সাঁওতাল বিদ্রোহ

সাঁওতাল বিদ্রোহ ও গাইবান্ধার সাঁওতালদের ওপর আক্রমণ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
কাজী মোহাম্মদ শীশ : ১৮৫৫ সাল। আজ থেকে ১৬৩ বছর আগের ঘটনা। তারিখটা ছিল ৩০ জুন। ভারতবর্ষে সাঁওতাল বিদ্রোহের বছর। এর ২ বছর পর ভারতের সিপাহীরা ব্রিটিশ রাজত্বের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে। যদিও ব্রিটিশরা একে সিপাহী বিদ্রোহ নাম দিয়েছে প্রকৃত পক্ষে এটা ছিল ব্রিটিশের বিরুদ্ধে প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম। গত ৬ নভেম্বর ২০১৬ তে উত্তরবঙ্গের গাইবান্ধা জেলার সাহেবগঞ্জর বাগদাফার্ম এলাকায় ঘটে আর এক মর্মান্তিক ঘটনা। ওই এলাকায় বসবাসকারী সাঁওতালদের উপর অত্যাচার, তাদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, শ্যামল হেমব্রম, রমেশ টুডু এবং মঙ্গল মার্ড্ডি নামে তিনজন সাঁওতালের মৃত্যুবরণ, শত শত মানুষের ভূমিহীন হওয়ার কথা দেশবাসী জানতে পারে। এই ঘটনা ও আদিবাসীদের বিষয় ও সমস্যা নিয়ে নানা বিশ্লেষণ চলছে। সেসব নিয়ে আলোচনার আগে আজ থেকে এক যুগ আগে ২০০৫ সালে ভারতের অরুণাচল প্রদেশের রাজধানী ইটানগর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে নীরজুলী নামে শহরতলীর এক পাহাড়ি আদিবাসীদের এলাকায় কাঁচা-পাকা খোঁচাখোঁচা দাড়ি, শ্যামল বর্ণের বলিষ্ঠ দেহের অতি সাধারণ চেহারার মলিন বেশের মাঝবয়সি একজন লোকের কথা মনে পড়ছে। ‘নদী ও পরিবেশ’ সংক্রান্ত এক সম্মেলনে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন থেকে কয়েকজন গিয়েছিলাম। এই ভদ্রলোক এসেছিলেন ভারতের ঝাড়খণ্ড থেকে। নাম অশ্বিনী কুমার পঙ্কজ। একটি মাসিক বুলেটিনের ম্যানেজিং এডিটর। পত্রিকার নাম দকযধহ কযধহরল অফযরশধৎ. কযধহ শব্দের ইংরেজি অর্থ গরহবং বাংলা খনি আর কযধহরল হল গরহবৎধষ বা খনিজ পদার্থ। খনি ও খনিজ পদার্থের ওপর অধিকার বিষয়ক কাগজের ম্যানেজিং এডিটর। তার কাছ থেকে ঝাড়খণ্ডের আদিবাসীদের ইতিহাস ও বিদ্রোহের বর্ণনা এবং ব্রিটিশদের অত্যাচারের কথা শুনে বারবার শিহরিত হয়ে উঠছিলাম। ঝাড়খণ্ড ট্রাইবাল বা আদিবাসীদের খুবই পুরানো শহর। গোড়ার দিকে ঝাড়খণ্ডে ত্রিশটার মতো আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে সাঁওতাল, মুণ্ডা, ওঁড়াও, খাড়িয়া, হো প্রাধান্য ছিল সর্বাধিক। অন্যান্য আদিবাসীদের মধ্যে রয়েছে আসুর, পাহাড়িয়া, মালতো, বীররাজিয়া, বাইগা ইত্যাদি। এই আদিবাসীদের নিজস্ব পৃথক পৃথক সংস্কৃতি, ভাষা, সামাজিক রীতিনীতি, ঐতিহ্য রয়েছে। সব আদিবাসী সম্প্রদায় নিজস্ব ঐতিহ্যগত শাসন ব্যবস্থা, আইন, জীবিকা অর্জনের প্রণালী অনুসরণ করত। আসুর সম্প্রদায় মূলত লোহার তৈরি নানা প্রকার উপকরণ নির্মাণ করত। তাই এদের লৌহজীবী বা Iron Smelters বলা হত। অন্যান্য সম্প্রদায় কাঠের কাজ, আধা কৃষিজাত কাজ ইত্যাদি নানা পেশায় নিয়োজিত থাকত। ভারতবর্ষে ব্রিটিশরাজ কায়েমের আগে আদিবাসীরা মূলত পাহাড়ি এলাকা ও বনাঞ্চলে বাস করত। তারা কারো দ্বারা