নবায়নযোগ্য শক্তি বায়োগ্যাস

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

মনির তালুকদার : নবায়নযোগ্য জ্বালানি বেশ সম্ভাবনাময় হলেও আমাদের দেশে এর ব্যবহার এখনো যথেষ্ট নয়। নবায়নযোগ্য শক্তি হিসেবে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার হচ্ছে, কিন্তু অন্যান্য নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস এখনো তেমন প্রচলিত নয়। তেমনি এক নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস বায়োগ্যাস প্লান্ট। বায়োগ্যাস এক প্রকার গ্যাস, যা জৈবিক পদার্থের পচনের মাধ্যমে তৈরি হয়। এই পচন প্রক্রিয়াটি হতে হবে অহধবৎড়নরপ পরিবেশ, অর্থাৎ অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে। আবর্জনা, প্রাণীর মলমূত্র বা ফসল (অর্থাৎ যেখানে জৈবিক পদার্থের উপস্থিতি বেশি) সাধারণ বায়োগ্যাস তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। যা থেকে বায়োগ্যাস তৈরি করা হয়। বায়োগ্যাস প্লান্ট কিভাবে কাজ করছে? বায়োগ্যাস প্লান্টের মূল উপাদান হলো ধারক (উরমবংঃবৎ), ইনলেট চেম্বার (ওহষবঃ ঈযধসনবৎ) যে প্রকেষ্টে আবর্জনা বা ঝঁনংঃৎধঃব দেয়া হয়) এবং গ্যাস কালেক্টর (যেখানে গ্যাস সংগ্রহ করা হয়।) এগুলো ছাড়াও বিভিন্ন আনুষঙ্গিক উপাদান থাকে মূলক সেফটি মেজারমেন্ট ও অপারেশনের জন্য। ডাইজেস্টার হলো মূল অংশ, যার মধ্যে পচন প্রক্রিয়াটি ঘটে থাকে। আবর্জনা বা ঝঁনংঃৎধঃব ইনলেট চেম্বারের মাধ্যমে ডাইজেস্টারে প্রবেশ করানো হয়। ডাইজেস্টারটি সম্পূর্ণ বায়ুরোধী, ফলে অক্সিজেনের অনুপস্থিতি নিশ্চিত হয়। ডাইেেজস্টারে প্রবেশ করানোর ৫-৭ দিন পর গ্যাস উৎপন্ন শুরু হয়। এই সময়ে প্রয়োজনীয় ব্যাকটেরিয়া জন্ম নিতে শুরু করে। আবর্জনার প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে গ্যাস উৎপন্ন হওয়ার পরিমাণ নির্ভর করে। এক্ষেত্রে বায়োগ্যাস প্লান্টের বাড়তি সুবিধা কি? নবায়নযোগ্য শক্তির অন্য যেকোন উৎসের তুলনায় বায়োগ্যাসের কিছু বাড়তি সুবিধা রয়েছে। অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি শুধু শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে, কিন্তু বায়োগ্যাস প্লান্ট শক্তির উৎস ছাড়া ও নিম্নোক্ত কাজ করে– ১। আবর্জনা থেকে ঘঁঃৎরবহঃ আহরণ করা, যা পনরায় ব্যবহার করা যায়। ২। জৈব সার তৈরি করে, যা কৃষি উৎপাদনে ব্যবহার হয়। ৩। পরিবেশের ময়লা অপসারণে ভূমিকা রাখে। তাই বায়োগ্যাস প্লান্টের উপযোগিতা শুধু শক্তির উৎস হিসেবে দেখলেই হবে না, বরং তার সামগ্রিক দিকগুলো বিবেচনায় আনতে হবে। যেমন– গৃহস্থালির ময়লা অপসারণে পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনগুলো বিপুল অর্থ ব্যয় করে থাকে, কিন্তু ওই অর্থ শুধু ময়লা সংগ্রহ করে শহরের বাইরে কোথাও ফেলে আসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ময়লা সংগ্রহের ভুল পদ্ধতির কারণে ওই আবর্জনার কোনো উপযোগিতা বর্তমানে একেবারেই নেই। কিন্তু সামান্য উদ্যোগ নেওয়া হলেই এ আবর্জনা থেকে বায়োগ্যাস ও জৈব সার তৈরি করা সম্ভব। ফলে এখানে- সেখানে ছড়ানো-ছিটানো পড়ে থাকা ময়লা যে রোগ-জীবাণু ও দুর্গন্ধ ছড়ায়, তা অবশ্যই রোধ করা সম্ভব হবে; আবর্জনা থেকে নির্গত মিথেন গ্যাসের প্রকৃত ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। যে আবর্জনা এখন ময়লা হিসেবে রয়েছে, তার কার্যকর ব্যবহার করা সম্ভব হবে ওই বায়োগ্যাস প্লান্ট টেকনোলজির মাধ্যমে। বায়োগ্যাস প্লান্ট শুধু নাগরিক বর্জ্য অপসারণেই নয়, তরল বর্জ্য, পরিশোধনেও ব্যবহার করা যেতে পারে। বিভিন্ন দেশে এ ধরনের মডেল ইতোমধ্যে সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যেসব আবর্জনায় জৈব পদার্থের পরিমাণ বেশি, সেগুলোকেই বায়োগ্যাস প্লান্টের ঝঁনংঃৎধঃব হিসেবে ব্যবহার করা যায়। যেমন- গৃহস্থালির বর্জ্য, তরল বর্জ্য, কৃষিজাত বর্জ্য, হাঁস-মুরগি-গুরু-ছাগল এবং মানব বর্জ্য ইত্যাদি। বাংলাদেশে বায়োগ্যাস প্লান্ট বেশ সম্ভাবনাময় হলেও এর ব্যবহার এখন পর্যন্ত সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। গ্রামাঞ্চলে একক বা যৌথ উদ্যোগে ছোট আকারের বায়োগ্যাস প্লান্ট তৈরি হয়েছে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি। অবশ্য হাতে গোনা বায়োগ্যাস প্লান্ট তৈরি হয়েছে কয়েকটি পোলট্রি ফার্ম এবং কৃষি খামারে। গরমকালে বাংলাদেশের তাপমাত্রা ৩০-৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে, যা বায়োগ্যাস তৈরির জন্যে খুবই উপযোগী। তাই বর্তমানে বাংলাদেশে বায়োগ্যাস প্লান্টের উদ্যোগ নেয়া খুবই সুবিধাজনক বিবেচিত হবে। বাংলাদেশে নগরায়ণের হার ৩ দশমিক পাঁচ শতাংশ। প্রতিদিনই বাড়ছে নাগরিক বর্জ্যরে পরিমাণ। এই বর্জ্য অপসারণ, পরিশোধনের জন্যে নেই কার্যকর কোনো নীতি বা উদ্যোগ। তাই নগর কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব শুধু বর্জ্য সংগ্রহ করে কোনো পরিত্যাক্ত জায়গায় ফেলে আসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। এই জমানো ময়লা দুর্গন্ধ রোগ-জীবাণুসহ মিথেন (গ্রিন হাউস গ্যাস) নির্গত করছে। অথচ বায়োগ্যাস প্লান্ট টেকনোলজি ব্যবহার করে এই ময়লা যেমন পরিশোধন করে পরিবেশের উন্নয়ন ঘটনো যায়, তেমনি বায়োগ্যাস ও সার তৈরি করে তা বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করা সম্ভব। অর্থাৎ আবর্জনা অর্থের উৎস হতে পারে এবং এই মডেল পরীক্ষিত। বাংলাদেশে প্রতিদিন বর্জ্য উৎপন্ন হয় ২ কোটি ২৫ লাখ টন। এই বর্জ্যরে প্রায় ৭০ শতাংশ জৈবিক বর্জ্য। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ টন জৈব বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১ লাখ লোক অধ্যুষিত একটি এলাকায় বায়োগ্যাস উৎপাদনের মতো বর্জ্য হয় প্রতিদিন প্রায় ২০ মেট্রিক টন। এই বর্জ্য ব্যবহার করে গ্যাস উৎপাদন করা যায় প্রায় ১৪০০ ঘনমিটার, যা দিয়ে প্রায় ১২০০ চুলায় প্রতিদিন রান্না করা সম্ভব। অর্থাৎ সারা দেশে যে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য এখন নষ্ট হচ্ছে, তার পরিকল্পিত ব্যবহার আমাদের গৃহস্থালির জ্বালানি সমস্যা অনেকটাই মেটাতে পারে। গ্রামাঞ্চলের জ্বালানি সংকট সমাধানে বায়োগ্যাস উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম। বাংলাদেশের নগরাঞ্চলে পাইপলাইনে, গ্যাস সংযোগ রয়েছে। এছাড়া সিলিন্ডারের মাধ্যমে গ্যাসের সরবরাহ অনেকটা শহরের মধ্যে সীাবদ্ধ। গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো লাকড়ি, খড় ও গোবর প্রধান জ্বালানি (প্রায় ৯৪ শতাংশ) হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে উজার হচ্ছে গাছ, বনাঞ্চল। গোবরসহ বিভিন্ন জৈব বর্জ্য নগরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে আরো বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়, ফলে গ্রামাঞ্চলে জ্বালানি সমস্যার সমাধানে বায়োগ্যাস প্লান্ট বেশ ভালো ভূমিকা রাখতে পারে। এতে করে গ্রামের ময়রা অপসৃত হবে, গাছের ওপর চাপ কমাবে এবং পরিবেশ রক্ষা পাবে। বর্তমানে গ্রামে চাকরি সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। ফলে গ্রামাঞ্চলে সিলিন্ডারের মাধ্যমে গ্যসের সরবরাহ প্রচুর বেড়েছে। এক্ষেত্রে গ্রামাঞ্চলের জ্বালানি সংকট সমাধানে বায়োগ্যাস প্লান্ট উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশে বিশাল সংখ্যক পোলট্রি ফার্ম আছে, যেগুলোর বর্জ্য বায়োগ্যাস প্লান্টের জন্য খুব উপযোগী। তবে সীমিত সংখ্যক পোলট্রি ফার্মে ইতোমধ্যে বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপিত হয়েছে এবং সেগুলো বেশ সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। সেক্ষেত্রে পোলট্রির মতো ডেইরি ফার্মেও বায়োগ্যাস প্লান্ট সফলভাবে ব্যবহার করা সম্ভব। প্রতিটন মুরগির বিষ্ঠা থেকে ৩০ থেকে ১০০ ঘনমিটার বায়োগ্যাস উৎপান্ন হয়, আর প্রতি টন গোবর থেকে উৎপন্ন হয় ১৫ থেকে ২৫ ঘনপিটার বায়োগ্যাস। এক হিসেবে দেখা গেছে, ৩০ কেজি গোবর বা ২০০ মুরগির বিষ্ঠা দিয়ে একটি চুলা প্রায় ৩ ঘণ্টা জ্বালানো যায়। বায়োগ্যাস উৎপাদনের পর যে আবর্জনা পড়ে থাকে, তা সার হিসেবেও ব্যবহর করা যায়। সব পোলট্রিও ডেইরি ফার্মে বায়োগ্যাস প্লান্ট চালু করা হলে ফার্মের বর্জ্য থেকে একই সাথে বায়োগ্যাস এবং সার উৎপন্ন করা সম্ভব হবে, যা বাণিজ্যিকভাবেও লাভজনক হবে। বায়োগ্যাস প্লান্ট থেকে উৎপাদিত গ্যাস পরিশোধন করে খুব সহজেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ জৈব বর্জ্য উৎপাদিত হয় বলে এখানে বায়োগ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও তাপ যৌথভাবে উৎপাদন করলে জৈব বর্জ্যরে সর্বোচ্চ ব্যবহার করা সম্ভব। কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তাপীয় কর্মদক্ষতা যেখানে সর্বোচ্চ যথাক্রমে ৩৪ শতাংশ এবং ৫৫ শতাংশ হতে পারে, বায়োগ্যাস ব্যবহার করে যৌথভাবে বিদুৎ ও তাপ উৎপাদন করলে সেখানে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত তাপীয় কর্মদক্ষতা অর্জন করা সম্ভব। বাংলাদেশ বেসরকারিভাবে ছোট আকারে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে তেমন কোনো সমন্বিত উদ্যোগ চোখে পড়ে না। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বায়োগ্যাস ব্রবহার করে ২০০ ও ১০০ কিলোওয়াটের দু’টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনা করছেন। একটি কেন্দ্রে দৈনিক ৩০ টন মুরগির বিষ্ঠা ব্যবহার করে ২৪০০ ঘনমিটার গ্যাস উৎপাদিত হয় এবং সেখানে থেকে ২০০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উদপাদিত হয়। অপর কেন্দ্রটিতে দৈনিক ১৫ টন মুরগির বিষ্ঠা থেকে ১২০০ ঘনমিটার গ্যাস উৎপাদিত হয় এবং তা থেকে ১০০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। ঢাকা শহরের খুব অল্প জায়গা পরিকল্পিত তরল বর্জ্য পরিশোধনের আওতাধীন। এর বাইরে অনুপস্থিত বিপুল জায়গায় তরল বর্জ্য অপসারণে কোনো পরিকল্পনা নেই। সামান্য বৃষ্টিতে আন্ডারগ্রাউন্ড নর্দমা ্পচে উঠে আসে ও ই বর্জ্য। পরিকল্পিতভাবে ডধংঃব ডধঃবৎ ঃৎবধঃসবহঃ চষধহঃ এর ব্যবহারের মাধ্যমে ওই তরল বর্জ্যকে পরিশোধন করা সম্ভব। যথেষ্ট সম্ভাবনাময় হওয়া সত্ত্বেও যথাযথ উদ্যোগের অভাবে বায়োগ্যাসের পরিপূর্ণ ব্যবহার বাংলাদেশে হচ্ছে না। বেসরকারিভঅবে বিশেষ করে রান্নার কাছে বায়োগ্যাস ব্যবহারের ছোট ছোট উদ্যোগ দেখা গেলেও বায়োগ্যাস ব্যবহার করে সমন্বিতভাবে বৃহৎ আকারে তাপ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্যে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। বাংলাদেশের জ্বালানি সমস্যা সমাধানে বায়োগ্যাসের বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্যে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয়ভাবে যথাযথ উদ্যোগ উপযুক্ত নীতি নির্ধারণ পরিকল্পনা প্রণয়ন, পর্যাপ্ত গবেষণা ও তার বাস্তবায়ন।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..