ ও উচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে। বর্ণ-হিন্দু ও বৃহৎ পুঁজির ভারতীয় রাষ্ট্র ভূ-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বার্থে একদিকে বাংলাদেশের লুটেরা বুর্জোয়াদের ইসলাম-ধর্মাশ্রয়ী ফ্যাসিবাদী শাসনকে টিকিয়ে রাখতে প্রধান ভূমিকা রাখছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক ঘটনা ও পরিস্থিতিকে তারা দক্ষতার সাথে ব্যবহার করে ভারতে হিন্দুত্ববাদী চিন্তার প্রসার ঘটাচ্ছে। আবার রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের আধিপত্যবাদী ভূমিকা ও ভারতে সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়নকে বাংলাদেশে অনেকেই সমগ্র হিন্দুদের দ্বারা সংঘটিত কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত। কিন্তু এটা বোঝা দরকার, একদিকে ধর্মনির্বিশেষে বাংলাদেশের নিপীড়িত জনগণের সাধারণ স্বার্থ ভারতের সাধারণ মানুষের স্বার্থের সাথে সম্পর্কযুক্ত, অন্যদিকে ভারতের বর্ণ-হিন্দু ও বৃহৎ পুঁজির সেবাদাস হচ্ছে বাংলাদেশের ধর্মাশ্রয়ী লুটেরা শাসকশ্রেণি, এরা একে অন্যের শক্তি বৃদ্ধির রসদের যোগান দেয়। এ বোধের কার্যকর উপলব্ধি ব্যতীত বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা ও নিপীড়ন বিরোধী আন্দোলনকে গণতান্ত্রিক ভিত্তির উপরে দাঁড় করানো সম্ভব নয়। ভারতীয় আধিপত্যবাদ, হিন্দুত্ববাদ ও বাংলাদেশের শাসকশ্রেণির ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের জয়লাভ এবং জনগণের চেতনার সুষ্ঠু ও উন্নত সাংস্কৃতিক বিকাশ ঘটার শর্ত তৈরি করা ছাড়া এ থেকে বের হয়ে আসার অন্য কোনো পথ খোলা নেই। আবার এক্ষেত্রে ধর্মনির্বিশেষে ভারতের জনগণের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের সাথে বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের সংগ্রামের কার্যকর ঐক্য ও যোগসূত্র স্থাপনও জরুরি কর্তব্য। লেখক : সভাপতি, খুলনা জেলা কমিটি, সিপিবি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..