শাসিতও হত না। শোষিতও হত না। ব্রিটিশরাজ কায়েমের পর ক্রমশ জমিদারী প্রথা চালু হয়। সেই সঙ্গে আসে ‘লগন’ বা ট্যাক্স আদায়ের ব্যবস্থা। জমিদারী ব্যবস্থা ও লগন আদায় কার্যকর করার ফলে জমি ও বনাঞ্চল ক্রমশ আদিবাসীদের হাত ছাড়া হতে থাকে। তারা ক্রমশ Bonded Labour বা দাস মজুরে পরিণত হয়ে দাসত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হতে থাকে। অনেক আদিবাসীকে শ্রমিক হিসাবে কাজ করার জন্য ঝাড়খণ্ড থেকে ভারতের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। ঝাড়খণ্ড থেকে আসা ছাড়াও বহু যুগ আগে থেকে বাংলাদেশের কয়েকটি অঞ্চলে বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায় বসবাস করে আসছে। ব্রিটিশ রাজত্বকালে ওই অঞ্চলের আদিবাসীরা ক্রমশ জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়তে থাকে। তাদের ওপর অত্যাচারের মাত্রা ক্রমশ বাড়তে থাকে। আঘাত আসে তাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক, আর্থিক রীতিনীতি ও ব্যবস্থার উপর। ক্রমশ তারা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। এই বিদ্রোহ ঝাড়খণ্ডের পৃথক পৃথক স্থানে শুরু হয়। সতেরশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে এই বিদ্রোহের সূত্রপাত। বিচ্ছিন্ন সব বিদ্রোহের মধ্যে প্রধান যেটি ছিল তা করে আদিবাসী পাহাড়িয়ারা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিদ্রোহ হয় ১৮৫৫ সালে। এই বিদ্রোহ হয় সাঁওতালদের নেতৃত্বে যা ‘সাঁওতাল বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত। ঝাড়খণ্ডে লোক সংখ্যার দিক থেকে সাঁওতালরা ছিল বেশি। জমিদার, মহাজন, ব্যবসায়ী এবং ইংরেজ সরকারের আধিকারীদের আর্থিক উৎপীড়ন ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সাঁওতাল সম্প্রদায় প্রচণ্ড বিদ্রোহে ফেটে পড়ে। এই বিদ্রোহের নেতা ছিলেন সিধু এবং কানু নামে দুই সাঁওতাল। ভয়ংকর হিংস্র দানবিক পদ্ধতিতে ইংরেজ সরকার সাঁওতাল বিদ্রোহ দমন করেছিল। সিধু সামনাসামনি লড়াইয়ে ধরা পড়েন। ১৮৫৬ সালের ফেব্রুয়ারির ২য় সপ্তাহে তাকে ভাগনাডিহি নামে এক স্থানে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। কারও কারও মতে তাকে ফাঁসি দেয়া হয়। পরবর্তীতে কানু ধরা পড়েন। বিচারে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় এবং ১৮৫৬ সালের ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। বিদ্রোহী ও সাধারণ লোকের মধ্যে আতংক ও ভয় সৃষ্টি করার জন্য অনেক বিদ্রোহীকে ধরে সিউড়ি শহরের কেন্দুয়ার ডাঙ্গায় সকলের সামনে খোলা ময়দানে ফাঁসি দেয়া হয়। ৩০ জুন ১৮৫৫ সালে ভগনাডিহি গ্রামে সিধু-কানু সাঁওতাল বিদ্রোহের যে ডাক দেন এবং শোষণহীন স্বরাজ প্রতিষ্ঠার জন্য দশ হাজার সাঁওতাল যে শপথ গ্রহণ করেন সে দিনটি আজও ‘সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। ইংরেজরা কঠোর হাতে সাঁওতাল বিদ্রোহ দমন করে। সাময়িকভাবে দমে গেলেও আদিবাসীরা বেশি দিন নিশ্চুপ থাকেনি। একের পর এক বিদ্রোহ হতেই থাকে। শুধু সাঁওতালরাই নয়, অন্যান্য আদিবাসীরাও বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ বিদ্রোহ হয় ১৮৯৫ থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত। এই বিদ্রোহ উলগুলান নামে পরিচিত। উল সাঁওতাল শব্দ, যার অর্থ বিদ্রোহ, উলগুলান মুণ্ডা শব্দ যার অর্থও বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহের মূল নেতা ছিলেন বিরসা মুন্ডা। যখন বিদ্রোহ শুরু হয় তখন তার বয়স মাত্র কুড়ি। বিরসা মুণ্ডাদের একত্রিত করে বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন। বিরসা মুণ্ডার ডাক ছিল হামকা আবুয়া রাজ (আমার নিজস্ব রাষ্ট্র) পুনরায় কায়েম করতে হবে। মুণ্ডারা তীর ধনুক, পাথর দিয়ে ইংরেজদের বন্দুক কামানের সঙ্গে খুবই সাহসিকতাপূর্ণ যুদ্ধ করে। শেষ যুদ্ধ হয় রাঁচি জেলার অধীনে কুঁঠি সাবডিভিশনে। ডোমবারি পাহাড়ে মুণ্ডা বিদ্রোহীরা একত্রিত হয়। এই যুদ্ধে বহু মুণ্ডা শহীদ হন। কিন্তু বিরসা মুণ্ডাকে ব্রিটিশরা মারতে পারেনি। মুণ্ডাদের শত অত্যাচার সত্ত্বেও ইংরেজরা বিরসা মুণ্ডাকে গ্রেফতার করতে পারছিল না। কিন্তু তিন-চার মাস পর এক বিশ্বাসঘাতক এই বীর যোদ্ধাকে ধরিয়ে দেয়। এর আগে বিরসা মুণ্ডা আর একবার বন্দী হয়েছিলেন। তখন মুণ্ডারা থানা ঘেরাও করে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে এসেছিল। তাই এবার তাকে রাতারাতি রাঁচি সেন্ট্রাল জেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। জেলেই তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর ঘটনা পর্যালোচনা করলে সহজেই বোঝা যাবে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ব্রিটিশরা তাকে হত্যা করেছে। বিরসাকে অসুস্থ অবস্থাতেও হাতে হাতকড়া, পা ও কোমরে ভারী শিকল পরিয়ে রাখা হয়েছিল। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তার মৃতদেহ থেকে শিকল খুলে নেয়া হয়। অনেকেই মনে করেন আর্সেনিক বিষ প্রয়োগ করে বিরসা মুণ্ডাকে হত্যা করা হয়েছে। ঝাড়খণ্ডে আদিবাসীদের এসব আন্দোলন প্রচণ্ড জোরালোরূপ গ্রহণ করেছিল। আদিবাসীদের দীর্ঘকালের আন্দোলন, ঝাড়খণ্ড আন্দোলন ও আত্মত্যাগ ভারত সরকারকে তাদের কয়েকটি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে বাধ্য করেছে এবং সমাজ ও রাজনীতিতে তার যথেষ্ট প্রভাব পড়েছে। যেমন, এক. আদিবাসীদের শিক্ষা-সংস্কৃতি, ঐতিহ্য সম্পর্কে পিছিয়ে পড়া দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করে প্রকৃত গবেষণা ও ব্যাখ্যা দ্বারা তাদের ইতিহাস ঐতিহ্যকে পুনঃস্থাপিত করতে বাধ্য হচ্ছে ভারত সরকার। দুই. ট্রাইবাল এজেন্ডাকে রাজনৈতিক এজেন্ডায় পরিণত করা হয়েছে। তিন. দীর্ঘদিনের আন্দোলন জাতিসত্তার প্রশ্নে আদিবাসীদের নিজস্ব পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেছে। চার. দীর্ঘ আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে ১৯৪৭, ’৫১, ’৫৭ সালের স্থানীয় নির্বাচনে জয়পাল সিং মুণ্ডার নেতৃত্বাধীন ঝাড়খণ্ড পার্টি কংগ্রেসকে বিপুল ভোটে হারায়। পরে অবশ্য ১৯৬১ সালে ঝাড়খণ্ড পার্টি কংগ্রেসের সাথে মার্জ করে। বর্তমান শতাব্দীর প্রথম দিকে আসাম সংসদের স্পিকার ছিলেন পৃথিবী নাথ মাঝি। তিনি ঝাড়খণ্ডি এবং সাঁওতাল সম্প্রদায়ের লোক। পাঁচ. আর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি এসেছে এসব আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। তা হল আদিবাসীদের ভাষার স্বীকৃতি। ভারতের রাঁচি বিশ্ববিদ্যালয়ে Tribal Regional Language Department প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই বিভাগে নয়টি ট্রাইবাল ভাষা পোস্ট গ্রাজুয়েট লেভেলে পড়ানো হয়। এবার গাইবান্ধা জেলার সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম এলাকায় গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতাল পল্লীতে ঘটে যাওয়া ৬ নভেম্বর ও তার পরবর্তী ঘটনাগুলো জানা ও বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব। বিভিন্ন প্রকাশিত তথ্য থেকে জানতে পারি এক সময় ওই এলাকাটি বন-জঙ্গলপূর্ণ এলাকা ছিল। এই অঞ্চলসহ উত্তরাঞ্চলের জয়পুরহাট, দিনাজপুর, সৈয়দপুর, নওগাঁ অঞ্চলের অনেক আবাদ যোগ্য জমি তৈরির পিছনে সমতলের আদিবাসীরা কাজ করেছে। আলোচ্য অঞ্চলে জঙ্গল কেটে জমি তৈরির কাজে আদিবাসী সাঁওতালদের অনেককে নিয়োগ করা হয় এবং তারা কিছু জমির মালিক হন। এভাবে কালক্রমে এখানে ১৫টি আদিবাসী পল্লী গড়ে উঠেছিল। এছাড়াও ৩টি বাঙালি গ্রাম ছিল। এখন পল্লীগুলোর মোট ১৮৪২ একর জমির মধ্যে সাঁওতালদের অংশ ১২০০ একর। এই জমির এক অংশে বসবাসকারী ১৫০০ পরিবারের মধ্যে ১২০০টি পরিবার সাঁওতাল সম্প্রদায়ভুক্ত। অবশিষ্টদের মধ্যে রয়েছে পাহাড়িয়া বাঙালি। তবে এসব পরিবারগুলিই চরম দরিদ্র ও বঞ্চনার মধ্যে বসবাস করে। এই প্রান্তিক মানুষগুলো সহজ-সরল। তবে সাহসী। রংপুর মহিমাগঞ্জ চিনিকল এবং চিনিকলের প্রয়োজনে আখচাষের জন্য ১৯৪৮ সালের রিক্যুজিশন অব প্রপার্টি অ্যাক্ট অনুসারে ১৯৫৫ সালে ভূমি রিক্যুজিশন শুরু হয়। ১৯৬২ সালের দিকে চিনিকলটি উৎপাদন শুরু করে। চালু হওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে এর কিছু কিছু কার্যক্রম গোটানো শুরু হয়। আখক্ষেতে সেচের জন্য ব্যবহৃত পাম্পগুলি থেকে প্রায় সাতশত পাম্প পাকিস্তান আমলেই খুলে নেয়া হয়। এভাবে চলতে থাকে এবং ২০০৪ সালে মিলটি ‘লে অফ’ ঘোষণা করা হয়। জমি তার মালিকদের ফেরত দেয়ার প্রশ্নটি সামনে আসলো। কারণ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে ধানচাষ, পুকুর খনন ইত্যাদি চুক্তি বর্হিভূত কাজে এই জমির ব্যবহার। আখ খামারের জন্য ব্যবহার না হলে চুক্তি অনুসারে মিল কর্তৃপক্ষ সরকারের কাছে জমি ফেরত দিবে এবং সরকার জমির পূর্বের মালিকের কাছে তা ফেরত দেবে। অথচ জমি পতিত না রেখে ১৮৪২ একরের পুরোটাই মিলের ম্যানেজার ও স্থানীয় কিছু নেতা জমিদারি কায়দায় পরিচালনা করে আসছে। এই জমি সরকার কর্তৃক রিক্যুজিশন, রংপুর মহিমাগঞ্জে চিনিকলের প্রয়োজনীয় আখচাষের জন্য ব্যবহার, চিনিকল বন্ধ, রিক্যুজিশনের চুক্তি অনুসারে জমি ফেরত পাওয়া নিয়ে জমি মালিকদের দীর্ঘদিন ধরে চলা আন্দোলন, ৬ই নভেম্বরের ঘটনা, সাঁওতাল পল্লী পুড়িয়ে দেয়া, গুলি চালানো, তিনজন সাঁওতালের মৃত্যু, আহত বন্দী সাঁওতালদের হাসপাতালে হাতকড়া পরিয়ে বেঁধে রাখা, কোর্ট থেকে নির্দেশ প্রদানের পর হাতকড়া খুলে দিতে বাধ্য হওয়া, চিকিৎসাধীন একজন বন্দী সাঁওতালের একটি চোখ নষ্ট হয়ে যাওয়া ও অন্যটিও প্রায় অন্ধ হওয়ার উপক্রম। গৃহহীন সাঁওতালদের খোলা আকাশের নীচে প্রায় অভুক্ত অবস্থায় পরিবার নিয়ে জীবন কাটানো। আর এরই মধ্যে চলে জমির মালিকানা নিয়ে আইনের ব্যাখ্যা নিয়ে নানা কূটকৌশল ও সময়ক্ষেপণ। প্রথমত ‘দ্যা ইমার্জেন্সি রিক্যুজিশন অব প্রপার্টি অ্যাক্ট ১৯৪৮’ বলে একটি আইন আছে। এই রিক্যুজিশন হল সরকার কোনো বিশেষ কাজের জন্য ব্যক্তির ভূমি নিতে পারে। তবে সেই কাজ শেষ না করা অথবা চালু না করলে ভূমির মালিককে ভূমি ফেরত দিতে হবে। রিক্যুজিশন ও এ্যাকুইজিশন এক কথা নয়। এ্যাকুইজিশন হল বিশেষ চুক্তির মাধ্যমে ব্যক্তির ভূমি সরকারি কাজে নেয়া হয়। ব্যবহার না করলেও মালিকানা সরকারের কাছেই থেকে যায়। এখানে আর একটি আইনের মারপ্যাঁচের উল্লেখ করতে হয়। ১৯৮২ সালে একটি অর্ডিন্যান্স জারি করা হয়। সেই আইনের মাধ্যমে রিক্যুজিশন ও এ্যাক্যুজিশনকে এক করে ফেলা হয়েছে। জমির মালিকানা নিয়ে আদিবাসী সাঁওতালেরা অনেক আগে থেকেই সংগঠিত হচ্ছিল। তাদের আন্দোলন সংঘবদ্ধ রূপ নেয় ২০১৩ সালে। আর ২০১৬ সালের মে সমাসে নিজেদের দাবির সমর্থনে ১০ হাজার আদিবাসীর সমাবেশ ঘটেছিল গোবিন্দগঞ্জে। ১০ এপ্রিল, ২০১৬ সালে গাইবান্ধায় ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ মানববন্ধন করে তারা। সংশ্লিষ্ট সকল স্থানে ভূমির মালিকানা দাবি করে আবেদনপত্র, স্মারকলিপি প্রদান করে। গণমাধ্যমে তাদের এসব কর্মসূচির কথা প্রচারিত হয়। সরকারি প্রশাসন তাদের বসবাসরত জমির মালিকানা দাবি করে উচ্ছেদ অভিযানে নামে। বসবাসকারী পল্লীবাসীরা বাধা দেয়। তাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে ছারখার করা হয়। ঘটে ৬ নভেম্বরের ঘটনা। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে দেখা যায়, এসব উচ্ছেদের আগে নোটিশ দিতে হয়। নোটিশে কাজ না হলে জেলা প্রশাসক ‘দখলকারী’দের সঙ্গে বৈঠক করবেন। ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমোদন নিয়ে মাইকিং করবেন। কোনো নোটিশও নাকি করা হয় নাই। তারপরও ঘটে গেল ৬ নভেম্বরের মতো নিষ্ঠুর অমানবিক ঘটনা। আমাদের মনে রাখতে হবে রক্ত দিয়ে, জীবন দিয়ে এই এলাকার আদিবাসীরা তাদের জমি ফিরে পাওয়ার আন্দোলন করছেন। আমরা তাদের এক সময়ের ভাষা-কৃষ্টি-সামাজিক আচার-আচরণ ফিরিয়ে দিতে না পারলেও অন্তত বেঁচে থাকার জন্য, বসবাসের জন্য জমিটুকু ফিরিয়ে দিতে পারি। ফিরিয়ে দিতে হবে। লেখক : সভাপতি, ঢাকা মহানগর উদীচী

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..